বইমেলায় একদিন
“বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না।”
— সৈয়দ মুজতবা আলী
ভূমিকা
শীতকাল মানেই উৎসবের আমেজ। বাংলার নানা প্রান্তে বসে বিভিন্ন ধরনের মেলা, আর তার মধ্যে বইমেলা হলো জ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য উৎসব। বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার স্থান নয়; এটি লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের এক মিলনমঞ্চ। বই মানুষের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে, কল্পনাকে প্রসারিত করে এবং মননকে শাণিত করে। তাই বইপ্রেমীদের কাছে বইমেলা এক মহোৎসবের নাম।
বইমেলায় যাওয়ার আনন্দ
এ বছর পরিবারের সঙ্গে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। বহুদিন ধরে এই দিনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মেলার প্রবেশদ্বারে পৌঁছাতেই চোখে পড়ল রঙিন ফেস্টুন, আলোকসজ্জা, মানুষের ঢল এবং উৎসবমুখর পরিবেশ। চারদিকে বইপ্রেমীদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছিল—জ্ঞান ও সাহিত্যের এক বিশাল সমুদ্রে এসে উপস্থিত হয়েছি ।

মেলার মনোমুগ্ধকর পরিবেশ
মেলার ভেতরে ঢুকতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। সারি সারি সুসজ্জিত স্টল, অসংখ্য প্রকাশনা সংস্থা, নতুন ও পুরোনো বইয়ের বিশাল সম্ভার, সব মিলিয়ে যেন এক অন্য জগৎ। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ছাড়াও বিভিন্ন বিদেশি ভাষার বই সেখানে পাওয়া হচ্ছিল। নতুন বইয়ের মনমাতানো গন্ধ মনকে এক অপার্থিব আনন্দে ভরিয়ে তুলছিল। সত্যিই নতুন বইয়ের সেই স্নিগ্ধ সুবাস আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান।
বই দেখা
আমি একের পর এক স্টলে ঘুরে ঘুরে বই দেখছিলাম। নানা ধরনের উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ভ্রমণকাহিনি, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও জীবনীগ্রন্থ আমাকে গভীরভাবে আকর্ষণ করছিল। অসংখ্য বই দেখে আমি বিস্মিত হয়ে পড়েছিলাম।
আমার বই কেনা
“আমরা যখন বই সংগ্রহ করি, তখন আমরা আনন্দকেই সংগ্রহ করি।”
অনেক বই কিনতে ইচ্ছা হলেও তা সম্ভব ছিল না। তাই পছন্দের বইগুলোর নাম লিখে রাখলাম। শেষ পর্যন্ত আমার সংগ্রহে যুক্ত হলো চমৎকার কিছু বই:
- 📖 ‘সুকান্ত সমগ্র’ ও ‘ঠাকুমার ঝুলি’
- 📖 ‘ব্যোমকেশ বক্সী সমগ্র’ ও ‘পথের পাঁচালী’
- 📖 ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ ও রবি ঠাকুরের ‘গল্পগুচ্ছ’
- 📖 একটি বিজ্ঞানবিষয়ক বই, একটি সাধারণ জ্ঞানের বই এবং একটি বাংলা অভিধান
নতুন বই হাতে পাওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লেখক-পাঠকের মিলন
বইমেলার আরেকটি আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন সাহিত্যসভা, কবিতা পাঠ, বই প্রকাশ অনুষ্ঠান ও লেখক-পাঠকের সরাসরি সাক্ষাৎ। শিশু-কিশোর কর্নারে ছোটদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। কোথাও আলোচনা সভা, কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে বইমেলা যেন প্রাণবন্ত এক সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, বই কেবল জ্ঞানের ভাণ্ডার নয়, মানুষের হৃদয়েরও সেতুবন্ধন।
ফেরার সময়ের অনুভূতি
ঘুরতে ঘুরতে কখন যে সময় কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। সন্ধ্যা নেমে এলে বাড়ি ফেরার সময় হলো। তখন মনটা কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে উঠল। মনে হচ্ছিল, এখনও কত স্টল দেখা বাকি, কত বই পড়া বাকি! নতুন কেনা বইগুলোর আনন্দ যেমন ছিল, তেমনি বইমেলা ছেড়ে আসার এক অদ্ভুত কষ্টও অনুভব করছিলাম। মনে মনে ঠিক করলাম, আগামী বছর আবার আরও বেশি সময় নিয়ে বইমেলায় আসব।
বইমেলার গুরুত্ব
বইমেলা মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলে, জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করে এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটায়। প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান যুগেও বইমেলা মানুষকে বইয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে, নতুন লেখক ও নতুন চিন্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। একটি शिक्षित, সচেতন ও মননশীল সমাজ গঠনে বইমেলার ভূমিকা অপরিসীম।
উপসংহার
বইমেলায় কাটানো দিনটি আমার জীবনের অন্যতম আনন্দময় ও শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। সেদিন আমি শুধু কয়েকটি বই কিনিনি; সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি নতুন জ্ঞানের আলো, সাহিত্যপ্রেম এবং অসংখ্য অনুপ্রেরণা। তাই আমি বিশ্বাস করি, বইমেলা কেবল বইয়ের বাজার নয়, এটি আলোকিত মানুষ গড়ার এক মহৎ আয়োজন।
“ রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে আসবে, কিন্তু বইখানা অনন্ত- যৌবনা- যদি তেমন বই হয়।”
— ওমর খৈয়াম
