বাংলা সহায়ক

প্রবন্ধ রচনা | probondho rachona|bengali essay| সহজেই প্রবন্ধ রচনা করুন | বাংলা নির্মিতি | প্রবন্ধ রচনার উদাহরণ | BanglaSahyak.com



১. বই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গী     
২. ইন্টারনেট ও আধুনিক জীবন
৩. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
৪. সাহিত্য পাঠের প্রয়োজনীয়তা
৫. গ্রন্থাগার
৬. সমাজসেবায় ছাত্র-ছাত্রীদের ভূমিকা
৭. বিজ্ঞান ও কুসংস্কার
৮. জীবনে সময়ানুবর্তিতার মূল্য
৯. প্রতিবন্ধীদের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য
১০. তোমার প্রিয় কবি নজরুল ইসলাম
১১. একটি গাছ একটি প্রাণ
১২.দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান
১৩.চরিত্র গঠনে খেলাধূলার ভূমিকা
১৪.বাংলার উৎসব
১৫.বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য
১৬.প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও তার প্রতিকার
১৭.অরণ্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ
১৮.মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুফল ও কুফল/ভালো-মন্দ
১৯.দেশভ্রমন : শিক্ষার অঙ্গ
২০.শিক্ষাবিস্তারে গণমাধ্যমের ভূমিকা
২১.শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে মাতৃভাষার গুরুত্ব
২২. কন্যাশ্রী প্রকল্প

১. বই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গী   
  
"সব নেশা ক্ষতিকর
    বই  পড়া হিতকর।"
 
ভূমিকাঃ
পল্লী কবি জসীমউদ্দিন বলেছেন, ‘বই জ্ঞানের প্রতীক, বই আনন্দের প্রতীক।‘ জ্ঞান আর আনন্দ ছাড়া মানব জীবন নিশ্চল হয়ে পড়ে। জীবনকে সুন্দর ভাবে বিকশিত করতে হলে, সুবাসিত করতে হলে জ্ঞানার্জন করতে হবে। আর জ্ঞানার্জন করতে হলে বই পড়ার কোন বিকল্প নেই।বই বিশ্বাসের অঙ্গ , বই মানবসমাজ এবং সভ্যতা টিকিয়ে রাখার জ্ঞান দান করে।অতএব বই হচ্ছে সভ্যতার রক্ষাকবচ।আবার সভ্যতার চাবিকাঠিও।

প্রাচীন যুগ ও গ্রন্থ পাঠ :
সেই প্রাচীন যুগ থেকেই মানুষ বই পড়তে অভ্যস্ত।প্রাচীনযুগে বই পড়াটা নাগরিকদের মধ্যে একটা বড়ো রকমের মর্যাদার ব্যাপার ছিল।বর্তমান ইউরোপে বই পড়া সভ্য সমাজের একটি সাংস্কৃতিক ব্যাপার বলে বিবেচিত।

পাঠাগারের ভান্ডার :
বই পড়া সর্বকালে সর্বদেশের মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ শখ।বিভিন্ন রুচির মানুষ তাদের রুচিমাফিক বইয়ের পাতায় চোখ রেখে শখ চরিতার্থ করে।আর এই শখ মেটানোর অন্যতম স্থান পাঠাগার।

বই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ :
একটি উন্নতমানের বই বা পুস্তকই হচ্ছে মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। যার সাথে পার্থিব কোন ধন-সম্পদের তুলনা হতে পারে না। মানুষের ধন-রত্ন, অঢেল সম্পদ এক সময় নিঃশেষ হয়ে যায়, কিন্তু একটি ভালো বইয়ের আবেদন কখনও হারিয়ে যায় না। তাই আমরা বই পড়তে ভালোবাসি এবং বই পড়ি।

জ্ঞানের ভান্ডার :
বই-ই হচ্ছে আমাদের প্রকৃত জ্ঞানদাতা।এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস ও সভ্যতা, বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার, জ্ঞানী ব্যক্তিদের চিন্তাধারা ও জীবন দর্শন প্রভৃতি বিষয় আমরা কেবল বই পড়ার মাধ্যমেই জানতে পারি।একমাত্র বই-ই আমাদের দেয় এ বিশ্বের জানা-অজানা বহু রহস্যের সন্ধান।অতএব বলা যায়, জ্ঞান লাভের উৎস হিসেবে বইয়ের কোন বিকল্প হতে পারে না।

আনন্দ এবং মানসিক সুস্থতা :
দেহের খাদ্য ভাত রুটি, মনের খাদ্যের যোগান দেয় বই।মনকে সুস্থ রাখার জন্য ভালো বইয়ের সঙ্গ প্রয়োজন।বই এক অপার্থিব আনন্দের উৎস। অতএব, সমস্যা ক্লিষ্ট জীবনে গ্রন্থের চেয়ে মূল্যবান আর কিছুই হতে পারে না।

প্রকৃত বন্ধু :
বই মানুষের প্রকৃত বন্ধু। বই-ই মানুষের অন্তর চক্ষু খুলে দেয় একটি ভালো বই পারে ঘুমন্ত বিবেককে জাগিয়ে তোলতে।একটি উত্তম বই মানুষকে মহৎ হতে শেখায়, মনকে প্রসারিত করে, বুদ্ধির বিকাশ ঘটিয়ে জীবনকে করে তালে পরিমার্জিত।অজানাকে জানা ও অচেনাকে চেনার যে চিরন্তন আগ্রহ, তা বই পড়ে মেটানো যায়।

সংস্কার থেকে মুক্তি :
অজ্ঞতা ও কুসংস্কারমুক্ত জীবন গড়ার প্রয়োজনে গ্রন্থ পাঠে মনোযোগী হওয়া দরকার। একটি ভালো বই মানুষকে প্রকৃত সুখ দেয়। মনন, মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিকে শানিত করে।তাই জীবনকে বুঝতে হলে,অভ্যাসের সংস্কারের বেড়া ভাঙতে হলে বইয়ের সঙ্গ অবশ্য প্রয়োজন।

উপযোগিতা :
বই মানুষের এক ঘেঁয়ে জীবনে আনে বৈচিত্র্য, মানুষকে দেয় স্বস্তি ও অপার্থিব শান্তি। মনোজগতের অবসাদ ও ক্লান্তি দূর করে। মহামানবদের কর্ম স্পৃহা, সহিষ্ণুতা আর ত্যাগ-তিতিক্ষার কাহিনি বই পড়েই জানা যায়।বইয়ের সাহায্যে ঘরে বসেই আবার বিভিন্ন দেশের সমাজ ব্যবস্থা, জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, আচার আচরণ, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও আরো অনেক বিষয় সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। বই থেকে যা কিছু শেখা যায়, তা অন্য কোন মাধ্যম থেকে লাভ করা সম্ভব নয়।

উপসংহার :
বই হল আয়নার মতো, যাতে আমাদের প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে।বই সম্পর্কে রবি ঠাকুরের মন্তব্য-"বই হচ্ছে অতীত ও বর্তমানের মধ্যে বেঁধে দেয়া সাঁকো ।আজকের দিনে বই বিহীন কক্ষকে আত্মাবিহীন দেহের সঙ্গে তুলনা করা চলে।প্রখ্যাত লেখক সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছেন-"বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না ।" সবমিলিয়ে বই মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গী একথা বলাই যায়।
☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★
       
   


২. ইন্টারনেট ও আধুনিক জীবন

  ভূমিকা :
বিজ্ঞানের যেসব আবিষ্কার মানুষকে সভ্যতার স্বর্ণশিখরে আরোহণ করতে সহায়তা করেছে তার অন্যতম হল ইন্টারনেট । বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচিত গতিময়তার এক মাইল ফলক ইন্টারনেট । বর্তমান বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তির কর্মকান্ডকে ইন্টারনেট এমন এক সুতোর বন্ধনে আবদ্ধ করেছে যে, সে সুতো ছিঁড়ে গেলে হয়তো সমগ্র বিশ্বব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়বে ।

ইন্টারনেট কী :
বিশ্ববিস্তৃত যোগাযোগ ব্যবস্থার যুগান্তকারী এক মাধ্যমের নাম ইন্টারনেট। অসংখ্য নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে গঠিত বিশ্বব্যাপী সুবিশাল কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে ইন্টারনেট বলা হয় । পৃথিবীব্যাপী মাকড়সার জালের মতো কম্পিউটার সংযোগের জন্য বলা হয় World Wide Web বা WWW .

ইন্টারনেটের ইতিহাস :
১৯৬০-এর দশকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গবেষণা সংস্থা ARPA পরীক্ষামূলকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাগারের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। ইন্টারনেট ১৯৮৯ সালে আইএসপি দ্বারা সবার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৯০ এর মাঝামাঝি থেকে ১৯৯০ এর পরবর্তি সময়ের দিকে পশ্চিমাবিশ্বে ইন্টারনেট ব্যাপক ভাবে বিস্তৃত হতে থাকে।বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা শত কোটির ঊর্ধ্বে।

আধুনিক জীবন ও ইন্টারনেট :
ইন্টারনেট ও  আধুনিক জীবনযাত্রা এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কসূত্রে গ্রথিত ।ইন্টারনেট হল এমন একটি মাধ্যম, যার দ্বারা আমরা কম্পিউটার ,ল্যাপটপ বা মোবাইলে বিশ্বের সমস্ত বিষয়ের খবরাখবর মুহুর্তের মধ্যেই পেয়ে যায়।আধুনিক জীবনে ইন্টারনেটের উপকারিতা ও উপযোগিতা যে কতখানি তা বলে শেষ করা যায় না।আধুনিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর উপযোগিতার দিক আলোচনা করা যেতে পারে -

১)যোগাযোগে :
কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাদের অফিসের কর্মচারীদের মধ্যে যোগাযোগ রাখতে পারে।

২) ব্যবসা বাণিজ্যে :
শুধু যোগাযোগ নয় ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবেও ইন্টারনেটের ব্যবহার দেখা যায়।বর্তমানে অনলাইন কেনাকাটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।অনলাইন ব্যাঙ্কিং, টেলিফোন, টিকটি বুকিং, হোটেল পরিষেবা সবই ইন্টারনেটের মাধ্যমে এখন দ্রুত পাওয়া যায়।

৩) শিক্ষাক্ষেত্রে :
শিক্ষাক্ষেত্রেও ইন্টারনেটের ব্যবহার যুগান্তকারী বিপ্লব এনেছে।গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থায় ইন্টারনেটের ব্যবহার শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ আকর্ষনীয়।

৪)বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে :
ইন্টারনেটের মাধ্যমে গান, সিনেমা, আড্ডা সবই আজ হাতের মুঠোয়।Facebook , WhatsApp,  Twitter প্রভৃতির ব্যবহার বিনোদনকে নিয়ে এসেছে হাতের নাগালে।

৫) গবেষণার ক্ষেত্রে :
গবেষণার ক্ষেত্রেও ইন্টারনেটের উপযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইন্টারনেটের ক্ষতিকর দিকঃ
ইন্টারনেটের হাজারো উপযোগিতা সত্ত্বেও তীব্র আলোর পিছনের অন্ধকারের মতো ইন্টারনেটের মন্দের দিকটিও অস্বীকার করা যায় না । ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি, ভাইরাস আক্রমণ, পর্নোগ্রাফিক চিত্র আদান-প্রদান, মানসিক অবসাদ, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ প্রভৃতি প্র্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। কিছু দিন আগে ‘ব্লু হোয়েল’ নামক ইন্টারনেটে অনলাইন ভিত্তিক একটি মারণখেলা সারা বিশ্বের বহু শিশু-কিশোরকে আত্মহত্যায় বাধ্য করে ।

উপসংহার :
ইন্টারনেট বিজ্ঞানের জয়যাত্রার সংযোজন করেছে নতুন মাত্রা। ইন্টারনেট আজ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। এর মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রা অনেক সহজ হয়ে আসছে। সারা বিশ্বের সকল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী যদি ইন্টারনেটের অপকারিতা বন্ধের লক্ষ্যে একত্রে কাজ করেন তাহলেই ইন্টারনেট মানব জীবনে আরও অগ্রগতি এনে দিতে সক্ষম হবে। আগামী দিনে হয়তো এই ইন্টারনেট ব্যবস্থাই পৃথিবীর সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করবে।

☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★
       

৩.   আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

ভূমিকা :    
   ‘মা তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতন।’ এ কেবল নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, এ হচ্ছে সর্বকালের মানুষের চিরন্তন অনুভূতি। মাতৃদুগ্ধ যেমন শিশুর সর্বোত্তম পুষ্টি, তেমনি মাতৃভাষার মাধ্যমেই ঘটতে পারে একটি জাতির শ্রেষ্ঠ বিকাশ। মানুষের পরিচয়ের সেরা নির্ণায়ক মাতৃভাষা। মাতৃভাষা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের এক মৌলিক সম্পদ। মা ও মাটির মতোই প্রতিটি মানুষ জন্মসূত্রে এই সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব বাংলার জনগণ রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছিল সেই মাতৃভাষার মর্যাদা।

মাতৃভাষা কীঃ
সাধারণ অর্থে মাতৃভাষা বলতে আক্ষরিক অর্থে মায়ের ভাষাই বোঝায়। একটি বৃহত্তর অঞ্চলে একই সাথে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত থাকে। এর মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ যে ভাষায় মনের ভাব প্রকাশ করে, সেটাই হচ্ছে সে অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা। মাতৃভাষা বহতা নদীর মতো শত ধারায় প্রবহমান। বাঙালির মাতৃভাষা হচ্ছে বাংলা। বাংলা আমাদের প্রাণের স্পন্দন, বাংলা আমাদের অহংকার। কবি অতুল প্রসাদ সেন এর ভাষায়-    ‘মোদের গরব মোদের আশা  /  আমরি বাংলা ভাষা।’

মাতৃভাষার গুরুত্বঃ
প্রখ্যাত ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছেন- ‘মা, মাতৃভূমি এবং মাতৃভাষা এই তিনটি জিনিস সবার কাছে পরম শ্রদ্ধার বিষয়।’ মাতৃভাষার মাধ্যমেই মানুষ প্রকাশ করে তার আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ-অনুভূতি। জাতীয় জীবনে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। জাতীয় জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করতে হলে মাতৃভাষার কোনো বিকল্প হতে পারে না। শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, শিল্প-সংস্কৃতি ও সাহিত্যের বিকাশে মাতৃভাষা হচ্ছে প্রধান মাধ্যম। কবি রামনিধি গুপ্তের ভাষায়-            
  "নানান দেশের নানান ভাষা/বিনা স্বদেশি ভাষা; পুরে কি আশা।"

মাতৃভাষা দিবসের পটভূমি :  
১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পরে বাংলার উপরে নেমে আসে উর্দুর অপচ্ছায়া। পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ যখন ঢাকার বুকে দাঁড়িয়ে দম্ভ করে ঘোষণা দেন 'Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan' তখন প্রতিবাদে, ক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলাভাষী লাখো জনতা। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচারী পাকিস্তানি মিলিটারির রাইফেলের গুলিকে উপেক্ষা করে বীর বাঙালি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। ঢাকার রাজপথ সেদিন লাল হয়ে যায় রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা অনেক তরুণের তাজা রক্তে। ভাষার জন্য জীবন দেবার এরকম নজির পৃথিবীর ইতিহাসে আর নেই। এজন্যই বাঙালি একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে পালন করে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসঃ
বাঙালি জাতির জীবনে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর আরো একটি ঐতিহাসিক গৌরবময় ও আনন্দঘন দিন। এই দিনে বাঙালি অর্জন করেছে তার প্রাণের সম্পদ একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা UNESCO প্যারিসে অনুষ্ঠিত ৩০তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। জাতিসংঘের ১৮৮টি দেশের এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন বাংলা ভাষার জন্য বাঙালির গৌরবময় আত্মদান বিশ্বমর্যাদা পায় তেমনি পৃথিবীর ছোট-বড়ো প্রত্যেকটি জাতির মাতৃভাষার প্রতিও শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শিত হয়।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের তাৎপর্য :
বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে নিজের মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধের মতোই পরম সমাদরের বস্তু। মাতৃভাষাই আত্মপ্রকাশের যথার্থ মাধ্যম। 21-এ  ফেব্রুয়ারির মতো একটি ঐতিহাসিক দিনকে ' আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসাবে পালন করার মধ্যে প্র্রতিটি মানুষকে তার মাতৃভাষার প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলার একটি শুভ প্রচেষ্টা নিহিত আছে।

উপসংহারঃ   
     ‘একুশ আমার চেতনা/একুশ আমার গর্ব’ কেবল বাংলা ভাষাকে নয়, পৃথিবীর সকল ভাষার নিজস্ব মহিমা অক্ষুন্ন রাখার দীপ্ত শপথ নেবার দিন হচ্ছে একুশে ফেব্রুয়ারি- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালি হিসেবে আজ আমাদের সবার অঙ্গীকার সর্বস্তরে বাংলা-ভাষার প্রচার ও প্রসার।      
☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆
 
৪. সাহিত্যপাঠের প্রয়োজনীয়তা

সূচনা :
ভাষার জন্ম হয়েছে নিজের ভাব অন্যের কাছে তুলে ধরার জন্য। আর ভাষাকে মহিমান্বিত করেছে সাহিত্যের স্বপ্নীল ছোঁয়া। সাধারণ একটি কথাই সাহিত্যিকের স্পর্শে হয়ে উঠে অনন্য। তুচ্ছ একটি কথা সাহিত্যিকের মুখে এসে নতুন জীবন লাভ করে। সাহিত্য ভাষাকে উপমা, অলংকার, আর শব্দের ব্যঞ্জনায় করে তোলে শ্রুতিমধুর। সাহিত্য পাঠে মনের যে বিশালতার সৃষ্টি হয় তা আকাশের বিশালতাকেও হার মানায়।

সাহিত্য কী ? :
‘সহিত’ শব্দ হতে সাহিত্য শব্দের উৎপত্তি। যার ধাতুগত অর্থ হচ্ছে মিলন। এ মিলন শুধু ভাবের সাথে ভাষার নয়। এ মিলন মানুষের সাথে মানুষের, অতীতের সাথে বর্তমানের,দূরের সাথে নিকটের। সাহিত্যকে আরো তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করতে গেলে শ্রীশচন্দ্র দাসের ভাষায় বলতে হয়- ‘নিজের কথা, পরের কথা, বাহ্য জগতের কথা সাহিত্যিকের মনোবীণায় যে সুরে ঝংকৃত হয় তার শিল্পসংগত প্রকাশই সাহিত্য।’

সাহিত্যের উদ্দেশ্য:
সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো। এই জাগরণ মানব মনকে করে তোলে সুশোভিত। মানুষ মাত্রই সুন্দরের পূজারী। এই সুন্দর মানুষের মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে যায়। আর জগতে সাহিত্যই হলো একমাত্র শুদ্ধতম জিনিস যা মনের গভীরতম স্থানে প্রবেশ করে। ভালো কোনো কবিতা কিংবা গল্প আমরা সহজেই ভুলে যাই না। বরং তা স্থান, কাল, পাত্র ভেদে মনের মানসপটে ভেসে উঠে। আর সাহিত্য এইখানেই তার উদ্দেশ্যে শতভাগ সফল। সাহিত্যের শুদ্ধ চর্চা মানুষের মনকে নিয়ে যায় এক অনন্য উচ্চতায়।

মানবজীবনে সাহিত্য:
সাহিত্য হলো আমাদের চোখের মতো যা ক্ষুদ্র অথচ চারপাশের সব কিছুকে বিশালাকারে দেখতে পায়। সাহিত্যকর্ম সে গল্প, কবিতা, উপন্যাস যাই হোক না কেনো তা মানুষের অন্তরের অনুভূতিকে প্রকাশ করে। সমাজের মূল্যবোধ, সমসাময়িক সকল চিন্তার সৃজনশীল প্রকাশের মাধ্যম হলো সাহিত্য। সাহিত্য ও সমাজ: কবি-সাহিত্যিকরা কল্পনা নির্ভর হলেও বাস্তবের বাইরে নন। তাই তাদের সৃষ্ট সাহিত্যকে এককথায় সমাজের দর্পণ বলা যায়। শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় তৎকালীন সমাজের রূপ আমাদের সামনে উঠে এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল কিংবা সুকান্তের লেখায় ফুটে উঠেছে সমাজ চিত্র, সাম্যের গান। মানবজীবনের জয়গান শুধু সাহিত্যিকের বীণাতেই ঝংকৃত হয়েছে বারবার।  সুতরাং সাহিত্যকে সমাজের বাইরে কল্পনা করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ সাহিত্য আর সমাজ একই সুঁতোয় গাঁথা।

সাহিত্য পাঠের উদ্দেশ্য:
সাহিত্য পাঠের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মনকে আনন্দ দেয়া। সেই আনন্দদানের ভেতর দিয়ে যদি কোনো জ্ঞানার্জন হয় তবেই তা সার্থকতা লাভ করে। কারণ একমাত্র সাহিত্যেই মানবাত্মা খেলা করে এবং তার আনন্দ উপভোগ করে।

সাহিত্যের বিস্তৃতি:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন- “যে দেশে সাহিত্যের অভাব সে দেশের লোক পরস্পর সজীব বন্ধনে আবদ্ধ নহে, তাহারা বিচ্ছিন্ন।” সাহিত্য হলো এমন বন্ধন যা অতীতকে বর্তমানের সাথে দারুণভাবে এক করে দিয়েছে। সাহিত্যের সূত্র ধরেই মানুষ তার শিকড়ের টানে ছুটে যায়। সাহিত্যের বিস্তৃতি শুধু কবিতার ছন্দে আর গল্পের লাইনে আবদ্ধ নয়। আকাশের যেমন সীমানা নেই তেমনি সাহিত্যও বিস্তৃত মানব সভ্যতার দিগন্ত থেকে দিগন্তে।

সাহিত্য পাঠের মূল্য:
সাহিত্য মানুষের মননকে যতটা বিকশিত করে ততটা বিকাশ লাভ আর কিছুতে হয় না। সাহিত্য মানবাত্মাকে তৃপ্তি দানের পাশাপাশি নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। সাহিত্যের স্নিগ্ধ জলে ম্লান করা পরিশীলিত মন কখনোই জগতের অকল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। সাহিত্য চর্চা মানব মনকে জাগতিক ব্যস্ততা থেকে মুক্তি দান করে। মুক্ত আত্মাই কেবল শুদ্ধ চিন্তার মাধ্যমে সভ্যতার বাতিঘরে অতন্দ্র প্রহরী হতে পারে। সুতরাং সাহিত্য পাঠের মূল্য জগতের যেকোনো কিছুর বিচারে শ্রেষ্ঠ।        

উপসংহার :
ফুল যেমন বাগানকে সুশোভিত করে, সাহিত্য তেমনি ভাষাকে অলংকৃত করে। সাহিত্য না থাকলে পৃথিবীতে এত গান, সুর, গল্প, কবিতা জন্মাত না। নীরস পৃথিবীকে সরস রাখতে সাহিত্য তাই অনুক্ষণ জেগে থাকে হৃদয় থেকে হৃদয়ে। অন্তরকে জাগ্রত রাখতে, মনকে আন্দোলিত করতে, চিত্তকে আকর্ষিত করতে সাহিত্য পাঠের কোনো বিকল্প নেই।
   ☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★              
         
                  ৫.  গ্রন্থাগার

সূচনা:
শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে মানব সভ্যতার সকল জ্ঞান জমা হয়ে আছে গ্রন্থের ভেতর। অন্তহীন জ্ঞানের আঁধার হলো গ্রন্থ, আর গ্রন্থের আবাসস্থল গ্রন্থাগার। মানুষের হাজার বছরের লিখিত-অলিখিত সব ইতিহাস ঘুমিয়ে আছে একেকটি গ্রন্থাগারের ছোট ছোট তাঁকে। গ্রন্থাগার হলো কালের খেয়াঘাট, যেখান থেকে মানুষ সময়ের পাতায় ভ্রমণ করে। প্রাচীন শিলালিপি থেকে আধুনিক লিপির গ্রন্থিক স্থান হলো গ্রন্থাগার। একটি গ্রন্থাগার মানব জীবনকে পাল্টে দেয়। গ্রন্থ কিবা গ্রন্থাগার আত্মার খোরাক যোগায়। গ্রন্থাগার হলো শ্রেষ্ঠ আত্মীয় যার সাথে সবসময় ভালো সম্পর্ক থাকে। আর জ্ঞানচর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অনন্য।

গ্রন্থাগার কী:
গ্রন্থাগার বা প্রকৃত অর্থে পাঠাগার হলো বই, পুস্তিকা ও অন্যান্য তথ্য সামগ্রির একটি সংগ্রহশালা যেখানে পাঠক গ্রন্থপাঠ, গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান করতে পারেন। বাংলা গ্রন্থাগার শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ করলে ‘গ্রন্থ+আগার’ পাওয়া যায়। অর্থাৎ গ্রন্থাগার হলো গ্রন্থ সজ্জিত পাঠ করার আগার বা স্থান। গ্রন্থাগার হলো জ্ঞানের এমন এক সমুদ্র সেখানে বিচরণ করে প্রতিটি মানুষ উন্নত মননের অধিকারী হতে পারে। আর তাই গ্রন্থাগারকে তুলনা করা হয় শব্দহীন মহাসমুদ্রের সাথে। এটি অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের মাঝে সেতুবন্ধনের এক নীরব সাক্ষী।

গ্রন্থাগারের ইতিহাস: 
আজকের পৃথিবীকে জ্ঞান বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করেছে যে গ্রন্থাগার তা প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। সভ্যতার ক্রমশ অগ্রসর হওয়ার পথে মানুষ তার সৃষ্টিশৈলিকে সংরক্ষণ করা শুরু করল। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া, ইরাকের বাগদাদ, দামেস্ক, প্রাচীন গ্রিস ও রোমে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের নিদর্শন পাওয়া যায়। এছাড়া উপমহাদেশের তক্ষশীলা ও নালন্দায় সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছিল। আব্বাসীয় ও উমাইয়া শাসনামলে ‘দারুল হকিমা’ নামক গ্রন্থাগার ইউরোপকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করেছে। সমকালীন মিশরের ‘বাইতুল হিকমা’ও অনুরূপ ভূমিকা পালন করেছে। যুগে যুগে গ্রন্থাগারগুলো গড়ে উঠেছিল রাজদরবার ও ধর্মীয় উপাসনালয়কে ঘিরে।

গ্রন্থাগারের ধরণ:
আধুনিক সভ্যতায় গ্রন্থাগারের ধরণ বদলে গেছে। ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারের ধারণা থেকে মানুষ এখন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছে। পারিবারিক গন্ডি থেকে গ্রন্থাগার এখন বৈশ্বিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ধরণ অনুযায়ী গ্রন্থাগারকে নিম্নোক্ত শ্রেণিতে ভাগ করা যায়-

ক) গণগ্রন্থাগার:
সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত গ্রন্থাগারকে গণগ্রন্থাগার বলা হয়। যা পাবলিক লাইব্রেরি নামে পরিচিত।

খ) কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার:
সাধারণত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানসম্পন্ন গ্রন্থাগার থাকে। যেখানে বহু মূল্যবান গ্রন্থ সংরক্ষিত থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার এরকম সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার।

গ) গবেষণা গ্রন্থাগার:
বিশেষ কোনো বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজনে যে গ্রন্থাগার খোলা হয় তাই হলো গবেষণা গ্রন্থাগার। ঢাকায় বিজ্ঞান বিষয়ক এমন গ্রন্থাগার হলো ‘ম্যান্সডক লাইব্রেরি’।

ঘ) বিশেষ গ্রন্থাগার:
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন যে গ্রন্থাগার পরিচালনা করে তাকে বিশেষ গ্রন্থাগার বলে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এরকম গ্রন্থাগার রয়েছে।

ঙ) ভ্রাম্যমান গ্রন্থাগার:
বিভিন্ন দেশে গাড়িতে বহনযোগ্য গ্রন্থাগার রয়েছে, যা পাঠকের কাছে গ্রন্থ পৌঁছে দেয়। বাংলাদেশে ‘বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র’ এমন একটি গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছে। ভেনিজুয়েলার ‘মমবয়’ বিশ্ববিদ্যালয় খচ্চরে ভ্রাম্যমান গ্রন্থাগার বানিয়ে পাহাড়ি জনপদে বই সরবরাহ করে থাকে।

গ্রন্থাগারের বৈশিষ্ট্য:
গ্রন্থাগার হলো সময়ের পাতা থেকে পাতায় ভ্রমণের একমাত্র সেতু। গ্রন্থাগারের জ্ঞান নদীর মতো দেশ, কাল, সীমানার গন্ডি পেরিয়ে যায়। প্রবাহিত হয় হৃদয় থেকে হৃদয়ে। গ্রন্থাগার তাই অজস্র মানুষের শব্দহীন মিলনের মুক্তমঞ্চ। জ্ঞানী যেখানে পায় জ্ঞানের অমিয় সুধা, ভাবুক খুঁজে পায় ভাবের টলমলে দীঘি, চিন্তাবিদ পায় চিন্তার বহুমুখী খোরাক। গ্রন্থাগারে রয়েছে সহস্র বছর ধরে জমে থাকা প্রশ্নের উত্তর। হৃদয় ও মনের এমন রঙিন পাঠশালা আর কোথাও নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘লাইব্রেরী’ প্রবন্ধে বলেছেন-‘লাইব্রেরীর মধ্যে আমরা অজস্র পথের চৌমাথার উপর দাঁড়াইয়া আছি। কোনো পথ অনন্ত সমুদ্রে গিয়াছে, কোনো পথ অনন্ত শিখরে উঠিয়াছে, কোনো পথ মানব হৃদয়ের অতল স্পর্শে নামিয়াছে। যে যেদিকে ধাবমান হও কোথাও বাধা পাইবে না।’ মানুষ গ্রন্থাগারের ভিতর খুঁজে পায় তার সকল জিজ্ঞাসার উত্তর। অনন্তকাল ধরে গ্রন্থাগার মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নীরবে-নিভৃতে।

গ্রন্থাগারের সুবিধা:
সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার জ্ঞানের নীরব সমুদ্র। তৃষিত পাঠকের জ্ঞান তৃষ্ণা নিবারণ করাই গ্রন্থাগারের উদ্দেশ্য। গ্রন্থাগার হলো কালান্তরের সকল গ্রন্থের মহাসম্মেলন। যেখানে এক হয়ে গেছে অতীত আর বর্তমান। সন্ধানী হৃদয় গ্রন্থাগারে অতীত-বর্তমানের সাথে ভবিষ্যতের সেতু রচনা করে। একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, একটি জাতির উন্নতির সোপান। গ্রন্থাগার নারী, পুরুষ, বয়সের কোনো বাঁধা রাখেনি। যে কেউ চাইলে এখানে এসে জ্ঞানের অতল সমুদ্রে অবগাহন করতে পারে। গ্রন্থাগারের সারি সারি তাকে জমে আছে সহস্রাব্দের কথামালা। গ্রন্থাগারের শব্দহীন কারাগারে বন্দী প্রতিটি মানুষই সভ্যতার আলোকবর্তিকা বহন করে আসছে যুগ যুগ ধরে।

বিখ্যাত গ্রন্থাগারসমূহ:
সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ ধন-সম্পদের পাশাপাশি গ্রন্থ সংগ্রহের মতো মহৎ কাজ করে আসছে। মানুষের এই মহৎ উদ্যোগের কারণে পৃথিবীর নানা প্রান্তে গড়ে উঠেছে উন্নতসব গ্রন্থাগার। বিখ্যাত গ্রন্থাগারসমূহের মধ্যে প্রথমেই আসে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগার ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেসে’র নাম। আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত এই লাইব্রেরিতে রয়েছে ৩ কোটি ২০ লাখ বইয়ের এক বিশাল সমাহার। লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামও পৃথিবীর বিখ্যাত লাইব্রেরির মধ্যে অন্যতম। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বডলিন লাইব্রেরি’তে রয়েছে ১ কোটিরও বেশি গ্রন্থ। এছাড়া পৃথিবীর প্রাচীনতম লাইব্রেরির মধ্যে রয়েছে ‘ভ্যাটিকান লাইব্রেরি’। এ ছাড়াও ফ্রান্সের বিবলিওথিক লাইব্রেরি, মস্কোর লেনিন লাইব্রেরি ও কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি উল্লেখযোগ্য। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিও পৃথিবীর প্রাচীন লাইব্রেরির মধ্যে অন্যতম। যা এক সময় পৃথিবীর সপ্তাচার্যের মধ্যেও ছিল।

গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা:
বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাবার দরকার, তেমনি জীবনকে গতিময় করার জন্য দরকার জ্ঞান। জ্ঞানের আঁধার হলো গ্রন্থ আর গ্রন্থের আবাসস্থল হলো গ্রন্থাগার। প্রতিটা সমাজে যেমন উপাসনালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল দরকার তেমনি গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। গ্রন্থাগার মানুষের বয়স, রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী গ্রন্থ সরবরাহ করে থাকে। আর তাই সচেতন মানুষ মাত্রই গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। পৃথিবীর যতো মহান মনীষী আছেন তাদের সবাই জীবনের একটা বড় সময় গ্রন্থাগারে কাটিয়েছেন। সাহিত্য-শিল্প, বিজ্ঞান, ইতিহাস সংস্কৃতিসহ সব ধরণের জ্ঞানের আঁধার হতে পারে একটি গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগার একটি জাতির বিকাশ ও উন্নতির মানদন্ড। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ছাড়া জাতীয় চেতনার জাগরণ হয় না। আর তাই গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। পৃথিবীর বহুদেশ পাঠকের চাহিদা পূরণের জন্য গড়ে তুলেছে অগণিত গ্রন্থাগার। শিক্ষার আলো বঞ্চিত কোনো জাতি পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেনি। শিক্ষার বাতিঘর বলা হয় গ্রন্থাগারকে। গ্রন্থাগার ছাড়া কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র তার নাগরিককে পরিপূর্ণ শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে পারে না। গ্রন্থাগারের প্রয়োজনীয়তা তাই প্রতিটি সমাজে অনিবার্য।

উপসংহার:
জীবনে পরিপূর্ণতার জন্য জ্ঞানের বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। জ্ঞান তৃষ্ণা নিবারণ করতে রয়েছে গ্রন্থাগার। একটি সমাজের রূপরেখা বদলে দিতে পারে একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। মনকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে গ্রন্থাগারের অবদান অনস্বীকার্য। তাই শহরের পাশাপাশি প্রতিটি গ্রামে গ্রন্থাগার গড়ে তোলা প্রয়োজন।
☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★★
   

৬.সমাজ সেবায় ছাত্র-ছাত্রীদের ভূমিকা / 
সমাজের প্রতি ছাত্র-ছাত্রীদের কর্তব্য / 
সমাজকল্যাণে ছাত্র-ছাত্রীদের কর্তব্য / 
ছাত্র-ছাত্রীদের সামাজিক দায়িত্ব / লেখাপড়ার বাইরে ছাত্র-ছাত্রীদের সামাজিক কর্তব্য / 
সমাজকল্যাণ ও ছাত্রসমাজ / দেশের ও সমাজের ভবিষ্যত হল ছাত্রসমাজ

ভূমিকাঃ
সমাজ একটা সংঘবদ্ধ ব্যবস্থা, মনুষ্যত্ব বিকাশের ক্ষেত্রভূমি। সমাজের মধ্যে দিয়েই মানুষ তার পাশব প্রবৃত্তিকে অতিক্রম করে মনুষ্যত্ব অর্জন করে। কাজেই যে সমাজ মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করে, তাকে অবশ্যই সুন্দর করে গড়ে তোলা দরকার। এর এ কাজে প্রতিটি সামাজিক মানুষের কিছু না কিছু কর্তব্য থাকে। ছাত্রছাত্রীরাও তার ব্যতিক্রম নয়। অধ্যয়ন ছাত্রছাত্রীদের প্রধান লক্ষ্য, একথা মেনে নিয়েও বলা যায়, অধ্যয়নের পাশাপাশি সমাজের প্রতিও তাদের অনেক কর্তব্য আছে।

সমাজের সঙ্গে ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্কঃ
ছাত্রগণ ভিন্ন গ্রহবাসী নয়। তারা এই সমাজের সব থেকে প্রাণবান, স্তেজ, বলিষ্ঠতম অংশীদার। তারাই ভবিষ্যৎ সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক, সমাজের মেরুদন্ড। তাই সমাজ যেমন জীবনের প্রস্তুতিপর্বে ছাত্রদের সর্ববিধ সুযোগ-সুবিধা দানের চেষ্টা করবে তেমনি ছাত্ররাও পুঁথিগত পাঠ ছাড়াও সমাজসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যেখানে অন্যায়, অবিচার, সামাজিক নিষ্পেষণ চলছে তা দূরীভূত করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

ছাত্রসমাজের সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ

(ক) সেবাপরায়ণতাঃ
জনগণের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার মধ্যেই নিহিত আছে শিক্ষার সার্থকতা। অল্পবয়সী ছাত্রদের গতিশীল, স্বার্থচিন্তা ও বৈষয়িকচিন্তনহীন নিঃস্বার্থপরতা ও সেবাধর্মে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। এইভাবে ছাত্রমনে সেবাধর্মী পবিত্র আদর্শবোধ চিরস্থায়ী আসনলাভে তাদের এক সংবেদনশীল নাগরিকে পরিণত করবে।

(খ) নিরক্ষরতা দূরীকরণঃ
আমাদের দেশের সার্বিক শিক্ষার অবস্থা খুবই খারাপ। ভারতবর্ষে নিরক্ষরতা একটি সামাজিক অভিশাপ। এই অভিশাপ থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার জন্য ছাত্রসমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে। ছাত্ররা নিজেদের শিক্ষিত করে তোলার সঙ্গে সঙ্গে নিরক্ষর ব্যক্তিদের সাক্ষর করে তোলার উদ্যোগী হতে পারে। ছাত্ররাই ভারতভূমিকে শিক্ষার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত করতে পারে।

(গ) স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষাঃ
আমাদের দেশে সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব লক্ষ্য করা যায়। গ্রাম ও শহরের নানা জায়গায় নানা রোগের জীবাণু ছড়িয়ে আছে। অপরিচ্ছন্নতা দূরীকরণে ছাত্ররা নিজেরাই হাত লাগায়। গ্রামে ও শহরে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে স্বাস্থ্যসচেতন করে তোলে। সমাজের অধিকাংশ লোকই আজ সর্বনাশা ড্রাগের নেশায় আচ্ছন্ন। এই পতনের হাত থেকেও তাদের সুষ্ঠু স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ছাত্রছাত্রীরা অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে।

(ঘ) প্রথা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইঃ
কুসংস্কারাচ্ছন্ন আমাদের সমাজ। এর কারণ অঞ্জতা এবং প্রথার প্রতি নির্বিচার আনুগত্য। মানুষের অঞ্জতা ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আজও নানান তুকতাক, তাবিজ-মাদুলি নিয়ে ভন্ড সাধুদের রমরমা চলছে। ছাত্রসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে সমাজকে কুসংস্কারগুলি থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে। পণপ্রথার মতো একটি সামাজিক পাপের বিনাশেও ছাত্রসমাজকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। তাহলেই ধীরে ধীরে সমাজে প্রথা ও কুসংস্কার বিলুপ্তি সম্ভব হবে।

(ঙ) প্রতিবাদ ও জাতীয় সংহতি রক্ষাঃ
সমাজে প্রতিনিয়ত অন্যায়-অবিচার ঘটেই চলেছে। এসব ক্ষেত্রে ছাত্রদেরকে রুখে দাঁড়াতে হবে। আমাদের দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ বিষ প্রবল হয়ে উঠেছে। এই সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীকে আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হতে হবে। ছাত্রশক্তিই একমাত্র পারে দেশের জাতীয় সংহতি রক্ষা করতে।

উপসংহারঃ
ছাত্রসমাজ একটি বৃহৎ শক্তি। এই শক্তি যদি সমাজকল্যাণে নিয়োজিত হয়, তাহলে সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত। ওরা “পদ্মকোশের বজ্রমণি ওরাই ধ্রুব সুমঙ্গল।” ছাত্রছাত্রীরা সচেষ্ট হলে একদিন না একদিন সেই আদর্শ সমাজ গড়ে উঠবেই। দেশবাসীর কল্যাণ আশিসে তাদের জীবন হবে সার্থক। নির্ভীক সমাজসেবী এইসব পরাগত প্রাণ ছাত্রছাত্রীদের মন্ত্র হোক—
“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী ভয় নাই,    ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ, যে করিবে দান ক্ষয় নাই, তার ক্ষয় নাই।”
    
               
☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★
          

৭.     বিজ্ঞান ও কুসংস্কার

ভূমিকাঃ
প্রাগৈতিহাসিক যুগে মানুষ ছিল নিতান্তই প্রকৃতি নির্ভর। প্রকৃতির নির্মম ঝড় ঝঞ্ঝায়, প্রবল বন্যা ও ক্ষরায় এবং ভূমিকম্পের বিধবংসী আলোড়নে মানবজীবন ক্ষণে ক্ষণে বিপর্যস্ত হয়েছে। চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহন এ সব কিছুকে সে দৈব নির্ভর বলে মেনে নিয়েছে। আর দৈনন্দিন জীবনে যা কিছু ভালো মন্দ ঘটেছে সব কিছুর পিছনে দেব-দেবীর সবাকু দৃষ্টির প্রভাব আছে বলে বিশ্বাস করেছে।

কুসংস্কারের স্বরূপঃ
যে বিশ্বাসের পিছনে কোন যুক্তি নির্ভরতা নেই, কোন তথ্যভিত্তিক প্রমাণাদি নেই , তাকেই আমরা কুসংস্কার বলি। অর্থাৎ যুক্তিহীন অন্ধবিশ্বাসই হল কুসংস্কার।

বিজ্ঞানের স্বরুপঃ
বিজ্ঞান কথাটির অর্থ হল বিশেষ জ্ঞান। অর্থাৎ কোন কিছু অজানা বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে কোন কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহন। সেক্ষেত্রে একই কার্যকরণের ফলে একই ফল হয়। সেটাই অমোঘ সত্য। সেটাই বিজ্ঞান। এখানে আছে শুধু বিচার-বিবেচনা, যুক্তি দিয়ে বিশেষ জ্ঞানে পৌছানো।

কুসংস্কারের বিভিন্ন প্রকাশঃ
একবিংশ শতাব্দীর ঊষালগ্নে, কম্পিউটার, রোবট ইত্যাদির যুগে পাহাড়ের মত উচু করে দাঁড়িয়ে আছে হাচি, টিকটিকি, পিছু ডাকা আরও কত কী। ভোরের স্বপ্ন নাকি বিফল হয় না, মেয়েদের বাম চোখ নাচলে নাকি শুভ হয় অপরপক্ষে ডান চোখ নাচা নাকি ভারি অপায়া, কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া মেয়েদের চুল কাটা ভূতের উপস্থিতি প্রভূতি। এছাড়া এমনকি পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যক্ষ বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সময় ঝাঁট দেখেছিলেন বলে সেদিনটি আর কাজেই যাওয়া হল না, এইরকম অনেক হাজার হাজার নাগপাশে আমাদের দিনক্ষণ বাঁধা।

কুসংস্কারে আস্থার কারণঃ
বিজ্ঞানের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। বিজ্ঞান কখনো কোন মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। বিজ্ঞান কোনো পরীক্ষার্থীর ভালো করে দিতে পারে না। কোন খেলায় কোন পক্ষ জয়ী হবে তা বলে দিতে পারে না। তাই এই সব যে অনিশ্চয়তা সেখানে বিজ্ঞান আপাত পরাজয়। আর সেখানেই শুরু দৈব বিশ্বাসের। জয় হয় দৈব নির্ভরতার। অতএব কুসংস্কার থাকবেই। যে কুসংস্কারের প্রভাবে মানুষ শুধুমাত্র ভাগ্যবাদী হয়। কোন কর্ম না করে শুধুমাত্র সৌভাগ্যের অপেক্ষায় থাকে তা নিশ্চয় মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর। তাই কর্ম করে যেতে হবে নিষ্ঠার সঙ্গে অর্থাৎ কর্ম ও ভাগ্যের সমন্বয়ে আসে সাফল্য।

কুসংস্কার দূরীকরণে আমাদের করণীয়ঃ
কুসংস্কার দূরীকরণের প্রধান হাতিয়ার হল বিজ্ঞান। মানুষের বিজ্ঞান চেতনাকে বৃদ্ধি করতে পারলেই এই দূরারোগ্য ব্যধি থেকে আমরা মুক্তি পেতে পারি। এ ব্যাপারে বিজ্ঞান পরিচালিত বিতর্ক সভা, আলোচনা চক্র, প্রদর্শনাদি অনেক সুফল দিতে পারে।

উপসংহারঃ
বিজ্ঞান চেতনাই পারে মানুষকে কুসংস্কার থেকে মুক্তি দিতে। তাই সব কিছুকে যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, বিচার করে গ্রহন করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। আর তার জন্য চাই শিক্ষা , সার্বিক শিক্ষা । শিক্ষা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কুসংস্কারের অপসারণ অবশ্যম্ভাবী।
☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★


৮. জীবনে সময়ানুবর্তিতার মূল্য

ভূমিকা:-
‘সময় চলিয়া যায় / নদীর স্রোতের প্রায়’ -- সময় কারোর জন্য থেমে থাকে না অথচ মানুষের জীবন সীমিত পরিসরের গন্ডিতে বাঁধা । নানা স্বপ্ন, আশা-প্রত্যাশার নানা কল্পনা নিয়েই মানুষ বাঁচে । তাঁর স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে জীবনে নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন । কিন্তু সময় কারোর জন্য অপেক্ষা করে না । তাই মানুষের জীবনে সময়ানুবর্তিতার একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে ।

সময়ের মূল্য:
সময় অমূল্য সম্পদ। পার্থিব জীবনের ধন-সম্পদ হাতছাড়া হয়ে গেলে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে হারানো সম্পদ পুনরায় অর্জন করা যায়, স্বাস্থ্য নষ্ট হলে চিকিৎসার মাধ্যমে তা ফিরে পাওয়া যায়। কিন্তু যে সময় একবার চলে যায়, কোনো কিছুর বিনিময়ে তা আর ফিরে আসে না। ইংরেজীতে একটি প্রবাদ আছে-‘Time and tide wait for none’। নদীর বয়ে যাওয়া স্রোতকে যেমন চাইলেও আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি অতিবাহিত সময়কেও ফেরত আনা যায় না। মানুষ শত চেষ্টা করলেও অতীতের দিনগুলি ফিরিয়ে আনতে পারে না। আর একারণেই জাগতিক কোনো মূল্যমান দ্বারা সময়কে বিচার করা যায় না। রবার্ট ব্রাউনিং যথার্থই বলেছেন- ‘একটা দিন চলে যাওয়া মানে জীবন থেকে একটা দিন ঝরে যাওয়া।’ আর ঝরে যাওয়া দিনটিকে কোনো কিছুই বিনিময়েই পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়। ফলে এক মুহূর্ত সময় অপচয় করা মানে জীবনের একটা অংশের অপচয় করা। আর এই অপচয়ের পরিণাম ভয়াবহ।

সময়ের অপচয় :-
সময় বড়ই মূল্যবান । তাকে অবহেলা, উপেক্ষা, অপচয় করলে তার মূল্য মানুষকে দিতেই হয় । কথায় বলে সময় থাকতে কিছু না করলে জীবনে অনিবার্য্য ভাবেই নেমে আসে দুঃখের অমানিকা । আলস্য, কর্মবিমুখ, উদাসীন ভাবে কাটালে জীবনে কখনই সফলতা আসে না । আর যদি সময়কে যথোচিত ভাবে মূল্য দিয়ে ব্যবহার করা যায় তাহলে জীবনে সাফল্য আসবে, জীবন সার্থক হবে ।

জীবনে সময় নিষ্ঠার মূল্য :-
মানবজীবনের ভবিষ্যৎ সফলতার প্রথম সোপান হল সময়ের সদ্ ব্যবহার । উন্নতকামী মানুষ সময়কে ঠিকমতো কাজে লাগিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার পিরামিড গড়ে তোলে । পৃথিবীতে যারা মৃত্যুজ্ঞয়ী, যারা মরেও মরে না, তাঁরা সময়ের নিগড়ে নিজেদের জীবনবীনাকে বেঁধেই চলেছিলেন । নিজেদের ব্যক্তিগত সুখস্বাচ্ছন্দের উপর বেশি নজর না দিয়ে সমাজের মঙ্গলের কথা, উন্নতির কথা ভেবেই তাঁরা অনলস ভাবে কাজ করে গেছেন । কঠোর সাধনা করেছেন । জীবনে সময়নিষ্ঠার প্রয়োজন সব থেকে বেশি ।

ছাত্রজীবন ও সময়াণুবর্তিতা :-
মানুষের চরিত্র গঠন ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রকৃষ্ট সময় হল ছাত্রজীবন । ছাত্রজীবনের মূলমন্ত্র হল, অধ্যয়নং তপঃ । পড়াশুনা করা তপস্যারই সামিল । সঠিক বিদ্যার্জন সাধনাসাপেক্ষ । সাধনার দ্বারাই তা অর্জন করতে হয় । তার জন্য সময়নিষ্ঠ হওয়া একান্ত প্রয়োজন । সময়ের নিগড়ে নিজের জীবনকে বেঁধে চলতে পারলে জীবনে সাফল্য আসবেই । মানবজীবনকে স্বার্থক করতে প্রত্যেকের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত-‘Work while you work, play while you play, And that is the way to be happy and gay.'  তাই ছাত্রজীবনে সময়ানুবর্তিতা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ।

উপসংহার :-
সময়ানুবর্তিতাই একটা সফল মানুষের মূল চাবিকাঠি । জীবনের স্বপ্নকে সার্থক ও সুন্দর করতে হলে সময়কে ঠিক ঠিক ভাবে ব্যবহার করতে হবে । সময়ের মূল্যবোধ একটা দেশ ও জাতিকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে । শৈশব থেকেই এই সময়ের ব্যবহারের মূল্যবোধ গড়ে তুলতে হবে । কারণ আমাদের মনে রাখতে হবে জীবনের মূল্য আয়ুতে নয়, কল্যাণপুত কর্মে । সময় নিষ্ঠা সেই কল্যাণ পুত কর্মের পথ প্রশস্ত করে । আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমরা যেন সময়ের দাস হয়ে না পড়ি, সময়কেই আমাদের দাস হতে হবে ।
☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★


৯. প্রতিবন্ধীদের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য

সূচনা :-
মানসিক বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যাদের মধ্যে রয়েছে তাদেরকে আমরা প্রতিবন্ধী বলি । প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ মানুষ । যে মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিকতা কিছু বেশি থাকে অর্থাৎ চলাফেরায় বা কথাবার্তায় যে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয় সেই প্রতিবন্ধী । কিন্তু এরাও সমাজের অন্তর্ভুক্ত । এদেরকে অবহেলা করে বা এদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে চললে কখনই সমাজের উন্নতি সাধন করা যায় না । এদের কে সঙ্গে নিয়েই আমাদের চলতে হবে ।

প্রতিবন্ধীদের শ্রেণীবিভাগ :-
প্রতিবন্ধীদের দুটি শ্রেণী – (১) শারীরিক প্রতিবন্ধী ও (২) মানসিক প্রতিবন্ধী । অন্ধ, বোবা, বধির, খোঁড়াদের বলা হয় শারীরিক প্রতিবন্ধী আর যাদের মানসিক ভারসাম্য নেই, বোকা, উন্মাদ তাদেরকে মানসিক প্রতিবন্ধী বলা হয় । কেউ কেউ জন্ম থেকে প্রতিবন্ধকতার শিকার হয় আবার কেউ মারাত্মক অসুখে ভুগে বা বিভিন্ন দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধী হয় । যে কোনো প্রতিবন্ধকতা মানুষের কাছে অবাঞ্ছিত এবং দুঃখজনক । শত দারিদ্রের মধ্যেও স্বাভাবিক জীবনের অধিকারী যে সে সুখী আর বিপুল ঐশ্বর্যের মধ্যে থেকেও একজন বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী কখনই সুখী হতে পারে না ।

প্রতিবন্ধীদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য :-
প্রত্যেক প্রতিবন্ধীই এই সমাজের অন্তর্ভুক্ত । তারা অন্য কোনো গ্রহের অন্য কোনো জীব নয় —একথা সবার প্রথমে আমাদের মনে রাখতে হবে । অনেক প্রতিবন্ধী আছে যারা মানসিক ভাবে দুর্বল হলেও শারীরিক দিক থেকে বেশি সক্ষম । তাদের সেই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের বেঁচে থাকার আশ্বাস যোগাতে হবে । তাদের পাশে থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রতিটি মানুষের একান্ত কর্তব্য । যে শারীরিক ভাবে প্রতিবন্ধী যেমন অন্ধ, খোঁড়া তাদের প্রতি আমাদের সহৃদয় হওয়া একটা সামাজিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে । ‘অন্ধজনে দেহ আলো’ —আলো না দিতে পারি ভালবাসা তো দিতে পারি ।

প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসন :-
বর্তমানে উন্নত চিকিৎসা বিদ্যার সাহায্যে বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধকতার চিকিৎসা করে প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব হচ্ছে । কৃত্রিমভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপনের সফল প্রয়োগে অনেকে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাছে । অনেকে শ্রবণ ক্ষমতাও ফিরে পাছে । আবার জটিল মানসিক প্রতিবন্ধী সুস্থ হয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসছে । তবে সে সুযোগ বা সুবিধা খুব কম সংখ্যক মানুষ উপভোগ করছে ।
সরকারি বা বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে প্রতিবন্ধী সমস্যা অনেকটা দূর করার চেষ্টা চলছে । প্রতিবন্ধীদের জন্য পদ সংরক্ষণ করে অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধীরা চাকরি করে নিজেদের জীবন নির্বাহ করছে । আমাদের কোলকাতা শহরে ‘ডিফ এন্ড ডাম্ব’ স্কুল বেহালার ব্লাইন্ড স্কুল, নরেন্দ্রপুরে রামকৃষ্ণ মিশনের ব্লাইন্ড স্কুল বিভিন্ন এন.জি.ও. বিভিন্ন রকম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে প্রতিবন্ধীদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করে চলেছে । এভাবে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি আমাদেরও এদের পাশে থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে । এটাই আমাদের সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে পড়ে ।

উপসংহার :-
জীব সেবা মানেই শিব সেবা । মানবসেবা হল পরম সেবা । কারণ ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ —একথা সকল মানব প্রেমিকেরাই বলে গেছেন । তাই প্রতিবন্ধীদের পাশে থেকে তাদের বন্ধু হয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে । যদি আমরা তাদের ভালোবেসে কাছে টেনে না নিই তাহলে তাদের চোখের জল আমাদের মসৃণ পথ পিছিল করে দেবে ।
☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★★★


১০. বিদ্রোহী কবি নজরুল / 
আমার প্রিয় কবি নজরুল ইসলাম

ভূমিকাঃ

“ভুল হয়ে গেছে বিলকুল
আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে
ভাগ হয়নি কো নজরুল।”
           —অন্নদাশঙ্কর রায়

বড়ো আক্ষেপ করে কবি অন্নদাশঙ্কর পঙক্তি কয়টি লিখেছেন। দেশভাগের বেদনা আর পাঁচজন বাঙালির মতো কবিকেও বিচলিত করেছিল। কিন্তু সব ভাগাভাগির উর্ধ্বে নজরুলকে স্থাপন করে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন নজরুল বাঙালী কবি। সকল সাম্প্রদায়িক গন্ডির বাইরে তার স্থান। সত্যিই নজরুল আমাদের জাতিসত্তার প্রতীক। তাঁর কবিতা আর গান আজও কোটি কোটি বাঙালীর জীবনের মহামন্ত্র ধ্বনিরূপে অনুরণিত। এককথায়—“সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনায় নজরুল।”

দারিদ্র্য নিপীড়িত শৈশবঃ
জন্মলগ্নেই নজরুলের ভাগ্যভূমিতে রোপিত হয়েছিল দুর্বিষহ দারিদ্র্যের বীজ। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে মে দীনদরিদ্র কাজি ফকির আহমেদের ঘরে বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের পর্ণকুটিরে অগ্নিশিশু নজরুলের জন্ম হয়। নজরুলের মায়ের নাম জাবেদা খাতুন। শৈশবে তাঁর নাম ছিল দুখু মিঞা। পিতা ছিলেন পরধর্ম সহিষ্ণু অথচ নিষ্ঠাবান মুসলমান।
মাত্র নয় বছর বয়সে নজরুলের পিতৃবিয়োগ হয়। ফলে শৈশবের শিক্ষার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। গাঁয়ের মক্তবের লেখাপড়া বাদ দিয়ে চুরুলিয়ার লেটো গানের দলে যোগ দেন এই সুকন্ঠী শিশু নজরুল। সমকালীন পরিবেশই তাঁকে দিয়েছিল দুঃখ জয়ের মহৎ উত্তরাধিকার। মেধা ছিল প্রখর কিন্তু সীমাহীন আর্থিক সংকটের পাহাড় তাঁর গতিপথে সৃষ্টি করেছিল দুস্থর বাঁধা। এই বাঁধাই সরস্বতীর সূচিসুভ্র অঙ্গন থেকে কঠিন সংগ্রামের রণভূমিতে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

জীবনের আর এক গতিপথঃ
১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশে, গঠিত হয়েছে সাত হাজার সৈনিক নিয়ে বাঙালি রেজিমেন্ট। নজরুলের চেতনায় তখন যৌবনের উন্মাদনা। তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ নামক একটি গল্প ১৯১৯ সালে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম কবিতা ‘মুক্তি’ ১৯১৯ সালেই বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হয়। এই কবিতায় তিনি আত্মস্বরূপ উন্মাচন করে বলেছিলেন—
“বল বীর বল উন্নত মম শির
শির নেহারি আমারই নতশির ঐ শিখর হিমাদ্রির।”

কবি জীবনের সূত্রপাতঃ
নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। তারপরে একে একে প্রাকাশিত হয় ‘দোলনচাঁপা’ (১৯২৩), ‘বিষের বাঁশি’ (১৯২৪), ‘ছায়ানট’ (১৯২৪) প্রভৃতি। শুধু কাব্যই নয় অসাধারণ সঙ্গীত রচনাতেও নজরুল আজও কিংবদন্তীর মতো বেঁচে রয়েছে। তাঁর গানে একদিকে যেমন স্বদেশ চেতনা আর মানবপ্রেম প্রচারিত হয়েছে, অন্যদিকে মানব জীবনের আশা আকাঙ্ক্ষার দ্যোতক প্রেমের অমীয় ধারা প্রাণ প্লাবিত জোয়ারে বাঙালীর মর্মে সৃষ্টি করে অপূর্ব গীতিঝংকার।

সাহিত্যসম্ভারঃ
নজরুলের আবির্ভাব পরাধীন ভারতে। আজীবন দরিদ্র নিপীড়িত কবির মধ্যে ছিল এক কঠিন সংগ্রামের স্পৃহা। তাঁর ওপর সাম্রাজ্যবাদী অপশাসন তাঁর চেতনায় বিপ্লবের অগ্নিসংযোগ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমসাময়িক কালে এবং তার পরবর্তী ব্রিটিশ ভারতে তাঁর কবিতার উজ্জীবনী শক্তি সংগ্রামের বীজ বপন করে। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সর্বহারা’, ‘ভাঙার গান’, ‘কামাল পাশা’, ‘সিন্ধুহিল্লোল’ প্রভৃতিতে তাঁর মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও সাম্যবাদী চেতনার আপসহীন সংগ্রামের ভাব প্রাকাশিত হয়েছে। ‘সাম্যবাদী’, ‘ফণীমনসা’ নজরুলের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও তাঁর সাহিত্য রচনার সংক্ষিপ্ত তালিকা এইরূপ— ছোটোগল্পঃ ‘ব্যাথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’; উপন্যাসঃ ‘বাঁধনহারা’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’, নাটকঃ ‘আলেয়া’, ‘ঝিলিমিলি’; কবিতাঃ ‘দোলন-চাঁপা’, ‘ছায়ানট’, ‘বুলবুল’—গীতগ্রন্থ ইত্যাদি।

বিদ্রোহী নজরুল:
বাংলা সাহিত্যে নজরুলের আবির্ভাব বিশেষত ঔপনিবেশিক শোষণ, অন্যায়, অত্যাচার ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে প্রবল ঝড়ের মতো। তাঁর রচিত কবিতা, গান, প্রবন্ধ, পত্রিকার নিবন্ধ প্রভৃতিতে কবির বিদ্রোহী সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন তিনি ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যের ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় বলেছেন-
‘মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না
বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।

সাম্য ও মানবতাবাদী নজরুল:
নজরুল ইসলাম ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির উর্ধ্বে তিনি শক্ত হাতে কলম ধরেছিলেন। ১৯২৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে তিনি লিখেছেন- কান্ডারী হুশিয়ার, পথের দিশা, হিন্দু-মুসলমান যুদ্ধ প্রভৃতি কবিতা। কান্ডারী হুঁশিয়ার কবিতায় বলেছেন-

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোনো জন?
কান্ডারী, বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!’

অন্যদিকে নজরুল ইসলামকে বলা হয় সাম্যের কবি, মানবতার কবি। তিনি হিন্দু-মুসলিম, ধনী-দরিদ্র, নারী-পুরুষকে সমান চোখে দেখেছেন। ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি বলেছেন
গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!

উপাধি ও সম্মানঃ
১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৌলিক সাহিত্য সৃষ্টির জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক পান। স্বাধীনোত্তর কালে ১৯৬০ সালে ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানে ভূষিত হন।

উপসংহারঃ
ডঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের মতে— “কবি নজরুল ইসলাম বাংলার তথা সমগ্র ভারতের আশা প্রদানকারী কবি। তিনি অনাগত কালের কবি।” নজরুলের সমগ্র সাহিত্যে বাংলাদেশের লোকজীবন তাঁর যথার্থ স্বরূপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। তিনি চির বিদ্রোহী তরুণ প্রাণের বার্তাবাহক। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, থাকবে বাঙালি, ততদিন তিনি বাংলার ঘরে ঘরে চিরজাগরুক থাকবেন তাঁর কবিতায়, গানে।
১৯৭৬ সালের ২৯শে মে, আগস্ট মাসে বাংলাদেশের ঢাকা শহরে রোগ জর্জর কবি গভীর আক্ষেপ বুকে নিয়ে চির বিদায় গ্রহণ করেন।

☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★☆★
    
  ১১  . একটি গাছ একটি প্রাণ
                           অথবা
                 গাছ আমাদের বন্ধু

ভূমিকা:

    "দাও ফিরে সে অরণ্য লহ এ নগর,      
   লহ যত  লৌহ , লোষ্ট্র, কাষ্ঠ ও প্রস্তর
                    হে নব সভ্যতা ।"

মানুষের প্রাণ শক্তি দিয়েছে গাছ।গাছ শুধু মানুষকে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন গ্যাসই দেয়নি, দিয়েছে খাদ্য এবং জীবনযাপনের আরো বিবিধ উপকরণ।অর্থাৎ মানুষের বাঁচার আশ্রয় হল অরণ্য। কিন্তু সভ্যতার বিকাশের ফলে নির্মম ভাবে ধ্বংস হচ্ছে গাছ।অরণ্যের সীমান্তে আজ নেমে এসেছে ধূসরতা । তাই পরিবেশ সচেতন প্রত্যেক মানুষ একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন, 'গাছ আমাদের বন্ধু' ।

জীবনের জন্য গাছপালা:
বাতাসে শ্বাস নিতে না পারলে আমাদের মৃত্যু অনিবার্য। বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে আমরা বাঁচি। নিঃশ্বাসের সঙ্গে আমরা কার্বন ডাই-অক্সাইড নামের বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে ছাড়ি। অন্যদিকে গাছপালা বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে ও বাতাসে অক্সিজেন ছাড়ে। গাছপালা না থাকলে একসময় বাতাসের অক্সিজেন একেবারে শেষ হয়ে যেত, আর আমরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তাম। কাজেই গাছপালা আমাদের জীবনের জন্য অত্যাবশ্যক।

বৃক্ষেরপ্রয়োজনীয়তা:                                 “বৃক্ষ নেই, প্রাণের অস্তিত্ব নেই, বৃক্ষহীন পৃথিবী যেন প্রাণহীন মহাশ্মশান।”
অফুরন্ত সৌন্দর্যের এক মধুর নিকুঞ্জ আমাদের এ পৃথিবী। এই পৃথিবীকে সবুজে-শ্যামলে ভরে দিয়েছে প্রাণপ্রদায়ী বৃক্ষরাজি। এ বিশ্বকে সুশীতল ও বাসযোগ্য করে রাখার ক্ষেত্রে বৃক্ষের অবদান অনস্বীকার্য। আবার মানুষের সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্যে যেসব মৌলিক চাহিদা রয়েছে তার অধিকাংশই পূরণ করে বৃক্ষ। তাই মানবজীবনে বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অপরীসীম।মানুষ ও প্রাণীর জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বৃক্ষের ব্যাপক আবশ্যকতা রয়েছে। তাই বৃক্ষকে মানবজীবনের ছায়াস্বরূপ বলা হয়। বৃক্ষ আমাদের নীরব বন্ধু, সে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত কত যে উপকার করছে তা একবার ভেবে দেখলে অনুধাবন করা যায়।

বনসম্পদ ও বনসৃজন :
সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন বনসৃজন।প্রাণধারণের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেনের প্রয়োজন, পরিবেশকে দূষণের হাত থেকে মুক্ত করতে প্রয়োজন বন সংরক্ষণ।প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় গাছপালার ভূমিকা অনস্বীকার্য।একথা মাথায় রেখে অরণ্য সংহার রোধ করতে হবে।

বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব :
পৃথিবীর মঙ্গলার্থে, সমগ্র জীবকুলের মঙ্গলার্থে তথা মানবসমাজের মঙ্গলার্থে বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব অপরিসীম।কারণ-
ক) বৃক্ষ সকল প্রাণিকুলের ত্যাগ করা বিষাক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে আর দেয় জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন। ফলে প্রাণীরা এ জগতে বেঁচে থাকতে পারে।
খ) বৃক্ষ প্রাণীজগৎকে খাদ্য দেয়। মানুষ ও পশু-পাখি বৃক্ষের ফুল-ফল এবং লতা-পাতা খেয়ে জীবন ধারণ করে।
গ)  আসবাবপত্র, গৃহ, নৌকা, জাহাজ, বাঁধ, সেতু ইত্যাদি নির্মাণে বৃক্ষ আমাদের কাঠ দেয়।এছাড়া বনভূমি থেকে মধু ও মোম সংগ্রহ করা হয়।
ঘ) গাছপালা মাটির উর্বরতা বাড়ায়, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং ঝড়-বৃষ্টি ও বন্যা প্রতিরোধে সহায়তা করে।
ঙ) গাছপালা দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে।
চ) বৃক্ষ আমাদের জীবন রক্ষার নানা ওষুধ দান করে।
ছ) সৌন্দর্য বর্ধনেও গাছের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।
প্র্রাচীন কাল থেকে গাছের অবদান :
যুগ যুগ ধরে গাছের সঙ্গে মানুষ নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ।প্রাচীন ভারতে বনভূমিতে গড়ে ওঠা আশ্রমিক শিক্ষার কথা আমরা সকলেই জানি।প্রাচীন যুগ থেকেই চিকিৎসা বিজ্ঞানে সাসাফল্য এনে দিয়েছে গাছপালা।

অরণ্য বন্দনা :
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আধুনিক ভারতে বৃক্ষরোপণ উৎসবের সূচনা করেছিলেন।বর্তমান ভারত সরকার ও রাজ্য সরকার নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন।প্র্রতিবছর উৎসাহের সঙ্গে পালিত হচ্ছে 'বনসৃজন সপ্তাহ'।

উপসংহার:
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কেবল বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ পালন করে সরকারিভাবে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জনসেবা করলেই দেশ সবুজ হয়ে যাবে না। সবুজায়ন যে আবশ্যক সেই সচেতনতা দেশে সমাজে জাগিয়ে তুলতে হবে ।প্রত্যেক মানুষের মধ্যে  "একটি গাছ একটি প্রাণ/ গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান " - এই বোধ জাগিয়ে তুলতে হবে ।মানুষের সচেতনতার হাত ধরে দেশে আবার 'সবুজ বলাকা' পাখা মেলবে ।


১২. দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান/
মানব কল্যাণে বিজ্ঞান/
বিজ্ঞান ও মানব জীবন

"বিজ্ঞানই সভ্যতার উন্নতির মাপকাঠি । বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানেই সমাজের অগ্রগতি।"--আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়

ভূমিকা : 
প্রাচীনকালে মানুষ ছিল অরণ্যচারী, গুহাবাসী।কালক্রমে তার বুদ্ধির বিকাশ ঘটলো।জ্ঞানবিজ্ঞান ও চেতনার আলোয় উদ্ভাসিত হলো মানবসমাজ। ফলে মানুষ ক্রমে দুরন্ত নদীকে করলো বশীভূত, দুস্তর সমুদ্র হার মানলো তার কাছে, অনন্ত মহাকাশ হলো বিজিত, গড়ে উঠলো মানব সভ্যতার সুরম্য ইমারত।এই গঠনকার্যে যার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ অবদান রয়ে গেল, সে হলো বিজ্ঞান।

বিজ্ঞান কী ? :
বিজ্ঞান হলো বিমূর্ত জ্ঞান।বিভিন্ন প্রযুক্তির মধ্যে যার বাস্তব রূপায়ণ ঘটে।উন্নত সভ্যতার মূল চাবিকাঠিই-বিজ্ঞান।

বিজ্ঞানের জয়যাত্রা :
যে দিন থেকে মানুষ আগুনের ব্যবহার শিখেছে ,চাকা আবিষ্কার করেছে সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে বিজ্ঞানের জয়যাত্রা।এরপর বিজ্ঞান সারথি হয়ে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল সভ্যতার বৈজয়ন্তী রথ।শিল্পবিপ্লবের সময়কালে , বাষ্পশক্তির আবিষ্কার এই জয়যাত্রাকে করলো তরান্বিত।এরপর এল বিদ্যুৎশক্তি। এই মহার্ঘ্যদানে বলীয়ান মানুষ গড়ে তুলল নতুন সভ্যতা।বিজ্ঞানলক্ষ্মীর সর্বশেষ শক্তিবর হল পারমাণবিক শক্তি। এইরূপ বিজ্ঞানের দানে প্রতি মুহূর্তে আমরা সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠেছি।

দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের দান :
দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য । আমাদের জীবন ও বিজ্ঞান যেন অবিচ্ছেদ্য সত্তা।প্রভাতের প্রত্যুষলগ্ন থেকে নিশীথে শয্যাগ্রহন পর্যন্ত আমাদের জীবনে ছায়ার মতো সঙ্গী বিজ্ঞান। প্রভাতে অ্যালার্ম ঘড়ির কলরবে শুরু হয় আমাদের সকাল।বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সংবাদ ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় সংবাদপত্রের মারফৎ।বিশ্ববার্তা ধ্বনিত হয় বেতারে, বিভিন্ন ছবি ফুটে ওঠে দূদূরদর্শনের পর্দায়। চলভাষে প্রিয়জনের সাথে সেরে নিই প্রয়োজনীয় কথাবার্তা।এইভাবেই দৈনন্দিন জীবনের মহতী যজ্ঞের প্রধান উপাচার হয়ে উঠেছে বিজ্ঞান।প্রতিনিয়ত সে আমাদের সরবরাহ করছে স্বপ্ন দেখার নব নব উপঢৌকনের।মানুষের বাসগৃহগুলি টিভি , ফ্রিজ,ওয়াশিং মেশিন, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র,  ওভেন ইত্যাদির উপস্থিতিতে পরিণত হয়েছে ছোটো ছোটো বিজ্ঞান কক্ষে।

কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞান :
কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদান যথেষ্ট রয়েছে।ভূমিকর্ষণ ,বীজ বপন, জলসেচ, ফসল তোলা , ঝাড়াই মাড়াই, সংরক্ষণ ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রেই লেগেছে বিজ্ঞানের জিয়নকাঠির পরশ।বিজ্ঞানের অকৃপণ দানেই ঊষর মরু হয়ে উঠেছে শস্য প্রসবিনী।

শিল্পক্ষেত্রে বিজ্ঞান :
শিল্পে বিপ্লব এনেছে বিজ্ঞান।বিজ্ঞান চালিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতির দানবীয় শক্তিতে কাজে এসেছে গতি।কলকারখানা ,ফ্যাক্টরি, শিল্পসংস্থা প্রভৃতি শিল্পক্ষেত্রে আজ বিজ্ঞান তার ডালি নিয়ে হাজির হয়েছে।কম্পিউটার নামক গণক যন্ত্রের আবিষ্কার বিজ্ঞানলক্ষ্মীর অন্যতম দান।

চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান :
বিজ্ঞান চিকিৎসাজগতে এনেছে অভাবনীয় পরিবর্তন।বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধির প্রতিষেধক ওষুধপত্র ও টিকা আবিষ্কারের ফলে মৃত্যুহার বহুলাংশে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়েছে । এক্স-রে, ইসিজি, হৃহৃৎপিণ্ড পরিবর্তন, ব্রেন অপারেশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অবদান রয়েছে ।

শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান :
শিক্ষা সংক্রান্ত অধিকাংশ জিনিসই বিজ্ঞানের কৃপাধন্য।বই, খাতা, কলম, বোর্ড সবই বিজ্ঞানের দান ।আজকালকার
শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থান করে নিয়েছে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তির নানা উপকরণ।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিজ্ঞান :
যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিজ্ঞান এনেছে গতি, দূরকে করেছে নিকট।মানুষ আজ পৃথিবীর সীমা ছাড়িয়ে অসীম আকাশে পাড়ি দিচ্ছে বিজ্ঞানের দানে।

অবসর বিনোদনে বিজ্ঞান :
মানুষের কর্মজীবনে ক্লান্তি দূরীকরণে অবসর বিনোদনের জন্য বিজ্ঞান দিয়েছে টিভি, সিনেমা, কম্পিউটার , মোবাইল আরো কতকিছু।

প্রযুক্তিবিদ্যায় বিজ্ঞান :
দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব এসেছে। ফেসবুক, ইমেল, ইন্টারনেট, হোয়াটস্অ্যাপের ফলে মানুষ দ্রুত কোনো সংবাদ অপরের কাছে পৌঁছে দিতে পারছে।মুঠোফোনের এক ছোঁয়ায় তামাম দুনিয়া চলে আসছে মুঠোর মধ্যে।

বিজ্ঞানের কুফল :
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চব্বিশ ঘণ্টাই আমরা বিজ্ঞান নির্ভর।বিজ্ঞান ব্যতীত জীবন যেন অকল্পনীয় ,তবে প্রদীপের তলায় যেমন অন্ধকার থাকে , ঠিক তেমনি বিজ্ঞানেরও এক হাতে রয়েছে সুধাপাত্র ও অপর হাতে বিষভাণ্ড।বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ।পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ বিজ্ঞানের অগ্রগতি।বিজ্ঞানের বলে বলীয়ান মানুষ আজ মারণাত্মক অস্ত্র নিয়ে রণোন্মত্ত।

উপসংহার :
অকল্যাণকর কাজে নয় মানুষের মঙ্গলসাধনে ব্যবহার করতে হবে বিজ্ঞান ও তার প্রযুক্তিকে।মানুষের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হলে বিজ্ঞান হয়ে উঠবে প্রগতির হাতিয়ার, প্রগতির বাহন এবং আমরা পৃথিবীর চির আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের স্বর্গ গড়ে তুলতে পারবো।
☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆


১৩. খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা/ 
চরিত্র গঠনে খেলাধুলার 

" দুর্বল মস্তিষ্ক কিছু করতে পারে না আমাদিগকে উহা বদলাইয়া সরল মস্তিষ্ক হইতে হইবে। গীতা পাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমারা স্বর্গের সমীপবর্তী হইবে।"         --স্বামী বিবেকানন্দ

ভূমিকা :
বহু প্রাচীন প্রবাদেই বলা আছে খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তার কথা : 'সুস্থ দেহেই সুস্থ মনের বাস'।আর সুস্থ সবলতার একমাত্র উৎস হল খেলাধুলা। মানবসভ্যতার ক্রম বিবর্তনের দেশে দেশে যুগে যুগে খেলাধুলার নানা রূপান্তর হয়েছে। সবরকম খেলাধুলাই মানুষকে অটুট স্বাস্থ্যের অধিকারি করে জীবনে জয় এনে দেয়।

শরীর চর্চার সেরা উপায় খেলাধুলাঃ 
একটা আদর্শ ছাত্রের প্রধান কর্তব্য যেমন পড়াশোনা তেমনি খেলাধূলাও।শরীরচর্চার ফলে দুর্বল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সবল হয়।খেলাধুলায় শরীরচর্চার সঙ্গে আনন্দও মেলে।

স্বাস্থ্যই সম্পদ :
'Health is wealth'-স্বাস্থ্যই সম্পদ।স্বাস্থ্যবান দেহ হয় সুখ সম্পদের অধিকারী, সৌন্দর্যের আকর।স্বাস্থ্য বিকশিত না হলে কোনো কর্মই সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে না।তাই স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে খেলাধুলা একাএকান্ত প্রয়োজন।এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়-"All work and no play makes Jack a dull boy."

খেলাধুলার শ্রেণি বিভাগঃ
খেলাধুলাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। (১) ইনডোর গেমস(ব্যায়াম, টেবিল টেনিস ইত্যাদি) (২) আউটডোর গেমস (ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি) প্রত্যেক বিদ্যালয়ে খেলাধুলার একজন শিক্ষক থাকেন। যিনি ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে খেলাধুলার আগ্রহ বাড়িয়ে তোলেন।

চরিত্র বিকাশ ও খেলাধুলা :
ব্যক্তির চরিত্র গঠনে  খেলাধুলার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। খেলাধুলার মাধ্যমে মানুষের চরিত্রে দৃঢ়তা আসে। খেলাধুলা করতে ধৈর্য ও সংযম উভয়েরই প্রয়োজন হয়। ফলে যারা খেলাধুলা করে তাদের ব্যক্তিগত জীবনে ও চরিত্রের মধ্যে এই দুটির ছাপ পড়ে। খেলাধুলা সহমর্মিতা ও সহানুভূতি বোধের জন্ম দেয় । খেলাধুলার মাধ্যমে ব্যক্তির চরিত্রে আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় প্রত্যয়, অধ্যবসায়ের মতো মানসিক গুণাবলীগুলো যুক্ত হয়।এছাড়া খেলাধুলা মানুষের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়া অভ্যাস গড়ে তোলে।

খেলাধুলার গুরুত্ব :
ছাত্রজীবনে খেলাধুলার গুরুত্ব অসীম।তাই স্কুল কলেজের পাঠক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে শারীরশিক্ষা।খেলাধুলা শিক্ষার্থীকে শেখায় বিনয়ী হতে এবং সর্বোপরি শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন করতে।খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় বলা যায়--

১.  মানসিক বিকাশে খেলাধুলা: 
শিশুর মানসিক বিকাশে খেলাধুলার ভূমিকা খুবই সহায়ক ও স্বতঃস্ফূর্ত। খেলাধুলার ফলে যে আনন্দময় পরিবেশে শিশু বড়ো হয় তা তাকে উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত, আনন্দমুখর করে তোলে। এর ফলে শিশুর মানসিক বিকাশ সহজ ও সাবলীল হয়।

২.  সম্প্রীতির বন্ধন তৈরিতে খেলাধুলা:
খেলাধুলার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি হয়।  খেলার মধ্যে সৃষ্ট পরস্পরের প্রতি  আস্থা, বিশ্বাস ও নির্ভরযোগ্যতা মানুষের ভেতরে সম্পর্ক তৈরি করে। সেই সম্পর্ক সহযোগিতার, সৌহার্দ্যরে ও সম্প্রীতির। 

৩.  জাতীয়তাবোধ তৈরিতে খেলাধুলা: 
খেলাধুলা মানুষের ভেতর জাতীয়তাবোধ তৈরি করে। কারণ খেলাধুলা এমন একটি বিষয় যা ধর্ম, বর্ণ, জাত, রাজনৈতিক পরিচয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমরা এক পতাকার নিচে চলে আসি।

৫.  বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ তৈরিতে খেলাধুলা:
অতীতকাল থেকেই একটি দেশের সাথে অন্য একটি দেশের সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরিতে খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমান সময়েও বিশ্বভ্রাতৃত্ব সৃষ্টিতে খেলাধুলা কার্যকর একটি মাধ্যম।  

৫.  খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়: 
খেলার মাঠ পুরো বিশ্বকে এক জায়গায় নিয়ে আসে। বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে এসময় মেলবন্ধন তৈরি হয় বলে তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান হয়।

অতিরিক্ত খেলাধুলার কুফল:
অতিরিক্ত কোনো কিছুই মানুষের জন্য ভালো নয়। অতিরিক্ত খেলাধুলা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা রেখে শুধুমাত্র খেলাধুলায় মগ্ন হয়ে পড়ে। এতে করে তাদের শিক্ষাজীবন ব্যহত হয়। অতিরিক্ত খেলার ফলে সময়, অর্থ, শ্রমের অপচয় হয়।

উপসংহার :
শরীর ও মন পরিপূর্ণভাবে উজ্জীবিত করতে খেখেলাধুলা অন্যতম বিবিষয়। খেলাধুলা যেমন নির্মল আনন্দ দেয় তেমনি জীবনকে উপভোগ্য করে তোলে। শুধু তাই নয় খেলাধুলা ব্যক্তিকে নাম, যশ, খ্যাতি, অর্থ এনে দেয়। মানুষকে বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে। পারস্পরিক তিক্ততা দূর করে মনে প্রশান্তি এনে দেয়।তাই পৃথিবীব্যাপী খেলাধুলার ব্যাপক প্রচলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆

        
     ১৪.   বাংলার উৎসব

          " এত ভঙ্গ বঙ্গ দেশ তবু রঙ্গে ভরা।"                                                ---ঈশ্বর গুপ্ত

ভূমিকা : 

উৎসব মানবজীবনে প্রাণচঞ্চল আনন্দময়তার অভিব্যক্তি। কেবল অন্ন-বস্ত্র সংস্থানেই মানবজীবনে সার্থকতা আসে না। তার জীবনে চাই অবাধ মুক্তির আনন্দ। সে আনন্দ লাভের একটি উপায় উৎসব ও মানব সম্মিলন।

উৎসব কী? :
’ উৎসব ’ বলতে মূলত আনন্দময় অনুষ্ঠানকে বোঝায়। উৎসবের মাধ্যমে আমরা আনন্দ প্রকাশ এবং আনন্দ লাভ করে থাকি। তবে এ আনন্দ একার আনন্দ নয়। পারিবারিক, সামাজিক বা সাম্প্রদায়িক পরিমণ্ডলে সকলের সম্মিলনে সুখ বা আনন্দ লাভের উপায় হলো উৎসব।

উৎসবের উদ্দেশ্য :
বাঙালির উৎসবের উদ্দেশ্য হলো প্রীতি ও প্রেমের পূর্ণ বন্ধন।মানুষের সঙ্গে মানুষের আনন্দময় আত্মিক মিলন।দৈনন্দিন জীবন-সংগ্রামে অবসন্ন মানুষের প্রাণশক্তি যখন শুকিয়ে আসে, যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে “জীবনের খণ্ড খণ্ড করি দণ্ডে দণ্ডে ক্ষয়” তখন উৎসবের আয়োজন মনে আনে ফূর্তি, আনে মুক্তি জীবনের আনন্দ, সৃষ্টি করে নতুন কর্মপ্রেরণা।

উৎসবের শ্রেণিবিভাগ :
  রূপসী বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সুরে সুর মিলিয়ে বাঙালির জীবনে উৎসব আসে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বহন করে।বাঙালির এই উৎসবকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায় । যথা- ক) ধর্মীয় উৎসব  খ) ঋতু উৎসব গ) সামাজিক উৎসব  ঘ)  রাষ্ট্রীয় উৎসব।

ক) ধর্মীয় উৎসব :
সাধারণত ধর্মীয় উৎসবগুলো এক-একটি ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভাবনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসব গুলির মধ্যে দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতী পূজা প্রভৃতি প্রধান।বাঙালি মুসলমানদেরও অনেক ধর্মীয় অনুষ্ঠান থাকে।যেমন-ইদলফেতর, ইদুজ্জোহা, মহরম প্রভৃতি। বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমা। খ্রিস্টানদের বড়দিন । জৈনদের মহাবীর জয়ন্তী প্রভৃতি ধর্মীয় উৎসব লক্ষ করা যায়।

খ) ঋতু উৎসব :
বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যের সঙ্গে বাঙালির প্র্রাণের সম্পর্ক গভীর।ঋতুকেন্দ্রিক উৎসবগুলি মূলত কৃষিনির্ভর।গ্রীষ্ম ঋতুতে বৈশাখের পুণ্য প্রভাতে নববর্ষের উৎসব , বর্ষার সমাগমে বৃক্ষরোপণ উৎসব , হেমন্ত ঋতুতে নবান্ন উৎসব,  শীতের দিনে পৌষপার্বণ, বসন্তে শুরু হয় বসন্তোৎসব।

গ) সামাজিক উৎসব 
বাংলার সমাজ জীবনও উৎসবে মেতে ওঠে।ব্যক্তিগত কিছু অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে উদযাপিত হয় সামাজিক উৎসব।বাংলার সামাজিক উৎসবগুলির মধ্যে  বিবাহ, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, ভাইফোঁটা, জামাইষষ্ঠী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

ঘ) রাষ্ট্রীয় উৎসব :
উৎসব কেবল লোকাচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের দেশে এমন কিছু উৎসব রয়েছে যেগুলো কোনো ধর্মকেন্দ্রিক সস্প্রদায়, পরিবার প্রভৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো সকল ধর্মের, সকল শ্রেণির মানুষের উৎসব। এ সর্বজনীন উৎসবগুলো আমাদের কাছে রাষ্ট্রীয় উৎসব হিসেবে পরিচিত। যেমন-  স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস প্রভৃতি। এছাড়াও রবীন্দ্র জয়ন্তী, নেতাজি জয়ন্তী,  গান্ধি জয়ন্তী প্রভৃতি যথাযোগ্য মর্যাদায় উৎসব আকারে পালন করা হয়ে থাকে।

উৎসবের উপযোগিতা :
উৎসব কেবল মানব সম্মিলনের আনন্দ দেয় না, প্রাণের স্ফূরণ ঘটিয়ে শারীরিক ও মানসিক শক্তিকে সতেজ রাখে, দেয় নব নব কর্মপ্রেরণা। উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের সৃজনশীলতারও নানা প্রকাশ ঘটে। রচিত হয় সংগীত, নৃত্য, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চলচ্চিত্রের কত না সম্ভার। উৎসবের অর্থনৈতিক উপযোগিতাও কম নয়। উৎসবকে কেন্দ্র করে যে ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা চলে তাতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অনেক পেশার মানুষ উপকৃত হয়।

উপসংহার :
উৎসব মানুষে মানুষে প্রীতির বন্ধনকে দৃঢ় করে, হৃদয়কে করে প্রসারিত। উৎসব সঞ্চারিত করে অপার আনন্দ, দেয় নবতর চেতনা। জাতীয় উৎসব জাতীয় চেতনাকে করে সংহত। আন্তর্জাতিক উৎসব প্রশস্ত করে শান্তি, মৈত্রী ও সৌহার্দ্যের পথ। উৎসব মানুষের চৈতন্যে বিস্তার ঘটায় সুরুচি ও শিল্পবোধের। মানুষের জীবনের ক্লান্তি, হতাশা, নৈরাজ্য, অস্থিরতা ও দুঃখ ঘোচাতে উৎসবের উপযোগিতা অসামান্য।
  
☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆ ☆           

    ১৫.  বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য

ভূমিকা:
সুজলা, সুফলা, শস্য, শ্যামলা এই রূপসী বাংলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বৈচিত্র্যময় ঋতু। ভিন্ন ভিন্ন রূপ-রস-গন্ধ নিয়ে পালাক্রমে ছয়টি ঋতু ঘুরে ফিরে আসে। প্রতিটি ঋতুই স্বতন্ত্র সৌন্দর্যে অপরূপ। ঋতুতে ঋতুতে চলে সাজ বদল।

ষড়ঋতুর পরিচয়ঃ
ছটি ঋতুর মালা যেন বিনি সুতোয় গাঁথা।এই ছয়টি ঋতুৃ হলো-  গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। প্রতি দুই মাস পর পর ঋতু বদল ঘটে। অর্থাৎ দুই মাসে একটি ঋতু। এরা চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে। এক ঋতু বিদায় নেয়, আসে অন্য ঋতু। নতুন ঋতুর ছোঁয়ায় প্রকৃতি সাজে নতুন রূপে, উপহার দেয় নতুন নতুন ফুল-ফল ও ফসল।

তাপদগ্ধ গ্রীষ্মকালঃ
ঋতুচক্রের শুরুতেই ‘ধূলায় ধূসর রুক্ষ, পিঙ্গল জটাজাল’ নিয়ে আর্বিভাব ঘটে গ্রীষ্মের। প্রকৃতিতে গ্রীষ্ম আসে তার দূরন্ত ও রুদ্র রূপ নিয়ে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে খাল-বিল, নদী-নালা শুকিয়ে যায়। জলশূন্য মাটিতে ফাটল ধরে। গাছের পাতা রুক্ষ হয়ে যায়। অসহ্য গরমে একটু শীতল বাতাস ও ছায়ার জন্য মানুষসহ সমস্ত পশু-পাখি কাতর হয়ে পড়ে। গ্রীষ্ম শুধু জনজীবনে রুক্ষতাই ছড়ায় না-  আম, কাঁঠালের সুগন্ধে ম ম করে ঘর-বাড়ি।

সজল বর্ষাঃ 
গ্রীষ্মের বিদায়ের সাথে সাথে আসে বর্ষা। উত্তপ্ত প্রকৃতিকে স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে তুলতে দূর আকাশে জমে ওঠে মেঘের স্তুপ। বর্ষার আগমনে দগ্ধ মাঠ-ঘাটে প্রাণ ফিরে আসে। নদী-নালা কানায় কানায় ভরে ওঠে। অবিরাম বর্ষণে গ্রীষ্মের রুক্ষ প্রকৃতিতে সজীবতা ফিরে আসে। জনজীবনে ফিরে আসে প্রগাঢ় শান্তি। যেন প্রকৃতিতে ছড়িয়ে দেয় নিবিড় মায়ার কাজল।

শুভ্র শরৎঃ
                  ‘আজি ধানের ক্ষেত্রে রৌদ্র ছায়ার লুকোচুরি খেলা
                  নীল -আকাশে কে ভাসালো সাদা মেঘের ভেলা।’ - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাংলার ঋতুচক্রে এভাবেই আসে শরৎ।  নীল আকাশে তুলোর মতো ভেসে বেড়ায় শুভ্র মেঘ আর নদীর দু’ তীর উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সাদা কাশফুলের সমারোহে। শিউলি, কামিনী, জুঁই প্রভৃতি ফুলের সৌরভে মেতে ওঠে শরৎ এর প্রকৃতি। মৃদুমন্দ বাতাসে ঢেউ খেলে সবুজ ফসলের মাঠে। শরৎ এর ভোরে শিশিরের হালকা ছোঁয়া আর মিষ্টি রোদের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে কবিগুরু বলে ওঠেন-
              ‘আজিকে তোমার মধুর মুরতি হেরিনু শারদ প্রভাতে’।

ফসলের হেমন্তঃ
শরতের রূপময়তাকে বিদায় জানিয়ে বৈরাগ্যের ঢঙে আসে হেমন্ত।  সর্ষে ফুলে ছেয়ে যায় মাঠের পর মাঠ। অন্যদিকে থাকে, সোনালি রঙের পাকা ধান। হেমন্ত মূলত ফসলের ঋতু। এ সময় মাঠে-ঘাটে থাকে শস্যের সমারোহ।নবান্নের উৎসবে মেতে ওঠে গ্রাম-বাংলার জনজীবন । তাই রবীন্দ্রনাথ যথার্থই গেয়েছেন-
‘ওমা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে
কী দেখেছি মধুর হাসি।’

শীতল শীত :
হেমন্ত বিদায় নিতে না নিতেই ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে উত্তুরে হাওয়ায় ভেসে আসে শীত। বছরের সর্বাপেক্ষা শীতল ঋতু এই শীতকাল।  নানা রকম শাক-সবজি, ফল ও ফুলের সমারোহ শীতকে জনপ্রিয় করে তোলে। একদিকে শীতের কষ্ট অন্যদিকে ফুল-ফল-ফসল ও পিঠা-পুলির সমারোহে  শীতের আনন্দ রোমাঞ্চকর। কবি গুরু তাই শীতকে নিয়েও কবিতা লিখতে ভোলেননি-
                    ‘শীতের হাওয়া লাগল আজি
                      আমলকির ঐ ডালে ডালে।’

ঋতুরাজ বসন্তঃ
সবশেষে রাজার বেশে আসে ঋতুরাজ বসন্ত। শীতের রিক্ততাকে মুছে ফেলে ফুলে ফুলে ভরে ওঠে প্রকৃতি। দক্ষিণা মৃদু বাতাসে প্রকৃতি ও মনে দোলা লাগে। কোকিলের কুহুতানে প্রকৃতি যেন জেগে ওঠে। শিমুল,পলাশ,   কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, অর্জুন প্রভৃতি রঙ-বেরঙের ফুলে বসন্ত সাজে অপার সৌন্দর্যে । আমের মুকুলের মৃদু সৌরভে বাতাস ম ম করে। কবির ভাষায় -
           " ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে।"

বাঙালি জীবনে ষড়ঋতুর প্রভাবঃ
বাংলার এই ঋতুবৈচিত্র্য কেবল প্রকৃতির বুকে নয়,সমান তালে মানব মনে এবং জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে।  ঋতুর প্রভাব বাঙালির সংস্কৃতি,কাব্য-সাহিত্য ও সংগীতে বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়।  ঋতুভেদে গ্রাম বাংলার জীবনে উদযাপিত হয় নানারকম পূজা-পার্বণ, মেলা ও উৎসব। অর্থাৎ  ষড়ঋতুর পালাবদলের সাথে এ দেশের জনজীবন নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।

উপসংহারঃ
সত্যিই অনবদ্য সৌন্দর্যে ভরপুর বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য। ষড়ঋতুর স্বতন্ত্র সৌন্দর্যের কোনো তুলনা হয় না। কিন্তু আশঙ্কার কথা হলো-ধীরে ধীরে শহরজীবন ঋত্যুবেচিত্র্যের প্রভাব থেকে দূরে সরে, কেবলই যান্ত্রিক সভ্যতা অভিমুখে এগিয়ে চলছে। উষ্ণায়নের কারণে প্রতিটি ঋতুরঙ্গ এখন বিপন্ন।

🎯🎯🎯🎯🎯🎯🎯🎯🎯🎯🎯🎯

১৬.প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও তার প্রতিকার

ভূমিকা :-
" মন্বন্তরে মরিনি আমরা, মারি নিয়ে ঘর করি "— বন্যা, খরা, ভূমিকম্প, মহামারী মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে । অথচ বিজ্ঞানের বলে বলিয়ান আমরা সদর্পে বলে চলেছি যে, প্রকৃতি আমাদের হাতের মুঠোয়, প্রকৃতি আমাদের কাছে বশীভূত । কিন্তু এ দর্প বা ধারণা সত্য নয় । মাঝে মধ্যেই প্রকৃতির রুদ্ররোষের কাছে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে । তখন বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আর কোন কাজে আসে না । যে প্রকৃতি সৃষ্টির আনন্দে উদ্বেল, আবার সেই ধ্বংসের মারণযজ্ঞে মেতে ওঠে কখনো কখনো । এই ধ্বংসকারিণী রূপের বর্ণনা কেই বলা হয় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নানান রূপ :- 
প্রাকৃতিক বিপর্যয় নানারূপে এই পৃথিবীর বুকে নেমে আসে । কখনো অতি বর্ষণের ফলে বন্যারূপে দেখা দেয় । কখনও প্রবল তান্ডবের সঙ্গে গগন ভেদ করে ভয়ংকর সামুদ্রিক ঝড় সবকিছু তছনছ করে দেয় । আবার অনাবৃষ্টির ফলে খরা দেখা যায় । যার ফলে মাঠ ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায় । ফল, ফুল,ফসলের অকাল মৃত্যু ঘটে । এছাড়াও ভূমিকম্পও নেমে আসে পৃথিবীর বুকে । অবলীলায় বহু প্রাণ চলে যায়, ক্ষতি হয় প্রচুর ।
 
প্রাকৃতিক বিপর্যয় রূপে বন্যা :- 
বন্যার প্রধান কারণ হল অতি বর্ষণ এবং পরিকল্পনাহীন নদী বাঁধ প্রকল্প । জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এবং কলকারখানায় ও চাষের প্রয়োজনে সারা বছর জল সরবরাহের জন্য নদীতে বাঁধ দেওয়া হয় । কিন্তু এই বাঁধ সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করার ফলে বর্ষার সময় জলস্ফীতি দেখা দেয় এবং বন্যা হয় । এছাড়া নদী-নালা, খাল-বিল গুলোও সংস্কার না হওয়ায় বন্যা হয় ।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় রূপে ঝড় :-  
প্রাকৃতিক বিপর্যয় রুপে ঝড় ও অত্যন্ত ক্ষতিকর ও মারাত্মক । সমুদ্রের জল সূর্যের তাপে অত্যন্ত গরম হওয়ার ফলে বাষ্পীভূত হয়ে গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয় তখন প্রবল ঝড় সমুদ্র উপকূলের নিকটে গ্রাম শহরে আছড়ে পড়ে সুপার সাইক্লোন, আয়লা, নার্গিস এর মত প্রবল ঝড়ে বহু মানুষের প্রাণ যায় এবং সম্পদ বিনষ্ট হয় ।

ভূমিকম্প :- 
প্রাকৃতিক বিপর্যয় রূপে ভূমিকম্প মানুষকে অসহায় করে তোলে । নিমিষে সাধের সৌধ মানুষের আবাসভূমি ধুলিসাৎ হয়ে যায় ভূমিকম্পের কবলে পড়ে । সাম্প্রতিককালে নেপালে ঘটে যায় ভয়াবহ ভূমিকম্প ।

খরা :- 
যে সূর্যতেজ ছাড়া প্রাণ বিকশিত হয় না সেই তেজ প্রাণহন্তা রূপ ধারণ করে কখনো কখনো । সূর্যতেজে সুজলা সুফলা ধরণী হয়ে ওঠে রুক্ষ । আবার সূর্যতেজে কর্ষণযোগ্য ভূমি হয়ে ওঠে মরুভূমি । এক ফোঁটা জলের জন্য, একটু ঠাণ্ডা বাতাসের জন্য মানুষ হাহাকার করে । এই সমস্ত প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানব জীবনে প্রচুর সমস্যার সৃষ্টি করে ।

প্রতিকার:-  
প্রাকৃতিক বিপর্যয় কোন একদিনের ঘটনা নয় । যে বিপর্যয় মাঝে মাঝেই আসে এবং মানুষ তার সমস্ত শক্তি দিয়ে মোকাবিলার চেষ্টাও করে । প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পিছনে যে কারণ গুলি আছে সেগুলি তলিয়ে দেখতে হবে এবং তার প্রতিকার করতে হবে । যেমন বন্যা রোধ করার জন্য নদী-নালা, খালের সংস্কার করতে হবে । নদীবাঁধ গুলো সুরক্ষিত করতে হবে । পরিকল্পিতভাবে জলাধার নির্মাণ করতে হবে । বেশি ফসলের জন্য গভীর নলকূপের বেশি ব্যবহার না করার দিকে নজর দিতে হবে । ভূমিকম্প রোধের ক্ষেত্রে ডায়নামাইট ব্লাস্ট বা বিভিন্ন এ্যাটোমিক বোমার বিস্ফোরণ যাতে না ঘটে সেদিকে নজর দিতে হবে । সর্বোপরি অরণ্য ধ্বংস না করে অরণ্য সৃজন ও সংরক্ষণের দিকে সজাগ দৃষ্টি দিলে তবেই প্রাকৃতিক বিপর্যয় এড়ানো যাবে ।
 
উপসংহার :-
 ধরণী মাতা আমাদের দিয়েছে অফুরন্ত সম্পদ । আর সেই সম্পদকে রক্ষা করার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে । এ পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলার জন্য মানুষকেই শপথ নিতে হবে । প্রকৃতিমাতাকে গর্ভধারিনীমাতৃ রূপে জ্ঞান করে তাকে ভালবাসতে পারলে বোধহয় প্রকৃতি স্থির থাকবে ।

🎈🎈🎈🎈🎈🎈🎈🎈🎈🎈🎈🎈🎈

১৭. অরণ্য ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ 

সূচনা :- 
মানুষের জন্ম থেকেই অরণ্য তার পরম আত্মীয়, অকৃত্রিম বন্ধু । অরন্যের ডাকেই ধরিত্রীর প্রথম ঘুম ভেঙ্গে ছিল । দিকে দিকে প্রচারিত হয়েছিল জীবনের মহিমা । ভারতীয় সভ্যতা অরণ্য কেন্দ্রিক সভ্যতা, অরণ্যের কোলেই মানুষ গড়ে তুলেছিল তার প্রথম বাসস্থান । অরণ্য দিয়েছে বেঁচে থাকার রসদ, প্রাণের নিঃশ্বাস, আশ্বাস ।

অরণ্য উচ্ছেদ: -
কালের বিবর্তনে সভ্যতার বিজয় রথ যত এগিয়েছে ততই সভ্যতা হয়ে উঠেছে যান্ত্রিক । যন্ত্রই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে । যন্ত্রদানবের প্রভাবে অকাতরে অরণ্য নিধন চলছে অহরহ । অরণ্য হটাও, বসতি বানাও, এই বিধানে এই যান্ত্রিক সভ্যতা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে । বৃক্ষ আজ লাশকাটা ঘরে আবদ্ধ । সবুজের ক্ষেত্রে এখন বহুতল আবাসন । অরণ্যকে ধ্বংস করে বড় বড় কলকারখানা আবাসন গড়তে ব্যস্ত আজকের মানুষ । যে বৃক্ষ ছিল মানুষের পরম বন্ধু সুহৃদ সেই বৃক্ষের উপর চলছে অকথ্য অত্যাচার, উচ্ছেদ । সবুজ বনানীর জায়গায় আজ ইট-কাঠ কংক্রিটের জঙ্গল গড়ে উঠেছে ।

অরণ্যের প্রয়োজনীয়তা :
মানুষের জন্মলগ্ন থেকেই অরণ্য প্রকৃত বন্ধুর মত পাশে থেকে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান যুগিয়েছে । নিঃশ্বাস নেওয়ার অক্সিজেন যোগান দিয়েছে । দূষণের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছে মানব সভ্যতাকে । মাটিকে আঁকড়ে রেখে ভূমিক্ষয় রোধ করেছে । বৃষ্টি নামিয়ে ধরিত্রীকে শস্য শ্যামলা করেছে যে অরণ্য সেই অরণ্যের প্রতি মানুষের অকথ্য অত্যাচার, উৎপীড়নের শেষ নেই । যথেচ্ছ ভাবে গাছগাছালি কেটে ফাঁক করে দিচ্ছে । উচ্ছেদ হচ্ছে বন বনানী । এই অপব্যবহারের ফল ও মানুষ কে ভুগতেও হচ্ছে । প্রকৃতিতে নানা রকম পরিবর্তন ঘটছে । সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে না । গরমে মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে উঠছে । এক ফোটাবৃষ্টির জন্যে প্রাণিকুল হা হা করে মরে ।  বর্তমানে নানা রকম দূষণের কবলে মনুষ্য সমাজ জর্জরিত । এই সব কিছুর মূলে রয়েছে অরণ্যের অভাব ।

অরণ্য সংরক্ষণ:- 
প্রকৃতির এই শাস্তি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য মানুষের মুখেই আবার ধ্বনিত হচ্ছে ‌"দাও ফিরে সে অরণ্য লহ এ নগর" সবুজের অভিযান অর্থাৎ বৃক্ষরোপণে মানুষকে সচেষ্ট হতে হবে বেশি করে । জেলায় জেলায় বৃক্ষরোপণ উৎসব পালিত হচ্ছে, মানুষকে বৃক্ষপ্রেমিক করে তোলার প্রয়াস চলছে । বন উন্নয়নের জন্য central forestry commission তৈরি হয়েছে । যার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, গ্রামে-গঞ্জে গাছপালার চারা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ :
 গাছের সঙ্গে সঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে । বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে - যার যেখানে থাকার কথা সে সেখানে থাকলেই সব কিছু ঠিক ঠাক থাকে । বন্যপ্রাণী অর্থাৎ বাঘ, সিংহ, হাতি দুবেলা যদি শিকারীর অত্যাচারে উৎপীড়িত হয় তখন তারাও মনুষ্য সমাজে ঢুকে ক্ষয় ক্ষতি করে । এদের উপর অত্যাচার বন্ধ করা একান্ত প্রয়োজন । তাহলেই সমস্ত ভারসাম্য বজায় থাকবে ।

উপসংহার:-
মানুষ এখনো বৃক্ষনিধন কর্ম থেকে বিরত হয়নি । এখনোও অকাতরে নিজের সুখের প্রয়োজনে বহু মূল্যবান গাছ-গাছালি কেটে ফেলছে । এটা বন্ধ করতে হবে । মানুষকে বুঝতে হবে গাছ আমাদের পরম বন্ধু । আমাদের বেঁচে থাকার জন্য আমরা একান্তভাবেই গাছের উপর নির্ভরশীল । একটি গাছ মানে একটি প্রাণ আর বৃক্ষ হত্যা মানেই নিজেকে হত্যা এই উপলব্ধি দরকার ।

 
১৮. মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুফল ও কুফল / ভালোমন্দ

ভূমিকা:
বিবর্তনের সোপান বেয়ে আসে সভ্যতা। সভ্যতা হচ্ছে মানবজাতির বুদ্ধি, মেধা ও অভিজ্ঞতার সমষ্টি। এ মানব সভ্যতায় নানা সময় সৃষ্টি হয়েছে নানা বিষ্ময়করজিনিস। বর্তমানে আমরা এক নতুন শতাব্দীতে এসে হাজির হয়েছি, যেখানে বিশ্বময় চলছে বিজ্ঞানের জয় জয়কার। এ বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের একটি বিষ্ময়কর আবিষ্কার হচ্ছে মোবাইল ফোন।

মোবাইল ফোন কী:
মোবাইল ফোন বা সেলুলার ফোন বা হ্যান্ড ফোন হচ্ছে তারবিহীন টেলিফোন বিশেষ। "Mobile" ইংরেজি শব্দ যার বাংলা প্রতিশব্দ হলো ‘ভ্রাম্যমান’ বা ‘স্থানান্তর যোগ্য’। এই ফোন সহজে যেকোনো স্থানে বহন এবং ব্যবহার করা যায় বলে একে মোবাইল ফোন নামকরণ করা হয়েছে। এটি ষড়ভূজ আকৃতির ক্ষেত্র বা এক-একটি সেল নিয়ে কাজ করে বলে একে সেলফোনও বলা হয়। মূলত মোবাইল ফোন যোগাযোগের একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র বিশেষ। এটি বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে কাজ করে বলে অনেক বড় ভৌগোলিক এলাকায় নিরবিচ্ছিন্নভাবে সংযোগ দিতে পারে। শুধু কথা বলাই নয়, মোবাইল ফোন এ মাধ্যমে আরো অনেক সেবা গ্রহণ করা যায় যেমনঃ- এস,এম,এস, ই-মেইল, ইন্টারনেট, ব্লু-টুথ ব্যবহার ইত্যাদি।

মোবাইল ফোনের আবিষ্কার:
সেলুলার ফোন প্রারম্ভিকভাবে জাহাজ ও ট্রেনে এনালগ রেডিও কমিউনিকেশন হিসেবে ব্যবহার করা হত। মোবাইল ফোনের উদ্ভাবক হলেন- ড. মার্কিন কুপার। তিনি ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল সফলভাবে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। মোবাইল ফোন প্রথম বাজারে আসে ১৯৮৩ সালে। ফোনটির নাম ছিল মোটোরোলা ডায়না "Ts 8000x''।

মোবাইল ফোনের প্রয়োজনীয়তা: 
বর্তমান বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগে দেশে বিদেশে যোগাযোগসহ শিক্ষা, সংস্কৃতি, আচার ব্যবহার ইত্যাদির সাথে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনের প্রয়োজনীয়তা অবশ্যম্ভাবী। তথ্য ও প্রযুক্তি ছাড়া বর্তমান মানব জীবন কল্পনা করা যায় না। এসব উপাদানের উৎস হিসেবেও মোবাইল ফোনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এককথায় বর্তমানে বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে আজকের মোবাইল ফোন।

যোগাযোগের মাধ্যম:
সুষ্ঠুভাবে জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য শর্ত হলো যোগাযোগ। দ্রুত যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হলো মোবাইল ফোন। এর মাধ্যমে আমরা দূরের স্থানে বা মানুষের খবর জানতে পারি। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাসময়ে নির্দিষ্ট স্থানে পাঠাতে পারি।

ইন্টারনেট ব্যবহার: 
বর্তমান বিশ্বকে বিশ্ব গ্রামে পরিণত করেছে যে উপাদানটি তার নাম ইন্টারনেট। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে ই-মেইলসহ বিশ্বের যেকোনো বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে পারি। এছাড়া মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টানেট থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি ডাউনলোড করা যায়।

চিত্তবিনোদনের মাধ্যম:  
মোবাইল ফোন শুধু প্রয়োজন মেটায় না, চিত্ত বিনোদনের একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছে । হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে খুব কম সময়ে ছবি, বা কোন ঘটনা বা অফিস-আদালতের সার্কুলার, মেমো প্রভৃতি খুব কম সময়ে পৌঁছে দেওয়া যায় । মোবাইল ফোনে গান শোনা, ভিডিও দেখা, ছবি তোলা, খেলা করা ইত্যাদি মাধ্যমে মানুষের চিত্তবিনোদনের চাহিদা পূরণ হয়।

বিবিধ সেবা প্রদান:
মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে বিভিন্ন সেবা প্রদান করা যায়, যা তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। এছাড়া বিভিন্ন অপারেটর কর্তৃক স্বাস্থ্য সেবা, কৃষি সেবা ইত্যাদি প্রদান করা হয়ে থাকে যা জনসাধারণকে সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনযাপনে সাহায্য করে। এটি রেডিও, টেলিভিশন থেকে শুরু করে ই-মেইল, ইন্টানেটের সকল সুবিধা প্রদান করে থাকে।

মোবাইল ফোনের ক্ষতিকর প্রভাব :
মোবাইল ফোনের ব্যবহার সভ্য জীবনের একটা অপরিহার্য ব্যবস্থা হয়ে উঠলেও এর ক্ষতির দিকও রয়েছে । মোবাইল ফোনে বেশি কথা বলা বা ব্যবহার করা ঠিক নয় । বর্তমানে আট থেকে আশি বছরের সবাই মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়েছে যে এটা ঠিক নয় । এ বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে । মোবাইল ফোনে অনর্থক কথা বলা, এস.এম.এস করা, গেম খেলা, বা নানা ধরনের পর্নো ছবি দেখায় লিপ্ত থাকে যুবক-যুবতীরা । এটি একটি নেশার মত যুব সমাজকে গ্রাস করেছে । কানে মোবাইল ফোনের কর্ড লাগিয়ে রাখায় কারোর কথা শুনতে পায় না বা শুনতে চায় না । একটা বেপরোয়া ভাব দেখা যায় এদের মধ্যে । আবার ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হওয়ার সময় কোনো দিকে খেয়াল থাকে না, এতে অকালে অনেক প্রাণ চলে যায় । অনেকে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে অনেকের বিপদ ডেকে আনে । অত্যধিক মোবাইল ফোনের ব্যবহারে মস্তিষ্কে ক্যানসারও হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা সমীক্ষা করে জানিয়েছেন ।

উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায় মোবাইল ফোন বর্তমান বিশ্বের আশীর্বাদ। যদিও এর কতিপয় নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে তবুও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করলে এর ব্যবহার আমাদের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। মোবাইল ফোনের ইতিবাচক ব্যবহারই উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে আমাদেরকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। অতএব মোবাইল ফোনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে আমাদের সচেতন হতে হবে।



 ১৯. দেশভ্রমণ : শিক্ষার অঙ্গ



২০. শিক্ষা বিস্তারে গণমাধ্যমের ভূমিকা

 


২১.   শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে মাতৃভাষার গুরুত্ব


২২.  কন্যাশ্রী প্রকল্প

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

13 মন্তব্যসমূহ

  1. উত্তরগুলি
    1. আপনাকেও ধন্যবাদ। এই ব্লগে আরো অনেক কিছু আছে দেখতে পারেন।

      মুছুন