বাংলা সহায়ক
সার্ধশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি (১৮৭৬ – ২০২৬)
সার্ধশতবর্ষে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বাংলা সহায়ক
•
পঠন সময়: ৮ মিনিট
ভূমিকা
বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক অবিস্মরণীয় নাম। সাধারণ মানুষের জীবন, দুঃখ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, সামাজিক বৈষম্য এবং নারীর বঞ্চনাকে তিনি অসাধারণ মমতা ও বাস্তবতার সঙ্গে সাহিত্যে রূপ দিয়েছেন। ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণকারী এই জনপ্রিয় কথাশিল্পীর ১৫০তম জন্মবর্ষ ২০২৬ সালে পূর্ণ হচ্ছে। সার্ধশতবর্ষে তাই তাঁর জীবন, সাহিত্য ও সমাজভাবনার দিকে ফিরে দেখা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
জন্ম ও শৈশব
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় হুগলি জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সাহিত্যপ্রবণ এবং মাতা ভুবনমোহিনী দেবী। শৈশবের একটি বড় অংশ ভাগলপুরে কাটে। দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়েছিল। এই জীবন-অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করে।
শিক্ষা ও কর্মজীবন
অর্থাভাবের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবন বারবার ব্যাহত হয়। ভাগলপুরের তেজনারায়ণ জুবিলি কলেজিয়েট স্কুল থেকে তিনি ১৮৯৪ সালে এনট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে আর্থিক কারণে উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পারেননি। কর্মসূত্রে তিনি বর্মার রেঙ্গুনে যান এবং সেখানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে কাজ করেন। ১৯১৬ সালে চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে সম্পূর্ণভাবে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন।
সাহিত্যকীর্তি
শরৎচন্দ্রের সাহিত্যজগৎ অত্যন্ত বিস্তৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস—‘বড়দিদি’, ‘পল্লীসমাজ’, ‘দেবদাস’, ‘চরিত্রহীন’, ‘শ্রীকান্ত’, ‘দত্তা’, ‘গৃহদাহ’, ‘দেনা-পাওনা’, ‘পথের দাবী’ ও ‘শেষ প্রশ্ন’। ‘রামের সুমতি’, ‘মহেশ’, ‘অভাগীর স্বর্গ’, ‘বিন্দুর ছেলে’ প্রভৃতি গল্পেও তাঁর অসাধারণ মানবদৃষ্টি প্রকাশ পেয়েছে।
সমাজবাস্তবতা ও মানবতাবাদ
শরৎচন্দ্র ছিলেন সমাজসচেতন কথাশিল্পী। তাঁর রচনায় তৎকালীন সমাজের কুসংস্কার, জাতিভেদ, দারিদ্র্য, সামাজিক অনাচার ও বৈষম্যের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। সমাজের অবহেলিত মানুষ, দরিদ্র, নিপীড়িত এবং তথাকথিত পতিত মানুষের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর সহানুভূতি। মানুষের সামাজিক পরিচয়ের চেয়ে মনুষ্যত্বকেই তিনি বেশি মূল্য দিয়েছেন।
নারীচরিত্র
শরৎসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য তাঁর শক্তিশালী নারীচরিত্র। ‘দত্তা’-র বিজয়া, ‘শ্রীকান্ত’-এর রাজলক্ষ্মী, ‘গৃহদাহ’-এর অচলা এবং ‘চরিত্রহীন’-এর কিরণময়ীর মতো চরিত্রের মাধ্যমে তিনি নারীর আত্মমর্যাদা, প্রেম, স্বাধীনতা ও মানসিক দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর রচনায় প্রতিবাদের সুর স্পষ্ট।
দেশপ্রেম ও ‘পথের দাবী’
শরৎচন্দ্রের সাহিত্য কেবল ব্যক্তিগত প্রেম ও পারিবারিক জীবনের কাহিনি নয়। তাঁর ‘পথের দাবী’ উপন্যাসে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লবী চেতনা প্রকাশ পেয়েছে। উপন্যাসটি ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। এর মাধ্যমে তাঁর দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় পাওয়া যায়।
ভাষাশৈলী
শরৎচন্দ্রের ভাষা সহজ, সাবলীল, স্বাভাবিক ও হৃদয়স্পর্শী। কথ্যভাষার স্বতঃস্ফূর্ত ব্যবহার এবং চরিত্রের মনস্তত্ত্বকে সহজভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ। তাঁর সাহিত্য সাধারণ শিক্ষিত পাঠকের পাশাপাশি বৃহত্তর জনসমাজের কাছেও সহজে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল।
সম্মান ও স্বীকৃতি
তাঁর অসামান্য সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ১৯২৩ সালে জগত্তারিণী স্বর্ণপদকে সম্মানিত করে। ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট. উপাধি প্রদান করে। জনপ্রিয়তার জন্য তিনি ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ নামে খ্যাত হন।
সার্ধশতবর্ষে প্রাসঙ্গিকতা
সময় বদলেছে, সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছে; কিন্তু মানুষের প্রেম, বেদনা, আত্মমর্যাদা, সামাজিক বৈষম্য ও সম্পর্কের সংকট আজও রয়েছে। তাই শরৎচন্দ্রের সাহিত্য এখনও প্রাসঙ্গিক। তাঁর রচনা আমাদের শুধু বিনোদন দেয় না, মানুষ ও সমাজকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখতে শেখায়।
উপসংহার
১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি শরৎচন্দ্রের জীবনাবসান হলেও তাঁর সাহিত্যজীবনের অবসান ঘটেনি। সার্ধশতবর্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে কেবল একজন জনপ্রিয় লেখককে স্মরণ করা নয়; বরং মানবতা, সাম্য, নারীর মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়ের মূল্যবোধকে নতুন করে উপলব্ধি করা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য যতদিন থাকবে, ততদিন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর কালজয়ী সাহিত্যসৃষ্টির মধ্য দিয়ে পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।
বাংলা সহায়ক
বাঙালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ধ্রুপদী সাহিত্যচর্চা নিয়ে নিবেদিত সংবাদ ও প্রবন্ধ প্রকাশনা বিভাগ। শরৎচন্দ্রের সার্ধশতবর্ষ উপলক্ষে বিশেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য।
