তেলেনাপোতা আবিষ্কার – প্রেমেন্দ্র মিত্র | তেলেনাপোতা আবিষ্কার গল্পের প্রশ্ন উত্তর | telenapota abishkar

তেলেনাপোতা আবিষ্কার

লেখক: প্রেমেন্দ্র মিত্র

গল্পের মূল বিষয়বস্তু

নগরজীবনের ক্লান্তি ও তেলেনাপোতার উদ্দেশ্যে যাত্রা

প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পে নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা ও একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়ার এক অদ্ভুত অভিযানের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। ছুটির অবসরে মাছ ধরার আনন্দ উপভোগ করার জন্য কথক তাঁর দুই বন্ধুকে নিয়ে কলকাতা থেকে তেলেনাপোতার উদ্দেশ্যে রওনা হন। মহানগরী থেকে মাত্র তিরিশ মাইল দূরে অবস্থিত এই স্থানটি যেন আধুনিক সভ্যতার আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এক বিস্মৃত জনপদ।

তেলেনাপোতায় পৌঁছানোর পথ ছিল বেশ দুর্গম ও রোমাঞ্চকর। প্রথমে ভিড়ভর্তি বাসে অনেকটা পথ যাওয়ার পর তাঁদের নামতে হয়। এরপর ঘন জঙ্গল, কাদাজল ও সংকীর্ণ পথ পেরিয়ে একটি ছোট গরুর গাড়িতে চেপে তাঁরা এগিয়ে যান। গাড়োয়ান বন্য জন্তুর ভয় তাড়াতে ক্যানেস্তারা বাজাতে বাজাতে পথ চলে। এভাবে নানা বাধা পেরিয়ে তাঁরা পৌঁছান প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে ঘেরা রহস্যময় তেলেনাপোতা গ্রামে।

তেলেনাপোতার রহস্যময় পরিবেশ

তেলেনাপোতায় পৌঁছে তাঁরা একটি ভগ্নপ্রায় পুরোনো অট্টালিকায় আশ্রয় নেন। বাড়িটি বাদুড়, চামচিকা ও মশার উপদ্রবে ভরা। চারদিকে নির্জনতা, জঙ্গল ও ধ্বংসস্তূপের পরিবেশ যেন জায়গাটিকে এক রহস্যময় রূপ দিয়েছে। কথকের দুই সঙ্গীর একজন মদ্যপানে এবং অন্যজন ঘুমে মগ্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু কথকের চোখে ঘুম আসে না। মাঝরাতে বাড়ির ভাঙা ছাদে উঠে চারপাশের পরিবেশ দেখে তাঁর মনে হয়, তিনি যেন কোনো রূপকথার ঘুমন্ত নগরীতে এসে উপস্থিত হয়েছেন। এমন সময় দূরের একটি ভাঙা জানালার আড়ালে তিনি ক্ষণিকের জন্য এক রহস্যময় নারীমূর্তি দেখতে পান। এই দৃশ্য তাঁর মনে কৌতূহল সৃষ্টি করে।

যামিনীর সঙ্গে পরিচয়

পরদিন সকালে কথক পুকুরের শ্যাওলা সরিয়ে মাছ ধরার জন্য ছিপ নিয়ে বসেন। এমন সময় একটি পিতলের কলসি হাতে জল নিতে আসে এক তরুণী। তার নাম যামিনী। তার শান্ত, গম্ভীর ও বিষণ্ণ মুখশ্রী কথককে আকৃষ্ট করে। পরে কথক জানতে পারেন, যামিনী তাঁর বন্ধু মণির দূরসম্পর্কের আত্মীয়া। আগের রাতে জানালার আড়ালে যে নারীমূর্তিকে তিনি দেখেছিলেন, সে আসলে যামিনীই।

যামিনীর জীবনের করুণ কাহিনি

দুপুরে কথক যামিনীদের বাড়িতে খাবার খেতে যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় যামিনীর অন্ধ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধা মায়ের। কথাবার্তার মধ্য দিয়ে যামিনীর জীবনের এক করুণ কাহিনি প্রকাশ পায়। বহু বছর আগে নিরঞ্জন নামে এক আত্মীয়ের সঙ্গে যামিনীর বিয়ের কথা হয়েছিল। কিন্তু নিরঞ্জন বিদেশে চলে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেনি। সে অন্যত্র সংসার পেতেছে। যামিনী এই সত্য জানলেও তার বৃদ্ধা মা তা জানেন না। অন্ধ বৃদ্ধা আজও বিশ্বাস করেন, নিরঞ্জন একদিন ফিরে এসে যামিনীকে বিয়ে করবে।

কথকের পায়ের শব্দ শুনে বৃদ্ধা তাঁকে নিরঞ্জন বলে ভুল করেন। মেয়ের বিয়ে দেওয়ার আশায় তিনি কথকের কাছে ব্যাকুলভাবে মিনতি জানাতে থাকেন। অসহায় বৃদ্ধার আকুল আবেদন এবং যামিনীর করুণ অবস্থায় কথকের মন গভীরভাবে বিচলিত হয়। বৃদ্ধার মনে শান্তি দেওয়ার জন্য কথক নিজেকে নিরঞ্জন বলে পরিচয় দেন এবং যামিনীকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁর এই আশ্বাসে বৃদ্ধা আশ্বস্ত হন। অন্যদিকে, যামিনীর চোখে ফুটে ওঠে নীরব কৃতজ্ঞতা ও আশার আলো।

প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাবর্তন ও স্মৃতির বিলুপ্তি

বিকেলে কলকাতায় ফিরে যাওয়ার সময় যামিনী কথককে তাঁর ফেলে যাওয়া ছিপটির কথা মনে করিয়ে দেয়। কথক আবার তেলেনাপোতায় ফিরে আসার আশ্বাস দেন। যামিনীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি আবার ফিরে এসে যামিনীর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বলে মনে মনে সংকল্প করেন।

কিন্তু কলকাতায় ফিরে আসার পরই তাঁর জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। তেলেনাপোতার জলাভূমি ও মশার কারণে তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হন। তীব্র জ্বরে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা ও স্বাভাবিক কাজকর্মের মধ্যে তেলেনাপোতার স্মৃতি ক্রমশ ম্লান হয়ে যায়। যামিনীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং সেখানে ফিরে যাওয়ার সংকল্পও একসময় বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যায়।

শেষ পর্যন্ত কথকের মনে হয়, তেলেনাপোতা, তার প্রাচীন ধ্বংসস্তূপ, অন্ধ বৃদ্ধা এবং যামিনী—সবই যেন জ্বরের ঘোরে দেখা কোনো স্বপ্ন। ক্ষণিকের জন্য আবিষ্কৃত সেই রহস্যময় জনপদ আবার তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে যায়।

উপসংহার: ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পে প্রেমেন্দ্র মিত্র নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি, গ্রামীণ জীবনের রহস্যময় সৌন্দর্য, মানুষের নিঃসঙ্গতা এবং জীবনের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। যামিনীর জীবনের করুণ বাস্তবতা এবং কথকের ক্ষণিকের মানবিক আবেগ গল্পটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। গল্পের শেষে তেলেনাপোতার স্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষের ক্ষণস্থায়ী আবেগ, প্রতিশ্রুতি ও বিস্মৃতির এক গভীর জীবনসত্য প্রকাশিত হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর

১. তেলেনাপোতা যাওয়ার কারণ কী? একে লেখক আবিষ্কার বলেছেন কেন?

মান: ২+৩

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ একটি ভিন্ন স্বাদের গল্প। এই গল্পে তেলেনাপোতা হলো শহর কলকাতার অনতিদূরে অবস্থিত মহামারীতে সর্বস্বান্ত হওয়া জনবিরল একটি গ্রাম। শহরের প্রাত্যহিক কাজকর্মে হাঁপিয়ে উঠে অবসর সময় কাটাতে এবং মৎস্য শিকারের ইচ্ছা চরিতার্থ করার জন্যই গল্পকথক তাঁর দুই বন্ধুর সঙ্গে তেলেনাপোতায় পাড়ি দেন।

মহানগরী থেকে মাত্র তিরিশ মাইল দূরে থেকেও লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গিয়েছিল তেলেনাপোতা। আলোচ্য গল্পে মৎস্যশিকারি কথক এবং পানরসিক ও নিদ্রাবিলাসী দুই বন্ধু মিলে তেলেনাপোতায় গিয়েছিল। সভ্যজগতের এত কাছাকাছি দূরত্বের মধ্যে এমন একটি শান্ত জনবিরল অজ্ঞাত পরিবেশের সন্ধান পাওয়া শহরাঞ্চলের ব্যস্ত মানুষের কাছে এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। লেখক এই কারণেই তেলেনাপোতা যাওয়ার ঘটনাকে আবিষ্কারের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

গল্পে উল্লেখিত তিন যুবক যেন বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া তেলেনাপোতাকে নতুন করে আবিষ্কার করেছিল। তাদের মাধ্যমেই প্রকাশ্যে এসেছিল মৃত্যুপুরী তেলেনাপোতা, অন্ধকারাচ্ছন্ন জনমানববর্জিত পরিবেশ এবং সেখানকার মানুষের কথা। তেলেনাপোতার এই অচেনা জগৎটিকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া গেছে বলেই লেখক একে ‘আবিষ্কার’ বলেছেন।

২. ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পে যামিনীর চরিত্রবৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।

মান: ৫

উত্তর: বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র তথা নায়িকা চরিত্র হলো যামিনী। সে অন্ধ অশক্ত বিধবা মায়ের একমাত্র সম্বল। যামিনী নামের অর্থ রাত্রি। রাত্রির অন্ধকার যেন তার জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। গল্পে লেখক যামিনীর চরিত্রের যে দিকগুলি উন্মোচিত করেছেন, সেগুলি নিচে আলোচনা করা হলো—

■ দায়িত্ববোধ: যামিনীর মা নিরঞ্জনকে উদ্দেশ্য করে কথককে যথার্থই বলেছিলেন যে, যামিনীর মতো মেয়ে হয় না। তেলেনাপোতার মতো প্রাণহীন জায়গায় যামিনী অন্ধ বৃদ্ধা মায়ের সেবা করেছে, সংসার সামলেছে।

■ সেবাপরায়ণতা: অন্ধ অসুস্থ বৃদ্ধা মায়ের খিটখিটে মেজাজ সহ্য করেও যামিনী মায়ের আন্তরিক সেবাযত্ন করেছে। কথক ও তাঁর দুই বন্ধুকে খাওয়ার আমন্ত্রণ ও স্নেহময়ীরূপে পরিবেশনের ঘটনাতেও যামিনীর সেবাপরায়ণতা লক্ষ করা যায়।

■ বিচারবোধ: যামিনীর মধ্যে বিচারবোধ ছিল বলেই, নিরঞ্জন সংক্রান্ত সত্যি কথা ও তার মনের যন্ত্রণা সে নিজের মধ্যেই চেপে রেখে দেয়। তার একমাত্র সঙ্গিনী মাকেও বাস্তবটা জানতে দেয় না, কেবল তাঁকে মানসিক শান্তি দেওয়ার জন্য।

■ জড়তামুক্ত ব্যবহার: যামিনী চরিত্রের কথায় ও ব্যবহারে কোনোরূপ আড়ষ্টতা চোখে পড়ে না। কথক যখন ভাঙা পুকুরের ঘাটে বসে মাছ ধরায় নিবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন, তখন বঁড়শির ফাতনায় টান পড়ায় যামিনী স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলে উঠেছিল— “বসে আছেন কেন? টান দিন।” লেখকের ভাষায়— ‘মেয়েটির অনাবশ্যক লজ্জা বা আড়ষ্টতা নেই।’

তবে গল্পকথকের রোমান্টিক দৃষ্টিতে যামিনী ছিল রূপকথার বন্দিনি রাজকন্যা। নিদারুণ দারিদ্র্য তাকে কষাঘাত করেছে, তবুও তার হৃদয়ের প্রেমের মুকুল ঝরে যায়নি। তার শুভ্র স্নিগ্ধ হাসি কথককে প্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাই তেলেনাপোতার প্রাণস্বরূপা, ধৈর্যশীলা ও সেবাপরায়ণা যামিনী চরিত্রটি নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য সৃষ্টি।

৩. “আমি তোমায় কথা দিচ্ছি মাসিমা”— কে, কাকে, কোন প্রসঙ্গে, কী কথা দিয়েছিল নিজের ভাষায় লেখো।
অথবা, “কে, নিরঞ্জন এলি?”— নিরঞ্জন কে? কোন্ পরিস্থিতিতে গল্পকথক নিরঞ্জনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন?

মান: ৫ / (২+৩)

উত্তর: প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটি বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। গল্পকথক যামিনীর অসহায় বৃদ্ধা মাকে যামিনীকে গ্রহণ করার কথা দিয়েছিলেন।

নিরঞ্জন কে?
প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পে নিরঞ্জন হলো যামিনীর মায়ের দূর সম্পর্কের বোনপো। সে পূর্বে যামিনীকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

পরিস্থিতি: আলোচ্য গল্পে দেখা যায়, মৎস্য শিকারের উদ্দেশ্যে গল্পকথক দু’জন বন্ধুর সঙ্গে তেলেনাপোতা গ্রামে হাজির হন। মাছ ধরতে না পারলেও একটি মেয়ে কথকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। মেয়েটি কথকের বন্ধু মণিদার জ্ঞাতিস্থানীয়া, নাম যামিনী। দুপুরে যামিনীই সকলের খাবার আয়োজন করেছিল।

ঘটনাক্রমে কথক জানতে পারেন যে, নিরঞ্জন নামের যুবকটি যামিনীকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদেশে চাকরি করার অজুহাতে চলে যায় এবং আর ফিরে আসেনি। এদিকে যামিনীর বৃদ্ধা মা মণির সঙ্গীদের কাউকে নিরঞ্জন ভেবে যামিনীকে জোর করছিলেন নিরঞ্জনকে তাঁর কাছে ডেকে আনার জন্য। অসহায় যামিনী মণিদাকে ডাকতে এসেছিল তার মাকে শান্ত করার অনুরোধ নিয়ে। মণিদা বিরক্ত হলেও গল্পকথক স্বেচ্ছায় যামিনীর মায়ের কাছে যেতে সম্মত হন।

মণিদার সঙ্গে যামিনীর মায়ের কাছে গেলে শয্যাশায়ী অন্ধ বৃদ্ধা কথককে ‘নিরঞ্জন’ সম্বোধন করে ব্যাকুলভাবে বলেন— “এবার তো আর অমন করে পালাবি না?” কথক বৃদ্ধার করুণ অবস্থা দেখে আত্মপরিচয় গোপন করে নিরঞ্জনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং বলে ওঠেন— “না, মাসিমা আর পালাব না।” এরপর যামিনীর মায়ের শেষ ইচ্ছাপূরণের লক্ষ্যে নিরঞ্জনরূপী কথক যামিনীকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন— “আমি তোমায় কথা দিচ্ছি মাসিমা। আমার কথার নড়চড় হবে না।”

৪. “আপনার আসল উদ্দেশ্য আপনি নিশ্চয় বিস্মৃত হবেন না।”— আসল উদ্দেশ্য কী? সেই উদ্দেশ্য সাধনে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি কী করলেন?

মান: ২+৩=৫

উত্তর: প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটি প্রেমেন্দ্র মিত্র রচিত ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্প থেকে সংকলিত। আলোচ্য গল্পে গল্পকথকের আসল উদ্দেশ্য ছিল মৎস্যশিকার। পৃথিবীর সরলতম মাছেদের বঁড়শিবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যেই উদ্দিষ্ট ব্যক্তির তেলেনাপোতায় আগমন।

তেলেনাপোতার ভগ্ন অট্টালিকায় রাত্রিযাপনের পর ‘ষোড়শোপাচার আয়োজন’ নিয়ে গল্পকথক শ্যাওলা-ঢাকা ভাঙা ঘাটের একপাশে গিয়ে বসেন। তারপর ‘যথোচিত নৈবেদ্য’ সমেত বঁড়শি জলে নামিয়ে দেন এবং পরম ধৈর্যের সাথে মাছেদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

বেলা ক্রমশ বাড়তে থাকে কিন্তু উদ্দিষ্ট ব্যক্তি মাছ ধরতে সক্ষম হন না। তাঁর অবস্থা দেখে মাছরাঙা পাখিও যেন বিদ্রূপের হাসি হাসতে থাকে। একজোড়া ফড়িংয়ের ফাতনার ওপর বসার প্রতিযোগিতা এবং বনের ঘুঘুর একঘেয়ে ডাক কথককে আনমনা করে তোলে। ঠিক সেই সময় নিথর জলের ছলাৎ শব্দে কথক দেখেন একটি মেয়ে পিতলের কলশিতে জল ভরছে। কলশি নিয়ে ঘাটের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে মেয়েটি হঠাৎ বলে— “বসে আছেন কেন? টান দিন।” কিন্তু আকস্মিক এই বাক্যে কথক চমকে উঠে সঠিক সময়ে ছিপে টান দিতে ভুলে যান। পরে ছিপ তুলে দেখেন বঁড়শির টোপ উধাও। শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ ও বিভ্রান্ত হয়ে তিনি মৎস্যশিকারের সাজসরঞ্জাম গুটিয়ে উঠে পড়েন।

৫. ‘মনে হবে তেলেনাপোতা বলে কোথাও কিছু সত্যি নেই’— একথা কার, কখন মনে হবে? এই মনে হবার কারণ কী?

মান: ২+৩=৫

উত্তর: উদ্ধৃত অংশটি প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্প থেকে গৃহীত। গল্পের প্রধান পুরুষ চরিত্র অর্থাৎ গল্পকথকের একথা মনে হবে। তেলেনাপোতা থেকে ফিরে দীর্ঘ ম্যালেরিয়া রোগভোগের পর আরোগ্য লাভের প্রাক্কালে কথকের কাছে তেলেনাপোতার স্মৃতি নিতান্তই অস্পষ্ট মনে হবে।

মনে হওয়ার কারণ: বহু বছর পূর্বে মহামারীর প্রকোপে তেলেনাপোতা গ্রামটি ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছিল। শহুরে তিন যুবকের অভিযানের মধ্য দিয়ে সেই মৃতপ্রায় তেলেনাপোতার ক্ষণিক পুনরুজ্জীবন ঘটে। আবেগতাড়িত হয়ে কথক যামিনীর দৃষ্টিহীন বৃদ্ধা মাকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন যামিনীকে বিয়ে করে নতুন জীবন দেওয়ার।

কিন্তু কলকাতায় প্রত্যাবর্তনের পরেই কথক তীব্র ম্যালেরিয়ায় শয্যাশায়ী হন। দীর্ঘ রোগভোগের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তিতে তাঁর মনের অনেক রোমান্টিক ভাবাবেগ ধুয়ে-মুছে যায়। মহানগরের রূঢ় বাস্তব ও দৈনন্দিন ব্যস্ততার ভিড়ে তেলেনাপোতার স্মৃতি ‘অস্ত যাওয়া তারার মতো’ ক্ষীণ হয়ে মিলিয়ে যায়। যে যামিনীকে তিনি একদা নতুন জীবনের আলো দেখিয়েছিলেন, শহুরে যুক্তিবাদী মনের কাছে সে নিতান্তই এক ‘দুর্বল মুহূর্তের অবাস্তব কুয়াশার কল্পনা’য় পর্যবসিত হয়। ফলে বাস্তব জীবনের দ্বন্দ্বে তেলেনাপোতার অস্তিত্বই তাঁর কাছে স্বপ্ন বলে প্রতীয়মান হয়।

৬. ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পটি আসলে আত্ম-আবিষ্কারের গল্প— বিষয়বস্তুর নিরিখে বক্তব্যটি ব্যাখ্যা করো।

মান: ৫

ভূমিকা: প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পে কেবল একটি অচেনা ভৌগোলিক স্থান আবিষ্কারের চেয়েও মানুষের নিজের অন্তর্লোক বা অন্তরের সত্য আবিষ্কারের দিকটি প্রধান হয়ে উঠেছে।

নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা ও একঘেয়েমি কাটাতে কথক দুই সঙ্গীকে নিয়ে তেলেনাপোতায় যান। সেখানে এক জীর্ণ অট্টালিকায় আশ্রয় নিয়ে তিনি যামিনী ও তার অন্ধ মায়ের সংস্পর্শে আসেন। মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধা কথককে নিরঞ্জন ভেবে মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চান। তাঁর সেই করুণ আকুলতা দেখে সংবেদনশীল কথক সত্য প্রকাশ না করে নিজেকে নিরঞ্জন বলে মেনে নেন এবং যামিনীকে বিয়ে করার আশ্বাস দেন।

এতে কথকের অন্তরের গভীর মানবিকতা, সহানুভূতি ও পরোপকারী সত্তা প্রকাশ পায়, যার সঙ্গে তিনি নাগরিক জীবনে হয়তো পরিচিত ছিলেন না। নিস্তব্ধ তেলেনাপোতার পরিবেশ তাঁর ভেতরের এই কোমল দরদি মানুষটিকে জাগিয়ে তোলে।

কিন্তু শহরে ফিরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর কথকের সেই আবেগ ক্রমে ম্লান হয়ে যায়। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় তেলেনাপোতার স্মৃতি ও যামিনীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ঝাপসা হয়ে ওঠে। সাময়িক আবেগ স্থায়ী দায়িত্ববোধে পরিণত হতে পারে না।

মূল্যায়ন: এভাবে কথক আবিষ্কার করেন, তাঁর অন্তরে যেমন এক মুহূর্তের গভীর মানবিক দরদ রয়েছে, তেমনই রয়েছে বাস্তব জীবনের চাপে সেই সহৃদয় প্রতিশ্রুতি ভুলে যাওয়ার দুর্বলতাও। তাই গল্পটি শুধুমাত্র একটি প্রাচীন জনপদের নয়, বরং মানুষের আত্মপরিচয় ও মানসিক দোলাচলের গভীর আত্ম-আবিষ্কারের গল্প।

৭. “তাহলে হঠাৎ একদিন তেলেনাপোতা আপনিও আবিষ্কার করতে পারেন।”— তেলেনাপোতা আবিষ্কারের শর্তগুলি উল্লেখ করো। গল্পের নায়ক কীভাবে তেলেনাপোতা আবিষ্কারে সমর্থ হয়েছিল লেখো।

মান: ৩+২=৫

তেলেনাপোতা আবিষ্কারের শর্তাবলি: গল্পের শুরুতে লেখক পাঠককে সরাসরি সম্বোধন করে আবিষ্কারের কয়েকটি অনিবার্য শর্তের কথা বলেছেন—

  1. দিনটি হতে হবে সপ্তাহের কোনো শনি অথবা মঙ্গলবার।
  2. কাজের ব্যস্ততার মাঝে হঠাৎ দু-দিনের অবসর মিলতে হবে এবং মাছ ধরার প্রতি উদগ্র আকর্ষণ থাকতে হবে।
  3. সঙ্গে থাকতে হবে এমন দুজন সঙ্গী—যাদের একজন মদ্যপানে আসক্ত (পানরসিক) এবং অন্যজন কেবল ঘুমে মগ্ন (নিদ্রাবিলাসী)।
  4. বিকেলবেলা ভিড়ে ঠাসা বাসে উঠে ভাদ্রমাসের অসহ্য গরমে ঘণ্টা দুয়েক ঝাঁকুনি সহ্য করে পথের মাঝে এক অচেনা জায়গায় নামতে হবে।
  5. এরপর স্যাঁতসেঁতে জলাভূমি পেরিয়ে একটি সংকীর্ণ গরুর গাড়িতে চেপে অন্ধকারে ঢাকা নির্জন পথে এগোতে হবে।

নায়কের আবিষ্কার বৃত্তান্ত: শহরের একঘেয়ে জীবনে হাঁপিয়ে ওঠা কথক এই শর্তগুলি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেই দুই সঙ্গীকে নিয়ে বাসে ও পরে গরুর গাড়িতে চেপে তেলেনাপোতায় পৌঁছান। সেখানে এক জীর্ণ অট্টালিকায় রাত কাটাতে গিয়ে তিনি জানলায় রহস্যময় ছায়ামূর্তি দেখেন এবং যামিনী ও তার অন্ধ মায়ের সংস্পর্শে আসেন। বৃদ্ধার বিশ্বাস রক্ষা করতে নিরঞ্জন সেজে তিনি যামিনীকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেন। এভাবেই একটি ভৌগোলিক জনপদের পাশাপাশি মানব হৃদয়ের অবহেলিত করুণ বাস্তবতাও তাঁর কাছে আবিষ্কৃত হয়।

৮. “ছাদে গিয়ে দেখবেন।”— উদ্দিষ্ট ব্যক্তি ছাদে গিয়ে কী দেখতে পাবেন? ছাদের দৃশ্যটি বর্ণনা দাও।

মান: ৩+২=৫

প্রসঙ্গ: প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পে তেলেনাপোতায় এসে কথক ও তাঁর সঙ্গীরা এক জরাজীর্ণ অট্টালিকায় রাত কাটান। ঘরের ভ্যাপসা গরম ও চামচিকার উপদ্রবে অস্বস্তি বোধ করে কথক টর্চ হাতে ছাদে ওঠেন। সেই ছাদের দৃশ্যই লেখক পাঠককে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন।

যা দেখা যাবে: ছাদের অধিকাংশ আলিসা ভেঙে পড়েছে এবং ফাটলে ফাটলে বট-অশ্বত্থের চারা শিকড় চালিয়ে বাড়িটির ধ্বংস ত্বরান্বিত করছে। কৃষ্ণপক্ষের ক্ষীণ চাঁদের আলোয় সেই ভগ্ন ছাদকে রূপকথার কোনো সুপ্ত মায়াপুরীর রাজপ্রাসাদ বলে মনে হয়।

ছাদের রূপ ও দৃশ্য: চারদিকের নিস্তব্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে কথকের মনে হয়, অট্টালিকার কোনো এক গোপন প্রকোষ্ঠে বন্দিনী রাজকুমারী সোনার-রুপোর কাঠি পাশে নিয়ে যুগ যুগ ধরে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে আছে। ঠিক তখনই অদূরে রাস্তার ওপারে একটি ধ্বংসপ্রায় বাড়ির জানলায় ক্ষীণ আলোর রেখা ফুটে ওঠে। সেই আলো আড়াল করে একটি রহস্যময় ছায়ামূর্তি এসে দাঁড়ায় এবং ক্ষণকালের মধ্যেই মিলিয়ে যায়। মনে হয়, যেন ধ্বংসপুরীর অতল নিদ্রা থেকে একটি স্বপ্নের বুদ্বুদ জেগে উঠে আবার মিলিয়ে গেল।

তাৎপর্য: বাস্তব ধ্বংসস্তূপের সঙ্গে রোমান্টিক কল্পনার এই মেলবন্ধনে তেলেনাপোতার নির্জনতা ও রহস্যময়তা জীবন্ত হয়ে ওঠে, যা যামিনীর সাথে পরবর্তী সাক্ষাতের পটভূমি নির্মাণ করে।

৯. “অস্ত যাওয়া তারার মতো তেলেনাপোতার স্মৃতি আপনার কাছে ঝাপসা একটা স্বপ্ন বলে মনে হবে।”— পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে গল্পকারের এমন মন্তব্যের কারণ পরিস্ফুট করো।

মান: ৫

পরিস্থিতি: তেলেনাপোতা থেকে শহরে ফিরে আসার পরও কথকের অন্তরে সেই নির্জন জরাজীর্ণ অট্টালিকা, যামিনীর বিষণ্ণ মুখ ও তার অন্ধ মাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির স্মৃতি উজ্জ্বল তারার মতো জ্বলজ্বল করছিল। তিনি সেখানে পুনরায় ফিরে যাওয়ার সংকল্প করছিলেন। ঠিক সেই সময় ১০৫ ডিগ্রি তীব্র ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কথক শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।

মন্তব্যের কারণ: দীর্ঘ রোগভোগের পর রোগমুক্ত হয়ে কথক অনুভব করেন যে, অসুস্থতা তাঁর মনের রোমান্টিক আবেগ ও সংবেদনশীলতাকে সম্পূর্ণভাবে মুছে দিয়েছে। শহরের কর্মব্যস্ত, স্বার্থপর ও যুক্তিনির্ভর জীবনে ফিরে তেলেনাপোতার ভাঙা বাড়ি, যামিনীর নীরব আকুলতা সবই তাঁর কাছে অতিবাস্তব কুয়াশাচ্ছন্ন কল্পনা মনে হতে থাকে।

অস্ত যাওয়া তারার আলো যেমন ধীরে ধীরে মহাকাশে বিলীন হয়ে যায়, কথকের হৃদয় থেকেও তেলেনাপোতার স্মৃতি ঠিক সেভাবেই ম্লান হয়ে মিলিয়ে যায়। যে আবেগ ক্ষণিকের জন্য তাঁকে আলোড়িত করেছিল, দৈনন্দিন বাস্তবতার চাপে তা নিছক স্বপ্নের বিভ্রম বলে মনে হয়। ফলে যামিনীর কাছে ফিরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষার কোনো তাগিদ তিনি আর অনুভব করেন না। এই গভীর জীবনসত্য ও মানবিক সীমাবদ্ধতা বোঝাতেই গল্পকার এমন মন্তব্য করেছেন।

১০. যে-বাড়িতে গল্পের চরিত্ররা রাতের জন্য আশ্রয় নেয়, সেই বাড়ির বর্ণনা দাও।

মান: ৫

ভূমিকা: প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পে কথক ও তাঁর দুই সঙ্গী রাতের আশ্রয়ের জন্য তেলেনাপোতার এক প্রাচীন, সুবিশাল ও জরাজীর্ণ অট্টালিকায় ওঠেন।

বাইরের রূপ: অর্ধস্ফুট চাঁদের আলোয় বাড়িটিকে মনে হচ্ছিল মধ্যযুগীয় দুর্গের মতো দণ্ডায়মান। তার চারপাশের প্রাচীর ছিল ধসে পড়া, ছাদ ভাঙা এবং পাল্লাহীন জানালাগুলি শূন্য অন্ধ কোটরের মতো দৃশ্যমান ছিল। বাড়িটির বিশাল কাঠামো প্রমাণ করে যে, এককালে এটি কোনো ধনী পরিবারের বাসস্থান ছিল। বাড়ির পাশের মজা পুকুর থেকে পানা-পচা জলের ভ্যাপসা দুর্গন্ধ চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল।

ভেতরের অবস্থা: যে ঘরে তাঁরা আশ্রয় নেন, সেটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত ও ধূলিধূসরিত। ঝুল, জঞ্জাল ও পলেস্তারা খসে পড়া দেয়ালে ঘরটি ছিল ভূতুড়ে। মেঝের স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতা আর বাতাসে বদ্ধ ভ্যাপসা গন্ধ এক শ্বাসরোধী পরিবেশ তৈরি করেছিল। ঘরের পুরোনো বাসিন্দা চামচিকা ও বাদুড়ের দল আগন্তুকদের উপস্থিতিতে ক্রমাগত ডানা ঝাপটে নিস্তব্ধ রাতকে ভয়াবহ করে তুলছিল। ছাদের আলিসা ভেঙে পড়ে ফাটল দিয়ে বটের শিকড় বাড়িটির বক্ষ বিদীর্ণ করছিল।

সারসংক্ষেপ: সামগ্রিকভাবে অট্টালিকাটি অতীত ঐশ্বর্যের এক করুণ কঙ্কাল এবং তেলেনাপোতার মৃত্যুপুরী রূপটির প্রতীকী প্রতিচ্ছবি।

Your Cart

error: Content is protected !!
Scroll to Top