প্রলয়োল্লাস – কাজী নজরুল ইসলাম
মূলগ্রন্থ : অগ্নিবীণা

১. ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটির মূল কাব্যগ্রন্থের নাম কী ?
(ক) সর্বহারা
(খ) অগ্নিবীণা
(গ) ফণীমনসা
(ঘ) সাম্যবাদী
২. ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর !’ —কবিতায় বাক্যটি কত বার ব্যবহৃত হয়েছে ?
(ক) ১৫ বার
(খ) ১৭ বার
(গ) ১৯ বার
(ঘ) ২০ বার
৩. বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে’ — কে আসছে ?
(ক) ভয়ংকর
(খ) শংকর
(গ) দ্বিগম্বর
(ঘ) শুভংকর
৪. জীবনহারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন ।’— কে আসে ?
(ক) মহাকাল সারথি
(খ) চিরসুন্দর
(গ) নবীন
(ঘ) প্রলয়
৫. ‘সর্বনাশী জ্বালামুখী’ কাকে বলা হয়েছে ?—(ক) সূর্যকে (খ) নক্ষত্রকে (গ) চন্দ্রকে (ঘ) ধূমকেতুকে
৬. ওই নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড় ।’ — ‘কেতন’ শব্দটির অর্থ কী ?
(ক) শিখা
(খ) পতাকা
(গ) ঝড়
(ঘ) জয়টিকা
৭. “কাল ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে”- যার আসার কথা বলা হয়েছে
ক) সুন্দর
খ) চিরসুন্দর
গ) নবীন
ঘ) মহাকাল
৮. “অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ” –
(ক) মহাকাল
(খ) চরাচর
(গ) গগনতল
(ঘ) গিরিশিখর
৯. কবি ‘নূতনের কেতন’ বলেছেন
ক) কালবোশেখির ঝড়কে
খ) বিশ্বমায়ের আসনকে
গ) দ্বাদশ রবির বহ্নিজ্বালাকে
ঘ) অট্টরোলের হট্টগোলকে
১০. “ভেঙে আবার গড়তে জানে সে __________!”-শূন্যস্থানে বসবে
ক) সুন্দর
খ) মহাকাল
গ) নবীন
ঘ) চিরসুন্দর
১১. “________ রবির বহ্নিজ্বালা ভয়াল তাহার নয়নকটায়,”
ক) সপ্ত
খ) দ্বাদশ
গ) উষ্ণ
ঘ) মধ্য গগণ
১২. “দিগন্তরের কাঁদন লুটায় পিঙ্গল তার ত্রস্ত জটায়।”- ‘পিঙ্গল’ শব্দের অর্থ-
ক) পীত (হলুদ) রঙের আভাযুক্ত গাঢ় নীল
খ) সাদা
গ) রক্তবর্ণ
ঘ) খয়েরি
১৩. জরায় মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ লুকানো রয়েছে-
ক) প্রলয়ের মধ্যে
খ) ধ্বংসের মধ্যে
গ) সৃষ্টির মধ্যে
ঘ) বিনাশের মধ্যে
১৪. ‘প্রলয়োল্লাস’ শব্দের অর্থ হল-
ক) ধ্বংসের আনন্দ
খ) রথঘর্ঘর
গ) ভয়ংকরের চণ্ডরূপ
ঘ) দিগন্তরের কাঁদন
১৫.’রক্ত-তাহার কৃপাণ ঝোলে’-‘কৃপাণ’ শব্দের অর্থ-
ক) ঝামর
খ) চাবুক
গ) তীর
ঘ) খড়গ
১৬. ‘অট্টরোলের হট্টগোলে স্তব্ধ’-
ক) চরাচর
খ) মহাকাল
গ) গগনতল
ঘ) গিরিশিখর
১৭. “দিগম্বরের জটায় হাসে”-
ক) গঙ্গানদীর জল
খ) পার্বতীর মুখ
গ) শিশু-চাঁদের কর
ঘ) কোনোটিই নয়
১৮. “উল্কা ছুটায় নীল খিলানে”-‘নীল খিলান’ বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে-
ক) প্রাসাদকে
খ) নীল স্তম্ভকে
গ) নীল আকাশকে
ঘ) নীল সমুদ্রকে
১৯. “মাভৈঃ মাভৈঃ” – মাভৈঃ শব্দের অর্থ –
ক) ভয় কোরো না
খ) ভয়ংকর
গ) সাবধান
ঘ) ভয় দূর হয়ে গেছে
২০. “কেশের দোলায় ঝাপটা মেরে গগন দুলায়।”- কে?
ক) বাতাস
খ) চামর
গ) সাগর
ঘ) ঝামর
উত্তরমালা
১খ ২গ ৩ক ৪গ ৫ঘ
৬খ ৭ক ৮খ ৯ক ১০ঘ
১১খ ১২ক ১৩ঘ ১৪ক ১৫ঘ
১৬ক ১৭গ ১৮গ ১৯ক ২০ঘ
কমবেশি কুড়িটি শব্দের মধ্যে উত্তর দাও।
১) ‘আসছে ভয়ংকর!’ – ভয়ংকর কীভাবে আসছে?
২) ‘স্তব্ধ চরাচর!’ – কী কারণে চরাচর স্তব্ধ হয়েছিল?
৩) “তোরা সব জয়ধ্বনি কর । ” – কবি কাদের জয়ধ্বনি করতে বলেছেন?
৪) ‘প্রলয়-নেশার নৃত্য পাগল’-এখানে কার কথা বলা হয়েছে ?
৫) ‘বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর!’-কবি কেন এমন বলেছেন?
৬) “জগৎ জুড়ে প্রলয় এবার ঘনিয়ে আসে ।”- কেন ?
৭) “বধূরা প্রদীপ তুলে ধর।”- বধূদের প্রদীপ তুলে ধরতে বলা হয়েছে কেন?
৮) ‘এবার মহানিশার শেষে’-কে আসবে?
৯) ‘বধূরা প্রদীপ তুলে ধর’-বধূরা কার উদ্দেশে প্রদীপ তুলে ধরবে?
১০) ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?’- কবি এ প্রশ্ন কাদের উদ্দেশ্যে করেছেন?
অথবা, ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?’-কবি ধ্বংসকে ভয় পেতে নিষেধ করেছেন কেন?
মাধ্যমিক পরীক্ষায় ১ নম্বরের যেসব প্রশ্ন এসেছিল
১. “ওরে ওই স্তব্ধ চরাচর!”-‘চরাচর’ স্তব্ধ কেন ? [মাধ্যমিক, ২০১৮]
উত্তর: প্রলয়ংকর শিবের অট্টহাসির প্রচণ্ড শব্দে চরাচর অর্থাৎ গোটা পৃথিবী জৎ, যার মধ্যে দিয়ে কবি বোঝাতে চেয়েছেন বিপ্লবীদের প্রচণ্ড বিপ্লবস্পৃহা পরাধীন দেশে প্রলয়ের বার্তা বহন করে এনেছে।
২. “প্রলয় বয়েও আসছে হেসে”-‘প্রলয়’ বহন করেও হাসির কারণ কী?[মাধ্যমিক, ২০১৯]
উত্তর: ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় প্রলয় অর্থাৎ ধ্বংসের বার্তা নিয়ে মহাকাল এসেছেন হাসিমুখে, কারণ তিনি যেমন ধ্বংস করবেন, তেমনই নতুন সৃষ্টিও করবেন।
৩. “ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?”-কবি এ প্রশ্ন কাদের উদ্দেশ্যে করেছেন?[মাধ্যমিক, ২০২০]
উত্তর: অচেতন, ভীর এবং নতুনকে গ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত দেশবাসীকে উদ্দেশ্য করে কবি প্রশ্নটি করেছেন।
৪. “এবার মহানিশার শেষে’-কে আসবে?[মাধ্যমিক, ২০২২]
▶ মহানিশার শেষে ভোর আসবে নতুন সূর্যের হাসিকে সঙ্গে নিয়ে, অর্থাৎ পরাধীনতার অন্ধকার কেটে গিয়ে স্বাধীনতার সূর্যের উদয় ঘটবে।
৫. “ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর”- কবি ধ্বংসকে ভয় পেতে নিষেধ করেছেন কেন? [মাধ্যমিক, ২০২৩]
▶ অচেতন, ভীরু এবং নতুনকে গ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত দেশবাসীকে উদ্দেশ্য করে কবি ভয় পেতে নিষেধ করেছেন কারণ সেই ধ্বংসের মধ্যেই রয়েছে সৃজনের বার্তা।
প্রসঙ্গ নির্দেশসহ কমবেশি ৬০টি শব্দে উত্তর দাও :
১. “তোরা সব জয়ধ্বনি কর!”-‘তোরা’ কারা? তাদের জয়ধ্বনি করতে বলা হচ্ছে কেন? ১+২
উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে।
‘তোরা’ কারা?
কবিতায় ‘তোরা’ বলতে কবি পরাধীন ভারতবর্ষের শোষিত-বঞ্চিত সমগ্র দেশবাসীকে বুঝিয়েছেন।
তাদের জয়ধ্বনি করতে বলার কারণ:
প্রলয় বা ধ্বংস সাধারণত ভীতি সঞ্চার করলেও কবির মতে, এটি আসলে অন্যায়, শোষণ ও পরাধীনতার জঞ্জাল মোছার মাধ্যম। এই প্রলয়ংকরী বিনাশের গর্ভেই লুকিয়ে আছে এক সুন্দর, কুসুমিত পৃথিবীর জন্মক্ষণ। দীর্ঘ অমাবস্যার অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা ও নতুন সৃষ্টির আলো আসবে বলেই কবি দেশবাসীকে ভয় না পেয়ে প্রলয়কে জয়ধ্বনির মাধ্যমে স্বাগত জানাতে বলেছেন।
২. “বজ্রশিখার মশাল জ্বেলে আসছে ভয়ংকর।”-‘ভয়ংকর’ বলতে কবি কী বোঝাতে চেয়েছেন? তার আসার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। ১+২
উত্তর: নিজেরা করো ।
৩. “এবার মহানিশার শেষে/আসবে ঊষা অরুণ হেসে” -‘মহানিশা’ কী? এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে কবি কীসের ইঙ্গিত দিয়েছেন? ১+২
উত্তর: নিজেরা করো ।
৪. ‘দিগম্বরের জটায় হাসে শিশু-চাঁদের কর’- দিগম্বর কে? উদ্ধৃতিটির অর্থ কী?১+২
উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় দিগম্বর হলেন মহাদেবরূপী শক্তিশালী তরুণ বিপ্লবী প্রাণ।
- মহাদেবের কপালে থাকে একফালি চাঁদ বা ‘শিশু চাঁদ’। ‘কর’ কথার অর্থ কিরণ। আসলে মহাদেবরূপী দেশের তরুণ বিপ্লবী সমাজই দেশের অগ্রদূত, যারা পথের দিশা বা আলো দেখায়।
৫. ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?’- ধ্বংসকে ভয় না-পাওয়ার কারণটি বুঝিয়ে দাও। ৩
উত্তর: নিজেরা করো ।
৬. ‘আসছে নবীন- জীবনহারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন!- উদ্ধৃতিটির তাৎপর্য লেখো। ৩
উত্তর: নিজেরা করো ।
৭. ‘ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চিরসুন্দর!-‘সে’ কে? ভেঙে আবার গড়ার বিষয়টি বুঝিয়ে দাও। ১+২
উত্তর: নিজেরা করো ।
কমবেশি ১৫০ শব্দের মধ্যে উত্তর লেখো :
১.প্রশ্ন :- ” তোরা সব জয়ধ্বনি কর!” — ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় এই আহ্বানটির পুনরাবৃত্তির কারণ উল্লেখ করো।
অথবা, ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’-কবির এই কথা বলার কারণ সংক্ষেপে লেখো। ৫
উত্তর:- বাংলা কাব্য সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত সমস্ত কবিতায় অগ্নি আখরে বিদ্রোহের সুরে প্রতিবাদের গান সোচ্চার কন্ঠে গেয়েছেন। ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতাটিও তার ব্যতিক্রম নয়।
আলোচ্য কবিতায় মোট উনিশ বার ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর ‘এই আহ্বান সূচক পঙক্তিটি উচ্চারিত হয়েছে। কবি নজরুল সমগ্র দেশবাসীর উদ্দেশ্য এই জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। প্রলয় সাধারণত মানুষের মনে ধ্বংসাত্মক ভীতির সঞ্চার করে। কিন্তু এই প্রলয় আসলে পৃথিবীর বিনাশ নয়, পৃথিবীর ওপর হতে থাকা নানা ধরনের অত্যাচার-অবিচার-অন্যায়-অপরাধ-শোষন-বঞ্চনা-লাঞ্ছনা ইত্যাদির বিনাশ। এই বিনাশের শেষে সুন্দর মনোহরা কুসুমিত পৃথিবীর সন্ধান মিলবেই-এই বিশ্বাস তাঁর অটুট। তাই পৃথিবীতে যখন প্রলয় নেমে আসছে, তখন কবি তাকে স্বাগত জানিয়ে আরো বেশি করে জয়ধ্বনি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
জগৎ জুড়ে যে প্রলয় ঘনিয়ে এসেছে তার প্রলয়ংকরী রূপ দেখে চরাচর স্তব্ধ। কিন্তু কবি ভয় পেতে বারণ করেছেন। কবি বলেছেন-জরায় মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ লুকানো ঐ বিনাশে’। প্রচণ্ড শক্তি আর অদম্য স্পৃহায় নবীন বিপ্লবীরা আপন প্রাণ দানের অঙ্গীকার বদ্ধ হয়ে ভয়াল ভয়ংকর প্রবল বেগে আসে- ‘জীবনহারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন’। তাই তাদের অভ্যর্থনা জানাতে হবে সমাজকে সুন্দর করে তুলতে। একারণেই কবি নজরুল ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ পঙক্তিটি পুনরাবৃত্ত করেছেন।
২. প্রশ্ন- “ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন”- কোন ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে? প্রলয়কে কেন ‘নূতন সৃজন-বেদন’ বলা হয়েছে?
উৎস: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত অংশটি নেওয়া হয়েছে।
কোন ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে?
আলোচ্য কবিতায় ‘ধ্বংস’ বলতে কবি মূলত জরাজীর্ণ, স্থবির ও পরাধীন সমাজব্যবস্থার বিনাশকে বুঝিয়েছেন। সমাজের বুকে জেঁকে বসা কুসংস্কার, জড়তা, ভীরুতা এবং যা কিছু ‘অসুন্দর’ ও ‘অকল্যাণকর’, তাকে সমূলে বিনাশ করার কথা এখানে বলা হয়েছে।
প্রলয়কে ‘নূতন সৃজন-বেদন’ বলার কারণ :
নজরুল বিশ্বাস করতেন ধ্বংসই সৃষ্টির আদি সোপান। প্রলয়কে ‘নূতন সৃজন-বেদন’ বলার কারণগুলো হলো:
সৃষ্টির অনিবার্য যন্ত্রণা: প্রসবকালীন যন্ত্রণার মধ্য দিয়েই যেমন একজন জননী নতুন প্রাণের জন্ম দেন, তেমনি একটি নতুন সমাজ বা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী ও কষ্টসাধ্য। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন বা ধ্বংসের বেদনা আসলে নতুন সৃষ্টিরই পূর্বলক্ষণ।
পুরাতনের বিনাশে নতুনের জয়গান: জীর্ণ পাতা ঝরে গেলেই যেমন গাছে নতুন কিশলয় জন্মায়, তেমনি জরাজীর্ণ পুরাতনকে ধ্বংস করেই আগামীর ‘সুন্দর’ প্রতিষ্ঠিত হয়। কবি দেখিয়েছেন, শিবরূপী তরুণ বিপ্লবীরা যে প্রলয় ঘটাবে, তা আসলে পরাধীনতার অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতার নতুন সূর্যকে ছিনিয়ে আনার এক পবিত্র ‘সৃজন-বেদনা’।
শিবের তাণ্ডব ও কল্যাণ: মহাদেব যেমন ধ্বংসের দেবতা হয়েও জগতের মঙ্গল সাধন করেন, ঠিক তেমনি বিপ্লবীদের এই ধ্বংসাত্মক রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে দেশমাতৃকার মুক্তির মহান সৃজন।
৩. প্রশ্ন- ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় একদিকে ধ্বংসের চিত্র, আরেকদিকে নতুন আশার বাণী কীভাবে ফুটে উঠেছে, তা কবিতা অবলম্বনে লেখো।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় ধ্বংসের ভয়াবহতা এবং নতুনের আবাহন সমান্তরালভাবে প্রবহমান। আলোচ্য কবিতায় কবি ধ্বংসের ভয়াবহতার মধ্যে আশার আলোর সন্ধান পেয়েছেন।
ধ্বংসের চিত্র:
কবিতার শুরুতে কালবৈশাখীর তাণ্ডব, ‘প্রলয়-নেশার নৃত্য-পাগল’ মহাকালের আগমন এবং ‘সর্বনাশী জ্বালামুখী ধুমকেতু’র উল্কাপাত এক প্রলয়ংকরী আবহ তৈরি করে। রক্তমাখা তরবারি আর বজ্রশিখার মশালে চরাচর স্তব্ধ হয়ে যায়। এই ধ্বংসাত্মক রূপ মূলত পরাধীন ভারতের জরাজীর্ণ শাসনব্যবস্থা ও জড়তাকে ভেঙে ফেলার প্রতীক।
আশার বাণী:
তবে এই প্রলয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নতুন আশার আলো। কবি বিশ্বাস করেন, অমাবস্যার অন্ধকার শেষেই নতুন দিনের সূর্য ওঠে। জরায়-মরা মুমূর্ষুদের প্রাণ এই বিনাশের মধ্যেই সুপ্ত থাকে। ‘অন্ধ কারার বন্ধ কূপে’ বন্দি দেবতাদের (বিপ্লবীদের) উদ্ধার করতেই মহাকালের সারথি ধেয়ে আসছেন। কবি আশ্বস্ত করেছেন যে, এই প্রলয় আসলে ‘সৃজন-বেদন’—যা অসুন্দরকে বিনাশ করে চির-সুন্দরকে প্রতিষ্ঠা করবে। তাই ধ্বংসের এই মহোৎসবে ভয় না পেয়ে কবি দেশবাসীকে ‘জয়ধ্বনি’ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
৪. “কাল-ভয়ংকরের বেশে এবার ওই আসে সুন্দর” -‘কাল-ভয়ংকর’ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? কবি তাকে সুন্দর বলেছেন কেন?১+৪
উত্তর: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতা থেকে উদ্ধৃতিটি নেওয়া হয়েছে। আলোচ্য কবিতায় ‘কাল-ভয়ংকর’ বলতে প্রলয়দেবতা শিব বা মহাকালের রুদ্র রূপকে বোঝানো হয়েছে। রূপক অর্থে কবি এখানে পরাধীন ভারতের সেই তরুণ বিপ্লবীদের ‘কাল-ভয়ংকর’ বিশেষণে ভূষিত করেছেন।
তাকে ‘সুন্দর’ বলার কারণ:
সাধারণত ধ্বংস বা ভয়ংকর রূপকে আমরা অসুন্দর মনে করি, কিন্তু কবি নজরুল এখানে এক গভীর সত্য উন্মোচন করেছেন। তাকে ‘সুন্দর’ বলার কারণগুলো হলো:
- অসুন্দরের বিনাশ: কবির মতে, সমাজে যা কিছু জরাজীর্ণ, স্থবির, মৃতপ্রায় এবং পরাধীনতার গ্লানিতে ভরা, তা-ই আসলে ‘অসুন্দর’। এই অসুন্দরকে উপড়ে ফেলার জন্য ধ্বংসের প্রয়োজন।
- নতুনের আবাহন: ধ্বংসের পরেই নতুনের সৃষ্টি হয়। কাল-ভয়ংকর যেমন একদিকে বিনাশ করেন, অন্যদিকে নতুনের আগমনের পথ প্রশস্ত করেন। এই নতুনের সৃজন-বেদনার মধ্যেই প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।
- শিবের কল্যাণময় রূপ: পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, শিব বা রুদ্রদেব যেমন প্রলয় ঘটিয়ে জগতকে পাপমুক্ত ও পবিত্র করেন, বিপ্লবীরাও তেমনি ধ্বংসের মাধ্যমে পরাধীনতার অন্ধকার ঘুচিয়ে স্বাধীনতার আলো নিয়ে আসে।
- আশার প্রতীক: ধ্বংসের মশাল হাতে নিয়ে যে কাল-ভয়ংকর আসছে, তার আগমনেই ‘অন্ধ কারার বন্ধ কূপে’ বন্দি থাকা বিপ্লবীরা মুক্তি পাবে। এই মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বপ্নই কবিকে দিয়ে বলািয়েছে যে— ভয়ংকর বেশে আসলেও সে আসলে ‘সুন্দর’।
উপসংহার: ধ্বংসের মধ্য দিয়ে জগতকে নতুন করে সাজানোর এই আকাঙ্ক্ষাই ভয়ংকরকে সুন্দরে রূপান্তরিত করেছে।
