প্রবন্ধ রচনা :
একটি গ্রামের আত্মকথা

আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে বাঁচাইয়াছে প্রাণ৷
মাঠ ভরা ধান তার জল ভরা দিঘি,
চাঁদের কিরণ লেগে করে ঝিকিমিকি৷”
– বন্দে আলী মিয়া
১. ভূমিকা :
আমি একটি গ্রাম। সুজলা-সুফলা, শস্যশ্যামলা ভারতবর্ষের বুকে আমার মতো অসংখ্য গ্রামের অবস্থান। আমি রূপসী বাংলার এক নিভৃত পল্লি। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর হলেও দারিদ্র্য, অবহেলা ও অনুন্নয়ন আজও আমার নিত্যসঙ্গী। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের ভাষায়—
“তুমি যাবে ভাই—যাবে মোর সাথে, আমাদের ছোট গাঁয়,
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়।”
২. জন্ম ও শৈশব :
আমার জন্ম বহু শতাব্দী আগে প্রকৃতির স্নেহময় কোলে। চারদিকে ছিল সবুজ ধানক্ষেত, নদী-খাল, কাঁচা মেঠোপথ আর পাখির কূজনে মুখর পরিবেশ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যথার্থই লিখেছেন—
“ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড়, ছোটো ছোটো গ্রামগুলি।”
৩. আমার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি :
লোকসংস্কৃতি, কীর্তন, বাউলগান, যাত্রাপালা, পৌষমেলা, নবান্ন ও দোলযাত্রার মতো উৎসব আমার প্রাণ। সহজ-সরল জীবনযাপন, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যই আমার প্রকৃত পরিচয়। বাংলার সংস্কৃতির শিকড় আজও আমার বুকেই প্রোথিত।
৪. মানবসভ্যতায় আমার অবদান :
আমি দেশের অন্নভাণ্ডার। আমার উর্বর মাটিতে উৎপন্ন শস্য, শাকসবজি, ফলমূল ও দুধ শহরের মানুষের জীবনধারণে সহায়তা করে। কৃষক, তাঁতি, কুমোর, কামারসহ অসংখ্য পরিশ্রমী মানুষের কর্মক্ষেত্র আমি। তাই দেশের অর্থনীতি ও সভ্যতার বিকাশে আমার অবদান অনস্বীকার্য।
৫. বর্তমান পরিবর্তন ও উন্নয়ন :
আজ আমার বুকে পাকা রাস্তা, বিদ্যুৎ, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইন্টারনেট ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রসার ঘটেছে। সরকারি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প আমার জীবনকে নতুন সম্ভাবনার পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তবু আরও উন্নত শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার অপেক্ষায় আছি।
৬. দুঃখ ও সংকট :
আধুনিকতার মোহে মানুষ আমাকে ভুলতে বসেছে। বৃক্ষনিধন, জলাশয় ভরাট, পরিবেশ দূষণ ও কর্মসংস্থানের অভাবে আমার যুবসমাজ শহরমুখী হচ্ছে। ফলে আমার প্রাণচাঞ্চল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে।
৭. আমার স্বপ্ন :
আমি চাই উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অটুট থাকুক। আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি ও শিল্পের প্রসারে আমার সন্তানরা যেন নিজ গ্রামেই সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে পারে। সবুজে ঘেরা, স্বনির্ভর ও সুখী গ্রাম হিসেবেই আমি আবার পরিচিত হতে চাই।
৮. উপসংহার :
আমি আধুনিকতার বিরোধী নই; আমি চাই উন্নয়নের আলো আমার প্রতিটি ঘরে পৌঁছাক। তবে সেই উন্নয়ন যেন প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস না করে। মানুষ যেন আবার মাটির টানে, শিকড়ের আহ্বানে আমার কাছে ফিরে আসে। সেই আশাতেই আমি আজও অপেক্ষা করে আছি—
“ফিরে চল মাটির টানে,
যে মাটি আঁচল পেতে কোল বাড়ায়।”
