বাংলা সহায়ক

আবৃত্তির কবিতা

   

  
হঠাৎ দেখা

               - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 


রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা,

   ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন।

      আগে ওকে বারবার দেখেছি

            লালরঙের শাড়িতে

                 দালিম ফুলের মতো রাঙা;

আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,

                 আঁচল তুলেছে মাথায়

দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে

     মনে হল, কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব

               ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে,

            যে দূরত্ব সর্ষেখেতের শেষ সীমানায়

                     শালবনের নীলাঞ্জনে।

                থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা;

    চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে।

            হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে

                     আমাকে করলে নমস্কার।

            সমাজবিধির পথ গেল খুলে,

                      আলাপ করলেম শুরু --  

কেমন আছ, কেমন চলছে সংসার

                           ইত্যাদি।


      সে রইল জানলার বাইরের দিকে চেয়ে

যেন কাছের দিনের ছোঁয়াচ-পার-হওয়া চাহনিতে।

      দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো-একটা জবাব,

            কোনোটা বা দিলেই না।

      বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায় --

            কেন এ-সব কথা,

      এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ করে থাকা।

                 আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে

                       ওর সাথিদের সঙ্গে।

এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে।

            মনে হল কম সাহস নয়;

                 বসলুম ওর এক-বেঞ্চিতে।

গাড়ির আওয়াজের আড়ালে

                         বললে মৃদুস্বরে,

                 "কিছু মনে কোরো না,

            সময় কোথা সময় নষ্ট করবার।

      আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই;

               দূরে যাবে তুমি,

      দেখা হবে না আর কোনোদিনই।

    তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে,

      শুনব তোমার মুখে।

            সত্য করে বলবে তো?

আমি বললেম, "বলব।"

      বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল,

"আমাদের গেছে যে দিন

      একেবারেই কি গেছে,

            কিছুই কি নেই বাকি।"

একটুকু রইলেম চুপ করে;

      তারপর বললেম,

      "রাতের সব তারাই আছে

              দিনের আলোর গভীরে।"

খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম না কি।

    ও বললে, "থাক্‌, এখন যাও ও দিকে।"

           সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে;

                          আমি চললেম একা।


 


           সোনার তরী 

           - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 


গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।

কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।

রাশি রাশি ভারা ভারা

ধান কাটা হল সারা,

ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা।

কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।


একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,

চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।

পরপারে দেখি আঁকা

তরুছায়ামসীমাখা

গ্রামখানি মেঘে ঢাকা প্রভাতবেলা–

এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।


গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,

দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।

ভরা-পালে চলে যায়,

কোনো দিকে নাহি চায়,

ঢেউগুলি নিরুপায় ভাঙে দু-ধারে–

দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।


ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,

বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।

যেয়ো যেথা যেতে চাও,

যারে খুশি তারে দাও,

শুধু তুমি নিয়ে যাও ক্ষণিক হেসে

আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।


যত চাও তত লও তরণী-‘পরে।

আর আছে?– আর নাই, দিয়েছি ভরে।

এতকাল নদীকূলে

যাহা লয়ে ছিনু ভুলে

সকলি দিলাম তুলে থরে বিথরে–

এখন আমারে লহ করুণা করে।


ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই– ছোটো সে তরী

আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।

শ্রাবণগগন ঘিরে

ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,

শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি–

যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।



                 নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ 

                        - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 


আজি এ প্রভাতে রবির কর

কেমনে পশিল প্রাণের 'পর,

কেমনে পশিল গুহার আঁধারে

প্রভাত-পাখির গান।

না জানি কেন রে         এতদিন পরে

জাগিয়া উঠিল প্রাণ।

জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,

ওরে        উথলি উঠেছে বারি,

ওরে       প্রাণের বাসনা  প্রাণের আবেগ

রুধিয়া রাখিতে নারি।

থর থর করি কাঁপিছে ভূধর,

শিলা রাশি রাশি পড়িছে খসে,

ফুলিয়া ফুলিয়া ফেনিল সলিল

গরজি উঠিছে দারুণ রোষে।

হেথায় হোথায় পাগলের প্রায়

ঘুরিয়া ঘুরিয়া মাতিয়া বেড়ায়,

বাহিরিতে চায়,         দেখিতে না পায়

   কোথায় কারার দ্বার।

প্রভাতেরে যেন লইতে কাড়িয়া

আকাশেরে যেন ফেলিতে ছিঁড়িয়া

উঠে শূন্যপানে--পড়ে আছাড়িয়া

করে শেষে হাহাকার।

প্রাণের উল্লাসে ছুটিতে চায়

ভূধরের হিয়া টুটিতে চায়,

আলিঙ্গন তরে ঊর্ধ্বে বাহু তুলি

আকাশের পানে উঠিতে চায়।


প্রভাতকিরণে পাগল হইয়া

জগৎ-মাঝারে লুটিতে চায়।

কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন,

চারিদিকে তার বাঁধন কেন?

ভাঙ্‌ রে হৃদয় ভাঙ্‌ রে বাঁধন,

সাধ্‌ রে আজিকে প্রাণের সাধন,

লহরীর পরে লহরী তুলিয়া

আঘাতের পর আঘাত কর্‌।

মাতিয়া যখন উঠিছে পরান,

কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!

উথলি যখন উঠিছে বাসনা,

জগতে তখন কিসের ডর!


সহসা আজি এ জগতের মুখ

নূতন করিয়া দেখিনু কেন?

একটি পাখির আধখানি তান

জগতের গান গাহিল যেন!

জগৎ দেখিতে হইব বাহির,

আজিকে করেছি মনে,

দেখিব না আর নিজেরি স্বপন

বসিয়া গুহার কোণে।

আমি       ঢালিব করুণাধারা,

আমি       ভাঙিব পাষাণকারা,

আমি       জগৎ প্লাবিয়া বেড়াব গাহিয়া

আকুল পাগল-পারা;

কেশ এলাইয়া, ফুল কুড়াইয়া,

রামধনু-আঁকা পাখা উড়াইয়া,

রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া,

দিব রে পরান ঢালি।

শিখর হইতে শিখরে ছুটিব,

ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব

হেসে খলখল গেয়ে কলকল

তালে  তালে দিব তালি।

তটিনী হইয়া যাইব বহিয়া--

যাইব বহিয়া--যাইব বহিয়া--

হৃদয়ের কথা কহিয়া কহিয়া

গাহিয়া গাহিয়া গান,

যত দেব প্রাণ       বহে যাবে প্রাণ

ফুরাবে না আর প্রাণ।

এত কথা আছে     এত গান আছে

এত প্রাণ আছে মোর,

এত সুখ আছে      এত সাধ আছে

প্রাণ হয়ে আছে ভোর।


এত সুখ কোথা     এত রূপ কোথা

এত খেলা কোথা আছে!

যৌবনের বেগে      বহিয়া যাইব

কে জানে কাহার কাছে!

অগাধ বাসনা        অসীম আশা

জগৎ দেখিতে চাই!

জাগিয়াছে সাধ      চরাচরময়

প্লাবিয়া বহিয়া যাই।

যত প্রাণ আছে ঢালিতে পারি,

যত কাল আছে বহিতে পারি,

যত দেশ আছে ডুবাতে পারি,

তবে আর কিবা চাই!    

পরানের সাধ তাই।

 

কী জানি কী হল আজি জাগিয়া উঠিল প্রাণ,

দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান--

"পাষাণ-বাঁধন টুটি, ভিজায়ে কঠিন ধরা,

বনেরে শ্যামল করি, ফুলেরে ফুটায়ে ত্বরা

সারাপ্রাণ ঢালি দিয়া,

জুড়ায়ে জগৎ-হিয়া--

আমার প্রাণের মাঝে কে আসিবি আয় তোরা!'


আমি যাব, আমি যাব, কোথায় সে, কোন্‌ দেশ--

জগতে ঢালিব প্রাণ,

গাহিব করুণাগান,

উদ্‌বেগ-অধীর হিয়া

সুদূর সমুদ্রে গিয়া

সে প্রাণ মিশাব আর সে গান করিব শেষ।


ওরে, চারিদিকে মোর

এ কী কারাগার ঘোর!

ভাঙ্‌ ভাঙ্‌ ভাঙ্‌ কারা, আঘাতে আঘাত কর্‌!

  ওরে,আজ কী গান গেয়েছে পাখি,

এয়েছে রবির কর!



                     কৃপণ

                   - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 


    আমি    ভিক্ষা করে ফিরতেছিলেম

                          গ্রামের পথে পথে,

              তুমি তখন চলেছিলে

                          তোমার স্বর্ণরথে।

              অপূর্ব এক স্বপ্ন-সম

              লাগতেছিল চক্ষে মম--

              কী বিচিত্র শোভা তোমার,

                          কী বিচিত্র সাজ।

              আমি মনে ভাবেতেছিলেম,

                          এ কোন্‌ মহারাজ।

 

আজি   শুভক্ষণে রাত পোহালো

                          ভেবেছিলেম তবে,

              আজ আমারে দ্বারে দ্বারে

                         ফিরতে নাহি হবে।

              বাহির হতে নাহি হতে

              কাহার দেখা পেলেম পথে,

              চলিতে রথ ধনধান্য

                         ছড়াবে দুই ধারে--

              মুঠা মুঠা কুড়িয়ে নেব,

                          নেব ভারে ভারে।

 

    দেখি    সহসা রথ থেমে গেল

                          আমার কাছে এসে,

              আমার মুখপানে চেয়ে

                          নামলে তুমি হেসে।

              দেখে মুখের প্রসন্নতা

              জুড়িয়ে গেল সকল ব্যথা,

              হেনকালে কিসের লাগি

                          তুমি অকস্মাৎ

              "আমায় কিছু দাও গো' বলে

                          বাড়িয়ে দিলে হাত।


    মরি,    এ কী কথা রাজাধিরাজ,

                          "আমায় দাও গো কিছু'!

              শুনে ক্ষণকালের তরে

                          রইনু মাথা-নিচু।

              তোমার কী-বা অভাব আছে

              ভিখারী ভিক্ষুকের কাছে।

              এ কেবল কৌতুকের বশে

                                  আমায় প্রবঞ্চনা।

                          ঝুলি হতে দিলেম তুলে

                          একটি ছোটো কণা।


      যবে       পাত্রখানি ঘরে এনে

                    উজাড় করি-- এ কী!

                   ভিক্ষামাঝে একটি ছোটো

                    সোনার কণা দেখি।

                   দিলেম যা রাজ-ভিখারীরে

                   স্বর্ণ হয়ে এল ফিরে,

                   তখন কাঁদি চোখের জলে

                    দুটি নয়ন ভরে--

                   তোমায় কেন দিই নি আমার

                    সকল শূন্য করে।


 


                    বাঁশি

            - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 




কিনু গোয়ালার গলি।

                   দোতলা বাড়ির

          লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর

                       পথের ধারেই।

        লোনা-ধরা দেওয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,

               মাঝে মাঝে স্যাঁতা-পড়া দাগ।



মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি

           সিদ্ধিদাতা গণেশের

                   দরজার 'পরে আঁটা।

           আমি ছাড়া ঘরে থাকে আরেকটা জীব

                   এক ভাড়াতেই,

                       সেটা টিকটিকি।

                   তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু,

                       নেই তার অন্নের অভাব।

বেতন পঁচিশ টাকা,

    সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি।

        খেতে পাই দত্তদের বাড়ি

              ছেলেকে পড়িয়ে।

        শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই,

           সন্ধেটা কাটিয়ে আসি,

        আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে।

এঞ্জিনের ধস্‌ ধস্‌,

        বাঁশির আওয়াজ,

           যাত্রীর ব্যস্ততা,

               কুলি-হাঁকাহাঁকি।

                   সাড়ে দশ বেজে যায়,

           তার পরে ঘরে এসে নিরালা নিঃঝুম অন্ধকার।


 

ধলেশ্বরীনদীতীরে পিসিদের গ্রাম।

        তাঁর দেওরের মেয়ে,

অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক।

          লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল--

        সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে।

    মেয়েটা তো রক্ষে পেলে,

           আমি তথৈবচ।

ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসাযাওয়া--

           পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।



        বর্ষা ঘন ঘোর।

    ট্রামের খরচা বাড়ে,

মাঝে মাঝে মাইনেও কাটা যায়।

           গলিটার কোণে কোণে

        জমে ওঠে পচে ওঠে

       আমের খোসা ও আঁঠি, কাঁঠালের ভূতি,

                          মাছের কান্‌কা,

মরা বেড়ালের ছানা,

        ছাইপাঁশ আরো কত কী যে!

    ছাতার অবস্থাখানা জরিমানা-দেওয়া

               মাইনের মতো,

                   বহু ছিদ্র তার।

           আপিসের সাজ

    গোপীকান্ত গোঁসাইয়ের মনটা যেমন,

               সর্বদাই রসসিক্ত থাকে।

                   বাদলের কালো ছায়া

               স্যাঁৎসেঁতে ঘরটাতে ঢুকে

                   কলে-পড়া জন্তুর মতন

                       মূর্ছায় অসাড়।

    দিন রাত মনে হয়, কোন্‌ আধমরা

জগতের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি।

 

    গলির মোড়েই থাকে কান্তবাবু,

        যত্নে-পাট-করা লম্বা চুল,

           বড়ো বড়ো চোখ,

               শৌখিন মেজাজ।

           কর্নেট বাজানো তার শখ।

    মাঝে মাঝে সুর জেগে ওঠে

           এ গলির বীভৎস বাতাসে--

    কখনো গভীর রাতে,

        ভোরবেলা আধো অন্ধকারে,

    কখনো বৈকালে

        ঝিকিমিকি আলোয় ছায়ায়।

    হঠাৎ সন্ধ্যায়

সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান,

        সমস্ত আকাশে বাজে

           অনাদি কালের বিরহবেদনা।

               তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে

                   এ গলিটা ঘোর মিছে,

            দুর্বিষহ, মাতালের প্রলাপের মতো।

                   হঠাৎ খবর পাই মনে

           আকবর বাদশার সঙ্গে

               হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।

                   বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে

           ছেঁড়াছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে

                          এক বৈকুণ্ঠের দিকে।

    এ গান যেখানে সত্য

অনন্ত গোধূলিলগ্নে

        সেইখানে

           বহি চলে ধলেশ্বরী;

        তীরে তমালের ঘন ছায়া;

               আঙিনাতে

        যে আছে অপেক্ষা ক'রে, তার

           পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।


 


            বনলতা সেন

             - জীবনানন্দ দাশ 


হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে

অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে

সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;

আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,

আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।


চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,

মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর

হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,

তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’

পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।


সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন

সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;

সব পাখি ঘরে আসে— সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;

থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।





অমলকান্তি 

 - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী



অমলকান্তি আমার বন্ধু,

ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।

রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারত না,

শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে

এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে,

দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।


আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।

অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি।

সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!

ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,

জাম আর জামরুলের পাতায়

যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে।


আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।

অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।

সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।

মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে;

চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে।”

আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।


আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,

অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,

যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,

উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।

অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।

অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।

সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে

ভাবতে-ভাবতে

যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।




মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়

       - জয় গোস্বামী


বেণীমাধব, বেণীমাধব, তোমার বাড়ি যাবো

বেণীমাধব, তুমি কি আর আমার কজথা ভাবো?

বেণীমাধব, মোহনবাঁশি তমাল তরুমূলে

বাজিয়েছিলে, আমি তখন মালতী ইস্কুলে

ডেস্কে বসে অঙ্ক করি, ছোট্ট ক্লাসঘর

বাইরে দিদিমণির পাশে দিদিমণির বর

আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন শাড়ি

আলাপ হলো, বেণীমাধব, সুলেখাদের বাড়ি


বেণীমাধব, বেণীমাধব, লেখাপড়ায় ভালো

শহর থেকে বেড়াতে এলে, আমার রঙ কালো

তোমায় দেখে এক দৌড়ে পালিয়ে গেছি ঘরে

বেণীমাধব, আমার বাবা দোকানে কাজ করে

কুঞ্জে অলি গুঞ্জে তবু, ফুটেছে মঞ্জরী

সন্ধেবেলা পড়তে বসে অঙ্কে ভুল করি

আমি তখন নবম শ্রেণী, আমি তখন ষোল

ব্রীজের ধারে, বেণীমাধব, লুকিয়ে দেখা হলো


বেণীমাধব, বেণীমাধব, এতদিনের পরে

সত্যি বলো, সে সব কথা এখনো মনে পড়ে?

সে সব কথা বলেছো তুমি তোমার প্রেমিকাকে?

আমি কেবল একটি দিন তোমার পাশে তাকে

দেখেছিলাম আলোর নীচে; অপূর্ব সে আলো!

স্বীকার করি, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো

জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চেখ

বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ওদের ভালো হোক।


রাতে এখন ঘুমাতে যাই একতলার ঘরে

মেঝের উপর বিছানা পাতা, জ্যো‍‍‌ৎস্না এসে পড়ে

আমার পরে যে বোন ছিলো চোরাপথের বাঁকে

মিলিয়ে গেছে, জানি না আজ কার সঙ্গে থাকে

আজ জুটেছে, কাল কী হবে? – কালের ঘরে শনি

আমি এখন এই পাড়ায় সেলাই দিদিমণি

তবু আগুন, বেণীমাধব, আগুন জ্বলে কই?

কেমন হবে, আমিও যদি নষ্ট মেয়ে হই?




      পাগলী, তোমার সঙ্গে 

             - জয় গোস্বামী



পাগলী, তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোবালি কাটাব জীবন

এর চোখে ধাঁধা করব, ওর জল করে দেব কাদা

পাগলী, তোমার সঙ্গে ঢেউ খেলতে যাব দু’কদম।


অশান্তি চরমে তুলব, কাকচিল বসবে না বাড়িতে

তুমি ছুঁড়বে থালা বাটি, আমি ভাঙব কাঁচের বাসন

পাগলী, তোমার সঙ্গে বঙ্গভঙ্গ জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে ৪২ কাটাব জীবন।


মেঘে মেঘে বেলা বাড়বে, ধনে পুত্রে লক্ষ্মী লোকসান

লোকাসান পুষিয়ে তুমি রাঁধবে মায়া প্রপন্ঞ্চ ব্যন্জ্ঞন

পাগলী, তোমার সঙ্গে দশকর্ম জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে দিবানিদ্রা কাটাব জীবন।


পাগলী, তোমার সঙ্গে ঝোলভাত জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে মাংসরুটি কাটাব জীবন

পাগলী, তোমার সঙ্গে নিরক্ষর জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে চার অক্ষর কাটাব জীবন।


পাগলী, তোমার সঙ্গে বই দেখব প্যারামাউন্ট হলে

মাঝে মাঝে মুখ বদলে একাডেমি রবীন্দ্রসদন

পাগলী, তোমার সঙ্গে নাইট্যশালা জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে কলাকেন্দ্র কাটাব জীবন।


পাগলী, তোমার সঙ্গে বাবুঘাট জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে দেশপ্রিয় কাটাব জীবন

পাগলী, তোমার সঙ্গে সদা সত্য জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে ‘কী মিথ্যুক’ কাটাব জীবন।


এক হাতে উপায় করব, দুহাতে উড়িয়ে দেবে তুমি

রেস খেলব জুয়া ধরব ধারে কাটাব সহস্র রকম

লটারি, তোমার সঙ্গে ধনলক্ষ্মী জীবন কাটাব

লটারি, তোমার সঙ্গে মেঘধন কাটাব জীবন।


দেখতে দেখতে পুজো আসবে, দুনিয়া চিত্‍কার করবে সেল

দোকানে দোকানে খুঁজব রূপসাগরে অরূপরতন

পাগলী, তোমার সঙ্গে পুজোসংখ্যা জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে রিডাকশনে কাটাব জীবন।


পাগলী, তোমার সঙ্গে কাঁচা প্রুফ জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে ফুলপেজ কাটাব জীবন

পাগলী, তোমার সঙ্গে লে আউট জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে লে হালুয়া কাটাব জীবন।


কবিত্ব ফুড়ুত্‍ করবে, পিছু পিছু ছুটব না হা করে

বাড়ি ফিরে লিখে ফেলব বড়ো গল্প উপন্যাসোপম

পাগলী, তোমার সঙ্গে কথাশিল্প জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে বকবকম কাটাব জীবন।


নতুন মেয়ের সঙ্গে দেখা করব লুকিয়ে চুরিয়ে

ধরা পড়ব তোমার হাতে, বাড়ি ফিরে হেনস্তা চরম

পাগলী, তোমার সঙ্গে ভ্যাবাচ্যাকা জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে হেস্তনেস্ত কাটাব জীবন।


পাগলী, তোমার সঙ্গে পাপবিদ্ধ জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে ধর্মমতে কাটাব জীবন

পাগলী, তোমার সঙ্গে পুজা বেদি জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে মধুমালা কাটাব জীবন।


দোঁহে মিলে টিভি দেখব, হাত দেখাতে যাব জ্যোতিষীকে

একুশটা উপোস থাকবে, ছাব্বিশটা ব্রত উদযাপন

পাগলী, তোমার সঙ্গে ভাড়া বাড়ি জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে নিজ ফ্ল্যাট কাটাব জীবন।


পাগলী, তোমার সঙ্গে শ্যাওড়াফুলি জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে শ্যামনগর কাটাব জীবন

পাগলী, তোমার সঙ্গে রেল রোকো জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে লেট স্লিপ কাটাব জীবন।


পাগলী, তোমার সঙ্গে আশাপূর্ণা জীবন কাটাব

আমি কিনব ফুল, তুমি ঘর সাজাবে যাবজ্জীবন

পাগলী, তোমার সঙ্গে জয় জওয়ান জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে জয় কিষান কাটাব জীবন।


সন্ধেবেলা ঝগড়া হবে, হবে দুই বিছানা আলাদা

হপ্তা হপ্তা কথা বন্ধ মধ্যরাতে আচমকা মিলন

পাগলী, তোমার সঙ্গে ব্রক্ষ্মচারী জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে আদম ইভ কাটাব জীবন।


পাগলী, তোমার সঙ্গে রামরাজ্য জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে প্রজাতন্ত্রী কাটাব জীবন

পাগলী, তোমার সঙ্গে ছাল চামড়া জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে দাঁতে দাঁত কাটাব জীবন।


এর গায়ে কনুই মারব রাস্তা করব ওকে ধাক্কা দিয়ে

এটা ভাঙলে ওটা গড়ব, ঢেউ খেলব দু দশ কদম

পাগলী, তোমার সঙ্গে ধুলোঝড় জীবন কাটাব

পাগলী, তোমার সঙ্গে ‘ভোর ভয়োঁ’ কাটাব জীবন।



ঈশ্বর আর প্রেমিকের সংলাপ 

          - জয় গোস্বামী


— ‘সে যদি তোমাকে অগ্নিতে ফেলে মারে?’

বিনা চেষ্টায় মরে যাব একেবারে


— ‘সে যদি তোমাকে মেঘে দেয় উত্থান?’

বৃষ্টিতে, আমি বৃষ্টিতে খানখান


— ‘সে যদি তোমাকে পিষে করে ধুলোবালি?’

পথ থেকে পথে উড়ে উড়ে যাব খালি


— ‘উড়বে?– আচ্ছা, ছিঁড়ে দেয় যদি পাখা?’

পড়তে পড়তে ধরে নেব ওর শাখা


— ‘যদি শাখা থেকে নীচে ফেলে দেয় তোকে?’

কী আর করব? জড়িয়ে ধরব ওকেই


বলো কী বলব, আদালত, কিছু বলবে কি এরপরও?

— ‘যাও, আজীবন অশান্তি ভোগ করো!’




             প্রাক্তন 

            - জয় গোস্বামী


ঠিক সময়ে অফিসে যায়?

ঠিক মতো খায় সকালবেলা?

টিফিনবাক্স সঙ্গে নেয় কি?

না ক্যান্টিনেই টিফিন করে?

জামা কাপড় কে কেচে দেয়?

চা করে কে আগের মতো?

দুগগার মা ক’টায় আসে?

আমায় ভোরে উঠতে হত

সেই শার্টটা পরে এখন?

ক্যাটকেটে সেই নীল রঙ টা?

নিজের তো সব ওই পছন্দ

আমি অলিভ দিয়েছিলাম

কোন রাস্তায় বাড়ি ফেরে?

দোকানঘরের বাঁ পাশ দিয়ে

শিবমন্দির, জানলা থেকে

দেখতে পেতাম রিক্সা থামল

অফিস থেকে বাড়িই আসে?

নাকি সোজা আড্ডাতে যায়?

তাসের বন্ধু, ছাইপাঁশেরও

বন্ধুরা সব আসে এখন?

টেবিলঢাকা মেঝের ওপর

সমস্ত ঘর ছাই ছড়ানো

গেলাস গড়ায় বোতল গড়ায়

টলতে টলতে শুতে যাচ্ছে

কিন্তু বোতল ভেঙ্গে আবার

পায়ে ঢুকলে রক্তারক্তি

তখন তো আর হুঁশ থাকে না

রাতবিরেতে কে আর দেখবে।

কেন, ওই যে সেই মেয়েটা।

যার সঙ্গে ঘুরত তখন।

কোন মেয়েটা? সেই মেয়েটা?

সে তো কবেই সরে এসেছে!

বেশ হয়েছে, উচিত শাস্তি

অত কান্ড সামলাবে কে!

মেয়েটা যে গণ্ডগোলের

প্রথম থেকেই বুঝেছিলাম

কে তাহলে সঙ্গে আছে?

দাদা বৌদি? মা ভাইবোন!

তিন কূলে তো কেউ ছিল না

এক্কেবারে একলা এখন।

কে তাহলে ভাত বেড়ে দেয়?

কে ডেকে দেয় সকাল সকাল?

রাত্তিরে কে দরজা খোলে?

ঝক্কি পোহায় হাজার রকম?

কার বিছানায় ঘুমোয় তবে

কার গায়ে হাত তোলে এখন

কার গায়ে হাত তোলে এখন?




        টিউটোরিয়াল 

           - জয় গোস্বামী


তোমাকে পেতেই হবে শতকরা অন্তত নব্বই (বা নব্বইয়ের বেশি)

তোমাকে হতেই হবে একদম প্রথম

তার বদলে মাত্র পঁচাশি!

পাঁচটা নম্বর কম কেন? কেন কম?

এই জন্য আমি রোজ মুখে রক্ত তুলে খেটে আসি?

এই জন্যে তোমার মা কাক ভোরে উঠে সব কাজকর্ম সেরে

ছোটবেলা থেকে যেতো তোমাকে ইস্কুলে পৌঁছে দিতে?

এই জন্য কাঠফাটা রোদ্দুরে কি প্যাচপ্যাচে বর্ষায়

সারাদিন বসে থাকতো বাড়ির রোয়াকে কিংবা পার্কের বেঞ্চিতে?

তারপর ছুটি হতে, ভিড় বাঁচাতে মিনিবাস ছেড়ে

অটো-অলাদের ঐ খারাপ মেজাজ সহ্য করে

বাড়ি এসে, না হাঁপিয়ে, আবার তোমার পড়া নিয়ে

বসে পড়তো, যতক্ষণ না আমি বাড়ি ফিরে

তোমার হোমটাস্ক দেখছি, তারপরে আঁচলে মুখ মুছে

ঢুলতো গিয়ে ভ্যাপসা রান্নাঘরে?

এই জন্যে? এই জন্যে হাড়ভাঙা ওভারটাইম করে

তোমার জন্য আন্টি রাখতাম?

মোটা মাইনে, ভদ্রতার চা-জলখাবার

হপ্তায় তিনদিন, তাতে কত খরচা হয় রে রাস্কেল?

বুদ্ধি আছে সে হিসেব করবার?

শুধু ছোটকালে নয়, এখনো যে টিউটোরিয়ালে

পাঠিয়েছি, জানিস না, কিরকম খরচাপাতি তার?

ওখানে একবার ঢুকলে সবাই প্রথম হয়। প্রথম, প্রথম!

কারো অধিকার নেই দ্বিতীয় হওয়ার।

রোজ যে যাস, দেখিস না কত সব বড় বড়

বাড়ি ও পাড়ায়

কত সব গাড়ি আসে, কত বড় আড়ি করে

বাবা মা-রা ছেলেমেয়েদের নিতে যায়?

আর ঐ গাড়ির পাশে, পাশে না পিছনে-

ঐ অন্ধকারটায়

রোজ দাঁড়াতে দেখিস না নিজের বাবাকে?

হাতে অফিসের ব্যাগ, গোপন টিফিন বাক্স, ঘেমো জামা, ভাঙা মুখ –

দেখতে পাসনা? মন কোথায় থাকে?

ঐ মেয়েগুলোর দিকে? যারা তোর সঙ্গে পড়তে আসে?

ওরা তোকে পাত্তা দেবে? ভুলেও ভাবিস না!

ওরা কত বড়লোক!

তোকে পাত্তা পেতে হলে থাকতে হবে বিদেশে, ফরেনে

এন আর আই হতে হবে! এন আর আই, এন আর আই!

তবেই ম্যাজিক দেখবি

কবিসাহিত্যিক থেকে মন্ত্রী অব্দি একডাকে চেনে

আমাদেরও নিয়ে যাবি, তোর মাকে, আমাকে

মাঝে মাঝে রাখবি নিজের কাছে এনে

তার জন্য প্রথম হওয়া দরকার প্রথমে

তাহলেই ছবি ছাপবে খবর কাগজ

আরো দরজা খুলে যাবে, আরো পাঁচ আরো পাঁচ

আরো আরো পাঁচ

পাঁচ পাঁচ করেই বাড়বে, অন্য দিকে মন দিস না,

বাঁচবি তো বাঁচার মত বাঁচ!

না বাপী না, না না বাপী, আমি মন দিই না কোনোদিকে

না বাপী না, না না আমি তাকাই না মেয়েদের দিকে

ওরা তো পাশেই বসে, কেমন সুগন্ধ আসে, কথা বলে, না না বাপী পড়ার কথাই

দেখি না, উত্তর দিই, নোট দিই নোট নিই

যেতে আসতে পথে ঘাটে

কত ছেলে মেয়ে গল্প করে

না বাপী না, আমি মেয়েদের সঙ্গে মিশতে যাই না কখোনো

যেতে আসতে দেখতে পাই কাদা মেখে কত ছেলে বল খেলছে মাঠে

কত সব দুষ্টু ছেলে পার্কে প্রজাপতি ধরছে

চাকা বা ডাঙ্গুলি খেলছে কত ছোটোলোক

না, আমি খেলতে যাই না কখোনো

খেলতে যাইনি। না আমার বন্ধু নেই

না বাপী না, একজন আছে, অপু, একক্লাসে পড়ে

ও বলে যে ওর বাবাও বলেছে প্রথম হতে

বলেছে, কাগজে ছবি, ওর বাবা, ওকে ….

হ্যাঁ বাপী হ্যা, না না বাপী, অপু বলেছে পড়াশোনা হয়নি একদম

বলেছে ও ব্যাক পাবে, ব্যাক পেলে ও বলেছে, বাড়িতে কোথায়

বাথরুম সাফ করার অ্যাসিড আছে ও জানে,

হ্যাঁ বাপী হ্যা, ও বলেছে,

উঠে যাবে কাগজের প্রথম পাতায় …..




বাংলাটা ঠিক আসে না 

    - ভবানীপ্রসাদ মজুমদার 



ছেলে আমার খুব ‘সিরিয়াস’ কথায়-কথায় হাসে না

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।

ইংলিশে ও ‘রাইমস’ বলে

‘ডিবেট’ করে, পড়াও চলে

আমার ছেলে খুব ‘পজেটিভ’ অলীক স্বপ্নে ভাসে না

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।


‘ইংলিশ’ ওর গুলে খাওয়া, ওটাই ‘ফাস্ট’ ল্যাঙ্গুয়েজ

হিন্দি সেকেন্ড, সত্যি বলছি, হিন্দিতে ওর দারুণ তেজ।

কী লাভ বলুন বাংলা প’ড়ে?

বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে?

বেঙ্গলি ‘থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ তাই, তেমন ভালোবাসে না

জানে দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।


বাংলা আবার ভাষা নাকি, নেই কোনও ‘চার্ম’ বেঙ্গলিতে

সহজ-সরল এই কথাটা লজ্জা কীসের মেনে নিতে?

ইংলিশ ভেরি ফ্যান্টাসটিক

হিন্দি সুইট সায়েন্টিফিক

বেঙ্গলি ইজ গ্ল্যামারলেস, ওর ‘প্লেস’ এদের পাশে না

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।


বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে

শুনলে বেশি গা জ্ব’লে যায়, একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে।

কীসের গরব? কীসের আশা?

আর চলে না বাংলা ভাষা

কবে যেন হয় ‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না?

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।


ইংলিশ বেশ বোমবাস্টিং শব্দে ঠাসা দারুণ ভাষা

বেঙ্গলি ইজ ডিসগাস্টিং, ডিসগাস্টিং সর্বনাশা।

এই ভাষাতে দিবানিশি

হয় শুধু ভাই ‘পি.এন.পি.সি’

এই ভাষা তাই হলেও দিশি, সবাই ভালোবাসে না

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।


বাংলা ভাষা নিয়েই নাকি এংলা-প্যাংলা সবাই মুগ্ধ

বাংলা যাদের মাতৃভাষা, বাংলা যাদের মাতৃদুগ্ধ

মায়ের দুধের বড়ই অভাব

কৌটোর দুধ খাওয়াই স্বভাব

ওই দুধে তেজ-তাকত হয় না, বাংলাও তাই হাসে না

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।


বিদেশে কী বাংলা চলে? কেউ বোঝে না বাংলা কথা

বাংলা নিয়ে বড়াই করার চেয়েও ভালো নিরবতা।

আজ ইংলিশ বিশ্বভাষা

বাংলা ফিনিশ, নিঃস্ব আশা

বাংলা নিয়ে আজকাল কেউ সুখের স্বর্গে ভাসে না

জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসেনা।


শেক্সপীয়র, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলী বা কীটস বা বায়রন

ভাষা ওদের কী বলিষ্ঠ, শক্ত-সবল যেন আয়রন

কাজী নজরুল- রবীন্দ্রনাথ

ওদের কাছে তুচ্ছ নেহাত

মাইকেল হেরে বাংলায় ফেরে, আবেগে-উচছ্বাসে না

জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসেনা।




        দেশলাই কাঠি

        - সুকান্ত ভট্টাচার্য 


আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি

এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না:

তবু জেনো

মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ—

বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;

আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।


মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল?

ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন—

আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!

কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,

কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাৎ,

আমি একাই—ছোট্ট একটা দেশলাই কাঠি।


এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে

তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?

মনে নেই? এই সেদিন—

আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;

চমকে উঠেছিলে—

আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।


আমাদের কী অসীম শক্তি

তা তো অনুভব করেছ বারংবার;

তবু কেন বোঝ না,

আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,


আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব

শহরে, গঞ্জে, গ্রামে—দিগন্ত থেকে দিগন্তে।

আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়—

তা তো তোমরা জানোই!

কিন্তু তোমরা তো জানো না:

কবে আমরা জ্বলে উঠব—

সবাই—শেষবারের মতো!



একটি মোরগের কাহিনী

- সুকান্ত ভট্টাচার্য 


একটি মোরগ হঠাৎ আশ্রয় পেয়ে গেল

    বিরাট প্রাসাদের ছোট্ট এক কোণে,

      ভাঙা প্যাকিং বাক্সের গাদায়—

          আরো দু’তিনটি মুরগীর সঙ্গে।


আশ্রয় যদিও মিলল,

            উপযুক্ত আহার মিলল না।

সুতীক্ষ্ণ চিৎকারে প্রতিবাদ জানিয়ে

       গলা ফাটাল সেই মোরগ

             ভোর থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত—

তবুও সহানুভূতি জানাল না সেই বিরাট শক্ত ইমারত।


তারপর শুরু হল তাঁর আঁস্তাকুড়ে আনাগোনা:

       আশ্চর্য! সেখানে প্রতিদিন মিলতে লাগল

ফেলে দেওয়া ভাত-রুটির চমৎকার প্রচুর খাবার!


তারপর এক সময় আঁস্তাকুড়েও এল অংশীদার—

       ময়লা ছেঁড়া ন্যাকড়া পরা দু’তিনটে মানুষ;

কাজেই দুর্বলতার মোরগের খাবার গেল বন্ধ হয়ে।


খাবার! খাবার! খানিকটা খাবার!

      অসহায় মোরগ খাবারের সন্ধানে

           বার বার চেষ্টা করল প্রাসাদে ঢুকতে,

             প্রত্যেকবারই তাড়া খেল প্রচণ্ড।

ছোট্ট মোরগ ঘাড় উঁচু করে স্বপ্ন দেখে-—

‘প্রাসাদের ভেতর রাশি রাশি খাবার’!


তারপর সত্যিই সে একদিন প্রাসাদে ঢুকতে পেল,

        একেবারে সোজা চলে এল

ধপ্‌ধপে সাদা দামী কাপড়ে ঢাকা খাবার টেবিলে;

             অবশ্য খাবার খেতে নয়—

             খাবার হিসেবে॥



           রানার 

        - সুকান্ত ভট্টাচার্য 


রানার ছুটেছে তাই ঝুম ঝুম ঘন্টা বাজছে রাতে

রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,

রানার চলেছে, রানার!

রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার।

দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-

কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার।


রানার! রানার!

জানা-অজানার

বোঝা আজ তার কাঁধে,

বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে;

রানার চলেছে, বুঝি ভোর হয় হয়,

আরো জোরে, আরো জোরে, এ রানার দুর্বার দুর্জয়।

তার জীবনের স্বপ্নের মত পিছে সরে যায় বন,


আরো পথ, আরো পথ-বুঝি হয় লাল ও-পূর্ব কোণ।

অবাক রাতের তারারা আকাশে মিট্ মিট্ করে চায়;

কেমন ক'রে এ রানার সবেগে হরিণের মত যায়।

কত গ্রাম, কত পথ যায় সরে সরে

শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে;

হাতে লন্ঠন করে ঠন্ ঠন্, জোনাকিরা দেয় আলো

মাভৈঃ; রানার! এখনো রাতের কালো।


এমনি ক’রেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,

পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে ‘মেলে’।

ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে

জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।

অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে, অনুরাগে,

ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে।


রানার! রানার!

এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?

রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে?

ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া,

পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,

রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,

দস্যুর ভয়, তার চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে

কত চিঠি লেখে লোকে-

কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে

এর দুঃখের চিঠি পড়বেনা জানি কেউ কোন দিনও,

এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,

এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,

এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে।

দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি-,

এ-কে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি-

রানার! রানার! কি হবে এ বোঝা ব'য়ে?

কি হবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষ'য়ে ক্ষ'য়ে?

রানার! রানার! ভোর তো হয়েছে-আকাশ হয়েছে লাল,

আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল?


রানার! গ্রামের রানার!

সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;

শপথের চিঠি নিয়ে চল আজ

ভীরুতা পিছনে ফেলে-

পৌঁছে দাও এ নতুন খবর

অগ্রগতির ‘মেলে’,

দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি-

নেই দেরী নেই আর,

ছুটে চলো, ছুটে চলো, আরো বেগে

দুর্দম, হে রানার।।



      অতি কিশোরের ছড়া

           - সুকান্ত ভট্টাচার্য 


তোমরা আমায় নিন্দে ক'রে দাও না যতই গালি,

আমি কিন্তু মাখছি আমার গালেতে চুনকালি,

কোনো কাজটাই পারি নাকো বলতে পারি ছড়া,

পাশের পড়া পড়ি না ছাই পড়ি ফেলের পড়া।

তেতো ওষুধ গিলি নাকো, মিষ্টি এবং টক

খাওয়ার দিকেই জেনো আমার চিরকালের সখ।

বাবা-দাদা সবার কাছেই গোঁয়ার এবং মন্দ,

ভাল হয়ে থাকার সঙ্গে লেগেই আছে দ্বন্দ্ব ।

পড়তে ব'সে থাকে আমার পথের দিকে চোখ,

পথের চেয়ে পথের লোকের দিকেই বেশী ঝোঁক।

হুলের কেয়ার করি নাকো মধুর জন্য ছুটি,

যেখানে ভিড় সেখানেতেই লাগাই ছুটোছুটি।

পণ্ডিত এবং বিজ্ঞজনের দেখলে মাথা নাড়া,

ভাবি উপদেশের ষাঁড়ে করলে বুঝি তারা।

তাইতো ফিরি ভয়ে ভয়ে, দেখলে পরে তর্ক,

বুঝি কেবল গোময় সেটা,- নয়কো মধুপর্ক।

ভুল করি ভাই যখন তখন, শোধরাবার আহ্লাদে

খেয়ালমতো কাজ করে যাই, কষ্ট পাই কি সাধে ?

সোজাসুজি যা হয় বুঝি, হায় অদৃষ্ট চক্র!

আমার কথা বোঝে না কেউ পৃথিবীটাই বক্র।।



        মোদের গরব, মোদের আশা

           অতুলপ্রসাদ সেন


মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা!

তোমার কোলে, তোমার বোলে, কতই শান্তি ভালবাসা!

কি যাদু বাংলা গানে!- গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,

এমন কোথা আর আছে গো!

গেয়ে গান নাচে বাউল, গান গেয়ে ধান কাটে চাষা।।


ঐ ভাষাতেই নিতাই গোরা, আনল দেশে ভক্তি-ধারা,

মরি হায়, হায় রে!

আছে কই এমন ভাষা, এমন দুঃখ-শ্রান্তি-নাশা!

বিদ্যাপতি, চণ্ডী, গোবিন, হেম, মধু, বঙ্কিম, নবীন-

আরও কত মধুপ গো!

ঐ ফুলেরি মধুর রসে, বাঁধলো সুখে মধুর বাসা।।


বাজিয়ে রবি তোমার বীণে, আনলো মালা জগৎ জিনে-

গরব কোথায় রাখি গো!

তোমার চরণ-তীর্থে আজি, জগৎ করে যাওয়া-আসা

ওই ভাষাতেই প্রথম বোলে, ডাকনু মায়ে 'মা', 'মা' বলে;

ওই ভাষাতেই বলবো 'হরি', সাঙ্গ হলে কাঁদা-হাসা।।



কেউ কথা রাখেনি

  -সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি

ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমী তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল

শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে

তারপর কত চন্দ্রভূক অমাবস্যা চলে গেলো, কিন্তু সেই বোষ্টুমী

আর এলোনা

পঁচিশ বছর প্রতিক্ষায় আছি।


মামা বাড়ির মাঝি নাদের আলী বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর

তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো

সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর

খেলা করে!

নাদের আলী, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এ ঘরের ছাদ

ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায়

তিন প্রহরের বিল দেখাবে?


একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারিনি কখনো

লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্করবাড়ির ছেলেরা

ভিখারীর মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি

ভিতরে রাস-উৎসব

অবিরল রঙের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ পরা ফর্সা রমণীরা

কত রকম আমোদে হেসেছে

আমার দিকে তারা ফিরেও চায়নি!

বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন, আমরাও…

বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয়নি কিছুই

সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস-উৎসব

আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবেনা!


বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,

যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে

সেদিন আমার বুকেও এ-রকম আতরের গন্ধ হবে!

ভালোবাসার জন্য আমি হাতের মুঠেয়ে প্রাণ নিয়েছি

দূরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়

বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীল পদ্ম

তবু কথা রাখেনি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ

এখনো সে যে-কোনো নারী।

কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল, কেউ কথা রাখে না!



ভালোবাসি ভালোবাসি  

          -সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়


ধরো কাল তোমার পরীক্ষা,

রাত জেগে পড়ার

টেবিলে বসে আছ,

ঘুম আসছে না তোমার

হঠাত করে ভয়ার্ত কন্ঠে উঠে আমি বললাম-

ভালবাসো?

তুমি কি রাগ করবে?

নাকি উঠে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে,

ভালোবাসি,ভালোবাসি..


ধরো ক্লান্ত তুমি,

অফিস থেকে সবে ফিরেছ,

ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত পীড়িত,

খাওয়ার টেবিলে কিছুই তৈরি নেই,

রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে

ঘর্মাক্ত আমি তোমার

হাত ধরে যদি বলি- ভালবাসো?

তুমি কি বিরক্ত হবে?

নাকি আমার হাতে আরেকটু চাপ দিয়ে বলবে,

ভালোবাসি,ভালোবাসি…


ধরো দুজনে শুয়ে আছি পাশাপাশি,

সবেমাত্র ঘুমিয়েছ তুমি

দুঃস্বপ্ন দেখে আমি জেগে উঠলাম

শতব্যস্ত হয়ে তোমাকে ডাক দিয়ে যদি বলি-ভালবাসো?

তুমি কি পাশ ফিরে শুয়ে থাকবে?

নাকি হেসে উঠে বলবে,

ভালোবাসি,ভালোবাসি…….


ধরো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি দুজনে,

মাথার উপর তপ্ত রোদ,

বাহন পাওয়া যাচ্ছেনা এমন সময়

হঠাৎ দাঁড়িয়ে পথ

রোধ করে যদি বলি-ভালবাসো?

তুমি কি হাত সরিয়ে দেবে?

নাকি রাস্তার সবার

দিকে তাকিয়ে

কাঁধে হাত দিয়ে বলবে,

ভালোবাসি, ভালোবাসি……


ধরো শেভ করছ তুমি,

গাল কেটে রক্ত পড়ছে,

এমন সময় তোমার এক ফোঁটা রক্ত হাতে নিয়ে যদি বলি- ভালবাসো?

তুমি কি বকা দেবে?

নাকি জড়িয়ে তোমার গালের রক্ত আমার

গালে লাগিয়ে দিয়ে খুশিয়াল গলায় বলবে,

ভালোবাসি, ভালোবাসি….


ধরো খুব অসুস্থ তুমি,

জ্বরে কপাল পুড়েযায়,

মুখে নেই রুচি,

নেই কথা বলার অনুভুতি,

এমন সময় মাথায় পানি দিতে দিতে তোমার মুখের

দিকে তাকিয়ে যদি বলি-ভালবাসো?

তুমি কি চুপ করে থাকবে?

নাকি তোমার গরম শ্বাস আমার শ্বাসে বইয়ে দিয়ে বলবে,

ভালোবাসি, ভালোবাসি..


ধরো যুদ্ধের দামামা বাজছে ঘরে ঘরে,

প্রচন্ড যুদ্ধে তুমিও অংশীদার,

শত্র“বাহিনী ঘিরে ফেলেছে ঘর

এমন সময় পাশে বসে পাগলিনী আমি তোমায়

জিজ্ঞেস করলাম-

ভালবাসো?

ক্রুদ্ধস্বরে তুমি কি বলবে যাও

নাকি চিন্তিত আমায় আশ্বাস দেবে, বলবে,

ভালোবাসি,ভালোবাসি


ধরো দূরে কোথাও যাচ্ছ তুমি,

দেরি হয়ে যাচ্ছে,বেরুতে যাবে,

হঠাৎ বাধা দিয়ে বললাম-ভালবাসো?

কটাক্ষ করবে?

নাকি সুটকেস ফেলে চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলবে,

ভালোবাসি,ভালোবাসি……


ধরো প্রচন্ড ঝড়,উড়ে গেছে ঘরবাড়ি,

আশ্রয় নেই

বিধাতার দান এই পৃথিবীতে,

বাস করছি দুজনে চিন্তিত তুমি

এমন সময় তোমার

বুকে মাথা রেখে যদি বলি ভালবাসো?

তুমি কি সরিয়ে দেবে?

নাকি আমার মাথায় হাত রেখে বলবে,

ভালোবাসি,ভালোবাসি…..


ধরো সব ছেড়ে চলে গেছ কত দুরে,

আড়াই হাত মাটির নিচে শুয়ে আছ

হতভম্ব আমি যদি চিতকার করে বলি-

ভালবাসো?

চুপ করে থাকবে?

নাকি সেখান থেকেই

আমাকে বলবে,

ভালোবাসি, ভালোবাসি……


যেখানেই যাও,যেভাবেই থাক,

না থাকলেও দূর

থেকে ধ্বনি তুলো,

ভালোবাসি,ভালোবাসি,ভালোবাসি..


দূর থেকে শুনব তোমার কন্ঠস্বর,

বুঝব তুমি আছ, তুমি আছ

ভালোবাসি,ভালোবাসি…..!



              প্রেম 

           - শুভ দাশগুপ্ত 


৪ঠা অক্টোবর তাদের দুজনের প্রথম দেখা হল।

তখন বিকেল ঘনিয়ে আসছে। বাতাসে শীতের আমেজ।


১০ই অক্টোবর তাদের দীর্ঘক্ষণ কথা হল টেলিফোনে।

সেদিন ছেলেটি নতুন কেনা টব’এ গোলাপের চারা লাগাল।


৩০শে অক্টোবর রেস্টুরেন্টের নিরালা কেবিনে

ছেলেটি বলল—

তোমাকে আমি ভালবাসি।

মেয়েটি লজ্জায় মাথা নিচু করে টেবিলে আঁকিবুকি কাটল।


১২ই ডিসেম্বর গোলাপগাছে কুঁড়ি ধরল।

মেয়েটি রেস্টুরেন্টে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল—

—কেন ভালবাস আমায়? আমি সুন্দরী, তাই?

—তোমার চেয়েও সুন্দরী আছে কত…

—আমার বাবার প্রচুর অর্থ—তাই?

—তোমার বাবার চেয়ে বড়োলোক এখানে কম আছে?

—তাহলে?

—ভালবাসি ভালবাসি। তার আবার কারণ হয় নাকি?

মেয়েটি বাড়ি ফিরে বন্ধুদের টেলিফোনে অনেক আলোচনা

করল। সবাই একবাক্যে বুঝিয়ে দিল—- ভালো যখন বাসে—তখন

একটা কিছু কারণ তো আছে বটেই। সেটা না বুঝে বেশি এগোস না।



৩রা জানুয়ারি মেয়েটি বললো :

—আমার কাছে কী চাও?

—কই, চাইনি তো কিছু।

—ভালোবাস অথচ চাওনা—তাহলে?

—না চাহিলে যারে পাওয়া যায়

তেওয়াগিলে আসে হাতে…

—এতো গান।

—শুধুই গান?

—তা ছাড়া কী?… কিছুই যদি না চাও, তবে ভালোবাস কেন?

—ভালোবাসি, তাই ভালোবাসা দিতে চাই। চাইব কেন?

—তুমি সত্যিই অদ্ভূত!


১০ই ফেব্রুয়ারি দুজনের দেখা হল মেট্রো স্টেশনের পাতালে।

ছেলেটি বললো :

—আমি কাল সারারাত বাঁশি বাজিয়েছি। সারারাত সেই সুরের

মায়াবী আলোয় তুমি নাচছিলে। অসামান্য অনন্য সে নাচ।

—ধ্যাৎ। কাল সারারাত আমি ঘুমিয়েছি।

—আমি কিন্তু তোমার নাচই দেখে গেছি সারারাত।

—তোমার বাঁশি একদিন শুনতে হবে


১২ই মার্চ ছেলেটি বাঁশি বাজালো। মেয়েটি শুনলো। সময় থমকে রইল অনেকক্ষণ।

বাঁশি যখন থামল, মেয়েটির দুচোখ ভরা

জলে। বললো—

—বাঁশি শুনতে শুনতে আমার ঘুম এল আবেশে। আমি দেখলাম

আমি নাচছি। মেঘের মাঝখানে, তারাদের পাশে আমি নাচছি। আকাশে ফুলের

গন্ধ।

—ডাক্তার আমায় বাঁশি বাজাতে নিষেধ করেছেন।

—সেকি? কেন?

—বাঁশি আমায় টেনে নিয়ে যায় স্বপ্নের মধ্যে। ডাক্তার বলেছে

স্বপ্ন দেখে আমার মস্তিষ্কের শিরা উপশিরায় জট

পাকিয়ে যাচ্ছে।

—তাহলে?

—ভাবছি।


১৬ই এপ্রিল মেয়েটি বললো :

— আমার বন্ধুরা বলেছে— তুমি খুউব ভালো। অসাধারণ, কিন্তু তুমি

সৃষ্টি ছাড়া। তোমার স্বপ্ন সব অর্থহীন।

—আমি জানি।

স্বপ্ন-টপ্ন ছেড়ে দিতে পারো না তুমি?

—-না।

—তাহলে… তুমি তো আমাকে হারাবে।

—তোমায় পাইনি তো কখনও!


৫ই মে ছেলেটির মস্তিষ্কে অপারেশন হল। একটু সুস্থ হতে মেয়েটি

এসে বললো :

—ভাল আছ তো? এখন আর স্বপ্ন দেখছ না তো?

—দেখছি। আরও সুন্দর সব স্বপ্ন।

—তাহলে তো দেখছি operationটা আদৌ সফল হয়নি!

বাড়ি ফিরে বন্ধুদের ফোন করল মেয়েটি।

বন্ধুরা একবাক্যে বলল : বাঁশি বাজানো, স্বপ্ন দেখা, সবই backdated

সৃষ্টিছাড়া। তুই আর লোক পেলি না? তুই এত রূপসী।

তোর এত উজ্জ্বল prosppect। ভালো যদি চাস তাহলো শিগগির

বিয়ে করে ফেল তোর দাদার সেই বন্ধুকে—। উনিতো শুনলাম

কানাডাতেই settle করবেন।


৭ই জুলাই মেয়েটি আবার জিজ্ঞেস করলো : —

—তুমি সত্যিই কী চাও বলতো?

—তুমি আরও সার্থক, আরও সুন্দর হয়ে ওঠো।

—ব্যাস! আর কিছু না

—আর! চাই স্বপ্ন দেখতে।

—ও : স্বপ্ন তাহলে তুমি ছাড়তে পারবে না?

—না।

—তাহলে থাকো তুমি স্বপ্ন নিয়ে।


১২ই আগস্ট গোলাপ গাছে ফুল ফুটলো অনেক। সেদিন দুপুরে

ছেলেটির মস্তিষ্কে আবার অপারেশন হল।


১৩ই সেপ্টেম্বর ছেলেটি মারা গেল।


১৪ই সেপ্টেম্বর মেয়েটির শুভবিবাহ সুসম্পন্ন হল কানাডাগামী

সেই পাত্রের সঙ্গে।


২০শে সেপ্টেম্বর গোলাপ গাছটি হঠাৎ ঝড়ে উপড়ে গেল।

সেদিন সন্ধ্যার বিমানে মেয়েটি হানিমুনে গেল—।

যাবার আগে বন্ধুদের বলে গেল। স্বপ্নের চেয়ে বাস্তব অনেক ভাল।

অনেক মধুর। স্বপ্ন দেখে কেবল বোকারা।


৪ঠা অক্টোবর ছেলেটির মা ঝরে পড়া গোলাপ গাছটিকে

সযত্নে তুলে ফেলে দিলেন।


শূন্য টবে তখন কয়েকটা পোকা, কয়েকটা মাছি।

আমরা কেউ জানিনা

ওগুলো পোকা-মাছি-না কি

ছেলেটির স্বপ্ন।

আমরা ঠিক জানিনা।

আমরা কেউই জানিনা।



      


ফুল ফুটুক না ফুটুক

--- সুভাষ মুখোপাধ্যায়



ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত

শান-বাঁধানো ফুটপাথে

পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ

কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে

হাসছে।

ফুল ফুটুক না ফুটুক

আজ বসন্ত।

আলোর চোখে কালো ঠুলি পরিয়ে

তারপর খুলে -

মৃত্যুর কোলে মানুষকে শুইয়ে দিয়ে

তারপর তুলে -

যে দিনগুলো রাস্তা দিয়ে চলে গেছে

যেন না ফেরে।

গায়ে হলুদ দেওয়া বিকেলে

একটা দুটো পয়সা পেলে

যে হরবোলা ছেলেটা

কোকিল ডাকতে ডাকতে যেত

– তাকে ডেকে নিয়ে গেছে দিনগুলো।

লাল কালিতে ছাপা হলদে চিঠির মত

আকাশটাকে মাথায় নিয়ে

এ-গলির এক কালোকুচ্ছিত আইবুড়ো মেয়ে

রেলিঙে বুক চেপে ধ’রে

এই সব সাত-পাঁচ ভাবছিল-

ঠিক সেই সময়

চোখের মাথা খেয়ে গায়ে উড়ে এসে বসল

আ মরণ! পোড়ারমুখ লক্ষ্মীছাড়া প্রজাপতি!

তারপর দড়াম করে দরজা বন্ধ হবার শব্দ।

অন্ধকারে মুখ চাপা দিয়ে

দড়িপাকানো সেই গাছ

তখন ও হাসছে।


      শাড়ি

           - সুবোধ সরকার 


বিয়েতে একান্নটা শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা
অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে আরো ছটা
এতো শাড়ি একসঙ্গে সে জীবনে দেখেনি।

আলমারির প্রথম থাকে সে রাখলো সব নীল শাড়িদের
হালকা নীল একটা কে জড়িয়ে ধরে বলল, তুই আমার আকাশ
দ্বিতীয় থাকে রাখল সব গোলাপীদের
একটা গোলাপীকে জড়িয়ে সে বলল, ‘ তোর নাম অভিমান’
তৃতীয় থাকে তিনটি ময়ূর, যেন তিন দিক থেকে ছুটে আসা সুখ
তেজপাতা রং যে শাড়িটার, তার নাম দিল বিষাদ ।
সারা বছর সে শুধু শাড়ি উপহার পেল
এত শাড়ি সে কি করে এক জীবনে পড়বে ?

কিন্তু বছর যেতে না যেতেই ঘটে গেল সেই ঘটনাটা
সন্ধের মুখে মেয়েটি বেরিয়েছিল স্বামীর সঙ্গে, চাইনিজ খেতে ।
কাপড়ে মুখ বাঁধা তিনটি ছেলে এসে দাঁড়ালো
স্বামীর তলপেটে ঢুকে গেল বারো ইঞ্চি
ওপর থেকে নীচে। নীচে নেমে ডান দিকে ।
যাকে বলে এল ।
পড়ে রইলো খাবার, চিলি ফিস থেকে তখনও ধোঁয়া উড়ছে ।
-এর নাম রাজনীতি, -বলেছিল পাড়ার লোকেরা ।

বিয়েতে একান্নটা শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা
অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে আরো ছটা
একদিন দুপুরে শাশুড়ি ঘুমিয়ে, সমস্ত শাড়ি বের করে
ছতলার বারান্দা থেকে উড়িয়ে দিল নীচের পৃথিবীতে ।
শাশুড়ি পড়িয়ে দিয়েছেন তাকে সাদা থান
উনিশ বছরের একটা মেয়ে সে একা ।

কিন্তু সেই থানও এক ঝটকায় খুলে নিল তিনজন, পাড়ার মোড়ে
একটি সদ্য নগ্ন বিধবা মেয়ে দৌড়াচ্ছে আর চিৎকার করছে, ‘বাঁচাও’
পেছনে তিনজন, সে কি উল্লাস, নির্বাক পাড়ার লোকেরা ।

বিয়েতে একান্নটা শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা
অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে আরো ছটা….



               মিথ্যে কথা

               – শঙ্খ ঘোষ


লোকে আমায় ভালোই বলে দিব্যি চলনসই

দোষের মধ্যে একটু নাকি মিথ্যে কথা কই।

ঘাটশিলাতে যাবার পথে ট্রেন-ছুটছে যখন

মায়ের কাছে বাবার কাছে করছি বকম বকম।


হঠাৎ দেখি মাঠের মধ্যে চলন্ত সব গাছে

এক একরকম ভঙ্গি ফোটে এক একরকম নাচে।

“ওমা , দেখো নৃত্যনাট্য” -যেই বলেছি আমি

মা বকে দেয় , “বড্ড তোমার বেড়েছে ফাজলামি।”


চিড়িয়াখানার নাম জানো তো আমার সেজ মেসোর

আদর করে দেখিয়ে দিলেন পশুরাজের কেশর।

ক’দিন পরে চুন খসানো দেয়াল জুড়ে এ কী

ঠিক অবিকল সেইরকমই মূর্তি যেন দেখি ?


ক্লাসের মধ্যে যেই বলেছি সুরঞ্জনার কাছে

“জানিস ? আমার ঘরের মধ্যে সিংহ বাঁধা আছে !”

শুনতে পেয়ে দিদিমণি অমনি বলেন “শোন ,

এসব কথা আবার যেন না শুনি কখনো।”


বলি না তাই সে সব কথা সামলে থাকি খুব

কিন্তু সেদিন হয়েছে কি এমনি বেয়াকুব-

আকাশপারে আবার ও চোখ গিয়েছে আটকে

শরৎ মেঘে দেখতে পেলাম রবীন্দ্রনাথকে।


 


                সৎপাত্র

               - সুকুমার রায় 


শুনতে পেলাম পোস্তা গিয়ে—

তোমার নাকি মেয়ের বিয়ে ?

গঙ্গারামকে পাত্র পেলে ?

জানতে চাও সে কেমন ছেলে ?

মন্দ নয় সে পাত্র ভালো

রঙ যদিও বেজায় কালো ;

তার উপরে মুখের গঠন

অনেকটা ঠিক পেঁচার মতন ;

বিদ্যে বুদ্ধি ? বলছি মশাই—

ধন্যি ছেলের অধ্যবসায় !

উনিশটিবার ম্যাট্রিকে সে

ঘায়েল হয়ে থামল শেষে ।

বিষয় আশয় ? গরীব বেজায়—

কষ্টে–সৃষ্টে দিন চলে যায় ।

মানুষ তো নয় ভাইগুলো তার—

একটা পাগল একটা গোঁয়ার ;

আরেকটি সে তৈরী ছেলে,

জাল করে নোট গেছেন জেলে ।

কনিষ্ঠটি তবলা বাজায়

যাত্রাদলে পাঁচ টাকা পায় ।

গঙ্গারাম তো কেবল ভোগে

পিলের জ্বর আর পাণ্ডু রোগে ।

কিন্তু তারা উচ্চ ঘর,

কংসরাজের বংশধর !

শ্যাম লাহিড়ী বনগ্রামের

কি যেন হয় গঙ্গারামের ।—

যহোক, এবার পাত্র পেলে,

এমন কি আর মন্দ ছেলে ?



          বোম্বাগড়ের রাজা

          - সুকুমার রায়


কেউ কি জান সদাই কেন বোম্বাগড়ের রাজা

ছবির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখে আমসত্ত ভাজা ?

রানীর মাথায় অষ্ট প্রহর কেন বালিশ বাঁধা ?

পাঁউরুটিতে পেরেক ঠোকে কেন রানীর দাদা ?

কেন সেথায় সর্দি হ'লে ডিগ্‌বাজি খায় লোকে ?

জোছনা রাতে সবাই কেন আলতা মাখায় চোখে ?

ওস্তাদেরা লেপ মুড়ি দেয় কেন মাথায় ঘাড়ে ?

টাকের 'পরে পণ্ডিতেরা ডাকের টিকিট মারে ?

রাত্রে কেন ট্যাঁক্‌ঘড়িটা ডুবিয়ে রাখে ঘিয়ে ?

কেন রাজার বিছ্‌না পাতা শিরীষ কাগজ দিয়ে ?

সভায় কেন চেঁচায় রাজা 'হুক্কা হুয়া' ব'লে ?

মন্ত্রী কেন কল্‌সী বাজায় ব'সে রাজার কোলে ?

সিংহাসনে ঝোলায় কেন ভাঙা বোতল শিশি ?

কুমড়ো দিয়ে ক্রিকেট খেলে কেন রাজার পিসি ?

রাজার খুড়ো নাচেন কেন হুঁকোর মালা প'রে ?

এমন কেন ঘটছে তা কেউ বলতে পার মোরে ?



 

          গোঁফ চুরি

           - সুকুমার রায়



হেড আফিসের বড়বাবু লোকটি বড় শান্ত,

তার যে এমন মাথার ব্যামো কেউ কখনো জান্‌ত?

দিব্যি ছিলেন খোসমেজাজে চেয়ারখানি চেপে,

একলা বসে ঝিম্‌ঝিমিয়ে হটাত্‍‌ গেলেন ক্ষেপে!

আঁত্‍‌কে উঠে হাত‐পা ছুঁড়ে চোখটি ক’রে গোল!

হটাত্‍‌ বলেন, “গেলুম গেলুম, আমায় ধ’রে তোল!”

তাই শুনে কেউ বদ্যি ডাকে, কেউ‐বা হাঁকে পুলিশ,

কেউ‐বা বলে, “কামড়ে দেবে সাবধানেতে তুলিস।”

ব্যস্ত সবাই এদিক‐ওদিক করছে ঘোরাঘুরি—

বাবু হাঁকেন, “ওরে আমার গোঁফ গিয়েছে চুরি!”

গোঁফ হারানো! আজব কথা! তাও কি হয় সত্যি?

গোঁফ জোড়া তো তেমনি আছে, কমে নি এক রত্তি।

সবাই তাঁরে বুঝিয়ে বলে, সামনে ধরে আয়না,

মোটেও গোঁফ হয় নি চুরি, কক্ষনো তা হয় না।


রেগে আগুন তেলে বেগুন, তেড়ে বলেন তিনি,

“কারো কথার ধার ধারি নে, সব ব্যাটাকেই চিনি।

নোংরা ছাঁটা খ্যাংরা ঝাঁটা বিচ্ছিরি আর ময়লা,

এমন গোঁফ তো রাখত জানি শ্যামবাবুদের গয়লা।

এ গোঁফ যদি আমার বলিস করব তোদের জবাই”—

এই না বলে জরিমানা কল্লেন তিনি সবায়।

ভীষণ রেগে বিষম খেয়ে দিলেন লিখে খাতায়—

“কাউকে বেশি লাই দিতে নেই, সবাই চড়ে মাথায়।

আফিসের এই বাঁদরগুলো, মাথায় খালি গোবর

গোঁফ জোড়া যে কোথায় গেল কেউ রাখে না খবর।

ইচ্ছে করে এই ব্যাটাদের গোঁফ ধরে খুব নাচি,

মুখ্যুগুলোর মুণ্ডু ধরে কোদাল দিয়ে চাঁচি।

গোঁফকে বলে তোমার আমার— গোঁফ কি কারো কেনা?

গোঁফের আমি গোঁফের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।”



           নোটবই    

              - সুকুমার রায়


এই দেখ পেনসিল্, নোটবুক এ–হাতে,

এই দেখ ভরা সব কিল্‌বিল্ লেখাতে ।

ভালো কথা শুনি যেই চট্‌পট্ লিখি তায়—

ফড়িঙের ক'টা ঠ্যাং, আরশুলা কি কি খায় ;

আঙুলেতে আটা দিলে কেন লাগে চট্‌চট্,

কাতুকুতু দিলে গরু কেন করে ছট্‌ফট্ ।

দেখে শিখে প'ড়ে শুনে ব'সে মাথা ঘামিয়ে

নিজে নিজে আগাগোড়া লিখে গেছি আমি এ ।

কান করে কট্ কট্ ফোড়া করে টন্‌টন্—

ওরে রামা ছুটে আয়, নিয়ে আয় লন্ঠন ।

কাল থেকে মনে মোর লেগে আছে খট্‌কা,

ঝোলাগুড় কিসে দেয় ? সাবান না পট্‌কা ?

এই বেলা প্রশ্নটা লিখে রাখি গুছিয়ে,

জবাবটা জেনে নেব মেজদাকে খুঁচিয়ে ।

পেট কেন কাম্‌ড়ায় বল দেখি পার কে ?

বল দেখি ঝাঁজ কেন জোয়ানের আরকে ?

তেজপাতে তেজ কেন ? ঝাল কেন লঙ্কায় ?

নাক কেন ডাকে আর পিলে কেন চমকায় ?

কার নাম দুন্দুভি ? কার নাম অরণি ?

বল্‌বে কি, তোমরা তো নোটবই পড়নি ।



             ভয় পেয়ো না

                - সুকুমার রায়


ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না—

সত্যি বলছি কুস্তি ক’রে তোমার সঙ্গে পারব না।

মনটা আমার বড্ড নরম, হাড়ে আমার রাগটি নেই,

তোমায় আমি চিবিয়ে খাব এমন আমার সাধ্যি নেই!

মাথায় আমার শিং দেখে ভাই ভয় পেয়েছ কতই না—

জানো না মোর মাথার ব্যারাম, কাউকে আমি গুঁতোই না?

এস এস গর্তে এস, বাস ক'রে যাও চারটি দিন,

আদর ক’রে শিকেয় তুলে রাখব তোমায় রাত্রিদিন।

হাতে আমার মুগুর আছে তাই কি হেথায় থাকবে না?

মুগুর আমার হাল্‌কা এমন মারলে তোমার লাগবে না।

অভয় দিচ্ছি, শুনছ না যে? ধরব নাকি ঠ্যাং দুটা?

বসলে তোমার মুণ্ডু চেপে বুঝবে তখন কাণ্ডটা!

আমি আছি, গিন্নি আছেন, আছেন আমার নয় ছেলে—

সবাই মিলে কাম্‌ড়ে দেব মিথ্যে অমন ভয় পেলে।


            

                 সবার আমি ছাত্র

                - সুনির্মল বসু 


আকাশ আমায় শিক্ষা দিল

উদার হতে ভাই রে,

কর্মী হবার মন্ত্র আমি

বায়ুর কাছে পাই রে।

পাহাড় শিখায় তাহার সমান-

হই যেন ভাই মৌন-মহান,

খোলা মাঠের উপদেশে-

দিল-খোলা হই তাই রে।

সূর্য আমায় মন্ত্রণা দেয়

আপন তেজে জ্বলতে,

চাঁদ শিখাল হাসতে মোরে,

মধুর কথা বলতে।

ইঙ্গিতে তার শিখায় সাগর-

অন্তর হোক রত্ন-আকর;

নদীর কাছে শিক্ষা পেলাম

আপন বেগে চলতে।

মাটির কাছে সহিষ্ণুতা

পেলাম আমি শিক্ষা,

আপন কাজে কঠোর হতে

পাষান দিল দীক্ষা।

ঝরনা তাহার সহজ গানে,

গান জাগাল আমার প্রাণে;

শ্যাম বনানী সরসতা

আমায় দিল ভিক্ষা।

বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর,

সবার আমি ছাত্র,

নানান ভাবে নতুন জিনিস

শিখছি দিবারাত্র।

এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়,

পাঠ্য যেসব পাতায় পাতায়

শিখছি সে সব কৌতূহলে,

নেই দ্বিধা লেশমাত্র।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ