অভিষেক – মাইকেল মধুসূদন দত্ত | মাধ্যমিক বাংলা | পদ্য | আলোচনা ও প্রশ্ন | Banglasahayak.com

অভিষেক

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

কবি পরিচিতি

জন্ম: ২৫ জানুয়ারি ১৮২৪ | মৃত্যু: ২৯ জুলাই ১৮৭৩

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক মহাকবি। স্বতন্ত্র কবিসত্তার অধিকারী এই দূরদর্শী সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দসনেটের (চতুর্দশপদী কবিতা) প্রবর্তক। এছাড়াও তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাট্যকার, প্রহসন রচয়িতা এবং পত্রকাব্যকার হিসেবে খ্যাত।

নাট্যকার হিসেবেই তিনি প্রথম বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে পদার্পণ করেন। রামনারায়ণ তর্করত্ন বিরচিত ‘রত্নাবলী’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব গভীরভাবে বোধ করেন। এই অভাব পূরণের লক্ষ্য নিয়েই তিনি নাটক লেখায় আগ্রহী হন। ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রচনা করেন ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক, যা প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক।

উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি

  • মহাকব্য: মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১)
  • কাব্যগ্রন্থ: তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০), ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১), দ্য ক্যাপটিভ লেডি (১৮৪৯), ভিশন অফ দ্য পাস্ট (১৮৪৯)
  • পত্রকাব্য: বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২)
  • সনেট: চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৫)
  • নাটক: শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯), পদ্মাবতী (১৮৬০), কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১), মায়াকানন (১৮৭৪)
  • প্রহসন: একেই কি বলে সভ্যতা? (১৮৬০), বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০)
  • অনুবাদ গ্রন্থ: হেক্টর বধ (১৮৬২ – হোমারের ইলিয়াডের বঙ্গানুবাদ)
“এই প্রাচীন দেশে ২ সহস্র বৎসরের মধ্যে কবি একা জয়দেব গোস্বামী। …জয়দেব গোস্বামী পর শ্রীমধুসূদন। অবনতাবস্থায়ও বঙ্গমাতা রত্নপ্রসবিনী। …কাল প্রসন্ন সুপবন বহিতেছে দেখিয়া জাতীয় পতাকা উড়াইয়া দাও। তাহাতে নাম লেখো শ্রী মধুসূদন।”
— বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

উৎস ও বিষয়-সংক্ষেপ

মূলগ্রন্থ: পাঠ্য ‘অভিষেক’ নামক কাব্যাংশটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা যুগান্তকারী সাহিত্যিক মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত হয়েছে। মূল মহাকাব্যটি মোট ৯টি সর্গে রচিত। প্রথম সর্গের নামই ‘অভিষেক’। এই সর্গে মোট ৭৮৬টি লাইন রয়েছে, যার মধ্যে ৬৫৭ থেকে ৭১২ নম্বর লাইন পর্যন্ত (মোট ১০৬টি লাইন) আমাদের পাঠ্য।

সংক্ষেপ: লঙ্কার ঘোরতর সংকটের সময়ে রাবণপুত্র মেঘনাদ প্রমোদ উদ্যানে বিলাসে মত্ত ছিলেন। ধাত্রীমাতা প্রভাষার ছদ্মবেশে দেবী লক্ষ্মী সেখানে উপস্থিত হয়ে মেঘনাদকে তাঁর প্রিয় অনুজ বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ দেন এবং জানান যে শত্রুপক্ষ লঙ্কাপুরী ঘিরে ফেলেছে। দেশের এই বিপদে আমোদপ্রমোদে মত্ত থাকার জন্য মেঘনাদ নিজেকে ধিক্কার জানান এবং তৎক্ষণাৎ যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নেন। স্ত্রী প্রমীলা অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানতে চাইলে মেঘনাদ রাঘবকে (রামচন্দ্র) বিনাশ করে দ্রুত ফিরে আসার আশ্বাস দেন।

যুদ্ধযাত্রার পূর্বে পিতা রাবণের অনুমতি চাইতে গেলে পুত্রস্নেহে আকুল রাবণ তাঁকে পাঠাতে অসম্মতি জানান, কারণ বিধাতা তাঁর প্রতি বিরূপ। রামের মায়াবী শক্তির কারণে বীরবাহু ও কুম্ভকর্ণের মতো বীরদের পতন হয়েছে। তাই রাবণ পুত্রকে প্রথমে ইষ্টদেবের পূজা ও নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন। এরপর শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে গঙ্গাজল (গঙ্গোধক) দিয়ে মেঘনাদকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করেন。

বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (MCQ) — পার্ট ১

[নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর চেক করতে “উত্তর দেখুন” বাটনে ক্লিক করুন]

১. ইন্দ্রজিতের স্ত্রীর নাম কী?
(ক) ইন্দিরা
(খ) সরমা
(গ) নিকষা
(ঘ) প্রমীলা

সঠিক উত্তর: (ঘ) প্রমীলা

২. ইন্দ্রজিতের কাছে ছদ্মবেশে কে এসেছিলেন?
(ক) জনক সুতা
(খ) পাঞ্চাল সুতা
(গ) দানব সুতা
(ঘ) অম্বুরাশি-সুতা

সঠিক উত্তর: (ঘ) অম্বুরাশি-সুতা

৩. ‘ছদ্মবেশী অম্বুরাশি-সুতা উত্তরিলা;’— ‘অম্বুরাশি-suতা’ কথার অর্থ কী?
(ক) সমুদ্রকন্যা
(খ) অগ্নিকন্যা
(গ) পবনকন্যা
(ঘ) রাক্ষসকন্যা

সঠিক উত্তর: (ক) সমুদ্রকন্যা

৪. ‘হাসিবে মেঘবাহন;’— মেঘবাহন কাকে বলা হয়েছে?
(ক) ইন্দ্রজিৎকে
(খ) ইন্দ্রকে
(গ) বরুণকে
(ঘ) অগ্নিকে

সঠিক উত্তর: (খ) ইন্দ্রকে

৫. ‘অভিষেক’ কবিতাটি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর কোন সর্গ থেকে নেওয়া হয়েছে?
(ক) দ্বিতীয় সর্গ
(খ) প্রথম সর্গ
(গ) ষষ্ঠ সর্গ
(ঘ) quarto সর্গ

সঠিক উত্তর: (খ) প্রথম সর্গ

৬. ‘হৈমবতীসুত যথা নাশিতে তারকে’ — ‘হৈমবতীসুত’ কাকে বলা হয়েছে?
(ক) অর্জুন
(খ) গণেশ
(গ) কার্তিকেয়
(ঘ) মেঘনাদ

সঠিক উত্তর: (গ) কার্তিকেয়

৭. ‘অভিষেক করিলা কুমারে।’ কবিতাটিতে কার অভিষেক হয়েছে?
(ক) বীরবাহুর
(খ) কুম্ভকর্ণের
(গ) মেঘনাদের
(ঘ) বিভীষণের

সঠিক উত্তর: (গ) মেঘনাদের

৮. ‘অভিষেক করিলা কুমারে।’ কীভাবে রাজা কুমারকে অভিষেক করলেন?
ক) বিল্বপত্র দিয়ে
খ) দধিদুগ্ধ দিয়ে
গ) গঙ্গোধক দিয়ে
ঘ) পাদোদক দিয়ে

সঠিক উত্তর: গ) গঙ্গোধক দিয়ে

৯. ‘কে বধিল কবে প্রিয়ানুজে?’ — প্রিয়ানুজ কে ছিলেন?
(ক) ইন্দ্রজিৎ
(খ) রামচন্দ্র
(গ) লক্ষ্মণ
(ঘ) বীরবাহু

সঠিক উত্তর: (ঘ) বীরবাহু

১০. ‘রাক্ষস-কুল-শেখর তুমি, বৎস; তুমি রাক্ষস-কুল- ভরসা।’ — এখানে যার কথা বলা হয়েছে তিনি হলেন:
(ক) রাবণ
(খ) মেঘনাদ
(গ) বীরবাহু
(ঘ) কুম্ভকর্ণ

সঠিক উত্তর: (খ) মেঘনাদ

১১. ‘সমরে নাশি তোমার কল্যাণে / রাঘবে’। — ‘তোমার’ বলতে বোঝানো হয়েছে—
(ক) রাবণকে
(خ) প্রমীলাকে
(গ) ইন্দ্রজিৎকে
(ঘ) ইন্দিরাকে

সঠিক উত্তর: (খ) প্রমীলাকে

১২. ‘উত্তরিলা বীরদর্পে অসুরারি রিপু’ — ‘অসুরারি রিপু’ হলো—
(ক) রামচন্দ্র
(খ) বীরবাহু
(গ) ইন্দ্রজিৎ
(ঘ) রাবণ

সঠিক উত্তর: (গ) ইন্দ্রজিৎ

১৩. “হায় বিধি বাম মম প্রতি”- বক্তা কে?
ক) রাবণ
খ) ইন্দ্রজিৎ
গ) রামচন্দ্র
ঘ) প্রমীলা

সঠিক উত্তর: ক) রাবণ

১৪. “কে কবে শুনেছে, লোক মরি পুনঃ বাঁচে?” – বক্তা হলেন:
ক) রাবণ
খ) ইন্দ্রজিৎ
গ) রামচন্দ্র
ঘ) প্রমীলা

সঠিক উত্তর: ক) রাবণ

১৫. “তাই আমি জাগানু অকালে ভয়ে” – কে কাকে জাগিয়েছিল?
ক) প্রমীলা ইন্দ্রজিৎকে
খ) রাবণ ইন্দ্রজিৎকে
গ) রাবণ কুম্ভকর্ণকে
ঘ) ইন্দ্রজিৎ রাবণকে

সঠিক উত্তর: গ) রাবণ কুম্ভকর্ণকে

১৬. “কনক-আসন ত্যজি, বীরেন্দ্রকেশরী / ইন্দ্রজিৎ, প্রণমিয়া,…” -ইন্দ্রজিৎ কাকে প্রণাম করেছিলেন?
ক) রাবণকে
খ) চিত্রাঙ্গদাকে
গ) মন্দোদরীকে
ঘ) ধাত্রীকে

সঠিক উত্তর: ঘ) ধাত্রীকে

১৭. “কি হেতু, মাতঃ, গতি তব আজি / এ ভবনে?” – ইন্দ্রজিৎ এ কথা জিজ্ঞাসা করেছেন—
ক) মন্দোদরী দেবীকে
খ) প্রমীলাকে
গ) সীতাদেবীকে
ঘ) প্রভাষাবেশী লক্ষ্মীকে

সঠিক উত্তর: ঘ) প্রভাষাবেশী লক্ষ্মীকে

১৮. “হায়। পুত্র, কি আর কহিব / কনক-লঙ্কার দশা!” – বক্তা লঙ্কার কথা বলার ক্ষেত্রে হতাশা প্রকাশ করেছেন, কারণ ঘোরতর যুদ্ধে—
ক) কুম্ভকর্ণের মৃত্যু হয়েছে
খ) বীরবাহুর মৃত্যু হয়েছে
গ) রাবণরাজার মৃত্যু হয়েছে
ঘ) চিত্রঙ্গদার মৃত্যু হয়েছে

সঠিক উত্তর: খ) বীরবাহুর মৃত্যু হয়েছে

১৯. “ঘোরতর রণে, / হত প্রিয় ভাই তব…” এই ‘প্রিয় ভাই’ হল—
ক) বীরবাহু
খ) লক্ষ্মণ
গ) কুম্ভকর্ণ
ঘ) ইন্দ্রজিৎ

সঠিক উত্তর: ক) বীরবাহু

২০. “তার শোকে মহাশোকী রাক্ষসাধিপতি” – রাক্ষসাধিপতি রাবণ যার শোকে কাতর, তিনি হলেন—
ক) প্রমীলা
খ) চিত্রাঙ্গদা
গ) মন্দোদরী
ঘ) বীরবাহু

সঠিক উত্তর: ঘ) বীরবাহু

২১. “… ইন্দিরা সুন্দরী / উত্তরিলা;” – ‘ইন্দিরা’ সম্পর্কে যে বিশেষণ এখানে প্রযুক্ত হয়েছে—
(ক) রত্নোত্তমা
(খ) রত্নাকর প্রিয়তমা
(গ) রত্নাকর রত্নোত্তমা
(ঘ) রত্নাকর হেমলতা

সঠিক উত্তর: (গ) রত্নাকর রত্নোত্তমা

২২. “হায়। পুত্র __________ সীতাপতি; তব শরে মরিয়া বাঁচিল।” – ‘সীতাপতি’ সম্পর্কে যে বিশেষণটি প্রয়োগ করা হয়েছে—
ক) মায়াবী মানব
খ) রঘুকুলমণি
গ) বীরবর রঘুবর
ঘ) মহাবলী

সঠিক উত্তর: ক) মায়াবী মানব

২৩. “তব শরে মরিয়া বাঁচিল।” – মরে বেঁচে উঠেছেন—
(ক) লক্ষ্মণ
(খ) রামচন্দ্র
(গ) বিভীষণ
(ঘ) কুম্ভকর্ণ

সঠিক উত্তর: (খ) রামচন্দ্র

২৪. “যথা অশোকের ফুল অশোকের তলে / আভাময়!” – অশোক ফুলের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে যার—
ক) কনক বলয়
(খ) কুণ্ডল
গ) প্রমীলার অলংকারের
ঘ) কুসুমদাম

সঠিক উত্তর: (খ) কুণ্ডল

২৫. “শোভিল কুণ্ডল,” – কুণ্ডল কোথায় শোভা পাচ্ছিল?
ক) শিরোপরে
খ) পদতলে
গ) অশোকের তলে
ঘ) আকাশে

সঠিক উত্তর: খ) পদতলে

২৬. “উদ্ধারিতে / গোধন, সাজিলা শূর শমীবৃক্ষমূলে।” – কে সেজেছিলেন?
ক) অর্জুন
খ) মেঘনাদ
গ) হৈমবতীসুত
ঘ) বিরাটপুত্র

সঠিক উত্তর: ক) অর্জুন

২৭. ‘বৃহন্নলারূপী কিরীটী’ — ‘কিরীটী’ হলেন:
ক) অর্জুন
খ) ইন্দ্রজিৎ
গ) অভিমন্যু
ঘ) বিরাটপুত্র

সঠিক উত্তর: ক) অর্জুন

২৮. ‘কে কবে শুনেছে পুত্র, ভাসে শিলা জলে,’ – এখানে ‘পুত্র’ হলেন—
ক) মেঘনাদ
খ) রাবণ
গ) রামচন্দ্র
ঘ) বীরবাহু

সঠিক উত্তর: ক) মেঘনাদ

২৯. বিদায় কালে পত্নীকে ইন্দ্রজিৎ কী বলে সম্বোধন করেছিলেন?
ক) চন্দ্রমুখী
খ) সোনামুখী
গ) সূর্যমুখী
ঘ) বিধুমুখী

সঠিক উত্তর: ঘ) বিধুমুখী

৩০. “শিঞ্জিনী আকর্ষি রোষে,” – এখানে ‘শিঞ্জিনী’ শব্দের অর্থ হলো—
ক) দুন্দুভি
খ) পায়ের নূপুর
গ) ধনুকের ছিলা
ঘ) অসি

সঠিক উত্তর: গ) ধনুকের ছিলা

অতি সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (মান – ১)

১. “কে কবে শুনেছে পুত্র, ভাসে শিলা জলে”— বক্তার এমন মন্তব্যের কারণ কী?

বক্তার (রাবণের) বিশ্বাস জন্মেছে বিধাতা তাঁর প্রতি বিরূপ। প্রসঙ্গত তিনি রামচন্দ্রের অলৌকিকভাবে পুনর্জীবন লাভের কথা বোঝাতে এই মন্তব্য করেছেন।

২. “ছদ্মবেশী অম্বুরাশি-সুতা” কেন ইন্দ্রজিতের কাছে এসেছিলেন?

বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ ও রাজা রাবণের যুদ্ধসজ্জার খবর মেঘনাদকে দেওয়ার জন্য অম্বুরাশি-সুতা (দেবী লক্ষ্মী) মেঘনাদের ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে প্রমোদ উদ্যানে এসেছিলেন।

৩. “হায় বিধি বাম মম প্রতি”- বক্তার এমন মন্তব্যের কারণ কী? [মাধ্যমিক, ২০২০]

ইন্দ্রজিতের হাতে নিশারণে নিহত রামচন্দ্র অলৌকিকভাবে পুনর্জীবিত হয়ে যেভাবে রাবণপুত্র বীরবাহুকে হত্যা করেছেন, সেই নিয়তির প্রতিকূলতার কারণেই রাবণের মনে হয়েছে বিধি তাঁর প্রতি বিরূপ।

৪. “এ কলঙ্ক, পিতঃ ঘুষিবে জগতে।”- বক্তা কোন্ কলঙ্কের কথা বলেছেন? [মাধ্যমিক, ২০২২]

বীর চূড়ামণি মেঘনাদ জীবিত থাকতে তাঁর বৃদ্ধ পিতা লঙ্কাধিপতি রাবণ যদি স্বয়ং যুদ্ধযাত্রা করেন, তবে তা বীরপুত্র হিসেবে মেঘনাদের পক্ষে চরম লজ্জাজনক ও বিশ্বজগতে কলঙ্ক হিসেবে ঘোষিত হবে।

৫. “হা ধিক্ মোরে”— বক্তা নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছেন কেন? [মাধ্যমিক, ২০২৩]

মাতৃভূমি স্বর্ণলঙ্কা যখন ঘোরতর শত্রুসৈন্য দ্বারা বেষ্টিত, সেই চরম সংকটের সময়ে তিনি প্রমোদ উদ্যানে নারী সান্নিধ্যে বিলাসমত্ত হয়ে সময় কাটাচ্ছেন—একথা ভেবেই ইন্দ্রজিৎ নিজেকে তীব্র ধিক্কার দিয়েছেন।

৬. ‘এক অদ্ভুত বারতা, জননী/ কোথায় পাইলে তুমি,’ – কোন বার্তাকে অদ্ভুত বলা হয়েছে?

ইন্দ্রজিৎ নিজে রাতের যুদ্ধে রামচন্দ্রকে খণ্ড-খণ্ড করে কেটে হত্যা করেছিলেন। সেই মৃত রামচন্দ্র পুনরায় বেঁচে উঠে বীরবাহুকে বধ করেছেন—এই অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য সংবাদকেই অদ্ভুত বার্তা বলা হয়েছে।

৭. ‘বিদায় এবে দেহ বিধুমুখী’ – বিধুমুখী কে? বিদায় চাওয়ার কারণ কী?

এখানে ‘বিধুমুখী’ (চাঁদের মতো মুখ যার) বলতে মেঘনাদের স্ত্রী প্রমীলাকে বোঝানো হয়েছে। লঙ্কার চরম সংকটে রাঘব বা রামচন্দ্রকে সমূলে বিনাশ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধযাত্রার জন্যই ইন্দ্রজিৎ তাঁর স্ত্রীর কাছে বিদায় চেয়েছেন।

৮. ‘অভিষেক করিলা কুমারে,’ – কুমারকে কী দিয়ে অভিষিক্ত করা হয়েছিল?

লঙ্কাধিপতি রাজা রাবণ শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে পবিত্র ‘গঙ্গোদক’ অর্থাৎ গঙ্গাজল দিয়ে কুমার মেঘনাদকে রাক্ষস সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করেছিলেন।

৯. “জিজ্ঞাসিলা মহাবাহু বিস্ময় মানিয়া।”— বিস্ময়ের কারণ কী?

যাকে মেঘনাদ নিজে নিশারণে শরবিদ্ধ করে সংহার করেছিলেন, সেই মৃত রামচন্দ্র কীভাবে পুনরায় জীবিত হয়ে বীরবাহুকে হত্যা করতে পারেন—এই অসম্ভব ঘটনার কথা শুনেই মহাবাহু ইন্দ্রজিৎ চরম বিস্মিত হয়েছিলেন।

১০. “ঘুচাব ও অপবাদ বধি রিপুকুলে।” — কোন অপবাদের কথা বলা হয়েছে?

স্বর্ণলঙ্কা যখন শত্রু পরিবেষ্টিত এবং বীর ভ্রাতা বীরবাহু নিহত, তখন জ্যেষ্ঠ পুত্র ইন্দ্রজিতের প্রমোদ উদ্যানে বিলাসে মত্ত থাকা এবং বীর পিতার স্বয়ং যুদ্ধে সজ্জা করার ঘটনাকেই ইন্দ্রজিৎ নিজের অপবাদ বলেছেন।

১১. “হায় বিধি বাম মম প্রতি।” — কেন এই উক্তি?

ইন্দ্রজিতের তীরের আঘাতে নিহত হওয়ার পরেও রামচন্দ্র অলৌকিকভাবে পুনর্জীবন লাভ করে রাবণের বীর পুত্র ও ভাইদের একে একে বিনাশ করছেন—প্রকৃতির এই অলৌকিক ও প্রতিকূল আচরণের জন্যই রাবণের এই উক্তি।

১২. “এ মায়া পিতঃ বুঝিতে না পারি।”— কোন মায়ার কথা বলা হয়েছে?

নিশারণে খণ্ড-খণ্ড করে কাটার পরেও শত্রু রামচন্দ্রের অলৌকিকভাবে প্রাণ ফিরে পাওয়া এবং পুনরায় লঙ্কার বীরদের হত্যা করার মতো মায়াবী ও দৈব ক্ষমতাকে মেঘনাদ বুঝতে না পেরে মায়া বলেছেন।

১৩. “সসৈন্যে সাজেন আজি যুঝিতে আপনি।”— কে, কেন সসৈন্যে সেজেছেন?

লঙ্কাধিপতি রাবণ সসৈন্যে সেজেছেন। ঘোরতর যুদ্ধে তাঁর প্রিয় পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে এবং শত্রু রামচন্দ্রের হাত থেকে স্বর্ণলঙ্কাকে রক্ষা করতে তিনি নিজে যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

১৪. “কাঁপিলা লঙ্কা” — লঙ্কার কেঁপে ওঠার কারণ কী?

ধাত্রী প্রভাষার মুখে লঙ্কার ঘোর বিপদের কথা শুনে ক্রুদ্ধ মেঘনাদ যখন তীব্র রোষে তাঁর ধনুকের ছিলা (শিঞ্জিনী) টেনে ধনুর্বাণ আকর্ষণ করেন, তখন সেই ধনুকের প্রচণ্ড টঙ্কারে সমগ্র লঙ্কাপুরী ও সমুদ্র কেঁপে ওঠে।

১৫. হৈমবতীসুত কে?

‘হৈমবতী’ অর্থাৎ দেবী দুর্গা বা পার্বতীর পুত্র হলেন শিবপুত্র কার্তিকেয়। তারকাসুর বধের উদ্দেশ্যে কার্তিকেয় যেভাবে মহাশক্তিশালী রণসাজে সেজেছিলেন, তাঁর সঙ্গে মেঘনাদের তুলনা করতে কবি এই প্রসঙ্গ এনেছেন।

১৬. “কি কহিলা ভগবতি” — ভগবতী কে?

এখানে ‘ভগবতী’ বলতে মেঘনাদের ধাত্রীমাতা প্রভাষার রূপধারিণী ধনদাত্রী দেবী লক্ষ্মীকে সম্বোধন করা হয়েছে।

১৭. “কে বধিল কবে/ প্রিয়ানুজে?” – ‘প্রিয়ানুজ’ কাকে বলা হয়েছে?

‘প্রিয়ানুজ’ অর্থাৎ প্রিয় ছোট ভাই বলতে রাবণপুত্র ও মেঘনাদের কনিষ্ঠ সহোদর বীরবাহুকে বোঝানো হয়েছে, যিনি রামচন্দ্রের সাথে সম্মুখ সমরে নিহত হন।

১৮. “হেনকালে প্রমীলা সুন্দরী” — প্রমীলা কে?

প্রমীলা হলেন লঙ্কার প্রধান বীরচূড়ামণি মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিতের পরম সুন্দরী ও পতিব্রতা পত্নী।

১৯. “ব্রততী বাঁধিলে সাধে করি পদ” — ‘করি-পদ’ শব্দটির অর্থ কী?

‘করি’ শব্দের অর্থ হাতি। সুতরাং ‘করি-পদ’ শব্দের অর্থ হলো হাতির পা। লতা যেমন ভালোবেসে হাতির পা জড়িয়ে ধরে, প্রমীলাও ঠিক তেমনভাবেই বিদায়বেলায় স্বামী ইন্দ্রজিতের হাত দুটি জড়িয়ে ধরেছিলেন।

২০. “কিংবা যথা বৃহন্নলারুপী/কিরীটি” — ‘বৃহন্নলারুপী কিরীটি’ কাকে বলা হয়েছে?

মহাভারতের অন্যতম প্রধান বীর অর্জুনকে ‘কিরীটী’ বলা হয়েছে। অজ্ঞাতবাসের সময় বিরাট রাজার গৃহে তিনি ‘বৃহন্নলা’ ছদ্মনাম ধারণ করেছিলেন। বিরাটপুত্রের গোধন উদ্ধারের জন্য শমীবৃক্ষমূলে তাঁর রণসজ্জার সাথে ইন্দ্রজিতের রণসজ্জার তুলনা করা হয়েছে।

সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (মান – ৩)

১) “জিজ্ঞাসিলা মহাবাহু বিস্ময় মানিয়া।” — মহাবাহু কে? তার বিস্ময়ের কারণ কী? (১+২)

মহাবাহু: মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র প্রথম সর্গ থেকে গৃহীত ‘অভিষেক’ কাব্যাংশের আলোচ্য অংশে মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎকে ‘মহাবাহু’ বলা হয়েছে।

বিস্ময়ের কারণ: প্রভাষা রাক্ষসীর ছদ্মবেশী দেবী লক্ষ্মীর কাছে ইন্দ্রজিৎ জানতে পারলেন যে, তাঁর প্রিয় ভাই বীরবাহু রামচন্দ্রের হাতে নিহত হয়েছেন এবং পুত্রশোকে কাতর রাজা রাবণ স্বয়ং যুদ্ধযাত্রা করার জন্য সসৈন্যে সাজছেন। কিন্তু ইন্দ্রজিৎ নিজেই আগের রাতের যুদ্ধে রাঘবকে (রামচন্দ্র) পরাস্ত করে খণ্ড-খণ্ড করে কেটেছিলেন। সুতরাং মৃত রামচন্দ্র কীভাবে পুনর্জীবন লাভ করে বীরবাহুকে হত্যা করতে পারেন—এই অলৌকিক ঘটনাটিই ইন্দ্রজিতের চরম বিস্ময়ের কারণ হয়ে উঠেছিল।

২) ‘হায়, বিধি বাম মম প্রতি।’ – কার উক্তি? এমন উক্তির কারণ কী? (১+২)

উক্তি কার: উদ্ধৃত অংশটি লঙ্কাধিপতি রাক্ষসরাজ রাবণের উক্তি।

উক্তির কারণ: রাবণের মনে হয়েছে ভাগ্য বা বিধাতা তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিকূল। কারণ প্রকৃতির অমোঘ নিয়মকে লঙ্ঘন করে মৃত রামচন্দ্র অলৌকিকভাবে পুনরায় প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, পুনর্জীবিত হয়ে রামচন্দ্র রাবণের অপরাজেয় বীরপুত্র বীরবাহু ও পর্বতসম ভাই কুম্ভকর্ণকে বীর দর্পে হত্যা করেছেন। নিয়তির এই অভূতপূর্ব ও মায়াবী বিরূপতার কারণেই রাবণ গভীর হতাশায় এই উক্তি করেছেন।

৩) ‘এ কলঙ্ক পিতঃ ঘুষিবে জগতে’ – কার এই উক্তি? বক্তা কোন কলঙ্কের কথা এখানে বলেছেন? (১+২)

উক্তি কার: আলোচ্য উক্তিটি রাক্ষসরাজ রাবণের জ্যেষ্ঠ ও প্রধান বীরপুত্র ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদের।

কোন কলঙ্ক: রাক্ষসকুলের শ্রেষ্ঠ ও অপরাজেয় বীর সন্তান মেঘনাদ জীবিত থাকা সত্ত্বেও যদি তাঁর বৃদ্ধ পিতা রাক্ষসাধিপতি রাবণকে স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলা করতে যেতে হয়, তবে তা পুত্র হিসেবে মেঘনাদের পক্ষে চরম লজ্জাজনক। মেঘনাদের মতে, তাঁর বর্তমানে পিতার এই যুদ্ধযাত্রা বীরপুত্র হিসেবে তাঁর কর্তব্যের অবহেলাকে প্রমাণ করবে এবং সমগ্র বিশ্বজগতে তাঁর এই অক্ষমতার অপবাদ বা কলঙ্ক রটে যাবে।

৪) “ঘুচাব ও অপবাদ বধি রিপুকুলে।” — বক্তা কে? এখানে কোন অপবাদের কথা বলা হয়েছে? (১+২)

বক্তা: উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হলেন লঙ্কেশ্বর রাবণের সুযোগ্য পুত্র বীরেন্দ্রকেশরী ইন্দ্রজিৎ।

অপবাদ: যখন প্রবল পরাক্রমী শত্রু রামচন্দ্র লঙ্কাপুরী বেষ্টন করেছে এবং প্রিয় অনুজ বীরবাহু যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন, সেই জাতীয় সংকটের দিনে রাবণের শ্রেষ্ঠ বীর পুত্র হয়েও ইন্দ্রজিৎ প্রমোদ উদ্যানে নারীদের সান্নিধ্যে বিলাসে মত্ত ছিলেন। দেশের এই চরম দুর্দিনে পিতার পাশে না থেকে প্রমোদবিহারে লিপ্ত থাকার এই লজ্জাজনক আত্মবিস্মৃতিকেই বক্তা নিজের ‘অপবাদ’ বলে চিহ্নিত করেছেন।

৫) “সাজিলা রথীন্দ্রর্ষভ বীর আভরণে।” — ‘রথীন্দ্রর্ষভ’ কে? তার সজ্জার বর্ণনা দাও। (১+২)

রথীন্দ্রর্ষভ: ‘রথীন্দ্রর্ষভ’ শব্দের অর্থ রথীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এখানে ‘রথীন্দ্রর্ষভ’ বলতে রাক্ষস বীর ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদকে বোঝানো হয়েছে।

সজ্জার বর্ণনা: ধাত্রী প্রভাষার মুখে লঙ্কার চরম বিপদের কথা শুনে ইন্দ্রজিৎ সমস্ত অলংকার ত্যাগ করে বীরসাজে সজ্জিত হন। কবি তাঁর এই যুদ্ধসজ্জাকে দুটি পৌরাণিক উপমায় ভূষিত করেছেন—তারকাসুর বধের জন্য মহাদেব ও পার্বতীপুত্র কার্তিকেয় যেভাবে তেজস্বী সাজে সেজেছিলেন, কিংবা মহাভারতে অজ্ঞাতবাসকালে বৃহন্নলারূপী অর্জুন বিরাটপুত্রের গোধন উদ্ধার করতে শমীবৃক্ষমূলে যেভাবে বীর সাজে সেজেছিলেন, ইন্দ্রজিতের রণসজ্জাও ছিল ঠিক তেমনই দীপ্তিময় ও পরাক্রমশালী।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান – ৫)

১. “নমি পুত্র পিতার চরণে, করজোড়ে কহিলা;” — পিতা ও পুত্রের পরিচয় দাও। পাঠ্যাংশ অবলম্বনে পিতা ও পুত্রের কথোপকথন নিজের ভাষায় লেখ। (১+৪)
পিতা ও পুত্রের পরিচয়: মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত ‘অভিষেক’ কাব্যাংশের আলোচ্য অংশে ‘পিতা’ বলতে লঙ্কাধিপতি রাবণ এবং ‘পুত্র’ বলতে তাঁর পরম পরাক্রমী ও জ্যেষ্ঠ সন্তান মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎকে বোঝানো হয়েছে।

পিতা ও পুত্রের কথোপকথন: লঙ্কার সংকটকালে প্রমোদ উদ্যান থেকে ফিরে এসে মেঘনাদ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পিতা রাবণের চরণে প্রণাম জানিয়ে লঙ্কা জয়ের জন্য সেনাপতি পদে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি প্রার্থনা করেন। পুত্রের এই রণহুঙ্কার ও দেশপ্রেমের কথার প্রত্যুত্তরে লঙ্কেশ্বর রাবণের এক ব্যাকুল ও স্নেহশীল পিতার রূপ প্রকাশিত হয়। রাবণ পুত্রকে জানান যে, তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ মেঘনাদকে আর এই ভয়ানক যুদ্ধে পাঠাতে চান না। কারণ তিনি অনুভব করেছেন যে, দৈব বা বিধাতা লঙ্কার প্রতি সম্পূর্ণ বিমুখ। নইলে যে রামচন্দ্রকে ইন্দ্রজিৎ নিশারণে বধ করেছিলেন, সে কীভাবে পুনর্জীবিত হয়ে বীরবাহুকে হত্যা করতে পারে! শিলা যেমন কখনও জলে ভাসে না, মৃত মানুষও তেমন বাঁচে না, কিন্তু লঙ্কার ভাগ্যে তা-ই ঘটছে।

পিতার এই আশঙ্কায় মেঘনাদ দমে যাননি। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে পিতাকে বলেন যে, তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে জয় করেছেন, সুতরাং এই সামান্য মানব রামচন্দ্র তাঁর কাছে কিছুই নয়। তিনি পিতার কাছে আর একটিবার মাত্র সুযোগ চান এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে শত্রুপক্ষকে সমূলে বিনাশ করবেন। পুত্রের এই অদম্য জেদ ও আত্মবিশ্বাসের কাছে পিতা রাবণ নতিস্বীকার করেন। তবে দূরদর্শী পিতা হিসেবে তিনি মেঘনাদকে পরামর্শ দেন যেন যুদ্ধযাত্রার পূর্বে তিনি তাঁদের ইষ্টদেব অগ্নির পূজা করেন এবং নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করেন। কথোপকথন শেষে শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী পবিত্র গঙ্গাজল (গঙ্গোধক) দিয়ে রাবণ পরম স্নেহে ও গুরুদায়িত্বে পুত্র মেঘনাদকে লঙ্কার সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করেন।

২. “ঘুচাবো এ অপবাদ, বধি রিপুকূলে”— উদ্ধৃতাংশের বক্তা কে? বক্তা তাঁর কোন অপবাদের কথা বলেছেন? অপবাদ ঘোচাবার জন্য তিনি কী করেছিলেন? (১+২+২)
বক্তা: মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘অভিষেক’ কাব্যাংশে উদ্ধৃতাংশটির বক্তা হলেন রাক্ষসাধিপতি রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ।

অপবাদের বিবরণ: রামচন্দ্রের সাথে লঙ্কার ঘোরতর সমরে লঙ্কার একের পর এক বীর ও রথীদের পতন ঘটছিল। মেঘনাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বীরবাহু এবং লঙ্কার পর্বতসম মহাশক্তিধর বীর কুম্ভকর্ণ যুদ্ধে নিহত হন। বীরদের এই অকাল প্রয়াণে রাক্ষসরাজ রাবণ গভীর শোকে মগ্ন হয়ে নিজেই যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। অথচ লঙ্কার এই চরম দুর্দিনে, যখন জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে পিতার পাশে দাঁড়িয়ে রাজ্য রক্ষা করা তাঁর প্রধান কর্তব্য ছিল, তখন মেঘনাদ প্রমোদ উদ্যানে স্ত্রী প্রমীলা ও সখীদের সাথে আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত ছিলেন। বীরশ্রেষ্ঠ হয়েও দেশের সংকটে এই উদাসীন থাকাকেই ইন্দ্রজিৎ নিজের চরম ‘অপবাদ’ বলে মনে করেছেন।

অপবাদ ঘোচাতে গৃহীত পদক্ষেপ: ধাত্রীমাতা প্রভাষার মুখে স্বর্ণলঙ্কার এই দুর্দশার কথা শোনার সাথে সাথে মেঘনাদের বীরসত্তা জাগ্রত হয়। তিনি তীব্র অনুশোচনায় ও ক্রোধে নিজের শরীর থেকে কনকবলয়, কুণ্ডল, কুসুমদাম প্রভৃতি সমস্ত বিলাসী আভরণ দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেন। লঙ্কায় দ্রুত পৌঁছানোর জন্য তিনি রথ আনার নির্দেশ দেন। তারকাসুর বধের জন্য সাজা কার্তিকেয় কিংবা গোধন উদ্ধারে যাওয়া অর্জুনের মতো তিনি নিজেকে মহাশক্তিশালী রণসাজে সাজিয়ে তোলেন। তাঁর ধনুকের তীব্র টঙ্কারে লঙ্কা ও সমুদ্র কেঁপে ওঠে। এরপর বীরদর্পে লঙ্কায় প্রবেশ করে পিতা রাবণের চরণে প্রণত হয়ে তিনি যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চান এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে মায়াবী রাঘবকে তিনি এবার সমূলে বিনাশ করে লঙ্কার বুকে নিজের এই অপবাদ চিরতরে মুছে দেবেন।

৩. অভিষেক কাব্যাংশ অবলম্বনে ইন্দ্রজিতের চরিত্র বৈশিষ্ট্য আলোচনা করো। (৫)
ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের অগ্রদূত মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমর সৃষ্টি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। এই মহাকাব্যের প্রথম সর্গ ‘অভিষেক’ কাব্যাংশে মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ চরিত্রটি এক অনন্য সাধারণ বীরত্ব ও মানবিক সত্তার মেলবন্ধনে ফুটে উঠেছে। পাঠ্যাংশ অবলম্বনে তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি নিম্নরূপ:

১. অসীম বীরত্ব ও পরাক্রম:

ইন্দ্রজিৎ ত্রিভুবন বিজয়ী বীর। তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাজিত করে ‘ইন্দ্রজিৎ’ উপাধি লাভ করেছিলেন। তাঁর বীরত্বের দাপট এতটাই যে, তাঁর ধনুকের সামান্য টঙ্কারে লঙ্কাপুরী ও মহাসমুদ্র প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। শত্রুপক্ষকে দমন করার জন্য তিনি সদা প্রস্তুত।

২. কর্তব্য সচেতনতা ও স্বদেশপ্রেম:

ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে দেবী লক্ষ্মীর কাছে যখন তিনি লঙ্কার বিপন্নতার কথা শোনেন, তখন প্রমোদ উদ্যানের সমস্ত বিলাসিতা তাঁর কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। স্বদেশের এই দুর্দিনে প্রমোদকাননে সময় কাটানোকে তিনি নিজের প্রতি ‘ধিক্কার’ বলে মনে করেছেন। দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও কর্তব্যবোধ অত্যন্ত প্রখর।

৩. দৃঢ় আত্মবিশ্বাস:

ইন্দ্রজিৎ অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয়ী। রামচন্দ্র অলৌকিকভাবে বেঁচে উঠেছে শুনেও তিনি ভয় পাননি। বরং দৃঢ় কণ্ঠে পিতার কাছে অনুমতি চেয়ে বলেছেন— “দুইবার আমি হারানু রাঘবে; / আর একবার পিতঃ দেহ আজ্ঞা মোরে।” নিজের বাহুবলের ওপর তাঁর এই অগাধ বিশ্বাস চরিত্রটিকে মহিমান্বিত করেছে।

৪. পতিপ্রেম ও সুকোমল হৃদয়:

ইন্দ্রজিৎ যেমন রণক্ষেত্রে কঠোর, পরিবারে তেমনই কোমল। যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে স্ত্রী প্রমীলা যখন অশ্রুসজল চোখে তাঁর পথ আগলে দাঁড়ায়, তখন তিনি তাঁকে অত্যন্ত মধুর বাক্যে সান্ত্বনা দেন এবং “বিধুমুখী” সম্বোধন করে বলেন যে রাঘবকে বিদায় জানিয়ে তিনি দ্রুত প্রমীলার কল্যাণে ফিরে আসবেন।

৫. পিতৃভক্তি ও বিনয়:

লঙ্কায় ফিরে এসে বীরদর্পে সোজা পিতার কাছে গেলেও তিনি উদ্ধত হননি। পিতার চরণে নত হয়ে করজোড়ে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চেয়েছেন। পিতার আদেশ মেনে ইষ্টদেবের পূজা ও যজ্ঞ সম্পন্ন করতেও তিনি রাজি হন।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত চিরাচরিত রামায়ণের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে মেঘনাদকে দেশপ্রেমিক, কর্তব্যপরায়ণ স্বামী, বীর ও বিনীত এক আধুনিক নায়কোচিত গরিমায় ফুটিয়ে তুলেছেন।

৪. “তবে কেন তুমি, গুণনিধি, / ত্যাজ কিঙ্করীরে আজি?” – কে কখন কথাটি বলেছেন? তাকে কী সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছিল? (৩+২)
বক্তা ও প্রেক্ষাপট: মধুসূদন দত্তের ‘অভিষেক’ কাব্যাংশ থেকে গৃহীত আলোচ্য অংশটির বক্তা হলেন মেঘনাদের পত্নী প্রমীলা সুন্দরী। লঙ্কার ঘোরতর সংকটের কথা শুনে মেঘনাদ যখন প্রমোদ উদ্যানের বিলাসিতা ত্যাগ করে তীব্র গতিতে লঙ্কার উদ্দেশ্যে যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক সেই বিদায়লগ্নে প্রমীলা অশ্রুপূর্ণ চোখে স্বামীর হাত দুটি ধরে অত্যন্ত কাতরভাবে এই কথাটি বলেছিলেন।

প্রদত্ত সান্ত্বনা: বিরহকাতর ও ভীত প্রমীলাকে সান্ত্বনা দিয়ে বীর মেঘনাদ অত্যন্ত মধুর স্বরে বলেন যে, প্রমীলা তাঁর প্রেমের বাঁধনে ইন্দ্রজিৎকে এমনভাবে বেঁধেছেন যে সেই বাঁধন ছিন্ন করার সাধ্য কারও নেই। তিনি প্রমীলাকে আশ্বস্ত করে “কল্যাণি” ও “বিধুমুখী” বলে সম্বোধন করেন এবং বলেন যে তিনি অত্যন্ত দ্রুত লঙ্কা থেকে রাঘবকে (রামচন্দ্র) সমূলে বিনাশ করে তাঁর কাছে ফিরে আসবেন। প্রমীলার কল্যাণের জন্যই তিনি এই যুদ্ধে যাচ্ছেন, তাই তাকে ভয় না পেয়ে হাসিমুখে বিদায় দিতে বলেন।

৫. “হায়, বিধি বাম মম প্রতি।” — কখন বক্তা এ কথা বলেছেন? বক্তার এ কথা বলার কারণ কী? (২+৩)
সময়/প্রেক্ষাপট: রাক্ষসরাজ রাবণ স্বয়ং যখন বীরবাহুর মৃত্যুতে শোকাতুর হয়ে সসৈন্যে যুদ্ধযাত্রা করছিলেন, তখন প্রমোদ উদ্যান থেকে ফিরে এসে মেঘনাদ পিতার চরণে প্রণাম করে নিজে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চান। পুত্রকে পুনরায় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে অনিচ্ছুক পিতা রাবণ মেঘনাদের সেই প্রস্তাব শুনে গভীর হাহাকার ও দুঃখের সাথে এই কথাটি বলেছিলেন।

উক্তির কারণ: রাবণের এই উক্তির মূল কারণ হলো প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম লঙ্কার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টে গেছে, যা প্রমাণ করে ভাগ্য বা বিধাতা তাদের প্রতি সম্পূর্ণ বিমুখ (বাম)। মেঘনাদ নিজের হাতে নিশারণে রামচন্দ্রকে খণ্ড-খণ্ড করে কেটে বধ করেছিলেন। কিন্তু সেই মৃত রামচন্দ্র অলৌকিকভাবে পুনরায় জীবিত হয়ে রাবণের কনিষ্ঠ পুত্র বীরবাহু এবং অপরাজেয় ভাই কুম্ভকর্ণকে হত্যা করেছে। শিলা যেমন জলে ভাসে না, মৃত মানুষও তেমন বাঁচে না; কিন্তু রামচন্দ্রের ক্ষেত্রে এই অসম্ভবই সম্ভব হচ্ছে। এই দৈব মায়া ও নিয়তির নির্মম পরিহাসের কারণেই রাবণ নিজেকে অসহায় মনে করে এই উক্তি করেছেন।

৬. “তারে ডরাও আপনি।” — কে, কাকে ভয় পান? উদ্দিষ্ট ব্যক্তির ভয় পাওয়ার কারণ কী? বক্তা কীভাবে সেই ভয় দূর করতে সচেষ্ট হয়েছেন? (১+২+২)
কে কাকে ভয় পান: এখানে বক্তা মেঘনাদের মতে, তাঁর পিতা রাক্ষসরাজ রাবণ সামান্য এক মরণশীল মানব রামচন্দ্রকে (রাঘব) ভয় পাচ্ছেন।

ভয় পাওয়ার কারণ: রাবণের ভয় পাওয়ার কারণটি বস্তুগত নয়, বরং অলৌকিক বা দৈব। মেঘনাদ স্বয়ং নিশারণে রামচন্দ্রকে শরবিদ্ধ করে হত্যা করা সত্ত্বেও সে অলৌকিকভাবে পুনর্জীবন লাভ করে লঙ্কায় ফিরে এসেছে। এই অলৌকিক ক্ষমতার বলে সে রাবণের পুত্র বীরবাহু ও ভ্রাতা কুম্ভকর্ণকে বধ করেছে। প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘনকারী এই দৈব মায়াশক্তি এবং নিয়তির বিরূপতা দেখেই রাবণ মনে মনে অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েছিলেন যে হয়তো মেঘনাদকেও তিনি হারাবেন।

ভয় দূর করতে বক্তার প্রচেষ্টা: পিতার মন থেকে এই ভয় দূর করতে মেঘনাদ তাঁর নিজের অতীত পরাক্রমের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন যে, তিনি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রকে যুদ্ধে পরাস্ত করেছেন, সুতরাং এই সামান্য ছার মানব রামচন্দ্র তাঁর কাছে কোনো পাত্তাই পায় না। তিনি পিতার কাছে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সাথে মাত্র আর একবার যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চান এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে এবার তিনি রামচন্দ্রকে এমন কোনো ঔষধে বা উপায়ে বাঁচতে দেবেন না, তাকে সমূলে নির্মূল করবেন। পিতার মনে বীরত্বের চেতনা জাগিয়ে তুলে এবং নিজের অপরাজেয় শক্তির আশ্বাস দিয়ে মেঘনাদ রাবণের ভয় দূর করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন।


Your Cart

error: Content is protected !!
Scroll to Top