প্রার্থনা
উৎস, সারসংক্ষেপ, নামকরণ ও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
১উৎস
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের ৭২ সংখ্যক কবিতাটি পাঠ্যপুস্তকে ‘প্রার্থনা’ শিরোনামে সংকলিত হয়েছে। কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ ‘Where the Mind Is Without Fear’ রবীন্দ্রনাথের ‘Gitanjali: Song Offerings’ গ্রন্থের ৩৫ সংখ্যক কবিতা হিসেবে পরিচিত। কবিতাটিতে কবি পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষের ভয়হীনতা, আত্মমর্যাদা, মুক্ত জ্ঞান, সত্যনিষ্ঠা ও যুক্তিবাদী মানসিকতার বিকাশ কামনা করেছেন। সর্বোপরি, পরমপিতার কাছে তিনি এমন এক আদর্শ ভারত গড়ে তোলার প্রার্থনা জানিয়েছেন, যেখানে মানুষ সংকীর্ণতা ও কুসংস্কারের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে এবং মানবকল্যাণে কাজ করতে পারবে।
২সারসংক্ষেপ
‘প্রার্থনা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পরমপিতার কাছে এক আদর্শ ভারতবর্ষের জাগরণ কামনা করেছেন। কবির স্বপ্নের দেশে মানুষের মন হবে ভয়হীন এবং মাথা থাকবে আত্মমর্যাদায় উন্নত। জ্ঞানচর্চা কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকবে না; জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও প্রাদেশিকতার বিভেদ পৃথিবীকে খণ্ডিত করতে পারবে না। মানুষ অন্তরের গভীর সত্য থেকে নির্ভয়ে কথা বলবে এবং মানবকল্যাণে নিয়োজিত কর্মধারা সর্বত্র প্রবাহিত হবে। অন্ধ কুসংস্কার ও অর্থহীন আচার যেন মানুষের বিচারবুদ্ধিকে গ্রাস করতে না পারে, সেই কামনাও কবি প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ঈশ্বরই মানুষের সকল সৎকর্ম, শুভচিন্তা ও আনন্দের পথপ্রদর্শক। পরাধীনতা, অজ্ঞতা ও মানসিক জড়তা থেকে মুক্ত হয়ে ভারতবর্ষ যেন সত্য, জ্ঞান, যুক্তি ও কর্মের আলোয় জেগে ওঠে—এই মহৎ আকাঙ্ক্ষাই কবিতাটির মূল বক্তব্য।
৩নামকরণ
সাহিত্যে নামকরণ রচনার মূল ভাব ও বিষয়বস্তুকে প্রকাশ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতার নামকরণ বিষয়বস্তুর বিচারে সার্থক ও তাৎপর্যপূর্ণ।
‘প্রার্থনা’ শব্দের অর্থ ঈশ্বরের কাছে আন্তরিক আবেদন বা মঙ্গলকামনা। কবি এই কবিতায় নিজের ব্যক্তিগত সুখ-সমৃদ্ধি চাননি; চেয়েছেন সমগ্র ভারতবাসীর মুক্তি ও জাগরণ। তাঁর কাঙ্ক্ষিত দেশে মানুষের মন হবে ভয়হীন, মাথা থাকবে উন্নত এবং জ্ঞান হবে মুক্ত। সংকীর্ণতা ও কুসংস্কারের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হবে সত্যনিষ্ঠা, যুক্তিবোধ ও সৎকর্মের আদর্শ। কবিতার বিভিন্ন পঙ্ক্তিতে ‘যেথা’ শব্দের পুনরাবৃত্তি কবির স্বপ্নের আদর্শ সমাজের রূপ ফুটিয়ে তুলেছে। কবিতার শেষ পঙ্ক্তিতে কবি পরমপিতার কাছে আবেদন জানিয়েছেন—
এই প্রার্থনাই কবিতাটির মূল সুর। তাই সমগ্র কবিতার ভাববস্তু ও অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘প্রার্থনা’ নামকরণটি যথার্থ হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর
১‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’— কবির কাঙ্ক্ষিত স্বদেশের মানুষের ভয়শূন্য চিত্ত ও উচ্চ শির হওয়ার উপযোগিতা কী? ৫
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতায় ভয়শূন্য চিত্ত ও উন্নত শির আদর্শ স্বদেশের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
ভয়শূন্য চিত্তের উপযোগিতা: ভয় মানুষের স্বাধীন চিন্তা, আত্মবিশ্বাস ও সত্য প্রকাশের সাহসকে দুর্বল করে দেয়। ভয়হীন মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকতে পারে। তাই জাতির স্বাধীনতা ও অগ্রগতির জন্য ভয়মুক্ত মন অপরিহার্য।
উচ্চ শিরের উপযোগিতা: উন্নত শির আত্মমর্যাদা, আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীন ব্যক্তিত্বের প্রতীক। আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না এবং নিজের আদর্শে দৃঢ় থাকে। এমন মানুষই দেশের সম্মান রক্ষা করতে পারে।
কবি মনে করেন, ভয় ও হীনমন্যতা থেকে মুক্ত না হলে মানুষের প্রকৃত বিকাশ সম্ভব নয়। তাই দেশের মানুষের মনে সাহস, আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটিয়ে একটি জাগ্রত জাতি গড়ে তোলাই কবির কাম্য।
২‘জ্ঞান যেথা মুক্ত…বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি’— ‘মুক্ত জ্ঞান’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? কী কী কারণে বসুধা খণ্ড, ক্ষুদ্র হয়ে যায়? ২+৩=৫
মুক্ত জ্ঞান: ‘মুক্ত জ্ঞান’ বলতে কবি এমন জ্ঞানচর্চাকে বুঝিয়েছেন, যা অজ্ঞতা, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতার বন্ধন থেকে মুক্ত। যে জ্ঞান মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা বাড়ায় এবং সত্য অনুসন্ধানে সাহায্য করে, তা-ই প্রকৃত মুক্ত জ্ঞান।
বসুধা খণ্ড ও ক্ষুদ্র হওয়ার কারণ: মানুষের সংকীর্ণ মনোভাব ও বিভেদকামী প্রবণতার ফলে পৃথিবী খণ্ডিত হয়ে পড়ে। এর প্রধান কারণগুলি হলো—
- জাতিভেদ, বর্ণবৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতা মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে।
- সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ, প্রাদেশিকতা ও নিজস্ব গোষ্ঠীর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি বিশ্বমানবতার পথে বাধা দেয়।
- ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও স্বার্থপরতা মানুষকে বৃহত্তর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে।
কবি চান, মানুষ সমস্ত সংকীর্ণতা অতিক্রম করে বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হোক। তবেই পৃথিবী বিভেদের পরিবর্তে ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হবে।
৩‘যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে/উচ্ছ্বসিয়া ওঠে’— উৎসসহ উক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। ৫
উৎস: উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘প্রার্থনা’ কবিতা থেকে গৃহীত।
তাৎপর্য: কবি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষ মনের গভীর অনুভূতি ও সত্যকে নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারবে। এখানে ‘হৃদয়ের উৎসমুখ’ বলতে মানুষের অন্তরের গভীরতম অনুভূতি ও আন্তরিকতাকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘উচ্ছ্বসিয়া ওঠে’ কথাটির মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্য প্রকাশের ভাবটি ফুটে উঠেছে।
ভয়, স্বার্থ, চাটুকারিতা ও সামাজিক চাপের কারণে মানুষ অনেক সময় নিজের প্রকৃত বক্তব্য প্রকাশ করতে পারে না। ফলে সমাজে মিথ্যা, কপটতা ও অসত্যের বিস্তার ঘটে। কবি এমন পরিস্থিতির পরিবর্তন চান। অতএব, বাক্স্বাধীনতা, সত্যনিষ্ঠা ও অকপটতা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটি সুস্থ, স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই কবির মূল বক্তব্য।
৪‘দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়/অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়’— কবি কোন কর্মধারার কথা বলেছেন? কীভাবে সেই কর্মধারার বিস্তার ঘটতে পারে? ২+৩=৫
কর্মধারার পরিচয়: এখানে কবি মানুষের সৃজনশীল, প্রগতিশীল ও মানবকল্যাণমুখী কর্মধারার কথা বলেছেন। যে কর্ম মানুষের প্রতিভার বিকাশ ঘটায়, সমাজের উন্নতি সাধন করে এবং জীবনে সার্থকতা আনে, তা-ই এই কর্মধারার অন্তর্গত।
কর্মধারার বিস্তারের উপায়:
- মুক্ত জ্ঞানচর্চা: শিক্ষার প্রসার ও স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটলে মানুষ নতুন নতুন কাজের মাধ্যমে সমাজের উন্নতি করতে পারবে।
- সংকীর্ণতা দূরীকরণ: জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও প্রাদেশিকতার বিভেদ ভুলে মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
- সত্য ও যুক্তির অনুসরণ: কুসংস্কার ও অন্ধ অনুকরণ পরিহার করে যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা ও কর্মনিষ্ঠাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
কবি চান, মানুষের কর্মশক্তি কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ুক। এই কর্মধারা যত বিস্তৃত হবে, ততই মানুষের বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটবে এবং বিশ্বমানবতার কল্যাণ সাধিত হবে।
৫‘যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি/বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি’— তুচ্ছ আচার কীভাবে বিচারের স্রোতপথকে গ্রাস করে? তা থেকে কীভাবে মুক্তিলাভ সম্ভব? ২+৩=৫
তুচ্ছ আচারের প্রভাব: কবি ‘তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি’ বলতে অর্থহীন প্রথা, অন্ধ কুসংস্কার ও যুক্তিহীন লোকাচারকে বুঝিয়েছেন। মরুভূমির বালি যেমন নদীর জলধারাকে গ্রাস করে, তেমনই অন্ধ সংস্কার মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও বিচারবুদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। মানুষ যখন কোনো প্রথার যথার্থতা বিচার না করে কেবল প্রচলিত বলে তা মেনে নেয়, তখন যুক্তিবোধ দুর্বল হয় এবং সমাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয়।
মুক্তিলাভের উপায়:
- শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে মানুষের মধ্যে যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে।
- প্রচলিত আচার-আচরণকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে যুক্তি, মানবিকতা ও বাস্তবতার নিরিখে বিচার করতে হবে।
- কুসংস্কার ও সামাজিক গোঁড়ামি পরিহার করে সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে হবে।
কবি এমন একটি সমাজ চান, যেখানে মানুষের বিচারশক্তি স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং কোনো অর্থহীন প্রথা তার অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
৬‘নিত্য যেথা/তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা’— নেতা বলতে কবি কাকে বুঝিয়েছেন? ‘প্রার্থনা’ কবিতার আলোকে কবির ঈশ্বরভাবনার পরিচয় দাও। ২+৩=৫
‘নেতা’র পরিচয়: উদ্ধৃত অংশে ‘নেতা’ বলতে কবি সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বা পরমপিতাকে বুঝিয়েছেন, যিনি মানুষের সকল সৎকর্ম, শুভচিন্তা ও নির্মল আনন্দের পথপ্রদর্শক।
কবির ঈশ্বরভাবনা: ‘প্রার্থনা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বরভাবনা মানবকল্যাণ ও নৈতিক আদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। প্রথমত, কবি ঈশ্বরকে মানুষের কর্ম, চিন্তা ও আনন্দের চিরন্তন প্রেরণার উৎস হিসেবে কল্পনা করেছেন। দ্বিতীয়ত, ‘পিতঃ’ সম্বোধনের মাধ্যমে তিনি ঈশ্বরের সঙ্গে পিতা ও সন্তানের আন্তরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তৃতীয়ত, কবির ঈশ্বর মানুষের অজ্ঞতা, সংকীর্ণতা ও জড়তা দূর করে তাকে সত্য ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করেন।
কবি বিশ্বাস করেন, ঈশ্বরের নির্দেশিত পথে চললে মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবকল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে পারে। তাই তাঁর ঈশ্বরভাবনা নিছক আচারসর্বস্ব নয়; তা মানুষের নৈতিক উন্নতি, আত্মিক মুক্তি ও জাতীয় জাগরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
৭‘নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ,/ ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত’— ‘পিতঃ’ বলতে কবি কাকে বুঝিয়েছেন? ‘পিতঃ’-কে কেন নির্দয় আঘাত করতে হবে? ২+৩=৫
‘পিতঃ’-এর পরিচয়: ‘পিতঃ’ শব্দের অর্থ পিতা। এখানে কবি সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বা বিশ্বপিতাকে এই সম্বোধন করেছেন।
নির্দয় আঘাতের তাৎপর্য: কবির সময়ে ভারতবর্ষ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল। পাশাপাশি সমাজে কুসংস্কার, অন্ধ প্রথা, সংকীর্ণতা ও মানসিক জড়তা মানুষের স্বাধীন চিন্তা ও আত্মবিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল। এই অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে জাতিকে জাগিয়ে তোলাই ছিল কবির লক্ষ্য।
তাই কবি পরমপিতার কাছে কঠোর আঘাতের প্রার্থনা করেছেন। এখানে ‘নির্দয় আঘাত’ আক্ষরিক অর্থে শারীরিক আঘাত নয়; এটি মানুষের দীর্ঘদিনের মোহ, অজ্ঞতা, আত্মবিস্মৃতি ও জড়তা ভেঙে দেওয়ার প্রতীক। কবি চান, কঠোর উপলব্ধি ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতবাসী নতুন চেতনায় জেগে উঠুক।
অতএব, এই আঘাতের উদ্দেশ্য ধ্বংস নয়, বরং জাতির আত্মশক্তি জাগিয়ে তাকে স্বাধীন, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও আদর্শ সমাজ গঠনে সক্ষম করে তোলা।
৮‘ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত’— কবি ভারতকে যেভাবে স্বর্গে জাগরিত করার কথা বলেছেন, তা নিজের ভাষায় লেখো। ৫
‘প্রার্থনা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের কল্পিত স্বর্গ কোনো অলৌকিক বা পরলোকের স্থান নয়; এটি পৃথিবীতেই প্রতিষ্ঠিত একটি আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতীক।
কবি এমন ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষের মন হবে ভয়হীন এবং মাথা থাকবে আত্মমর্যাদায় উন্নত। সকলের জন্য জ্ঞানচর্চার পথ উন্মুক্ত থাকবে এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও প্রাদেশিকতার বিভেদ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। মানুষ অন্তরের গভীর থেকে সত্য কথা বলবে এবং মানবকল্যাণে নিয়োজিত কর্মধারা সর্বত্র প্রবাহিত হবে।
কবি আরও চান, অন্ধ কুসংস্কার ও অর্থহীন প্রথা যেন মানুষের বিচারবুদ্ধিকে গ্রাস করতে না পারে। যুক্তি, সত্যনিষ্ঠা, কর্মপ্রেরণা ও ঈশ্বরের পথনির্দেশে মানুষ নিজের প্রকৃত শক্তিকে আবিষ্কার করবে।
এইভাবে ভারতবর্ষের মানুষের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক মুক্তি ঘটলেই কবির স্বপ্নের স্বর্গ প্রতিষ্ঠিত হবে। ভারতকে এমন আদর্শ দেশে জাগিয়ে তোলার জন্যই কবি পরমপিতার কাছে প্রার্থনা করেছেন।
৯‘প্রার্থনা’ কবিতা অবলম্বনে কবির মানবকল্যাণ ভাবনার স্বরূপ আলোচনা করো। ৫
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতায় কবির উদার মানবতাবাদ ও বিশ্বমানবের কল্যাণকামনা প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষের স্বাধীন চিন্তা, আত্মমর্যাদা ও সৃজনশীলতার পূর্ণ বিকাশ ঘটবে।
কবি চান, মানুষ ভয় ও হীনমন্যতা থেকে মুক্ত হয়ে সত্যের পথে চলুক। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে কোনো সংকীর্ণতা থাকবে না এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও প্রাদেশিকতার বিভেদ মানুষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করবে না। তাঁর কাছে সমগ্র পৃথিবী একটি বৃহত্তর মানবসমাজ, যেখানে সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় কল্যাণ সাধিত হতে পারে।
কবি অন্ধ কুসংস্কার ও অর্থহীন প্রথার পরিবর্তে যুক্তিবোধ, সত্যনিষ্ঠা ও সৎকর্মের প্রতিষ্ঠা কামনা করেছেন। তাঁর মতে, মানুষের কর্ম ও চিন্তা যখন ব্যক্তিগত স্বার্থের সীমা অতিক্রম করে বৃহত্তর মানবকল্যাণে নিয়োজিত হবে, তখনই সমাজের প্রকৃত উন্নতি ঘটবে।
অতএব, সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীন, সত্যনিষ্ঠ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাই কবির মানবকল্যাণ ভাবনার মূল পরিচয়।
১০‘প্রার্থনা’ কবিতা অবলম্বনে কবির দেশাত্মবোধের পরিচয় আলোচনা করো। ৫
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতায় গভীর দেশপ্রেমের সঙ্গে উদার মানবতাবাদের সমন্বয় ঘটেছে। কবি পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষের মানসিক মুক্তি ও জাতীয় জাগরণ কামনা করেছেন।
কবির কাছে দেশপ্রেম কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা নয়; এর সঙ্গে দেশের মানুষের আত্মমর্যাদা, মুক্তচিন্তা ও নৈতিক উন্নতি জড়িত। তাই তিনি এমন ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষের মন হবে ভয়হীন, মাথা থাকবে উন্নত এবং জ্ঞানচর্চা হবে মুক্ত। জাতিভেদ, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার ও সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে ভারতবাসী সত্য ও যুক্তির পথে এগিয়ে যাবে—এটাই তাঁর প্রত্যাশা।
কবি চান, দেশের মানুষ অলসতা ও মানসিক জড়তা কাটিয়ে মানবকল্যাণে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করুক। এই কারণেই তিনি পরমপিতার কাছে কঠোর আঘাতের মাধ্যমে ভারতকে জাগিয়ে তোলার প্রার্থনা জানিয়েছেন।
কবির দেশপ্রেম সংকীর্ণ নয়; তা বিশ্বমানবতার আদর্শে উদার ও মহৎ। ভারতকে মানবিক, স্বাধীন ও আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আকাঙ্ক্ষাই তাঁর দেশাত্মবোধের প্রধান বৈশিষ্ট্য।
১১তোমার পাঠ্য ‘প্রার্থনা’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। ৫
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতাটির নামকরণ বিষয়বস্তু ও অন্তর্নিহিত ভাবের বিচারে সম্পূর্ণ সার্থক।
‘প্রার্থনা’ শব্দের অর্থ ঈশ্বরের কাছে আন্তরিক আবেদন বা মঙ্গলকামনা। এই কবিতায় কবি নিজের ব্যক্তিগত সুখ বা সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করেননি; তিনি সমগ্র ভারতবর্ষের মুক্তি, জাগরণ ও কল্যাণ কামনা করেছেন। তাঁর স্বপ্নের দেশে মানুষের মন হবে ভয়হীন, মাথা থাকবে উন্নত এবং জ্ঞান হবে সকলের জন্য উন্মুক্ত। সংকীর্ণতা ও বিভেদের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হবে বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শ। মানুষ সত্য কথা বলবে, সৎকর্মে নিয়োজিত হবে এবং যুক্তিবোধের সাহায্যে কুসংস্কারকে দূর করবে।
কবিতার শেষাংশে কবি পরমপিতার কাছে আবেদন জানিয়েছেন—
এই পঙ্ক্তিতে কবির সমগ্র প্রার্থনার মূল উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতবাসীর মানসিক ও নৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই কবিতাটির প্রধান সুর। তাই বিষয়বস্তু, ভাব ও উদ্দেশ্যের বিচারে ‘প্রার্থনা’ নামকরণটি যথার্থ ও সার্থক।
১২রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘প্রার্থনা’ কবিতাটির বিষয়বস্তু আলোচনা করো। ৫
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রার্থনা’ কবিতার মূল বিষয় হলো ভারতবর্ষের সার্বিক মুক্তি, মানবিক উন্নতি ও জাতীয় জাগরণ।
কবিতার শুরুতে কবি এমন এক আদর্শ দেশের কল্পনা করেছেন, যেখানে মানুষের চিত্ত হবে ভয়হীন এবং মস্তক থাকবে আত্মমর্যাদায় উন্নত। জ্ঞানচর্চা কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকবে না। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও প্রাদেশিকতার বিভেদ অতিক্রম করে মানুষ বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হবে। প্রত্যেকে অন্তরের গভীর থেকে সত্য কথা বলবে এবং মানুষের সৃজনশীল কর্মধারা দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়বে।
কবি চান, অন্ধ কুসংস্কার ও অর্থহীন প্রথা যেন মানুষের বিচারবুদ্ধিকে গ্রাস করতে না পারে। যুক্তি, সত্যনিষ্ঠা ও শুভচিন্তার মাধ্যমে মানুষ নিজের প্রকৃত শক্তিকে বিকশিত করবে। তাঁর বিশ্বাস, ঈশ্বর মানুষের সকল সৎকর্ম, চিন্তা ও আনন্দের পথপ্রদর্শক।
পরিশেষে কবি পরমপিতার কাছে প্রার্থনা করেছেন, ভারতবর্ষ যেন সমস্ত জড়তা ও সংকীর্ণতা কাটিয়ে আদর্শ স্বর্গরাজ্যে জেগে ওঠে। এভাবেই কবিতায় দেশপ্রেম, মানবতাবাদ ও মুক্তচিন্তার আদর্শ প্রকাশিত হয়েছে।
