অসুখী একজন- পাবলো নেরুদা | asukhi ekjon|মাধ্যমিক বাংলা | পদ্য | কবি পরিচিতি , অনুবাদক পরিচিতি , প্রাসঙ্গিক তথ্য , ইংরেজি ভাষায় , সরলার্থ | প্রশ্ন | BanglaSahayak.com

অসুখী একজন

-পাবলো নেরুদা ।

(মূল কবিতা)

আমি তাকে ছেড়ে দিলাম

অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রেখে দরজায়

আমি চলে গেলাম দূর… দূরে।

সে জানত না আমি আর কখনো ফিরে আসব না।

একটা কুকুর চলে গেল,হেঁটে গেল গির্জার এক নান

একটা সপ্তাহ আর একটা বছর কেটে গেল।

বৃষ্টিতে ধুয়ে দিল আমার পায়ের দাগ

ঘাস জন্মালো রাস্তায়

আট একটার পর একটা, পাথরের মতো

পর পর পাথরের মতো, বছরগুলো

নেমে এল তার মাথার ওপর।

তারপর যুদ্ধ এল

রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো।

শিশু আর বাড়িরা খুন হলো।

সেই মেয়েটির মৃত্যু হলো না।

সমস্ত সমতলে ধরে গেল আগুন

শান্ত হলুদ দেবতারা

যারা হাজার বছর ধরে

ডুবে ছিল ধ্যানে

উল্টে পড়ল মন্দির থেকে টুকরো টুকরো হয়ে

তারা আর স্বপ্ন দেখতে পারল না।

সেই মিষ্টি বাড়ি,সেই বারান্দা

যেখানে আমি ঝুলন্ত বিছানায় ঘুমিয়েছিলাম,

গোলাপি গাছ,ছড়ানো করতলের মতো পাতা

চিমনি,প্রাচীন জলতরঙ্গ

সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে।

যেখানে ছিল শহর

সেখানে ছড়িয়ে রইল কাঠকয়লা

দোমড়ানো লোহা,মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা

রক্তের একটা কালো দাগ।

আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়।

( ইংরেজি অনুবাদ )

The Unhappy One

-Pablo Neruda

I left her in the doorway waiting

and I went away, away,

She didn’t know I would not come back.

A dog passed, a nun passed,

a week and a year passed.

The rains washed out my footprints

and the grass grew in the street,

and one after another, like stones,

like gradual stones, the years

came down on her head.

Then the war came

like a volcano of blood.

Children and houses died.

And that woman didn’t die.

The whole plain caught fire.

The gentle yellow gods

who for a thousand years

had gone on meditating

were cast from the temple in pieces.

They could not go on dreaming.

The sweet homes, the veranda

where I slept in a hammock,

the rosy plants, the leaves

in the shape of huge hands,

the chimneys, the marimbas,

all were crushed and burned.

And where the city had been

only cinders were left,

twisted iron, grotesque

heads of dead statues

and a black stain of blood.

And that woman waiting.

কবি পরিচিত:

পাবলো নেরুদা ছিলেন একজন চিলিয়ান কবি ও রাজনীতিবিদ। তাঁর জন্ম চিলির সীমান্ত শহর পারলেতে ১৯০৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নেকতালি রিকার্দো রেয়েন্স বাসোয়ালতো। পাবলো নেরুদা তার ছদ্মনাম হলেও পরে নামটি আইনি বৈধতা লাভ করে।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে তিনি যেমন কবিতা লিখেছেন তেমনই লিখেছেন ঐতিহাসিক মহাকাব্য, প্রকাশ্য রাজনৈতিক ইস্তাহার। ১৯২৭ সালে চিলির সরকার তাঁকে রাষ্ট্রদূত করে রেঙ্গুনে পাঠায় । এ পদে থেকে তিনি চিন, জাপান, কলম্বোসহ ভারতেও আসেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি পরলোকগমন করেন।

পাবলো নেরুদার লেখা বিখ্যাত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-

The Captain’s Verses

Residence on Earth

Extravagaria

Twenty Love Poems and a Song of Despair

Still Another Day

The Separate Rose

Winter Garden

The Yellow Heart

Stones of the Sky

অনুবাদক পরিচিত:

নবারুণ ভট্টাচার্য (১৯৪৮ – ২০১৪) :

নবারুণ ভট্টাচার্য মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বিখ্যাত নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য এবং মাতা স্বনামধন্যা সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী। স্কুল জীবনে বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হল – ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’, ‘রাতের সার্কাস’ প্রভৃতি। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘হারবার্ট’ ‘কাঙাল মালসাট’ প্রভৃতি।

তরজমা : নবারুণ ভট্টাচার্য ।

ইংরেজি অনুবাদ : The unhappy one .

মূলগ্রন্থ : বিদেশি ফুলে রক্তের ছিটে

ভাববস্তু :

বিশ্বখ্যাত কবি পাবলো নেরুদার রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতাটি আত্মকথনের আদলে রচিত। কথকের জবানিতে কবিতাটি শুরু হয় । তাঁর প্রিয়তমাকে দুয়ারে অপেক্ষায় রেখে বহুদূরে চলে যায়। প্রিয়তম ফিরে আসবে এই সরল বিশ্বাসে অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে কথকের প্রিয়তমা । সে জানতো না যে তার প্রিয়তম আর কখনো ফিরে আসবে না । সময় বহমান। তাই সপ্তাহ মাস বছর কেটে যায়।কথক আর ফিরে আসেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে আসে কথকের স্মৃতি।কথকের পায়ের চিহ্ন বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়। রাস্তায় ঘাস জন্মায়। অপেক্ষমান মেয়েটির মাথায় পাথরের মতো একটির একটি বছর নেমে আসে। তারপর আসে বীভৎস এক প্রাণঘাতী যুদ্ধ। রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো যুদ্ধ, যার নিষ্ঠুরতায় বাদ যায়নি বাড়ির শিশুরাও। সমস্ত স্মৃতি মুছে গেলেও বেঁচে থাকে কবির সেই প্রিয়তমা মেয়েটি। কারন প্রেম শ্বাশত , তার মৃত্যু নেই। চিরন্তন প্রেম মানুষকে মরতে মরতে বাঁচতে শেখায়। যুদ্ধের আগুন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ।বাদ যায়না দেবালয়ও । শান্ত হলুদ ধ্যানমগ্ন দেবতারা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে মন্দির থেকে। এই দুঃসময়ে দেবতারা মানুষকে বাঁচাতে ও স্বপ্ন দেখাতে ব্যর্থ হন। যুদ্ধের রোষানলে কবির ফেলে আসা বাড়ি,বারান্দা, ঝুলন্ত বিছানা, চিমনি, জলতরঙ্গ সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। ধ্বংসের তীব্রতাকে আরো স্পষ্ট করে রক্তের কালো দাগ। আর এই ধ্বংসের মধ্যে জেগে থাকে মৃত্যুহীন ভালোবাসা; যে ভালোবাসা নিয়ে কবির জন্য অপেক্ষা করে থাকে তার প্রিয়তমা।

১.সঠিক বিকল্পটি নির্বাচন করো :

১. “যেখানে ছিল শহর / সেখানে ছড়িয়ে রইল” — কী ছড়িয়ে রইল?

(ক) পায়ের দাগ

(খ) কাঠ কয়লা

(গ) গোলাপি গাছ

(ঘ) প্রাচীন জলতরঙ্গ

উত্তর দেখুন

সঠিক উত্তর: (খ) কাঠ কয়লা

২. “তারা আর স্বপ্ন দেখতে পারল না ।” — কারা স্বপ্ন দেখতে পারল না?

(ক) সেই মেয়েটি

(খ) গির্জার নান

(গ) কবিতার কথক

(ঘ) শান্ত হলুদ দেবতারা

উত্তর দেখুন

সঠিক উত্তর: (ঘ) শান্ত হলুদ দেবতারা

৩. ‘তারপর যুদ্ধ এল’ —

(ক) পাহাড়ের আগুনের মতো

(খ) রক্তের সমুদ্রের মতো

(গ) আগ্নেয় পাহাড়ের মতো

(ঘ) রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো

উত্তর দেখুন

সঠিক উত্তর: (ঘ) রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো

৪. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যে রঙের গাছের কথা বলা হয়েছে –

ক) লাল

খ) সবুজ

গ) নীল

ঘ) গোলাপি

উত্তর দেখুন

সঠিক উত্তর: ঘ) গোলাপি

৫. অসুখী একজন কবিতার কথক ঘুমিয়েছিলেন –

ক) বারান্দায়

খ) মেঝেতে

গ) ঝুলন্ত বিছানায়

ঘ) ঘাস জন্মানোর রাস্তায়

উত্তর দেখুন

সঠিক উত্তর: গ) ঝুলন্ত বিছানায়

৬. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় শান্ত হলুদ দেবতারা কত বছর ধ্যানে ডুবে ছিল?

(ক) একশো

(খ) দুহাজার

(গ) পাঁচশো

(ঘ) হাজার

উত্তর দেখুন

সঠিক উত্তর: (ঘ) হাজার

৭. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় মেয়েটিকে অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছিল –

(ক) দরজায়

(খ) ছাদে

(গ) বারান্দায়

(ঘ) রাস্তায়

普及উত্তর দেখুন

সঠিক উত্তর: (ক) দরজায়

৮. ‘অসুখী একজন’ কবিতাটি মূল কোন ভাষায় রচিত?

ক) ইংরেজি

খ) স্প্যানিশ

গ) বাংলা

ঘ) ল্যাটিন

উত্তর দেখুন

সঠিক উত্তর: খ) স্প্যানিশ

৯. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কারা খুন হলো?

ক) শিশু আর বাড়ি

খ) শান্ত হলুদ দেবতারা

গ) বাড়ি আর ঘর

ঘ) গ্রাম আর শহর

উত্তর দেখুন

সঠিক উত্তর: খ) শান্ত হলুদ দেবতারা

১০. ‘অসুখী একজন’ কবিতায় মেয়েটার মাথার উপর বছরগুলো নেমে এসেছিল –

ক) পাথরের মতো

খ) দুঃস্বপ্নের মতো

গ) রক্তের এক আগ্নেয়গিরির মতো

ঘ) নির্ঝরিণীর মতো

উত্তর দেখুন

সঠিক উত্তর: ক) পাথরের মতো

অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্নোত্তর :

১. “শিশু আর বাড়িরা খুন হলো ।” – শিশু আর বাড়িরা খুন হয়েছিল কেন ?

উত্তর: পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো যুদ্ধ এসেছিল। সেই যুদ্ধে শিশু আর বাড়িরা খুন হয়েছিল।

২. ‘সমস্ত সমতলে ধরে গেল আগুন’ — কীভাবে সমস্ত সমতলে আগুন ধরে গেল?

উত্তর : বিশ্বখ্যাত কবি পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো যুদ্ধে সমস্ত সমতলে আগুন ধরে যায়। ফলে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায়।

৩. “শান্ত হলুদ দেবতারা/যারা হাজার বছর ধরে…”—দেবতারা হাজার বছর ধরে কী করছিল বলে ‘অসুখী একজন’ কবিতায় উল্লেখ পাওয়া যায় ?

উত্তর : পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় শান্ত হলুদ দেবতারা হাজার বছর ধরে ধ্যানে ডুবে ছিল বলে কবি উল্লেখ করেছেন।

৪. “তারা আর স্বপ্ন দেখতে পারল না।”-কোন্ স্বপ্ন তারা আর দেখতে পারলেন না বলে তুমি মনে করাে?

উত্তর : বিশ্বখ্যাত কবি পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় প্রাণঘাতী যুদ্ধে মন্দির থেকে উল্টে পড়া দেবতারা শান্তি, মৈত্রী, অহিংসার স্বপ্ন আর দেখতে পেল না বলে আমার মনে হয়।

৫. “নেমে এলো তার মাথার উপর”- কার মাথার উপর কী নেমে আসার কথা বলা হয়েছে ?

উত্তর: পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কথকের জন্য অপেক্ষমান প্রিয়তমার মাথার উপর পাথরের মতো একটার পর একটা বছর নেমে এলো।

৬. ‘আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়’—কোন পরিস্থিতিতে মেয়েটি কথকের জন্য অপেক্ষা করেছে?

উত্তর : ‘অসুখী একজন’ কবিতায় মৃত্যুর ধ্বংসস্তুপ আর অবিশ্বাসের মধ্যেও কথকের প্রিয়তমা সেই মেয়েটি তার জন্য অপেক্ষা করেছে।

৭. ‘রক্তের একটা কালো দাগ’—বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

উত্তর : ‘অসুখী একজন’ কবিতায় রক্তের একটা কালো দাগ বলতে কবি বোঝাতে চেয়েছেন, যুদ্ধের বীভৎসতায় যেন রক্তও তার স্বাভাবিক রূপ হারিয়েছে। আসলে বিপর্যস্ত ও বিধ্বংসের বিকৃত রূপ বোঝাতে বহু ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যু বোঝাতে, কবি এই ধরনের চিত্রকল্পের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন।

৮. কে, কার জন্য অপেক্ষা করেছিল?

উত্তর : চিলিয়ান কবি পাবলাে নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কবিকথিত ‘মেয়েটি অর্থাৎ মাতৃকল্প দেশ, কবির দেশে ফেরার প্রত্যাশায় অপেক্ষা করেছিল।

৯. ‘সেই মেয়েটির মৃত্যু হল না।-কোন্ মেয়েটির মৃত্যু হল না?

উত্তর : কবি কথিত ‘সেই মেয়েটি আসলে মাতৃকল্প দেশ। দেশে যুদ্ধ বাধলে ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপকতা বাড়ে। দেশীয় সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ মরতে মরতে বেঁচে থাকে।

১০. অসুখী একজন কবিতায় যেখানে শহর ছিল সেখানে যুদ্ধের ফলে কী কী ছড়িয়ে রইল?

উত্তর: পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় যেখানে শহর ছিল সেখানে যুদ্ধের পর ছড়িয়ে রইল কাঠকয়লা,দোমড়ানো লোহা, মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা।

সংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্নোত্তর : [প্রতিটি প্রশ্নের মান-৩]

১. “সেই মেয়েটির মৃত্যু হলো না।” কোন্ মেয়েটির কেন মৃত্যু হলো না?

উত্তর: বিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় কথকের জন্য অপেক্ষারতা যে মেয়েটির উল্লেখ পাওয়া যায় তার কথা বলা হয়েছে।

মেয়েটি জানত না যে তার প্রিয়তম আর কখনও ফিরে আসবেনা। জীবন আপন ছন্দে চলল সপ্তাহ বছর অতিক্রান্ত হল। কবি পদচিহ্ন বৃষ্টিতে ধুয়ে গেল । তবুও অপেক্ষা চলল । এর পর যুদ্ধের বীভৎসতায় নগর দেবালয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হলো। মৃত্যু হলো শিশুসহ অজস্র মানুষের। শুধু অপেক্ষমাণ মেয়েটির মৃত্যু হল না কারণ ভালোবাসা অমর, চিরন্তন, শাশ্বত।

২. “তারা আর স্বপ্ন দেখতে পারল না।”- তারা কারা? কেন তারা স্বপ্ন দেখতে পারলো না?

উত্তর : বিশ্বখ্যাত নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় শান্ত হলুদ দেবতাদের কথা বলা হয়েছে।

আলোচ্য অংশে কবি বিনাশ ও ধ্বংসের কলরোলে দৈবীমহিমার অসারতার প্রতি কটাক্ষ করেছেন। মানবতার অপচয় প্রাণহানি কিংবা চূড়ান্ত বীভৎসতার সময় কোন দৈব-মাহাত্ম্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে না। হাজার বছর ধরে ধ্যানে ডুবে থাকা শান্ত হলুদ দেবতারা যুদ্ধের শিকার। ফলে তারা মন্দির থেকে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে। তাই তারা আর স্বপ্ন দেখাতে পারেনা। অর্থাৎ মানুষের মতোই যুদ্ধ তাণ্ডবের ভয়াবহতায় তারাও নিরাশ্রয় অস্তিত্বহীন এবং চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়। তাই মানুষকে স্বপ্ন দেখানোর ক্ষমতা লোপ পায়। আলোচ্য অংশে কবির এই ভাবনাই প্রকাশ পেয়েছে।

৩. “সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে।” কোন কোন জিনিসের কথা বলা হয়েছে? এই পরিণতির কারণ কী?

উত্তর: বিশ্বখ্যাত নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় আগ্নেয় পাহাড়ের মতো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আগুনে চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়েছিল কথকের বাড়ি, বারান্দা, ধ্বংস হয়েগেছিল কবির গোলাপি গাছ, চিমনি প্রাচীন জলতরঙ্গ ।

সময় পেরিয়ে যখন যথার্থই মুক্তির আবাহন হয় , সমাজ পরিবর্তনের প্রয়োজন আসে; তখন বিপ্লবের নামান্তর যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। প্রবল যুদ্ধে যে হত্যালীলা চলে সেখানে রেহাই পায় না শিশুরাও। ধ্বংস হয় শখের বাড়ি। যেখানে ছিল শহর সেখানে পড়ে থাকে থাকে শুধু কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা, আর মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা।

৪. “সে জানতো না আমি আর কখনো ফিরে আসব না।”– সে কে ? ‘আমি আর কখনো ফিরে আসব না’ বলার কারণ কী ?

উত্তর: পাবলো নেরুদা রচিত নবারুণ ভট্টাচার্য অনূদিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় ‘সে’ বলতে অপেক্ষমানা মেয়েটির কথা বলা হয়েছে।

কর্তব্যের খাতিরে স্বদেশ-স্বজন ছেড়ে কবি কথক হয়েছেন সুদূরের যাত্রী। বছরের পর বছর কেটে গেলেও তিনি ফিরে আসতে পারেননি। ঘটনাটি হৃদয়বিদারক হলেও তিনি প্রতীক্ষারতা মেয়েটিকে জানিয়ে যেতে পারেননি তাঁর না ফেরার কথা। বোধ করি সে কারণেই মেয়েটি দরজায় দাঁড়িয়ে কথকের ফেরার প্রতীক্ষা করেছিল বছরের পর বছর।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর : [ প্রতিটি প্রশ্নের মান-৫]

১. “যেখানে ছিল শহর / সেখানে ছড়িয়ে রইল কাঠকয়লা ।” — ‘অসুখী একজন’ কবিতা অবলম্বনে শহরের এই পরিণতি কীভাবে হল লেখো । [মাধ্যমিক-২০১৭]

উঃ- প্রখ্যাত চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদার “অসুখী একজন” কবিতায় অপেক্ষমান নারীর মধ্যে ভালোবাসার অনির্বাণ রূপটি ফুটে উঠেছে । কথক তাঁর প্রিয় নারীকে রেখে বহুদূরে চলে যান । অপেক্ষারতা জানত না যে তার প্রিয়তম আর ফিরে আসবে না । সময় চলমান তাই তা অতিক্রম করে কালকে । কথকের পদচিহ্ন ধুয়ে যায় । তাঁর চলার পথে ঘাস জন্মায় তবুও নারীর প্রতীক্ষার অবসান ঘটে না ।

এইভাবে প্রতিক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে সময়ের পাল্লা ভারী হয়ে মেয়েটির মাথায় যেন চিন্তার পাহাড় নেমে আসে । যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ে শহরে। কবির বর্ণনায়-

“তারপর যুদ্ধ এল

রক্তের এক আগ্নেয়পাহাড়ের মতো।”

আগুনের করাল গ্রাসে ধ্বংস হয় শিশু দেবতারা । শান্ত হলুদ দেবতারা তাঁদের মন্দির থেকে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে । কবির স্বপ্নের বাড়ি-ঘর সব চূর্ণ হয়ে যায়, পুড়ে যায় আগুনে । যেখানে শহর ছিল সেখানে চারদিকে ছড়িয়ে থাকে কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা, পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা, আর রক্তের একটা কালো দাগ । কিন্তু এত সবের মধ্যেও কবির প্রিয়তমা বেঁচে রইলেন । কারণ, প্রেম শ্বাশত তার মৃত্যু নেই । সেই জন্য ধ্বংসের মাঝেও বেঁচে থাকে মেয়েটির অনির্বাণ ভালবাসা, বেঁচে থাকে ভালবাসার জন্য প্রতীক্ষা । আগামীর প্রত্যাশায় যা চিরন্তন অমলিন স্মৃতিতে ভাস্বর ।

২. ‘সব চূর্ণ হয়ে গেল, জ্বলে গেল আগুনে’— কবিতাটি অনুসরণে পরিস্থিতিটির বিবরণ দাও ।

উত্তর:- বিশ্বখ্যাত নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত অংশটি নেওয়া হয়েছে ।

‘অসুখী একজন’ কবিতায় একদিকে দেশের বুকে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের কথা, অপরদিকে কবির প্রিয়তমা এক নারীর ভালোবাসা অর্থাৎ স্বদেশ মাতৃকার অসীম ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করেছেন । কবি তাঁর স্বদেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন । তিনি শোষিত বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তার সামর্থ মতো সাহায্য করতে চেয়েছিলেন । কিন্তু কবির দেশে যুদ্ধ শুরু হয় । যুদ্ধের লেলিহান শিখায় সবকিছু চূর্ন হয়ে যায় । রক্তে রেঙে উঠে তার স্বদেশভূমি । ‘রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো’ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বীভৎসতা তুলে ধরেছেন লাইনটির মধ্যে ।

রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে দেশের শিশুদের ও সাধারণ মানুষদের মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে আগে । যুদ্ধের তাণ্ডবে বাড়ি-ঘর সব ধ্বংস হয়েছিল ।যুদ্ধের রোষানলে কবির প্রিয় বাড়ি, ঝুলন্ত বারান্দায় গোলাপি গাছ, করতলের মতো চওড়া পাতা, চিমনি, প্রাচীন জলতরঙ্গ সবই ধ্বংস হয়েছিল । মন্দির থেকে দেবতাদের উলটে ফেলে দেওয়া হয়েছিল এবং সেগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায় । শহরের বুকে শুধু ছড়িয়ে থাকে কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা, মৃত পাথরের মূর্তির মতো মাথা । যুদ্ধ শুধু মানুষের প্রাণ নেয় না, মানুষের মনেও বিপর্যয় ঘটায় । যেন রক্তের একটা কালো দাগ মানুষের মনকে সম্পূর্ণ ভেঙে বিপর্যস্ত করে দেয় ।

৩. “তারপর যুদ্ধ এলো।”– কেমন যুদ্ধে এসেছিল ? যুদ্ধের পরিণতি কী হয়েছিল ?

উত্তর: বিশ্বখ্যাত নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদা রচিত ‘অসুখী একজন’ কবিতায় রক্তের এক আগ্নেয় পাহাড়ের মতো যুদ্ধ আসার কথা বলা হয়েছে।

প্রাণঘাতী সেই ভয়াবহ যুদ্ধের বীভৎসতায় মানুষ আশ্রয়হীন হয় । নৃশংসতার হাত থেকে রেহাই পায় না শিশুরাও । দাবানলের মতো যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সমতলে। ধ্বংস হয় দেবালয়ের দেবতারাও। কবির সেই মিষ্টি বাড়ি, বারান্দা,ঝুলন্ত বিছানা, গোলাপি গাছ, প্রাচীন জলতরঙ্গ সবকিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। একইরকমভাবে শহরটাও পুড়ে ছারখার হয়ে যায় । যেখানে ছিল শহর সেখানে ছড়িয়ে পড়ে কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা, পাথরের মূর্তি বীভৎস মাথা, রক্তের কালো দাগ। কিন্তু কবি বলেছেন সেই ধ্বংসস্তূপে অপেক্ষারতা মেয়েটির চিরন্তন ভালোবাসার জন্য তার মৃত্যু হয় না।

👨‍🎓👩‍🎓👨‍🎓👩‍🎓👨‍🎓👩‍🎓👨‍🎓👩‍🎓👨‍🎓👩‍🎓👨‍🎓👩‍🎓👨‍🎓👩‍🎓

Your Cart

Scroll to Top