বিশ্বের ভাষা ও পরিবার |একাদশ শ্রেণি |প্রথম সেমেস্টার|ভাষা


একাদশ শ্রেণি • প্রথম সেমিস্টার

বিশ্বের ভাষা ও ভাষাপরিবার

ভূমিকা ও প্রাথমিক তথ্য

🌍 বিশ্বের ভাষা

ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, বিশ্বে প্রায় ৩,০০০ ভাষা এবং সেগুলির বহু বৈচিত্র্য ও উপভাষা ছড়িয়ে রয়েছে।

📜 তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান

১৭৮৬ সালে কলকাতার ‘রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি’-র অধিবেশনে স্যার উইলিয়াম জোন্স প্রথম সংস্কৃত, গ্রিক, লাতিন ও জার্মানিক ভাষার মধ্যে গভীর সাদৃশ্য তুলে ধরে তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেন।

ভাষার প্রধান শ্রেণিবিভাগ পদ্ধতি

পৃথিবীর ভাষাগুলিকে প্রধানত ৬টি উপায়ে ভাগ করা হয়:

১. রূপতাত্ত্বিক/আকৃতিগত
২. গোত্র বা বংশানুযায়ী
৩. মহাদেশভিত্তিক
৪. দেশভিত্তিক
৫. ধর্মীয়
৬. কালগত

রূপতাত্ত্বিক বা আকৃতিগত শ্রেণিবিভাগ

শব্দ ও বাক্যের গঠনশৈলী অনুযায়ী বিশ্বের ভাষা ২টি প্রধান বর্গে বিভক্ত:

রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগ
অনন্বয়ী / অসমবায়ী
উপসর্গ/বিভক্তিহীন, পদে অবস্থানের দ্বারা অর্থ নির্দেশিত হয়। (যেমন: চিনা)

সমবায়ী
মুক্তান্বয়ী: বিভক্তি আলাদা করলেও অর্থ স্পষ্ট। (তুর্কি, সোয়াহিলি)
অত্যন্বয়ী: বাক্যই প্রধান অংশ। (এস্কিমো)
সমন্বয়ী: মূল শব্দের সাথে বিভক্তি মিশে যায়। (বাংলা, সংস্কৃত, ইংরেজি)

গোত্র বা বংশানুযায়ী শ্রেণিবিভাগ (ভাষাপরিবার)

অতীতে কোনো এক মূল ভাষা থেকে সৃষ্ট ভাষাগুলিকে সমগোত্রজ (Cognate) ভাষা এবং তাদের পরিবারকে ভাষাবংশ বলে। বিশ্বে প্রধান ভাষাবংশ ১২টি:

ক্র.নং.ভাষাবংশের নামপ্রধান ভাষা / শাখাবিশেষ তথ্য / উদাহরণ
ইন্দো-ইউরোপীয় (বৃহত্তম)৯টি প্রধান শাখাবিশ্বের সবচেয়ে বিস্তার লাভ করা ভাষাবংশ।
সেমীয়-হামীয়হিব্রু, আরবি, মিশরীয়হিব্রু ভাষা ইজরায়েলের সরকারি ও বাইবেলের ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এর ভাষা।
বান্টুসোয়াহিলি, কঙ্গো, জুলু, মাসাইআফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত।
ফিনো-উগ্রীয় (উরালীয়)হাঙ্গেরীয়, ফিনিস, এস্তোনীয়ইউরোপে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার মাঝে দ্বীপের মতো বিরাজমান।
তুর্ক-মোঙ্গল-মাঞ্চু (আলতাইক)তুর্কি, মোঙ্গলীয়মধ্য ও উত্তর এশিয়ায় প্রচলিত।
ককেশীয়জর্জীয়ককেশাস পার্বত্য অঞ্চলে প্রচলিত।
দ্রাবিড়তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালায়ালমদক্ষিণ ভারতের প্রধান ভাষাপরিবার।
অস্ট্রিকসাঁওতালি, মুণ্ডারি, খাসিদক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতের প্রাচীন আদিবাসীদের ভাষা।
ভোট-চিনীয়মান্দারিন (চিনা), তিব্বতি, বর্মিবিশ্বের অন্যতম জনবহুল ভাষাগোষ্ঠী।
১০প্রাচীন এশীয়কামচাটকান, ইউকাগিরসাইবেরিয়া ও উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় প্রচলিত।
১১এসকিমো-আলেউটইনুক্টিটুট (এসকিমো)উত্তর মেরু ও সংলগ্ন আমেরিকা অঞ্চলে প্রচলিত।
১২আমেরিকার আদিম ভাষাসমূহমায়া, আজতেক, কিচুয়া (ইনকা)আমেরিকার প্রাচীন সভ্যতার ভাষা।

🏛️ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের বিশেষ শাখা পরিচিতি

ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশের ৯টি প্রধান শাখা: ইতালীয়, গ্রিক, জার্মানিক, কেলতিক, তোখারীয়, আলবেনীয়, বালতো-স্লাভীয়, আরমেনীয়, এবং ইন্দো-ইরানীয়।

কেন্তুম্ (Kentum) বর্গ:
গ্রিক, ইতালীয়, জার্মানিক, কেলতিক, তোখারীয়।
সতম্ (Satem) বর্গ:
ইন্দো-ইরানীয়, আলবেনীয়, আরমেনীয়, বালতো-স্লাভীয়।

  • গ্রিক শাখা: খ্রিস্টপূর্ব ১৪৫০ অব্দে ক্রিট দ্বীপে এর নিদর্শন মেলে। হোমারের ইলিয়াডওডিসি এ ভাষায় রচিত।
  • ইতালীয় শাখা: প্রধান ভাষা লাতিন। এ থেকে উদ্ভূত—ফরাসি, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, পর্তুগিজ।
  • জার্মানিক শাখা: উত্তর শাখা (সুইডিশ, নরওয়েজিয়ান) ও পশ্চিম শাখা (ইংরেজি, জার্মান, ডাচ্)।
  • ইন্দো-ইরানীয় শাখা: দুটি উপশাখা—
    • ইরানীয় আর্য: প্রাচীনতম গ্রন্থ জরথুস্ট্রীয়দের ‘জেন্দ আবেস্তা’। পরবর্তীতে ফারসি, পশতু, বেলুচি।
    • ভারতীয় আর্য: বৈদিক সংস্কৃত → প্রাকৃত → অপভ্রংশ হয়ে বাংলা, হিন্দি, মারাঠি ইত্যাদি ভাষার উদ্ভব।

অবর্গীভূত বা অশ্রেণিবদ্ধ ভাষা (Unclassified)

যেসব ভাষার ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণের অভাবে কোনো নির্দিষ্ট ভাষাপরিবারে শ্রেণিভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

  • বিশ্বের উদাহরণ: জাপানি, কোরীয়, বাস্ক (স্পেন ও ফ্রান্স সীমান্ত)।
  • ভারতীয় উপমহাদেশের উদাহরণ: বুরুশাস্কি / খজুনা, আন্দামানি, মায়ানমারের করেন্ ও মন্।

অস্বাভাবিক ভাষা (মিশ্র ও কৃত্রিম ভাষা)

🔀 (ক) মিশ্র ভাষা (Mixed Language)

ভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর সান্নিধ্যে সৃষ্ট সীমিত শব্দভাণ্ডারের ভাষা।

১. পিজিন (Pidgin): বাণিজ্যের জন্য সৃষ্ট অ-মাতৃভাষা। ইংরেজি ‘Business’ থেকে শব্দটি এসেছে। (যেমন: পিজিন-ইংরেজি, বিচ-লা-মার)।
২. ক্রেওল (Creole): পিজিন স্থায়ী হয়ে মাতৃভাষায় রূপ নিলে তা ক্রেওল (প্রক্রিয়াটি Creolization)। (যেমন: মরিশাস ক্রেওল, চিনুক)।

🤖 (খ) কৃত্রিম ভাষা (Artificial Language)

বিশ্বজোড়া যোগাযোগের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে তৈরি ভাষা।

  • চিন্তানায়ক: রেনে দেকার্ত, ফ্রান্সিস বেকন।
  • ভোলাপুক: যোহান মার্টিন শ্লেইয়ার দ্বারা সৃষ্ট।
  • এসপেরান্তো (Esperanto): ১৮৮৭ সালে এল. এল. জামেনহফ (Doktoro Esperanto) উদ্ভাবন করেন।

    • ব্যাকরণ মাত্র ১৬টি সূত্রে আবদ্ধ।

    • ২৩টি ব্যঞ্জনধ্বনি, ৫টি স্বরধ্বনি, ২টো অর্ধস্বর ও ৬টি যৌগিক স্বর রয়েছে।

প্যারা ল্যাঙ্গুয়েজ ও সাংকেতিক ভাষা

👋 Para Language

বাচিক ধ্বনি ছাড়া অঙ্গভঙ্গি, চোখ বা শরীরের সঞ্চালনের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ।

🤟 Sign Language (সাংকেতিক ভাষা)

১৭৭৫ সালে ফরাসি শিক্ষাবিদ অ্যাবে চার্লস মিচেল ডি এল’ইপি প্রথম উদ্ভাবন করেন।

Paget-Gorman: ৩,০০০ সংকেতযুক্ত পদ্ধতি।
Dactylology: আঙুল দিয়ে বানান করার পদ্ধতি (Finger Spelling)।

Your Cart

error: Content is protected !!
Scroll to Top