চতুর্থ সেমিস্টার ·
সংসদ প্রবর্তিত মডেল প্রশ্ন
৫ নম্বরের পূর্ণাঙ্গ প্রশ্নোত্তর —
১.‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।৫
মহাশ্বেতা দেবীর গল্পের নামকরণ অত্যন্ত সার্থক, তাৎপর্যপূর্ণ ও ব্যঞ্জনাময়। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে গৌরবি ও মাতৃহারা মুসলমান শিশু হারার মানবিক সম্পর্ক। গৌরবি হারার রক্তের সম্পর্কের কেউ নয়; তবু শেষ পর্যন্ত সে-ই হয়ে ওঠে হারার আশ্রয়দাত্রী ‘মাসি’।
- বিষয়গত সার্থকতা: হারার মা আয়েষা মৃত্যুর আগে তাকে বলে যায়—
“মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস।”
এই কথাই পরবর্তীকালে গৌরবি ও হারার সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
- মাতৃত্বের প্রকাশ: নিজের সন্তান নিবারণের কাছ থেকে অবহেলা পেলেও গৌরবির মধ্যে হারাকে কেন্দ্র করে মাতৃসত্তা জেগে ওঠে। লেখিকা বলেছেন—
“গৌরবির শুকনো বুকে যেন কিসের ঢেউ লাগল।”
- ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে মানবিকতা: গৌরবি হিন্দু এবং হারা মুসলমান। তবু তাদের সম্পর্ক জাত-ধর্মের সীমা অতিক্রম করে মানবিকতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
- নতুন আত্মপরিচয়: নিবারণের মা হয়েও গৌরবি যে মর্যাদা পায়নি, হারার ‘মাসি’ হয়ে সে যেন নতুন এক আত্মপরিচয় লাভ করে।
- পরিণতির সঙ্গে সামঞ্জস্য: মুকুন্দের সামাজিক চাপ উপেক্ষা করে গৌরবি হারাকে নিয়ে শহরে চলে যায়। অর্থাৎ ‘মাসি’ পরিচয়টি শেষ পর্যন্ত তার জীবনসঙ্গী ও দায়িত্বের পরিচয়ে পরিণত হয়।
সুতরাং, গল্পের মূল বক্তব্য—রক্তের সম্পর্কের চেয়ে মানবিক মমতা ও আশ্রয়ের সম্পর্ক বড়ো—নামটির মধ্যেই সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাই নামকরণ সম্পূর্ণ সার্থক।
২.ছোটগল্প হিসাবে ‘হারুন সালেমের মাসি’ কতটা সার্থক তা দেখাও।৫
‘হারুন সালেমের মাসি’ একটি সার্থক ছোটগল্প। ছোটগল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য—এককেন্দ্রিকতা, সংহতি, সীমিত চরিত্র, স্বল্প পরিসরে গভীর জীবনবোধ এবং ব্যঞ্জনাময় পরিণতি—এই গল্পে যথাযথভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
- এককেন্দ্রিক কাহিনি: মাতৃহারা হারা ও গৌরবির মানবিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই গল্পের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।
- সীমিত চরিত্র: গৌরবি, হারা, আয়েষা, নিবারণ, যশি ও মুকুন্দ—প্রতিটি চরিত্রের নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে এবং তারা মূল কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
- চরিত্রের গভীরতা: অল্প কথায় গৌরবির মমতা, হারার অসহায়তা, নিবারণের স্বার্থপরতা, যশির কঠোর বাস্তববাদ এবং মুকুন্দের সামাজিক ক্ষমতার পরিচয় ফুটে উঠেছে।
- সংহতি ও নাটকীয়তা: হারার আশ্রয় পাওয়া থেকে শুরু করে সমাজের বাধা এবং শেষপর্যন্ত গৌরবির শহরে চলে যাওয়া—প্রতিটি ঘটনাই মূল কাহিনির সঙ্গে যুক্ত।
- ব্যঞ্জনাময় পরিণতি: গৌরবির উপলব্ধি—
“কেউ তোর পরিচয় জানবে না, আমার পরিচয় জানবে না।”
—এবং শহরকে “সমুদ্রের মতো” ভাবা গল্পের পরিণতিকে গভীর তাৎপর্য দিয়েছে।
- ভাষা ও সংলাপ: স্বাভাবিক সংলাপ ও গ্রামীণ কথ্যভাষা গল্পের বাস্তবতাকে জীবন্ত করেছে।
অতএব, সীমিত পরিসরে মানবিকতা, দারিদ্র্য, সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা ও সামাজিক বৈষম্যের গভীর চিত্র তুলে ধরার কারণে গল্পটি ছোটগল্প হিসেবে সম্পূর্ণ সার্থক।
৩.‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পের গৌরবি চরিত্রটি আলোচনা করো।৫
গৌরবি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে দরিদ্র, অসহায়, জন্মগতভাবে খোঁড়া এবং জীবনের নানা অবহেলায় জর্জরিত হলেও তার অন্তরে গভীর মানবিকতা ও মাতৃস্নেহ রয়েছে।
- দারিদ্র্য ও অসহায়তা:
“গৌরবির একখানা পা জন্ম থেকে খুঁতো।”
এই শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাকে শাকপাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।
- পারিবারিক অবহেলা: নিজের সন্তান নিবারণের কাছ থেকেও সে যথাযথ আশ্রয় পায় না। ফলে তার জীবন নিঃসঙ্গ ও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।
- মমতাময়ী সত্তা: মাতৃহারা হারাকে দেখে তার মধ্যে মাতৃস্নেহ জেগে ওঠে। হারার প্রতি তার মমতা ধীরে ধীরে গভীর হয়।
- মানবিকতার জাগরণ: আয়েষার শেষ কথা—
“মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস”
—শুনে তার “শুকনো বুকে যেন কিসের ঢেউ লাগল।” এই মুহূর্তে গৌরবির সুপ্ত মাতৃসত্তা পূর্ণভাবে জেগে ওঠে।
- সামাজিক দ্বন্দ্ব: হারা মুসলমান—এই পরিচয় এবং গ্রামের সামাজিক ভয়ের কারণে গৌরবির মনে দ্বিধা থাকলেও শেষ পর্যন্ত মানবিকতাই জয়ী হয়।
- আত্মত্যাগ ও সাহস: মুকুন্দের চাপ ও সামাজিক বাধার মুখেও গৌরবি হারাকে পরিত্যাগ করে না। বরং বলে—
“চল্ আমরা চলে যাব… শহরে।”
সুতরাং গৌরবি একই সঙ্গে অসহায় নারী, সংগ্রামী মানুষ, স্নেহময়ী মা এবং মানবিক প্রতিবাদী সত্তার প্রতীক।
৪.‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্প অবলম্বনে হারা চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।৫
হারা গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র। সে এক দরিদ্র, মাতৃহারা, অসহায় মুসলমান শিশু; তার মধ্য দিয়ে সমাজের প্রান্তিক ও আশ্রয়হীন শিশুর জীবনযন্ত্রণা প্রকাশ পেয়েছে।
- অসহায় পরিচয়: হারার বাবা সাপের কামড়ে এবং মা আয়েষা মৃত্যুবরণ করলে সে সম্পূর্ণ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে।
- শিশুসুলভ সরলতা: বয়স মাত্র সাত বছর হলেও তার কথা স্পষ্ট নয়—তার শিশুসুলভ দুর্বলতা ও অসহায়তা পাঠকের মনে করুণার সৃষ্টি করে।
- মায়ের প্রতি গভীর টান: মায়ের শেষ নির্দেশ সে ভুলে যায় না—
“মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস।”
এই কথাই তাকে গৌরবির কাছে নিয়ে আসে।
- কৃতজ্ঞতা ও পরিশ্রম: আশ্রয় পাওয়ার পর সে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে এবং গৌরবিকে সাহায্য করার চেষ্টা করে।
- নিষ্পাপ দৃষ্টিভঙ্গি:
“ঈশ্বরের জিনিস তো! শাকে-পাতায় দোষ নেই।”
—এই ধরনের সরল বক্তব্যে তার নিষ্পাপ ও স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা প্রকাশ পায়।
- গৌরবির প্রতি নির্ভরতা: গৌরবিই তার কাছে নতুন আশ্রয় ও আপনজন হয়ে ওঠে।
শেষ পর্যন্ত গৌরবির সঙ্গে শহরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তার নতুন নিরাপদ আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। তাই হারা একই সঙ্গে করুণ, সরল, কৃতজ্ঞ ও মমতাপ্রবণ শিশুচরিত্র।
৫.‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে গৌরবির মধ্য দিয়ে চিরন্তন মাতৃসত্তাকে লেখিকা যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা বিশ্লেষণ করো।৫
মহাশ্বেতা দেবী গৌরবির চরিত্রের মধ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে মাতৃত্ব কেবল রক্তের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মমতা, আশ্রয়, দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের মধ্যেও মাতৃত্বের প্রকাশ ঘটে।
- নিজের সন্তানের কাছ থেকে অবহেলা: গৌরবির নিজের সন্তান নিবারণ তাকে আশ্রয় দিতে চায় না। ফলে জন্মদাত্রী হয়েও সে সন্তানের কাছ থেকে মাতৃমর্যাদা পায় না।
- হারার প্রতি মমতার জাগরণ: মাতৃহারা হারার অসহায়তা গৌরবির হৃদয় স্পর্শ করে।
- গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি: আয়েষার শেষ কথা—
“মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস”
—শুনে “গৌরবির শুকনো বুকে যেন কিসের ঢেউ লাগল।” এই ‘ঢেউ’ তার মাতৃসত্তার জাগরণের প্রতীক।
- ধর্মের ঊর্ধ্বে মাতৃত্ব: হারা মুসলমান হলেও গৌরবির মাতৃস্নেহ তাকে ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায়।
- আত্মত্যাগ: সামাজিক নিরাপত্তা ও নিজের ভিটে হারানোর আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও সে হারাকে পরিত্যাগ করে না।
- চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
“চল্ আমরা চলে যাব… শহরে।”
—এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে গৌরবি নিজের স্বার্থের চেয়ে হারার নিরাপত্তাকে বড়ো করে দেখে।
অতএব, গৌরবির মাতৃত্ব জৈবিক নয়, মানবিক ও সর্বজনীন মাতৃত্বের প্রতীক।
৬.নিম্নবিত্ত পরিবারের মহিলাদের জীবনযাপনের ছবি নিজের ভাষায় লেখো।৫
‘হারুন সালেমের মাসি’ গল্পে নিম্নবিত্ত নারীদের জীবন দারিদ্র্য, কঠোর পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অবহেলায় পরিপূর্ণ।
- জীবিকার সংগ্রাম: গৌরবি ও আয়েষার মতো নারীরা শাকপাতা, গুগলি, কাঠি ইত্যাদি সংগ্রহ করে সামান্য অর্থ উপার্জন করত।
- শারীরিক পরিশ্রম: নিজেদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাদের প্রতিদিন মাঠ, বিল, খালপাড়ে গিয়ে সংগ্রহের কাজ করতে হতো।
- নিরাপত্তাহীনতা: স্বামী বা সন্তানের কাছ থেকে স্থায়ী আশ্রয় না পেয়ে গৌরবির মতো নারীদের অনিশ্চিত জীবন কাটাতে হয়।
- যশির জীবনসংগ্রাম:
“যশিরা হাঁটে না, ছোটে।”
—এই উক্তির মধ্য দিয়ে শ্রমজীবী নারীর নিরন্তর ছুটে চলা ফুটে উঠেছে।
- পুরুষতান্ত্রিক বাস্তবতা: সংসার টিকিয়ে রাখার মূল দায়িত্ব অনেক সময় নারীদের ওপর পড়লেও সামাজিক মর্যাদা বা নিরাপত্তা তারা পায় না।
- পারস্পরিক নির্ভরতা: দারিদ্র্যের মধ্যেও গৌরবি ও আয়েষার মতো নারীরা একে অপরের সহযোগিতায় বেঁচে থাকে।
সুতরাং গল্পে নিম্নবিত্ত নারীর জীবন শুধু দারিদ্র্যের নয়; শ্রম, আত্মনির্ভরতা, সহমর্মিতা ও বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামেরও ছবি।
৭.“ঈশ্বরের জিনিস তো! শাকে-পাতায় দোষ নেই।”— এমন মন্তব্যের কারণ কী?৫
এই মন্তব্যের মধ্যে গৌরবির সরল বিশ্বাসের পাশাপাশি জাত-ধর্মের সামাজিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এক গভীর ইঙ্গিত রয়েছে।
- প্রসঙ্গ: গৌরবি ও আয়েষা শাকপাতা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত।
- ধর্মীয় বিভেদ: আয়েষা মুসলমান হওয়ায় তার হাতে সংগৃহীত জিনিস নেওয়া নিয়ে গৌরবির মনে সামাজিক সংস্কারজনিত দ্বিধা তৈরি হয়।
- গৌরবির যুক্তি: শাকপাতা কোনো ব্যক্তির সৃষ্টি নয়; এগুলি প্রকৃতির দান, ঈশ্বরের সৃষ্টি।
- উদ্ধৃতির তাৎপর্য:
“শাকে-পাতায় দোষ নেই”
—বলে গৌরবি যেন বোঝাতে চায় যে প্রকৃতির সৃষ্টির মধ্যে মানুষের জাত-ধর্মের বিভেদ নেই।
- গভীর সামাজিক ব্যঞ্জনা: মানুষ যেখানে জাত-ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টি করে, প্রকৃতি সেখানে সকলের জন্য সমান।
অতএব, এই সরল উক্তির মধ্য দিয়ে প্রকৃতির সাম্য, মানুষের নিষ্পাপ বোধ এবং সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার অসারতা প্রকাশ পেয়েছে।
৮.“ওঃ! ঘর তুলেছিল যেমন কোঠাবাড়ি— বলে মাটিতে থুতু ফেলেছিল”— তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।৫
উদ্ধৃতিটি হারার বাবার মৃত্যুর পর সমাজের মানুষের আচরণকে কেন্দ্র করে বলা হয়েছে।
- হারার বাবার পরিচয়: হারার বাবা ছিলেন ঘরামি—ঘর তৈরির কারিগর।
- তাঁর স্বপ্ন: নিজের শ্রমে তিনি একটি উঁচু ও ভালো ঘর নির্মাণ করেছিলেন।
- ঘটনাটি: তাঁর মৃত্যুর পর দেহ মাদুরে মুড়ে উঠোনে তোলার সময় গ্রামের লোকেরা তাঁর নির্মিত ঘর নিয়ে বিদ্রূপ করেছিল।
- উদ্ধৃতি: তারা বলেছিল—
“ওঃ! ঘর তুলেছিল যেমন কোঠাবাড়ি”
—এবং মাটিতে থুতু ফেলেছিল।
- থুতু ফেলার কারণ: দরিদ্র ঘরামি হয়েও পালবাবুদের মতো উঁচু ঘর তৈরি করাকে তারা ‘কাঙালের আস্পর্ধা’ বলে মনে করেছিল।
- তাৎপর্য: ঘটনাটি কেবল ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়; এর মধ্যে শ্রেণিবৈষম্য ও দরিদ্র মানুষের উন্নত জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করার সামাজিক মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে।
অতএব, ‘থুতু ফেলা’ এখানে শ্রেণিঅহংকার, সামাজিক বৈষম্য ও দরিদ্র মানুষের স্বপ্নকে অপমান করার প্রতীক।
৯.“গৌরবি ওর নিড়িনি আর থলি খুঁজছিল”— ‘নিড়িনি’ ও ‘থলি’ শব্দ দুটির অর্থ কী? গৌরবি এ দুটি কেন খুঁজছিল?৫
নিড়িনি: ঘাস, আগাছা বা শাকপাতা তোলার কাজে ব্যবহৃত ছোট লোহার হাতিয়ার।
থলি: সংগৃহীত শাকপাতা বা অন্যান্য জিনিস রাখার ছোট ব্যাগ বা পুঁটলি।
গৌরবি কেন খুঁজছিল —
- জীবিকার প্রয়োজন: গৌরবির প্রধান জীবিকা ছিল শাকপাতা ও অন্যান্য জিনিস সংগ্রহ করে বিক্রি করা।
- সংগ্রহের সরঞ্জাম: নিড়িনি দিয়ে মাটি থেকে শাক বা আগাছা তোলা হতো।
- বহনের জন্য: সংগ্রহ করা জিনিস থলিতে রাখা ও বহন করা হতো।
- প্রতিদিনের কাজ: গৌরবি ও আয়েষা বিলের ধারে, খালপাড়ে গিয়ে থানকুনি পাতা, কচুশাক, দুর্বাঘাস, বেলপাতা, যজ্ঞডুমুরের ডাল প্রভৃতি সংগ্রহ করত।
- জীবিকার সঙ্গে সম্পর্ক: এই সামান্য সরঞ্জামগুলিই ছিল তার উপার্জনের অন্যতম অবলম্বন।
তাই নিড়িনি ও থলি গৌরবির কাছে নিছক দৈনন্দিন ব্যবহার্য বস্তু নয়; এগুলি তার দারিদ্র্যের সংসারে বেঁচে থাকার উপকরণ।
১০.“যশিরা হাঁটে না, ছোটে।”— এই মন্তব্যের আলোকে যশি চরিত্রটি সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করো।৫
উক্তিটির মধ্যেই যশির কঠোর শ্রমজীবনের পরিচয় নিহিত রয়েছে।
- শ্রমজীবী নারী: যশি নিম্নবিত্ত পরিশ্রমী নারী; ছোটবেলা থেকেই তাকে উপার্জন করে বাঁচতে হয়েছে।
- নিরন্তর শ্রম:
“সাত বছর বয়েস থেকে না খেটে একবেলা ভাত পেয়েছে মনে পড়ে না যশির।”
উক্তিটি তার দীর্ঘ সংগ্রামের পরিচয় দেয়।
- ছুটে চলার কারণ: জীবিকার তাগিদে তাকে শহরে যেতে হয়, বোঝা বহন করতে হয় এবং সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে হয়।
- কঠোর বাস্তববাদ: জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা তাকে আবেগের চেয়ে বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছে।
- গৌরবির প্রতি মনোভাব: গৌরবিকে সে কঠিন ভাষায় বাস্তব পরিস্থিতি বোঝায়—
“তোমার নিজের পেট চলে না তুমি যাও অন্যের ভালো করতে।”
- অন্তর্নিহিত মানবিকতা: রূঢ় মনে হলেও তার কথার মধ্যে গৌরবিকে বিপদ থেকে রক্ষা করার উদ্বেগও রয়েছে।
অতএব, যশি চরিত্রে দারিদ্র্য, কঠোর শ্রম, বাস্তববাদ এবং অন্তর্নিহিত মানবিকতার সমন্বয় ঘটেছে।
১১.“এই তো স্বর্গ! … নাকি সব গরিবের স্বর্গ আসলে এক?”— কোনটিকে স্বর্গ বলা হয়েছে? এমন ভাবনার কারণ কী?৫
গৌরবির স্বপ্নে মৃত আয়েষা তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে অঢেল শাকপাতা ও উদ্ভিদ রয়েছে—
“থানকুনি পাতা দুর্বাঘাসের মেলা। মাদারগাছের ছায়ায় ঢেঁকিশাকের জঙ্গল।”
সেই প্রাচুর্য দেখে গৌরবি মনে করে—
“এই তো স্বর্গ!”
- স্বর্গের রূপ: অঢেল শাকপাতা, খাদ্যের প্রাচুর্য ও অভাবহীন পরিবেশই গৌরবির কাছে স্বর্গ।
- বাস্তব জীবনের বিপরীত: বাস্তবে তাকে সামান্য শাকপাতা সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।
- আয়েষার সঙ্গে সাদৃশ্য: আয়েষাও একই দারিদ্র্য ও অভাবের মধ্যে জীবন কাটিয়েছে।
- ধর্মীয় প্রশ্ন: গৌরবি হিন্দু, আয়েষা মুসলমান—তাই গৌরবির মনে প্রশ্ন জাগে, তাদের স্বর্গ কি আলাদা?
- উপলব্ধি: উভয়ের দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও জীবনসংগ্রাম একই হওয়ায় গৌরবি ভাবতে থাকে—“সব গরিবের স্বর্গ আসলে এক?”
এই ভাবনার মধ্য দিয়ে লেখিকা দেখিয়েছেন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের কোনো ধর্ম নেই; গরিব মানুষের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা সর্বত্র এক।
১২.“শহরে গৌরবি আর হারার সমাজ অনেক বড়ো। সমুদ্রের মতো”— গৌরবি ও হারার সমাজের পরিচয় দাও। শহরকে সমুদ্রের মতো বলা হয়েছে কেন?৫
গৌরবি হিন্দু সমাজের এক দরিদ্র, প্রান্তিক নারী এবং হারা মুসলমান, মাতৃহারা ও অসহায় শিশু। গ্রামের সংকীর্ণ সামাজিক পরিবেশে তাদের ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক অবস্থান তাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে।
- গ্রামের সংকীর্ণ সমাজ: গ্রামে জাত, ধর্ম, পরিচয় ও লোকমতের প্রভাব প্রবল।
- নিবারণের মনোভাব: নিবারণ হারাকে গ্রহণ করতে চায় না; ধর্মীয় পরিচয়কে সে সমস্যার কারণ হিসেবে দেখে।
- মুকুন্দের বাধা: মুকুন্দ স্পষ্টভাবে জানায়—
“ও ছোঁড়াকে যদি বিদায় না কর আমার ভিটে ছেড়ে দাও।”
- গৌরবির উপলব্ধি: এই সামাজিক চাপ থেকে মুক্তির জন্য সে বলে—
“কেউ তোর পরিচয় জানবে না, আমার পরিচয় জানবে না।”
- শহর কেন সমুদ্রের মতো: শহরে অসংখ্য মানুষ পাশাপাশি বসবাস করে। সেখানে গ্রামের মতো প্রত্যেকের বংশ, জাত, ধর্ম ও ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়ে অনুসন্ধানের সুযোগ বা প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম।
- প্রতীকী তাৎপর্য: সমুদ্রে যেমন অসংখ্য জলধারা এসে একাকার হয়, তেমনই শহরের বিপুল জনসমুদ্রে গৌরবি ও হারা নিজেদের পরিচয়ের সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে মিশে যেতে পারবে।
সুতরাং “সমুদ্রের মতো” কথাটি বৃহত্তর সমাজ, পরিচয়ের মুক্তি এবং সংকীর্ণ গ্রামীণ সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থেকে পালিয়ে বাঁচার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
১৩.“এইসব সময়ে গৌরবির বড়ো কষ্ট হয়। ও রেললাইনের দিকে চেয়ে থাকে”— কারণ কী?২+৩=৫
গৌরবির বড়ো কষ্টের মূল কারণ তার বার্ধক্য, একাকীত্ব এবং ভবিষ্যৎ আশ্রয়হীনতার চিন্তা। হারার মা আয়েষা বিবি মৃত্যুর পর গৌরবি উপলব্ধি করে যে, মৃত্যুর সময় অন্তত আয়েষা “ছেলের হাতের মাটি” পেয়েছে এবং “নিজের ঘরে শুয়ে মরেছে”; কিন্তু তার নিজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সে ভাবে—
“আমি বা কোথায় মরব, কে মুখ শলা করবে কে জানে!”
নিজের ছেলে নিবারণ কাছাকাছি থাকলেও তাকে নিজের কাছে রাখতে চায় না।
রেললাইনের দিকে চেয়ে থাকার কারণ —
- নিবারণের অবস্থান: কয়েকটি স্টেশন দূরে নিবারণ থাকে এবং সেখানেই তার সংসার গড়ে উঠেছে।
- মায়ের প্রতি অবহেলা: গৌরবি সেখানে থাকতে চাইলেও নিবারণ তাকে গ্রহণ করেনি; বরং বলেছে—
“এবার পুঁটির কাছে যাও গিয়া। মাঝে-মধ্যে আমি খবর দিব।”
- হারানো আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষা: তাই রেললাইনের দিকে তাকিয়ে থাকা গৌরবির কাছে ছেলের কাছাকাছি থেকেও তার কাছে পৌঁছতে না-পারার বেদনার প্রকাশ।
- মৃত্যুর অনিশ্চয়তা: নিজের মৃত্যুর সময় কে পাশে থাকবে, কে শেষকৃত্য করবে—এই চিন্তাও তাকে কষ্ট দেয়।
অতএব, রেললাইনের দিকে তাকিয়ে থাকা গৌরবির অপূর্ণ মাতৃস্নেহ, হারানো আশ্রয় এবং ভবিষ্যৎ মৃত্যুভয়ের প্রতীক।
১৪.গৌরবির ছেলে নিবারণের চরিত্রটি কেমন, তা বিশ্লেষণ করো।৫
নিবারণ গৌরবির একমাত্র ছেলে হলেও তার চরিত্রে স্বার্থপরতা, পুরোনো অভিমান, সামাজিক মর্যাদার মোহ এবং মাতৃ-অবহেলা প্রবল।
- পুরোনো অভিমান: পুঁটির বিয়ের সময় তার বাবা ঘর তৈরির টাকা ভেঙে “ঘড়ি, সাইকেল, টর্চ” কিনেছিলেন। তখন নিবারণ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিল—
“সব একজনকে দিবি? তোমার একটা সন্তান?”
পরে তার মুখে শোনা যায়—“ভালো। সময়ে বুঝা যাবে।” এই কথার মধ্যেই ভবিষ্যৎ প্রতিহিংসার ইঙ্গিত ছিল।
- স্বার্থপরতা: বড়ো হয়ে নিজের ঘর তুলেছে, মেঝে পাকা করেছে, সংসার গুছিয়েছে; কিন্তু বৃদ্ধ মায়ের জন্য আশ্রয় বা ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেনি।
- সামাজিক মর্যাদার মোহ: গৌরবি আশ্রয় চাইলে সে বলে—
“এখন সমাজে আমার একটু নাম হয়েছে। আমার মা হয়ে ওই অজ গাঁয়ে পড়ে থাকবে সেটা ভালো দেখায় না বটে!”
- ধর্মীয় সংকীর্ণতা: হারা মুসলমান হওয়ায় তাকে আশ্রয় দেওয়াকে সে ‘পাপ’ বলে মনে করে—
“ও পাপ বিদেয় করো। তারপর ভেবে দেখব।”
- মাতৃ-অবহেলা: নিজের জন্মদাত্রী মায়ের অসহায় অবস্থার প্রতি তার কোনো প্রকৃত সহানুভূতি নেই।
সুতরাং নিবারণ চরিত্রে ব্যক্তিস্বার্থ, সামাজিক প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং মায়ের প্রতি নিষ্ঠুর উদাসীনতা একত্রে প্রকাশ পেয়েছে।
১৫.“মুকুন্দবাবু জানলে পরে তোমায় খেদা করবে।”— কে কাকে বলেছে? কারণ কী?২+৩=৫
উক্তিটি যশি গৌরবিকে বলেছিল।
- প্রসঙ্গ: হারার মা আয়েষা মারা যাওয়ার পর মাতৃহারা হারা গৌরবির উঠোনে আশ্রয় নেয়। গৌরবি তাকে নিজের অল্প খাবার ভাগ করে দেয় এবং তার প্রতি মমতা দেখাতে শুরু করে।
- ধর্মীয় পার্থক্য: গৌরবি হিন্দু এবং হারা মুসলমান। ফলে গৌরবির ঘরে মুসলমান শিশুর আশ্রয় নেওয়া গ্রামের প্রচলিত সামাজিক রীতির সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
- মুকুন্দের ক্ষমতা: যে বাড়িতে গৌরবি থাকে, সেই বাড়ির সঙ্গে মুকুন্দবাবুর প্রভাব ও অধিকার জড়িত। তাই যশি জানত, মুকুন্দ জানতে পারলে গৌরবিকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে।
- যশির সতর্কবাণী: সেই কারণেই সে বলে—
“তোমাদের দেশের রীতিকানুন জানি না মাসি, তবে মুকুন্দবাবু জানলে পরে তোমায় খেদা করবে।”
- তাৎপর্য: এই কথার মধ্য দিয়ে গ্রামের সামাজিক ক্ষমতা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা এবং দরিদ্র মানুষের অনিরাপদ আশ্রয়—তিনটিই প্রকাশিত হয়েছে।
১৬.“কী ভয়ানক প্রতিহিংসা নিবারণের”— কখন বুঝল? প্রতিহিংসার স্বরূপ আলোচনা করো।২+৩=৫
গৌরবি যখন নিজের ছেলে নিবারণের কাছে আশ্রয় চায় এবং নিবারণ তাকে প্রত্যাখ্যান করে, তখনই সে নিবারণের দীর্ঘদিনের প্রতিহিংসার স্বরূপ বুঝতে পারে। নিবারণ বলে—
“এবার পুঁটির কাছে যাও গিয়া। মাঝে-মধ্যে আমি খবর দিব।”
নিবারণের প্রতিহিংসার স্বরূপ —
- পুরোনো ক্ষোভ: পুঁটির বিয়ের সময় নিবারণের বাবা ঘর তৈরির টাকা ভেঙে “ঘড়ি, সাইকেল, টর্চ” কিনেছিলেন। নিবারণ তখন বলেছিল—
“সব একজনকে দিবি? তোমার একটা সন্তান?”
- ভবিষ্যৎ হুমকি: সেই সময় তার মুখে উচ্চারিত হয়েছিল—“ভালো। সময়ে বুঝা যাবে।”
- দীর্ঘস্থায়ী অভিমান: বড়ো হওয়ার পরও সে সেই পুরোনো ঘটনার ক্ষোভ ভুলতে পারেনি।
- মায়ের প্রতি নিষ্ঠুরতা: নিজের সংসার গড়ে সচ্ছল হলেও বৃদ্ধ মাকে আশ্রয় দেয়নি।
- প্রতিহিংসার চূড়ান্ত প্রকাশ: মায়ের দুর্দশার সময়েও সে সাহায্যের বদলে শর্ত দেয়—“ও পাপ বিদেয় করো। তারপর ভেবে দেখব।”
অতএব, নিবারণের প্রতিহিংসা তাৎক্ষণিক রাগ নয়; এটি শৈশবের পুঞ্জীভূত অভিমান ও স্বার্থপরতার দীর্ঘস্থায়ী নিষ্ঠুর প্রকাশ।
১৭.“কী বিপদ, কী বিপদ। ওর নিজের বলতে কেউ নেই?”— কখন এই ভাবনা আসে? বিপদটা কেমন ছিল?২+৩=৫
হারার মা আয়েষা বিবির মৃত্যুর পর হারা যখন আশ্রয়ের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে গৌরবির উঠোনে ফিরে আসে, তখন গৌরবির মনে এই ভাবনা জাগে। হারা নিজের পরিচয় সম্পর্কে বলে—
“মা বলত কেও নাই।”
তখনই গৌরবি উপলব্ধি করে—
“কী বিপদ, কী বিপদ! ওর নিজের বলতে কেউ নেই?”
হারার বিপদের দিকগুলি —
- আশ্রয়হীনতা: মাত্র সাত বছরের শিশু হারা মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছে; তার নির্ভর করার মতো আপনজন নেই।
- খাদ্যের অনিশ্চয়তা: সে নিজে উপার্জন করতে সক্ষম নয়; ফলে প্রতিদিনের খাবারের ব্যবস্থাও অনিশ্চিত।
- নিরাপত্তার অভাব: এত অল্প বয়সে নিজের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করার ক্ষমতা তার নেই।
- সামাজিক বিপদ: সে মুসলমান হওয়ায় হিন্দু গৌরবির কাছে আশ্রয় নেওয়াও সামাজিক বিরোধের কারণ হয়ে ওঠে।
- গৌরবিরও বিপদ: তাকে আশ্রয় দেওয়ায় গৌরবির নিজের ভিটে ও সামাজিক নিরাপত্তা বিপন্ন হয়।
তাই হারার বিপদ শুধু অনাথ হওয়ার নয়; আশ্রয়হীনতা, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা ও সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার সম্মিলিত বিপদ।
১৮.“গৌরবির শুকনো বুকে কিসের যেন ঢেউ লাগে”— কোন কথা শুনে? কারণ কী?২+৩=৫
হারার মুখে তার মৃত মায়ের শেষ নির্দেশ শুনে গৌরবির “শুকনো বুকে” ঢেউ লাগে। হারা জানায়, তার মা তাকে বলেছিল—
“মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস।”
- মাতৃত্বের পুনর্জাগরণ: এই কথা শুনে গৌরবির সুপ্ত মাতৃসত্তা জেগে ওঠে।
- নিজের সন্তানের অবহেলা: নিবারণ তাকে আশ্রয় দেয়নি। ফলে নিজের মা হিসেবে প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি তার মধ্যে অনেকটাই নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল।
- হারার নির্ভরতা: আয়েষা মৃত্যুর আগে নিজের সন্তানকে গৌরবির ওপর ভরসা করে দিয়ে গেছে।
- আত্মমর্যাদার অনুভূতি: গল্পকার বলেন—
“নিজেকে বড়ো প্রয়োজনীয় মনে হল হঠাৎ।”
এই অনুভূতিই গৌরবির অন্তরে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে।
- মাতৃত্বের সর্বজনীনতা: নিবারণের মা হয়েও যে মাতৃমর্যাদা সে পায়নি, হারার ‘মাসি’ হয়ে সে যেন নতুন করে মাতৃত্বের অর্থ খুঁজে পায়।
অতএব, এই ‘ঢেউ’ আসলে গৌরবির পুনর্জাগ্রত মাতৃত্ব, ভালোবাসা ও একজন অসহায় শিশুর কাছে নিজের প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠার আবেগের প্রতীক।
১৯.“সে কি হারার মা না নিবারণের মা?”— নিবারণের মা কে? বারণ করার কারণ কী?১+৪=৫
নিবারণের মা হল গৌরবি। কিন্তু হারার মা মারা যাওয়ার পর হারা যখন গৌরবির কাছে আশ্রয় নেয়, তখন গৌরবির মাতৃসত্তা নতুনভাবে জেগে ওঠে।
গৌরবিকে বারণ করার কারণগুলি —
- ধর্মীয় পার্থক্য: হারা মুসলমান এবং গৌরবি হিন্দু। তাই তাকে আশ্রয় দেওয়া গ্রামের ধর্মীয় সংস্কারের চোখে অপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে।
- সামাজিক চাপ: যশি সতর্ক করে—
“মুকুন্দবাবু জানলে পরে তোমায় খেদা করবে।”
- নিবারণের আপত্তি: নিবারণও হারা সম্পর্কে বলে—“ও পাপ বিদেয় করো। তারপর ভেবে দেখব।”
- আশ্রয় হারানোর ভয়: গৌরবি নিজেও জানে, হারাকে রাখলে তার নিজের ভিটে ও আশ্রয় বিপন্ন হতে পারে।
তবে এসব বাধা সত্ত্বেও গৌরবির মানবিকতা তাকে হারাকে ত্যাগ করতে দেয় না। ফলে প্রশ্নটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হল—রক্তের সম্পর্কের ছেলে নিবারণ যেখানে মাকে প্রত্যাখ্যান করে, সেখানে রক্তের সম্পর্কহীন হারা গৌরবির মাতৃসত্তাকে জাগিয়ে তোলে।
২০.“মর্ মর্! তোর জন্য আমার এত দুর্ভোগ।”— কী জন্য দুর্ভোগ? উক্তিটি কতটা আন্তরিক?৩+২=৫
হারাকে আশ্রয় দেওয়ার পর গৌরবির জীবনে নানা সমস্যা দেখা দেয়। হারা মুসলমান হওয়ায় তাকে আশ্রয় দেওয়া গ্রামের প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক রীতির বিরোধী বলে বিবেচিত হয়। যশি সতর্ক করে—
“মুকুন্দবাবু জানলে পরে তোমায় খেদা করবে।”
আবার নিবারণও বলে—“ও পাপ বিদেয় করো। তারপর ভেবে দেখব।”
ফলে গৌরবির সামনে —
- ভিটে হারানোর ভয়,
- ছেলের আশ্রয় পাওয়ার অনিশ্চয়তা,
- সমাজের বিরোধিতা এবং
- নিজের দারিদ্র্যের মধ্যেও হারাকে খাওয়ানোর দায়িত্ব
—সব মিলিয়ে প্রবল দুর্ভোগ তৈরি হয়।
উক্তিটি তাই মূলত অসহায়তা, ভয় ও সাময়িক রাগের বহিঃপ্রকাশ। এটিকে গৌরবির প্রকৃত মনের কথা বলা যায় না। কারণ হারার প্রতি তার গভীর মমতা ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে এবং সে তাকে সহজে ত্যাগ করতে পারে না। তাই উক্তিটির মধ্যে তার মাতৃস্নেহের বিপরীতে পরিস্থিতিজনিত অসহায়তার দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।
২১.গল্প অনুসরণ করে গৌরবির মাতৃরূপের পরিচয় দাও।৫
গৌরবির মাতৃরূপ এই গল্পের অন্যতম প্রধান মানবিক সৌন্দর্য। তার মাতৃত্ব প্রথমে রক্তের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে তা ধর্ম ও রক্তের সীমা অতিক্রম করে সর্বজনীন রূপ লাভ করে।
- নিজের সন্তানের কাছ থেকে অবহেলা: নিবারণ তার মা গৌরবিকে আশ্রয় দেয় না। ফলে গৌরবির মাতৃত্ব অপূর্ণ থেকে যায়।
- হারার প্রতি মমতা: মাতৃহারা হারা তার উঠোনে আশ্রয় নিলে গৌরবি নিজের সামান্য খাবারও তার সঙ্গে ভাগ করে নেয়।
- আয়েষার শেষ নির্দেশ:
“মাসির পা ধরে পড়ে থাকিস”
—এই কথা শুনে গৌরবির “শুকনো বুকে যেন কিসের ঢেউ লাগল।”
- আত্মমর্যাদার পুনর্জাগরণ:
“নিজেকে বড়ো প্রয়োজনীয় মনে হল হঠাৎ”
—এই উপলব্ধি তার মাতৃসত্তাকে আরও শক্তিশালী করে।
- ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবিকতা: হারা মুসলমান হলেও গৌরবি তার প্রতি মায়া ত্যাগ করতে পারে না।
- আত্মত্যাগ: সামাজিক চাপ, মুকুন্দের ভয় এবং নিজের অনিশ্চিত জীবন সত্ত্বেও সে হারার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে।
অতএব, গৌরবির মাতৃরূপ রক্তসম্পর্কের সীমা অতিক্রম করে মমতা, আশ্রয়, দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের সর্বজনীন মানবিক রূপ ধারণ করেছে।
