কেন এল না – সুভাষ মুখোপাধ্যায় | Keno Elo Na – Subhas Mukhopadhyay | কেন এল না কবিতার প্রশ্ন উত্তর

কবিতা

কেন এল না

সুভাষ মুখোপাধ্যায়

Sem-4 পাঠ্যবই • পরীক্ষার চূড়ান্ত সাজেশন পরীক্ষা স্পেশাল

HS Bangla Sahayak, Sem-4 | উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা সহায়ক চতুর্থ সেমিস্টার

📚 উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা পরীক্ষায় সেরা প্রস্তুতির সঙ্গী 📔 উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা সহায়ক চতুর্থ সেমিস্টার | ডিজিটাল ই-বুক...

সারসংক্ষেপনামকরণের সার্থকতা১৩টি প্রশ্নোত্তর

কবিতার সারসংক্ষেপ

উৎসবের আনন্দ ও প্রতীক্ষা

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজার প্রাক্কালে এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের চিত্র দিয়ে কবিতার সূচনা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা সকালে কাজে বেরোনোর সময় জানিয়ে গিয়েছিলেন যে মাইনে নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরবেন এবং পুজোর কেনাকাটা সেরে ফেলবেন। নতুন জামা পাওয়ার আশায় ছোট্ট ছেলেটি সারাদিন আনন্দে মেতে থাকে। কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও বাবা না ফেরায় সে ব্যাকুল হয়ে মাকে প্রশ্ন করে—

“এখনও বাবা কেন এল না, মা?”

গৃহকোণে উদ্বেগের ছায়া

বাবার ফিরতে দেরি হওয়ায় দুশ্চিন্তা ছড়ায় মায়ের মনেও। রান্নার সময় কড়ায় খুন্তির অস্থির সঞ্চালন, অন্যমনস্কতায় ভাতের ফ্যান গালতে গিয়ে পা পুড়ে যাওয়া কিংবা পরবর্তীতে উল বুনতে বসে কেবলই ঘর ভুল করার মধ্যে দিয়ে সেই উৎকণ্ঠা ধরা পড়ে। জানলার ধারে মাদুরে ইতিহাসের বই খুলে বসলেও ছেলেটির মন পড়ায় বসে না; বইয়ের অক্ষরগুলো তার কাছে অবাধ্য মনে হয়।

অশান্ত রাজপথ ও করুণ পরিণতি

বাইরের পরিস্থিতি ক্রমশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। রেডিয়োয় সান্ধ্য সংবাদ পাঠ শুরু হয়। বাবার খোঁজে ছেলেটি গলির মুখ পেরিয়ে রাস্তায় আসে। মোড়ে ভিড়, পুলিশের একটি কালো ভ্যান এবং বাজি ফোটার মতো শব্দ শুনে নিষ্পাপ ছেলেটি সেটিকে কোনো ‘পুজো’র উৎসব ভেবে দেখতে এগিয়ে যায়। গভীর রাতে বারুদের গন্ধমাখা রাজপথের অলিগলি ঘুরে, মৃত্যুর মুখ থেকে বাবা ঘরে ফেরেন; কিন্তু যার জন্য উৎসবের এই আয়োজন, সেই অবোধ কিশোর আর ফেরে না। কবি লেখেন—

“মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে / বাবা এল। / ছেলে এল না।।”

নামকরণের সার্থকতা

বিষয়বস্তুনির্ভর উৎকণ্ঠা

নামকরণের মধ্য দিয়ে কোনো সাহিত্যের অন্তর্নিহিত ভাবটি মূর্ত হয়ে ওঠে। কবিতার শুরু থেকে শেষপর্যন্ত এক গভীর প্রতীক্ষা ও প্রশ্ন আবর্তিত হয়েছে। বাবা মাইনে নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে পুজোর বাজার করবেন বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাত নামলেও তিনি না ফেরায় ছেলের কণ্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ে—

“এখনও বাবা কেন এল না, মা?”

একই শঙ্কা মায়ের অন্তরেও ঘনীভূত হয়—

“মানুষটা এখনও কেন এল না?”

ফলে কবিতার সিংহভাগ জুড়ে ‘কেন এল না’ প্রশ্নটি বাবাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়।

নাটকীয় রূপান্তর ও ব্যঞ্জনা

কবিতার অন্তিম পর্বে ঘটে তীব্র নাটকীয় মোড়। নানা বিপদের ফাঁদ ও মৃত্যুর হাত এড়িয়ে বাবা ঠিকই ঘরে ফিরে আসেন, কিন্তু কৌতূহলবশত বাইরে যাওয়া ছেলেটি আর ফেরে না। সমাপ্তি ঘটে চরম হাহাকারে—

“ছেলে এল না।”

নামকরণের সার্থকতা

বাবার না-ফেরার যে জাগতিক সংশয় দিয়ে কবিতা শুরু হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা রূপ নেয় সন্তান হারানোর এক চিরন্তন ট্র্যাজেডিতে। রাষ্ট্রীয় হিংস্রতার শিকার হওয়া নিরীহ শৈশবের মর্মান্তিক পরিণতি সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের বিবেকের কাছে এক জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায়। তাই ‘কেন এল না’ শিরোনামটি একদিকে সংগত এবং অন্যদিকে গভীর ব্যঞ্জনাধর্মী।

পূর্ণাঙ্গ প্রশ্নোত্তর

মান: ৫ · প্রশ্নে ট্যাপ করলে উত্তর খুলবে

১‘কেন এল না’ কবিতায় বর্ণিত ঘটনাটি নিজের ভাষায় আলোচনা করো। ৫ নম্বর

প্রতীক্ষা ও আনন্দ: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কেন এল না’ কবিতায় দুর্গাপূজার প্রাক্কালে এক শ্রমজীবী নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের উৎসবের আনন্দ ও চরম ট্র্যাজেডির আলেখ্য বর্ণিত হয়েছে। সকালে কাজে যাওয়ার সময় বাবা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি মাইনে পেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবেন এবং পুজোর কেনাকাটা করবেন। নতুন জামার প্রত্যাশায় সারাদিন আনন্দে কাটানোর পর সন্ধ্যা নামলে ছেলেটি বাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করে—

“এখনও বাবা কেন এল না, মা?”

পারিবারিক উৎকণ্ঠা: বাবার অস্বাভাবিক দেরিতে মায়ের মনেও শঙ্কা ঘনিয়ে ওঠে। রান্নার সময় কড়ায় খুন্তির অস্থির নাড়াচাড়া এবং ফ্যান গালতে গিয়ে পা পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় মায়ের মানসিক টানাপোড়েন প্রকাশ পায়। ছেলেটি জানলার ধারে মাদুরে ইতিহাসের বই খুলে বসলেও পড়ার প্রতিটি অক্ষর তার কাছে অবাধ্য মনে হয়। সময় বয়ে চলে, রেডিয়োয় জরুরি খবরের বুলেটিন শুরু হয়।

বাইরের পরিবেশ ও ট্র্যাজিক সমাপ্তি: বাবার খোঁজ নিতে ছেলেটি সদর দরজার ছিটকিনি খুলে গলির মোড়ে যায়। সেখানে সে দেখে মানুষের ভিড়, পুলিশের একটি কালো গাড়ি এবং বাজি ফোটার মতো শব্দ। সরল বালকটি রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ না বুঝে তাকে কোনো ‘পুজো’র আনন্দ ভেবে দেখতে এগিয়ে যায়। গভীর রাতে বারুদের গন্ধমাখা অলিগলি ঘুরে, সাক্ষাৎ মৃত্যুকে পাশ কাটিয়ে ক্লান্ত বাবা ঘরে ফিরে আসেন ঠিকই; কিন্তু পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারানো অবোধ ছেলেটি আর কোনোদিন ফেরে না।

২‘কেন এল না’ কবিতাটির নামকরণ কতদূর সার্থক তা আলোচনা করো। ৫ নম্বর

নামকরণের উৎস ও বিকাশ: সাহিত্যের নামকরণে ঘটনার সংকেত ও ভাবসত্য প্রতিফলিত হয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কেন এল না’ কবিতার পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে এক অসহায় পরিবারের প্রতীক্ষা ও উৎকণ্ঠা। সকালে মাইনে নিয়ে পুজোর বাজার করার কথা বলে যাওয়া বাবা সন্ধ্যা নামলেও না ফেরায় ছেলেটি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সে মাকে বলে—

“এখনও বাবা কেন এল না, মা?”

একই প্রশ্ন মায়ের মনেও প্রতিধ্বনিত হয়—“মানুষটা এখনও কেন এল না?” ফলে কবিতার প্রথমার্ধের নামকরণটি সরাসরি বাবার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষাকে নির্দেশ করে।

ভাবগত মোড় ও সার্বজনীন হাহাকার: কিন্তু কবিতার শেষ চরণে পৌঁছালে পাঠক এক অপ্রত্যাশিত বাস্তবতার মুখোমুখি হন। বাবা নানা সংকট ও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেও, যে সন্তানের জন্য এই ফেরা, সেই ছেলেটি চিরতরে হারিয়ে যায়—

“ছেলে এল না।”

মূল্যায়ন: বাবার দেরি হওয়ায় যে প্রশ্নটি জেগেছিল, কবিতার শেষে তা রূপ নেয় সন্তানহারা মায়ের বুকে এক চিরস্থায়ী শূন্যতায়। উৎসবের আনন্দের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা এই নিষ্ঠুর সত্য সমাজব্যবস্থার বিবেককে নাড়া দেয়। তাই কবিতার বাহ্যিক কাঠামো ও অন্তর্নিহিত মর্মান্তিক সুর—উভয় দিক থেকেই ‘কেন এল না’ নামকরণটি সর্বতোভাবে সার্থক।

৩কোন্ পটভূমিতে ‘কেন এল না’ কবিতাটি রচিত তা আলোচনা করো। ৫ নম্বর

রচনাকাল ও সামাজিক প্রেক্ষাপট: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘যত দূরেই যাই’ (১৯৬২) কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘কেন এল না’ কবিতাটি রচিত হয়েছিল ১৯৫৭ থেকে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী এক উত্তাল কালপর্বে। দেশভাগের পরবর্তী শরণার্থী সমস্যা এবং তীব্র খাদ্যসংকট ও লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছিল।

খাদ্য আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস: ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দের ঐতিহাসিক ‘খাদ্য আন্দোলন’-এর পটভূমি কবিতাটির মূল ভিত্তি। চাল ও খাদ্যের দাবিতে ১৯৫৯ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতার রাজপথে লক্ষাধিক মানুষের যে অহিংস মিছিল বের হয়েছিল, তার ওপর পুলিশ নির্মম লাঠিচার্জ ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। অসংখ্য নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান। কবি কবিতায় বাস্তবতার সেই সংকেতগুলি নিপুণভাবে বুনে দিয়েছেন—

  • ‘কালো গাড়ি’: পুলিশের প্রিজন ভ্যান।
  • ‘বাজি ফুটছে’: পুলিশের বন্দুকের গুলির শব্দ।
  • ‘বারুদের গন্ধে-ভরা রাস্তা’: সংঘর্ষদীর্ণ ও টিয়ার গ্যাসে আচ্ছন্ন কলকাতার রাজপথ।

মূল্যায়ন: কবি কোনো দলীয় প্রচারের ভাষায় নয়, বরং এক সাধারণ পরিবারের ব্যক্তিগত দুর্গতির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের এই ভয়াবহ ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে কবিতার পটভূমি হিসেবে তুলে ধরেছেন।

৪“কড়ার গায়ে খুন্তিটা / আজ একটু বেশি রকম নড়ছে”—কখন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানসিক অবস্থা আলোচনা করো। ২+৩=৫

পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট (২): পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম বাবা সকালে কথা দিয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি মাইনে পেয়ে তাড়াতাড়ি ফিরবেন এবং আসন্ন পুজোর কেনাকাটা করবেন। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাস্তায় আলো জ্বলে ওঠার বহুক্ষণ পরেও যখন তিনি ফিরলেন না, তখন গৃহকোণে অপেক্ষারত গৃহকর্ত্রী অর্থাৎ ছেলেটির মায়ের রান্নার মুহূর্তে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।

মানসিক অবস্থার পরিচয় (৩): উদ্দিষ্ট ব্যক্তি অর্থাৎ মায়ের মানসিক অবস্থা চরম উদ্বেগ ও আশঙ্কায় আচ্ছন্ন ছিল:

  • অস্থিরতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতা: স্বামীর অস্বাভাবিক বিলম্বে মায়ের মনে বাইরের দুর্যোগের আশঙ্কায় তোলপাড় চলছিল। সেই মানসিক অস্থিরতার প্রভাব পড়েছিল তাঁর হাতের কাজের ওপর; ফলে কড়ায় খুন্তি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ও অসমানভাবে নড়ছিল।
  • অন্যমনস্কতা ও গৃহস্থালির ক্ষতি: মনের উৎকণ্ঠা এতটাই গভীর ছিল যে তিনি কাজে একাগ্র হতে পারেননি। অসাবধানতাবশত ভাতের গরম ফ্যান গালতে গিয়ে তাঁর পা পুড়ে যায়।
  • দীর্ঘায়িত শঙ্কা: পরবর্তীতে সমস্ত কাজ সেরে উল বুনতে বসেও বারবার ঘর ভুল করা প্রমাণ করে যে তাঁর সমস্ত মন স্বামীর অমঙ্গলের আশঙ্কায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল।
৫“যতক্ষণ পুজোর জামা কেনা না হচ্ছে / নড়বে না।”—প্রসঙ্গসহ উদ্ধৃতাংশের তাৎপর্য আলোচনা করো। ২+৩=৫

প্রসঙ্গ (২): কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কেন এল না’ কবিতায় বাবা মাইনে নিয়ে ফিরলে পুজোর কেনাকাটা হবে—এই আশায় কিশোর ছেলেটি জানলার ধারে মাদুরে ইতিহাস বই খুলে বসেছিল। কিন্তু বাবার দেখা না মেলায় পড়ার বইয়ের অক্ষরের প্রতি তার যে চরম অনীহা ও চঞ্চলতা দেখা দিয়েছিল, সেই প্রসঙ্গে কবি এই উক্তিটি করেছেন।

তাৎপর্য (৩): উদ্ধৃতাংশটিতে চিরন্তন শৈশবের মনস্তত্ত্ব এবং উৎসবের ব্যাকুলতা অত্যন্ত জীবন্ত রূপ পেয়েছে:

  • শিশুমনের একগুঁয়েমি: মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের কাছে দুর্গাপূজার প্রধান আকর্ষণ হলো নতুন জামা। বাবার প্রতিশ্রুতিতে ছেলেটি জামা পাওয়ার কল্পনায় বুঁদ হয়ে ছিল। বাবার অনুপস্থিতি তার পড়ার ইচ্ছাকে রুদ্ধ করে দেয়।
  • উপমার সার্থকতা: কবি বইয়ের অক্ষরগুলিকে ‘বাপের-আদরে-মাথা-খাওয়া ছেলের মত’ একগুঁয়ে ও অবাধ্য বলেছেন। আদুরে ছেলে যেমন কোনো বায়না পূরণ না হলে অনড় থাকে, তেমনই বইয়ের অক্ষরগুলোও যেন মাথায় ঢুকতে অস্বীকার করছিল।
  • মনস্তাত্ত্বিক সত্য: আসলে অক্ষরগুলো অবাধ্য ছিল না; অবাধ্য ছিল কিশোরটির নিজের চঞ্চল মন। উৎসবের প্রত্যাশা যে কীভাবে অন্যান্য সমস্ত স্বাভাবিক কাজকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, পঙ্‌ক্তিটিতে সেই সত্যই মূর্ত হয়েছে।
৬“কিসের পুজো আজ”—পুজোর বর্ণনা দাও। প্রসঙ্গত বালকটির কৌতূহলের কারণ নির্দেশ করো। ২+৩=৫

‘পুজো’র বাস্তব স্বরূপ (২): বালকটি যাকে সহজ মনে ‘পুজো’ ভেবেছিল, তা প্রকৃতপক্ষে কোনো ধর্মীয় উৎসব বা দেবতার আরাধনা ছিল না। তা ছিল খাদ্য আন্দোলনে উত্তাল কলকাতার রাজপথে আন্দোলনরত সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশের বর্বরোচিত আক্রমণ। কবিতার ‘ভিড়’ ছিল সন্ত্রস্ত মানুষের বিশৃঙ্খলা, ‘কালো গাড়ি’ ছিল পুলিশের প্রিজন ভ্যান এবং ‘বাজি ফোটার শব্দ’ ছিল পুলিশের বন্দুক থেকে ছোড়া প্রাণঘাতী বুলেটের আওয়াজ। সংক্ষেপে, এটি ছিল রাষ্ট্রশক্তির হাতে মানুষের রক্তের বলিদান।

বালকের কৌতূহলের কারণ (৩): বালকটির এই ভুল ধারণার পেছনে কাজ করেছিল তার সহজাত সারল্য:

  • অভিজ্ঞতাহীনতা: গৃহকোণে নিরাপদে লালিত হওয়া কিশোরটির কাছে রাজনৈতিক সংঘাত, পুলিশি নির্যাতন বা বুলেটের শব্দের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।
  • উৎসবের মানসিকতা: সামনেই দুর্গাপূজা থাকায় তার ভাবনায় কেবল পুজো আর উৎসবের আমেজ ছিল। তাই হঠাৎ বাইরে বাজি ফোটার মতো শব্দ শুনে সে ভেবেছিল পাড়ায় হয়তো কোনো নতুন পুজোর বাজির প্রদর্শনী হচ্ছে। এই নিষ্পাপ কৌতূহল নিবৃত্ত করতেই সে বাইরে ছুটে গিয়েছিল।
৭“মানুষটা এখনও কেন এল না?”—কখন, কার মনে এরূপ প্রশ্নের উদয় হয়েছিল? তার এরূপ আশঙ্কার কারণ কী? ২+৩=৫

সময় ও উদ্দিষ্ট ব্যক্তি (২): কবিতায় রাত যখন গভীর হয়ে এসেছে, গৃহের রান্না ও গা ধোয়ার কাজ শেষ হয়ে গেছে এবং ছেলেটি একবার দরজায় এসে “মা, আমি খোকা” বলে নিজের উপস্থিতি জানিয়ে গেছে—তখন ঘরে বসে উল বুনতে থাকা ছেলেটির মায়ের মনে এই প্রশ্নের উদয় হয়েছিল।

আশঙ্কার কারণ (৩): মায়ের মনে এই গভীর শঙ্কার কারণগুলি হলো:

  • প্রতিশ্রুতিভঙ্গ: স্বামী সকালে স্পষ্ট কথা দিয়েছিলেন যে মাইনে নিয়ে তিনি ‘সকাল-সকাল’ ফিরবেন এবং পুজোর কেনাকাটা সারবেন। কিন্তু গভীর রাত হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তাঁর কোনো খোঁজ ছিল না।
  • বাইরের বিশৃঙ্খলা: রেডিয়োয় প্রচারিত সংবাদের মাধ্যমে মা বুঝতে পারছিলেন যে শহরের পরিস্থিতি ভয়াবহ ও সংঘাতপূর্ণ।
  • অশুভ অমঙ্গলের ভয়: তৎকালীন অস্থির সময়ের প্রেক্ষাপটে কোনো সাধারণ মানুষ কর্মস্থল থেকে নিরাপদে ফিরবে কি না, তা অনিশ্চিত ছিল। স্বামীর এই অস্বাভাবিক বিলম্ব মায়ের মনে চরম অমঙ্গলের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলেছিল।
৮“এখন রেডিয়োয় খবর বলছে।”—রেডিয়ো কী ধরনের খবর বলছে বলে তুমি মনে করো এবং তার প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল? ২+৩=৫

রেডিয়োর খবরের প্রকৃতি (২): ১৯৫৯ সালের ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে বোঝা যায়, রেডিয়োর সান্ধ্য বুলেটিনে কলকাতার রাজপথে সাধারণ মানুষের মিছিল, চালের দাবিতে বিক্ষোভ, পুলিশের নির্বিচার লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, গুলিবর্ষণ এবং সান্ধ্য আইন জারির মতো জরুরি ও রক্তক্ষয়ী ঘটনার সংবাদই প্রচারিত হচ্ছিল।

পরিবারে এর প্রতিক্রিয়া (৩): রেডিয়োর খবরের অভিঘাতে গৃহকোণে মারাত্মক প্রভাব পড়ে:

  • মায়ের অস্থিরতা: মা বাইরের বিপদ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তাঁর হাতের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায় এবং সোয়েটার বুনতে বসে কেবলই ভুল ঘর উঠতে থাকে।
  • ছেলের পদক্ষেপ: রেডিয়োর খবরের আবহ এবং বাবার দীর্ঘ অনুপস্থিতি অবোধ কিশোরটিকেও অধীর করে তোলে। সে ঘরে আর স্থির থাকতে না পেরে বাবার সন্ধানে দরজার ছিটকিনি খুলে গলির মোড়ে বেরিয়ে আসে।
৯“মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে / বাবা এল”—‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে? বাবা এলেন কীভাবে? ২+৩=৫

উদ্ধৃতাংশের তাৎপর্য (২): ‘মৃত্যুর পাশ কাটিয়ে’ বলতে বোঝানো হয়েছে সমকালীন কলকাতার রাজপথে পুলিশের বেপরোয়া গুলিচালনা, লাঠিচার্জ এবং সম্ভাব্য মৃত্যুর হাত থেকে কোনোক্রমে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে ঘরে ফেরাকে। চারপাশে যখন সাধারণ আন্দোলনকারীদের রক্ত ঝরছিল, বাবা সেই সাক্ষাৎ যমদূতকে ফাঁকি দিয়ে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন।

বাবার ফেরার প্রক্রিয়া (৩): বাবার ঘরে ফেরার পথটি ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক ও কষ্টকর:

  • বারুদের গন্ধে ভরা পথ: চারপাশের রাস্তা তখন পুলিশের টিয়ার গ্যাস ও বন্দুকের বারুদের তীব্র গন্ধে ঢাকা ছিল।
  • অলিগলির আশ্রয়: প্রকাশ্য রাজপথে পুলিশের আক্রমণ ও কারফিউ এড়াতে বাবাকে সোজা পথ ছেড়ে বহু অন্ধকার ও অপরিচিত ‘অলিগলি ঘুরে’ সন্তর্পণে এগোতে হয়েছিল।
  • দেরিতে ও বিধ্বস্ত অবস্থায়: বহু সাবধানতা অবলম্বন করে এবং সাক্ষাৎ মৃত্যুকে এড়িয়ে অনেক রাতে তিনি চরম বিধ্বস্ত অবস্থায় নিজের ঘরে পৌঁছান।
১০“ছেলে এল না”—উদ্ধৃতিটির প্রসঙ্গসহ তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো। ৫ নম্বর

প্রসঙ্গ: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কেন এল না’ কবিতার একেবারে শেষ চরণে এই অবিস্মরণীয় ট্র্যাজিক বাক্যটি প্রযুক্ত হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাবা বহু বিপদ পেরিয়ে বাড়ি ফিরলেও, যে কিশোর উৎসবের বাজি দেখতে বাইরে গিয়েছিল, সে আর ঘরে ফিরে আসেনি।

তাৎপর্য বিশ্লেষণ: পঙ্‌ক্তিটি মাত্র তিনটি শব্দের হলেও এর মধ্যে নিহিত রয়েছে সমগ্র কবিতার সবচেয়ে তীব্র বেদনা ও প্রতিবাদ:

  • প্রতীক্ষার চরম বিপর্যয়: পুরো কবিতা জুড়ে পরিবার ও পাঠকের উৎকণ্ঠা ছিল বাবাকে ঘিরে। কিন্তু বাবা যখন সমস্ত বিপদ কাটিয়ে ঘরে ফিরলেন, তখনই ঘটে চরম ট্র্যাজেডি—দেখা যায় পরিবারের ভবিষ্যৎ ও আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু ছেলেটিই নিখোঁজ।
  • রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের অন্ধ শিকার: ছেলেটি কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিল না; সে মিছিল বা অধিকারের সংঘাত বুঝত না। সে গিয়েছিল পুজোর আনন্দ ও বাজি দেখার নিখাদ সারল্য নিয়ে। কিন্তু পুলিশের অন্ধ বুলেট সেই সারল্যকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়।
  • সভ্যতার বিবেকের কাছে প্রশ্ন: “ছেলে এল না”—এই হাহাকার কেবল একটি পরিবারের পুত্রশোক নয়; এটি সমকালীন রক্তপায়ী রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখে এক জ্বলন্ত চড়। যে নতুন জামার জন্য ছেলেটি অপেক্ষায় ছিল, সেই জামা কেনা আর হলো না। এক চরম শূন্যতার সৃষ্টি করে কবিতাটির পরিসমাপ্তি ঘটে।
১১“ছেলেটা দেখে আসতে গেল”—কী দেখতে গিয়েছিল? শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল? ২+৩=৫

যা দেখতে গিয়েছিল (২): গলির দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলেটি দেখেছিল—রাস্তার মোড়ে মানুষের ভিড়, পুলিশের একটি কালো গাড়ি এবং খুব বাজি ফোটার শব্দ। সে ভেবেছিল পাড়ায় হয়তো কোনো নতুন পুজোর বাজি পোড়ানো হচ্ছে। সেই কাল্পনিক ‘পুজো’ এবং বাজির আনন্দ দেখতেই সে কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গিয়েছিল।

পরিণাম (৩): কিশোরটির পরিণতি হয়েছিল অত্যন্ত করুণ ও মর্মান্তিক:

  • ভুল অনুমানের মাশুল: ছেলেটি যাকে উৎসবের বাজি ভেবেছিল, তা ছিল পুলিশের রাইফেলের প্রাণঘাতী গুলির শব্দ। এই ভয়াবহ বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা তার ছিল না।
  • চিরতরে নিরুদ্দেশ: উত্তাল রাজপথে পৌঁছানোর পর সে পুলিশের গুলিবর্ষণ অথবা উন্মত্ত বিশৃঙ্খলার শিকার হয় এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
  • শূন্য গৃহকোণ: গভীর রাতে তার বাবা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এলেও, যে সন্তানের হাসিমুখ দেখার জন্য বাবার এই বেঁচে ফেরা—সেই ছেলে আর কোনোদিনই বাড়ি ফিরে আসেনি।
১২“হিজিবিজি অক্ষরগুলো একগুয়ে অবাধ্য”—কবি একথা কেন বলেছেন? ৫ নম্বর

কৈশোরের প্রত্যাশা ও অস্থিরতা: সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘কেন এল না’ কবিতায় নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেটির সারাটা দিন কেটেছিল পুজোর নতুন জামা পাওয়ার আনন্দময় ভাবনায়। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামলেও বাবা মাইনে নিয়ে না ফেরায় তার আনন্দ এক গভীর অনিশ্চয়তায় রূপ নেয়।

অক্ষরগুলির অবাধ্য মনে হওয়ার কারণ:

  • মনোযোগের অভাব: ছেলেটি জানলার ধারে মাদুরে ইতিহাসের বই খুলে পড়তে বসেছিল ঠিকই, কিন্তু তার কান ও মন পড়েছিল সদর দরজায় এবং বাবার ফেরার পথের দিকে। ফলে বইয়ের অক্ষরগুলো তার কাছে কোনো অর্থ প্রকাশ করতে পারছিল না; সেগুলো স্রেফ ‘হিজিবিজি’ আঁকিবুঁকি বলে মনে হচ্ছিল।
  • ব্যঞ্জনাধর্মী উপমা: কবি এখানে ‘বাপের-আদরে-মাথা-খাওয়া ছেলের মত’ উপমাটি ব্যবহার করেছেন। অতিরিক্ত আদরে লালিত সন্তান যেমন জেদ ধরলে অনড় থাকে, তেমনই বইয়ের অক্ষরগুলোও যেন জেদ ধরেছে—যতক্ষণ না নতুন জামা কেনা হচ্ছে, ততক্ষণ তারা মাথায় ঢুকবে না।
  • বাস্তবতার প্রতিফলন: বস্তুত, অক্ষরগুলো অবাধ্য ছিল না; অবাধ্য ছিল কিশোরটির নিজের উৎসুক ও উদ্বিগ্ন মন। উৎসবের প্রাক্কালে বাবার না-ফেরা কীভাবে একটি শিশুর স্বাভাবিক পড়াশোনাকে ব্যাহত করেছিল, কবি এখানে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন।
১৩“সামনে ইতিহাসের পাতা খোলা”—কোন্ পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে? ছেলেটি পড়ায় মন দিতে পারছিল না কেন? ৩+২=৫

পরিস্থিতি ও তাৎপর্য (৩):

  • পরিস্থিতি: সন্ধ্যায় আলো জ্বলে ওঠার পর বাবা না ফেরায় ছেলেটির মনে দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। এই উৎকণ্ঠার আবহেই সে পড়ার জন্য জানলার ধারে মাদুরে বসেছিল এবং তার সামনে ইতিহাসের বইয়ের পাতা খোলা ছিল।
  • গভীর তাৎপর্য: ইতিহাসের পাতা কেবল একটি পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা নয়, এর একটি অন্তর্নিহিত রূপক অর্থ রয়েছে। ঘরের ভেতরে ছেলেটির সামনে অতীতের ইতিহাস খোলা ছিল, আর ঘরের ঠিক বাইরে কলকাতার রাজপথে তখন রচিত হচ্ছিল সাধারণ মানুষের বাঁচার লড়াইয়ের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস (১৯৫৯-এর খাদ্য আন্দোলন)। সেই জীবন্ত ইতিহাসের নির্মম বলি হতে চলেছিল স্বয়ং এই কিশোরটি—খোলা পাতাটি যেন সেই আসন্ন ট্র্যাজেডিরই এক নিঃশব্দ সংকেত।

পড়াশোনায় মন না বসার কারণ (২):

  • বাবার জন্য প্রতীক্ষা: বাবা মাইনে নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরবেন এবং পুজোবাজার করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু রাত নামলেও বাবার দেখা না মেলায় ছেলেটির মন কেবল দরজার দিকেই পড়েছিল।
  • নতুন জামার আকাঙ্ক্ষা: পুজোর প্রধান আনন্দ নতুন জামা। সেই জামা কেনা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় তার সমস্ত চঞ্চলতা বইয়ের পাতাকে অর্থহীন করে তুলেছিল।

✨ মূল বার্তা

বাবার না-ফেরার প্রশ্ন দিয়ে শুরু হয়ে কবিতাটি শেষ হয় ছেলের না-ফেরার হাহাকারে। এই ব্যবধানেই রাষ্ট্রীয় নির্মমতার বিরুদ্ধে কবির তীব্র প্রতিবাদ ধরা পড়েছে।

বাংলা সহায়ক · banglasahayak.com

Your Cart

error: Content is protected !!
Scroll to Top