তিমিরহননের গান
জীবনানন্দ দাশ
উৎস
আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশের ‘তিমিরহননের গান’ কবিতাটি তাঁর ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর, দাঙ্গা ও সমাজের অবক্ষয়ের পটভূমিতে কবিতাটি লেখা। এতে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, মধ্যবিত্তের মানসিক অসাড়তা এবং অন্ধকার কাটিয়ে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে।
সারসংক্ষেপ
কবিতায় কবি অতীতের আনন্দময় জীবনের সঙ্গে বর্তমানের অবক্ষয়ী জীবনের তুলনা করেছেন। একসময় মানুষ প্রকৃতির কোলে পরস্পরের সঙ্গে মিশে ভালোবেসে জীবনকে চিনে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু আজ সেই জীবনরীতি মৃতের চোখের মতো প্রাণহীন হয়ে পড়েছে।
যুদ্ধ, মন্বন্তর ও দারিদ্র্যে অসহায় মানুষ লঙ্গরখানার অন্নের আশায় ঘুরছে। নর্দমা, ওভারব্রিজ আর ফুটপাতই তাদের ঠিকানা। অথচ মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিজেদের মোহের জগতে বেদনাহীন হয়ে দিন কাটাচ্ছে। এই বৈষম্য ও উদাসীনতা কবিকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
তবু কবি হতাশ হননি। আত্মজিজ্ঞাসার সুরে প্রশ্ন তুলেছেন, অন্ধকার দূর করতে এগিয়েও আমরা কি আসলে অন্ধকারেই আরাম খুঁজছি? শেষে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, আমরা ‘তিমিরবিলাসী’ নই, ‘তিমিরবিনাশী’ হতে চাই।
নামকরণ
‘তিমির’ মানে অন্ধকার, ‘হনন’ মানে বিনাশ। তাই ‘তিমিরহননের গান’ মানে অন্ধকার বিনাশের গান।
এই কবিতায় অন্ধকার কেবল রাতের অন্ধকার নয়। যুদ্ধ, মন্বন্তর, দারিদ্র্য, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও মধ্যবিত্তের উদাসীনতাই এখানে অন্ধকারের প্রতীক। কবি এই অন্ধকার মেনে নিতে চাননি। কবিতার শেষে তাঁর দৃপ্ত ঘোষণা—
আমরা তো তিমিরবিনাশী।”
এই সংকল্পের মধ্য দিয়েই অন্ধকার দূর করে মানবিক সমাজ গড়ার আশা ফুটে উঠেছে। কবিতার মূল ভাবের সঙ্গে নামটি সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ, তাই নামকরণ সার্থক।
পঙ্ক্তি বিশ্লেষণ
কবিতাটি তিন ভাগে পড়লে সহজ হবে
তিমিরহননের গান কবিতাটি ১৯৪৩-এর মন্বন্তর ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের। কবি বলছেন, একসময় মানুষের জীবনে ভালোবাসা, আনন্দ ও বিশ্বাস ছিল, আজ তা নিষ্প্রাণ। চারপাশে অনাহারী মানুষ, আর আমরা মধ্যবিত্তরা নিজের জগতে অসাড় হয়ে আছি। তবু শেষে কবি অন্ধকার বিনাশের সংকল্প করেছেন।
“কোনো হ্রদে / কোথাও নদীর ঢেউয়ে / কোনো এক সমুদ্রের জলে”
কবি নির্দিষ্ট কোনো জায়গার নাম বলেননি। ‘কোনো’, ‘কোথাও’, ‘কোনো এক’ বলায় স্থানটা অনির্দিষ্ট থাকে। এতে বোঝা যায়, কথাটা সমগ্র মানবজাতির অতীতের। জল এখানে প্রকৃতির বিস্তার ও প্রাণের প্রতীক।
“পরস্পরের সাথে দু-দণ্ড জলের মতো মিশে”
‘দণ্ড’ প্রাচীন সময়ের মাপ, প্রায় ২৪ মিনিট। ‘দু-দণ্ড’ মানে অল্প সময়। জলে জল যেমন কোনো ভেদ না রেখে মিশে যায়, মানুষও তেমন নিবিড়ভাবে মিশেছিল। মিলনটা ক্ষণিকের হলেও আন্তরিক।
“সেই এক ভোরবেলা শতাব্দীর সূর্যের নিকটে”
ভোরবেলা মানে নতুন শুরু ও আশার সময়। ‘শতাব্দীর সূর্য’ বলতে একটি যুগের আলো বা সভ্যতার জ্ঞান ও আদর্শকে বোঝানো হয়েছে।
“আমাদের জীবনের আলোড়ন—
হয়তো বা জীবনকে শিখে নিতে চেয়েছিলো।”
‘আলোড়ন’ মানে আবেগের তোলপাড়। তখন মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজছিল, জীবনকে শিখে নিতে চাইছিল। ‘হয়তো বা’ শব্দে কবির সংশয় ধরা পড়ে। অতীতের স্মৃতিও আজ তাঁর কাছে আবছা।
“অন্য এক আকাশের মতো চোখ নিয়ে
আমরা হেসেছি, আমরা খেলেছি;”
‘আকাশের মতো চোখ’ মানে উদার, নির্মল ও সংকীর্ণতাহীন দৃষ্টি। ‘অন্য এক’ বলায় বোঝা যায়, সেটা আজকের মতো মলিন আকাশ নয়। আনন্দময় এক ভিন্ন জীবনের ছবি এখানে আছে।
“স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই ভেবে
একদিন ভালোবেসে গেছি।”
‘উত্তরাধিকার’ মানে পূর্বপুরুষদের দেওয়া ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ। ‘গ্লানি’ মানে কলঙ্ক বা অশুদ্ধতা। মানুষ ভেবেছিল, সেই ঐতিহ্য নিষ্কলঙ্ক, তাই বিশ্বাস নিয়ে ভালোবেসেছিল। ‘ভেবে’ শব্দটা লক্ষ করো। ভাবনাটা যে ভুলও হতে পারে, কবি তা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন।
“সেই সব রীতি আজ মৃতের চোখের মতো তবু—
তারার আলোর দিকে চেয়ে নিরালোক।”
এটি উপমা: ‘রীতি’ = জীবনের আদর্শ ও আচরণ, ‘মৃতের চোখ’ = প্রাণহীন, দৃষ্টিহীন। তারার আলো থাকলেও মৃতের চোখে তা ঢোকে না। অর্থাৎ আশার আলো আছে, কিন্তু তা গ্রহণ করার প্রাণশক্তি আমাদের নেই।
“হেমন্তের প্রান্তরের তারার আলোক।”
হেমন্ত ঝরার ও শুকিয়ে যাওয়ার ঋতু। ফাঁকা প্রান্তরের তারার আলো দূরের, ঠান্ডা ও ক্ষীণ। আশা আছে, কিন্তু অনেক দূরে।
“সেই জের টেনে আজো খেলি।”
‘জের’ মানে রেশ বা ধারা। অতীতের আনন্দের রেশ ধরে আমরা আজও জীবনের ‘খেলা’ চালিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু আসল প্রাণ নেই। এখানে খেলা মানে অভ্যাসবশে বেঁচে থাকা।
“সূর্যালোক নেই—তবু—
সূর্যালোক মনোরম মনে হ’লে হাসি।”
সত্যিকারের আলো বা আনন্দ নেই। তবু মনে হলে যে আছে, আমরা হাসি। এটা আত্মপ্রবঞ্চনা, নিজেকে ভোলানো।
“স্বতই বিমর্ষ হ’য়ে ভদ্র সাধারণ
চেয়ে দ্যাখে তবু সেই বিষাদের চেয়ে
আরো বেশি কালো-কালো ছায়া”
‘স্বতই’ মানে স্বভাবতই। ‘বিমর্ষ’ মানে মনমরা। ‘ভদ্র সাধারণ’ মানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষ। তারা দুঃখ তো দেখছেই, তার চেয়েও গভীর অন্ধকার দেখছে, অর্থাৎ ভবিষ্যতের আরও বড় সংকটের ছায়া।
“লঙ্গরখানার অন্ন খেয়ে”
‘লঙ্গরখানা’ মানে দুর্ভিক্ষে বিনামূল্যে খাবার বিলির কেন্দ্র। ১৯৪৩-এর মন্বন্তরে কলকাতার পথে এমন দৃশ্য ছিল।
“মধ্যবিত্ত মানুষের বেদনার নিরাশার হিসেব ডিঙিয়ে”
‘ডিঙিয়ে’ মানে পেরিয়ে। এই মানুষদের কষ্ট এত বেশি যে মধ্যবিত্তের দুঃখ-হতাশার মাপে তাদের ধরা যায় না। তাদের বেদনা সেই হিসেবের অনেক ওপরে।
“নর্দমার থেকে শূন্য ওভারব্রিজে উঠে
নর্দমায় নেমে—
ফুটপাত থেকে দূর নিরুত্তর ফুটপাতে গিয়ে”
এই মানুষদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। তারা নর্দমা থেকে ওভারব্রিজে, আবার নর্দমায়, এক ফুটপাত থেকে আরেক ফুটপাতে ঘুরে বেড়ায়। ‘শূন্য’ মানে জনহীন ও লক্ষ্যহীন। ‘নিরুত্তর’ ফুটপাত মানে যেখানে কেউ সাড়া দেয় না। সমাজের উদাসীনতা এখানে ধরা পড়েছে।
“নক্ষত্রের জ্যোৎস্নায় ঘুমাতে বা ম’রে যেতে জানে।”
খোলা আকাশের নিচে তারার আলোয় তারা ঘুমোয় অথবা মারা যায়। ঘুম আর মৃত্যু এখানে প্রায় এক হয়ে গেছে। ‘জানে’ শব্দে বোঝা যায়, তারা এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, যা আরও করুণ।
“এরা সব এই পথে;
ওরা সব ওই পথে— তবু”
‘এরা’ হলো ওই ছিন্নমূল, ক্ষুধার্ত মানুষ। ‘ওরা’ হলো ভিন্ন পথের মানুষ, অর্থাৎ মধ্যবিত্ত বা তুলনামূলক স্বচ্ছল শ্রেণি। ‘তবু’ শব্দটি দুই বাস্তবতার বৈপরীত্য দেখায়।
“মধ্যবিত্তমদির জগতে
আমরা বেদনাহীন-অন্তহীন বেদনার পথে।”
‘মদির’ মানে মোহাচ্ছন্ন। মধ্যবিত্ত নিজেদের জগতে মোহগ্রস্ত হয়ে আপাতভাবে ‘বেদনাহীন’। অথচ আসলে তারা ‘অন্তহীন বেদনার পথে’। এটি বিরোধাভাস অলংকার: বেদনা অনুভব না করাটাই আসল বেদনা, কারণ সংবেদনশীলতা মরে গেছে। এই পঙ্ক্তিতে ‘আমরা’ বলে কবি নিজেকেও দোষের বাইরে রাখেননি।
“কিছু নেই— তবু এই জের টেনে খেলি;
সূর্যালোক প্রজ্ঞাময় মনে হ’লে হাসি;”
‘কিছু নেই’ মানে আসল আদর্শ ও আলো নেই। তবু আমরা জীবনের জের টানি। আগে ছিল ‘মনোরম’, এখানে ‘প্রজ্ঞাময়’। ‘প্রজ্ঞা’ মানে গভীর জ্ঞান। মধ্যবিত্ত নিজেকে জ্ঞানী ও আলোকিত ভেবে তৃপ্ত থাকে, যদিও ভেতরে ফাঁকা।
“জীবিত বা মৃত রমণীর মতো ভেবে—অন্ধকারে—
মহানগরীর মৃগনাভি ভালোবাসি।”
‘মৃগনাভি’ মানে কস্তুরী, তীব্র ও মোহময় সুগন্ধ। মহানগরীর আকর্ষণ আমাদের টানে, যদিও তাকে জীবিত না মৃত বোঝা যায় না। ‘অন্ধকারে’ বলায় বোঝা যায়, এই মোহ অন্ধকারের ভেতরেই। শহরের অবক্ষয় জেনেও আমরা তার মোহ কাটাতে পারি না।
“তিমিরহননে তবু অগ্রসর হ’য়ে
আমরা কি তিমিরবিলাসী?”
‘তিমির’ মানে অন্ধকার, ‘হনন’ মানে বিনাশ, ‘বিলাসী’ মানে যে আরাম পায়। কবি নিজেদের প্রশ্ন করছেন: অন্ধকার বিনাশের পথে এগোতে চাইছি, অথচ কাজে কি আমরা অন্ধকারেই আরাম খুঁজছি? এই প্রশ্নে তীব্র আত্মসমালোচনা আছে।
“আমরা তো তিমিরবিনাশী
হ’তে চাই।
আমরা তো তিমিরবিনাশী।”
এই উত্তরে আছে দৃঢ় সংকল্প। ‘বিনাশী’ মানে যে বিনাশ করে। প্রথমবার বলা হয়েছে ‘হতে চাই’, অর্থাৎ আকাঙ্ক্ষা। শেষবার বলা হয়েছে ‘আমরা তো তিমিরবিনাশী’, অর্থাৎ ঘোষণা। একই কথার পুনরাবৃত্তিতে কবির আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। হতাশার মধ্যেও কবিতাটি আশাবাদে শেষ হয়েছে।
প্রশ্নোত্তর
প্রশ্নে ট্যাপ করলে উত্তর খুলবে
১‘তিমিরহননের গান’ কবিতায় সমাজ ও সভ্যতার অবক্ষয়ের চিত্র কীভাবে কবির ব্যক্তিগত জীবনযন্ত্রণার সঙ্গে মিশে গেছে, আলোচনা করো। ৫ নম্বর
জীবনানন্দ দাশের ‘তিমিরহননের গান’ কবিতায় সমাজের অবক্ষয় ও কবির ব্যক্তিগত বেদনা এক হয়ে মিশে গেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, দাঙ্গা ও মূল্যবোধের পতনে তখনকার জনজীবন বিপর্যস্ত। কবি দেখেছেন, অসহায় মানুষ লঙ্গরখানায় অন্ন খুঁজছে, নর্দমা-ওভারব্রিজ-ফুটপাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই দৃশ্য তাঁর সংবেদনশীল মনকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছে।
অন্যদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আত্মকেন্দ্রিকতা ও অসাড়তা তাঁকে আরও ব্যথিত করেছে, কারণ কবি নিজেও এই শ্রেণিরই একজন। অতীতের ভালোবাসা ও আনন্দের সঙ্গে বর্তমানের নিষ্ঠুর বাস্তবতা মিলিয়ে তিনি সমাজের গভীর সংকট অনুভব করেছেন।
এভাবে সমাজের যন্ত্রণা কবির অন্তরের যন্ত্রণা হয়ে উঠেছে এবং তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি সমগ্র মানবসমাজের বেদনার প্রকাশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২‘তিমিরহননের গান’ কবিতার নামকরণের সার্থকতা বিচার করো। ৫ নম্বর
‘তিমির’ মানে অন্ধকার, ‘হনন’ মানে বিনাশ। তাই ‘তিমিরহননের গান’ হলো অন্ধকার দূর করার সংকল্পের গান।
কবিতায় কবি যুদ্ধ, মন্বন্তর, দারিদ্র্য ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ে জর্জরিত সমাজের ছবি এঁকেছেন। একদিকে অসহায় মানুষ লঙ্গরখানায় অন্ন খুঁজছে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তের একাংশ নিজেদের স্বার্থের জগতে ডুবে আছে। অতীতের ভালোবাসার রীতিগুলি আজ মৃতের চোখের মতো নিষ্প্রভ।
তবু কবি হতাশার কাছে হার মানেননি। অন্ধকারের সঙ্গে আপস করার প্রবণতাকে তিনি প্রশ্ন করেছেন এবং শেষে ঘোষণা করেছেন—“আমরা তো তিমিরবিনাশী হ’তে চাই।” এই ঘোষণায় অন্ধকার কাটিয়ে আলোয় পৌঁছানোর আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। কবিতার মূল বক্তব্যের সঙ্গে নামটি পুরোপুরি মিলে যায়, তাই নামকরণ সার্থক।
৩মানবজীবনের বেদনা ও আশার দ্বান্দ্বিক চিত্র ‘তিমিরহননের গান’ কবিতায় কীভাবে ফুটে উঠেছে, আলোচনা করো। ৫ নম্বর
‘তিমিরহননের গান’ কবিতায় একদিকে মানবজীবনের গভীর বেদনা, অন্যদিকে অন্ধকার জয় করার আশা, এই দুইয়ের দ্বন্দ্ব ফুটে উঠেছে।
বেদনার চিত্র: অতীতে মানুষ প্রকৃতির সান্নিধ্যে ভালোবাসা ও আনন্দের মধ্য দিয়ে জীবনকে চিনতে চেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ, মন্বন্তর ও অবক্ষয়ে সেই আনন্দ হারিয়ে গেছে। অসহায় মানুষ লঙ্গরখানায় অন্ন খুঁজছে, ফুটপাতে আশ্রয় নিচ্ছে। আবার মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিজেদের জগতে বেদনাহীনভাবে দিন কাটাচ্ছে।
আশার চিত্র: এত হতাশার মধ্যেও কবি অন্ধকারকে মেনে নেননি। আত্মজিজ্ঞাসার মাধ্যমে তিনি মানুষের নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে উঠতে চেয়েছেন। ‘তিমিরবিনাশী’ হওয়ার সংকল্পে আলোর প্রতি তাঁর অটুট বিশ্বাস প্রকাশ পেয়েছে।
এভাবে বেদনা ও আশার দ্বন্দ্বেই কবিতাটি গভীর তাৎপর্য পেয়েছে।
৪“তিমিরহননে তবু অগ্রসর হ’য়ে / আমরা কি তিমিরবিলাসী!”— কবির এই প্রশ্ন তোলার কারণ বিশ্লেষণ করো। ৫ নম্বর
কবির এই প্রশ্নে মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা ও মনের অসংগতি ধরা পড়েছে।
কবি অন্ধকার দূর করে সুন্দর, মানবিক সমাজ গড়তে চান। কিন্তু বাস্তবে তিনি দেখেছেন, অসহায় মানুষ দারিদ্র্য ও অনাহারে কষ্ট পাচ্ছে, অথচ মধ্যবিত্তের একাংশ নিজেদের আরাম ও স্বার্থে মগ্ন থেকে সেদিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।
‘তিমিরবিলাসী’ বলতে এমন মানুষকে বোঝানো হয়েছে, যারা অন্ধকারেই নিষ্ক্রিয়ভাবে থাকতে অভ্যস্ত। অন্ধকার কাটানোর কথা বললেও কাজে যদি কিছু না করা হয়, তাহলে কথা ও আচরণে বিরোধ থেকে যায়।
এই আত্মপ্রবঞ্চনা অনুভব করেই কবি প্রশ্ন করেছেন, আমরা কি সত্যিই অন্ধকার বিনাশ চাই, নাকি অজান্তেই তাকে আঁকড়ে ধরে আছি? এভাবে তিনি নিজেকে ও সমাজকে আত্মসমালোচনায় এবং সক্রিয় হতে ডাক দিয়েছেন।
৫“কোনো হ্রদে কোথাও নদীর ঢেউয়ে কোনো এক সমুদ্রের জলে”— কী ঘটেছিল, তার বিবরণ দাও। ৫ নম্বর
উদ্ধৃত অংশে কবি অতীতের আনন্দময় ও ভালোবাসাপূর্ণ মানবজীবনের স্মৃতি তুলে ধরেছেন।
অতীতে কোনো হ্রদে, নদীর ঢেউয়ে বা সমুদ্রের জলে মানুষ পরস্পরের সঙ্গে দু-দণ্ড জলের মতো মিশে গিয়েছিল। প্রকৃতির সান্নিধ্যে এক ভোরবেলায়, শতাব্দীর সূর্যের কাছে তারা জীবনের আলোড়ন অনুভব করেছিল এবং জীবনকে শিখে নিতে চেয়েছিল।
তারা অন্য এক আকাশের মতো উদার চোখ নিয়ে হেসেছিল, খেলেছিল এবং কোনো গ্লানি নেই ভেবে নিশ্চিন্তে ভালোবেসেছিল। এতে মানুষের আন্তরিকতা ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের পরিচয় মেলে।
কিন্তু বর্তমানে সেই জীবনরীতি মৃতের চোখের মতো নিষ্প্রভ। তাই অতীতের স্মৃতি কবির মনে একই সঙ্গে আনন্দ ও গভীর আক্ষেপ জাগায়।
৬“স্মরণীয় উত্তরাধিকারে কোনো গ্লানি নেই ভেবে”— ‘স্মরণীয় উত্তরাধিকার’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? গ্লানির প্রসঙ্গ এসেছে কেন? ২+৩=৫
‘স্মরণীয় উত্তরাধিকার’: অতীত থেকে পাওয়া ভালোবাসা, আনন্দ, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের ঐতিহ্যকেই এখানে ‘স্মরণীয় উত্তরাধিকার’ বলা হয়েছে। এটি মানুষের জীবনের মূল্যবান আত্মিক সম্পদ।
গ্লানির প্রসঙ্গ: অতীতের এই সুন্দর ঐতিহ্যের ওপর ভরসা রেখে মানুষ ভেবেছিল, তার ভালোবাসা ও জীবনযাপনে কোনো কলঙ্ক বা গ্লানি নেই। কিন্তু যুদ্ধ, মন্বন্তর, দারিদ্র্য ও অবক্ষয় সেই বিশ্বাসকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। অতীতের আদর্শ ও বর্তমানের বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ফারাক তৈরি হয়েছে। এই ফারাক থেকেই গ্লানি ও বেদনার প্রসঙ্গ এসেছে।
৭“সেই জের টেনে আজো খেলি।”— কবি কোন খেলার কথা বলেছেন? উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। ২+৩=৫
খেলার পরিচয়: এখানে ‘খেলা’ বলতে অতীতের আনন্দময় জীবনের রেশ ধরে বর্তমানের প্রাণহীন জীবনযাপন চালিয়ে যাওয়াকে বোঝানো হয়েছে।
তাৎপর্য: একসময় মানুষের জীবনে ভালোবাসা, আনন্দ ও আশা ছিল। আজকের অবক্ষয়ী সমাজে তা প্রায় হারিয়ে গেছে। তবু অভ্যাসের বশে মানুষ সেই পুরোনো জীবনের জের টেনে চলেছে।
কবি বলেছেন, সূর্যের আলো নেই, তবু সূর্যালোক মনোরম মনে হলে মানুষ হাসে। অর্থাৎ বাস্তবতা আর অনুভূতির মধ্যে অমিল রয়েছে। এই জীবনযাপনে কবি শূন্যতা, ক্লান্তি ও আত্মপ্রবঞ্চনার ছবি এঁকেছেন।
৮“নর্দমার থেকে শূন্য ওভারব্রিজে উঠে ফুটপাত থেকে দূর নিরুত্তর ফুটপাতে গিয়ে / নর্দমায় নেমে—” কবি এখানে কোন জীবনের পরিচয় দিয়েছেন? এই জীবনের এমন পরিণতির কারণ কী? ২+৩=৫
জীবনের পরিচয়: কবি এখানে যুদ্ধ ও মন্বন্তরে বিধ্বস্ত কলকাতার নিঃস্ব, আশ্রয়হীন, ছিন্নমূল মানুষের দুর্দশাগ্রস্ত জীবনের ছবি এঁকেছেন।
পরিণতির কারণ:
- যুদ্ধ ও মন্বন্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ মন্বন্তরে বহু মানুষ খাদ্য ও কাজ হারিয়েছিল।
- দারিদ্র্য ও আশ্রয়হীনতা: অন্ন, কাজ ও বাসস্থানের অভাবে তারা পথেঘাটে, নর্দমা ও ফুটপাতের ধারে থাকতে বাধ্য হয়েছিল।
- সামাজিক বৈষম্য ও সহায়তার অভাব: তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো যথেষ্ট ব্যবস্থা ছিল না, ফলে সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।
নর্দমা থেকে ওভারব্রিজে, আবার ফুটপাত থেকে নর্দমায় ফিরে আসার ছবিতে এই মানুষগুলির অনিশ্চিত ও চক্রাকার দুর্দশার জীবন ফুটে উঠেছে।
৯“তবু মধ্যবিত্তমদির জগতে আমরা বেদনাহীন”— ‘মধ্যবিত্তমদির জগতে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? ‘বেদনাহীন’ শব্দটি কেন ব্যবহার করা হয়েছে? ২+৩=৫
‘মধ্যবিত্তমদির জগতে’র অর্থ: ‘মদির’ মানে নেশাগ্রস্ত বা মোহাচ্ছন্ন। ‘মধ্যবিত্তমদির জগৎ’ বলতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সেই আত্মকেন্দ্রিক, মোহগ্রস্ত জীবনকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে মানুষ নিজের স্বার্থ ও আরামের মধ্যেই ডুবে থাকে।
‘বেদনাহীন’ শব্দের ব্যবহার: একদিকে অসহায় মানুষ অন্নের জন্য ঘুরছে, ফুটপাতে রাত কাটাচ্ছে। অন্যদিকে মধ্যবিত্তের একাংশ নিজেদের জগতে মগ্ন থেকে সেই কষ্টের প্রতি উদাসীন। অন্যের দুঃখ তাদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে না।
এই সংবেদনশীলতার অভাব ও মানসিক অসাড়তা বোঝাতেই কবি ‘বেদনাহীন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এতে মধ্যবিত্ত সমাজের আত্মকেন্দ্রিকতা এবং চারপাশের অন্তহীন বেদনার প্রতি তার উদাসীনতা ধরা পড়ে।
১০“জীবিত বা মৃত রমণীর মতো ভেবে—অন্ধকারে—মহানগরীর মৃগনাভি ভালোবাসি।”— উদ্ধৃত পঙ্ক্তির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। ৫ নম্বর
এই পঙ্ক্তিতে কবি আধুনিক মহানগরীর প্রতি মানুষের জটিল আকর্ষণ ও মানসিক দ্বন্দ্বের পরিচয় দিয়েছেন।
‘জীবিত বা মৃত রমণীর মতো’ কথাটিতে সজীবতা ও নিষ্প্রাণতার এক অস্পষ্ট ছবি ফুটে উঠেছে। মহানগরীও তেমনই। একদিকে সে মানুষের চেনা জীবন ও অভ্যাসের কেন্দ্র, অন্যদিকে দারিদ্র্য, ক্লান্তি ও মানবিক সংকটের প্রতীক।
‘মৃগনাভি’ মানে কস্তুরী, যার গন্ধ তীব্র ও মোহময়। ‘মহানগরীর মৃগনাভি’ বলতে অন্ধকারে ঢাকা মহানগরীর রহস্যময় ও মোহময় আকর্ষণকে বোঝানো হয়েছে। শহরের অবক্ষয় ও সংকট জেনেও মানুষ সেই মোহ কাটাতে পারে না।
এভাবে কবি আধুনিক নাগরিক জীবনের জটিলতা ও মোহময়তাকে তুলে ধরেছেন।
১১‘তিমিরহননের গান’ কবিতাটি কোন্ প্রেক্ষাপটে লেখা? কবি কেন ‘তিমিরবিলাসী’ নন, ‘তিমিরবিনাশী’ হতে চেয়েছেন? ২+৩=৫
প্রেক্ষাপট: কবিতাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সমাজ ও নাগরিক জীবনের অবক্ষয়ের পটভূমিতে লেখা।
‘তিমিরবিনাশী’ হতে চাওয়ার কারণ: ‘তিমিরবিলাসী’ বলতে সেই মানুষদের বোঝায়, যারা অন্ধকার ও হতাশার মধ্যেই নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে। আর ‘তিমিরবিনাশী’ হলো তারা, যারা অন্ধকার দূর করে আলোর পথ তৈরি করতে চায়।
কবি দেখেছেন, সমাজে দারিদ্র্য, অনাহার ও মূল্যবোধের অবক্ষয় থাকা সত্ত্বেও মধ্যবিত্তের একাংশ নিজেদের স্বার্থে মগ্ন। এই নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতা দূর করে মানবিকতা ও নতুন চেতনা প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর লক্ষ্য। তাই তিনি অন্ধকারের সঙ্গে আপস না করে তাকে বিনাশ করতে চেয়েছেন।
১২“এরা সব এই পথে”— ‘এরা’ বলতে কারা? ‘এই পথে’ বলতে কোন্ পথ বোঝানো হয়েছে? ২+৩=৫
‘এরা’ কারা: ‘এরা’ বলতে লঙ্গরখানার অন্নের ওপর নির্ভরশীল, নিঃস্ব, আশ্রয়হীন ও ছিন্নমূল মানুষদের বোঝানো হয়েছে। যুদ্ধ ও মন্বন্তরে যারা চরম দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে, তারাই ‘এরা’।
‘এই পথে’ কোন পথ: ‘এই পথ’ বলতে সেই অসহায় মানুষদের দুর্দশাগ্রস্ত জীবনপথকে বোঝানো হয়েছে। তাদের জীবন নর্দমা থেকে ওভারব্রিজে, ফুটপাত থেকে ফুটপাতে, আবার নর্দমায় ঘুরে ঘুরে কাটে। কোনো স্থায়ী আশ্রয়, নিরাপত্তা বা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই।
এই পথের শেষে হয় নক্ষত্রের জ্যোৎস্নায় ঘুমিয়ে পড়া, নয়তো মৃত্যু। এই ছবির মাধ্যমে কবি দরিদ্র মানুষের অসহায়তা ও জীবনের অন্তহীন সংকট তুলে ধরেছেন।
১৩“এরা সব এই পথে; ওরা সব ওই পথে— তবু মধ্যবিত্তমদির জগতে আমরা বেদনাহীন”— ‘ওরা’ বলতে কারা? ‘তবু’ শব্দটির তাৎপর্য লেখো। ২+৩=৫
‘ওরা’ কারা: ‘এরা’ যেখানে ক্ষুধার্ত, ছিন্নমূল মানুষ, সেখানে ‘ওরা’ বলতে ভিন্ন পথের মানুষদের, অর্থাৎ তুলনামূলক স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে বোঝানো হয়েছে। এরা নিজেদের স্বার্থ ও অভ্যাসের জগতে আবদ্ধ থেকে সমাজের সংকট সম্পর্কে উদাসীন। তবে কবি পরের পঙ্ক্তিতে ‘আমরা’ বলে নিজেকেও এই শ্রেণির মধ্যে ধরেছেন, তাই এখানে আত্মসমালোচনাও রয়েছে।
‘তবু’ শব্দের তাৎপর্য: ‘তবু’ শব্দটি দুটি বিপরীত বাস্তবতাকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একদিকে দরিদ্র মানুষ অনিশ্চয়তা ও দুর্দশার মধ্যে বেঁচে আছে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তের একাংশ বেদনাহীনভাবে নিজেদের জগতে দিন কাটাচ্ছে।
চারপাশে এত কষ্ট থাকা সত্ত্বেও মধ্যবিত্তের এই উদাসীনতা কবিকে ব্যথিত করেছে। ‘তবু’ শব্দে তাঁর আত্মসমালোচনা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ফুটে উঠেছে।
✨ মূল বার্তা
হতাশা ও অন্ধকারের মধ্যেও কবি আত্মসমালোচনার পথ ধরে ‘তিমিরবিনাশী’ হওয়ার সংকল্পে পৌঁছেছেন।
বাংলা সহায়ক · banglasahayak.com
