ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
“বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে,
করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে।”
— মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ভূমিকা
ঊনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন একাধারে অসাধারণ পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক, সাহিত্যিক ও মানবতাবাদী। অশিক্ষা, কুসংস্কার ও সামাজিক অনাচারে জর্জরিত সমাজকে শিক্ষা, যুক্তি ও মানবতার আলোয় আলোকিত করাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান ব্রত।
জন্ম ও বংশপরিচয়
ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা ভগবতী দেবী। অতি দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নিজের মেধা, অধ্যবসায় ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির বলে তিনি জীবনে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবন
শৈশবে গ্রামের পাঠশালায় শিক্ষার সূচনা হলেও অল্পবয়সেই তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ব্যাকরণ, সাহিত্য, অলংকার, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায় প্রভৃতি শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন। প্রাচ্য শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য জ্ঞানেও তিনি পারদর্শী হয়ে ওঠেন, যা তাঁর ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও চিন্তাধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
কর্মজীবন
১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা ভাষার প্রধান পণ্ডিত হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তীকালে সংস্কৃত কলেজে সাহিত্যের অধ্যাপক এবং ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে অধ্যক্ষের দায়িত্ব লাভ করেন। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্ঞানের প্রসারে তিনি আমৃত্যু নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।
শিক্ষাসংস্কার
সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালে তিনি পাঠ্যক্রমে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন—সংস্কৃতের পাশাপাশি ইংরেজি ও পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সংযোজন এবং জাতিভেদ নির্বিশেষে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। ১৮৫০-এর দশকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি প্রায় বিশটিরও বেশি মডেল স্কুল স্থাপন করেন। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল সমাজের অন্ধকার দূর করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
নারীশিক্ষা
নারীশিক্ষার প্রসারে বিদ্যাসাগরের অবদান অসামান্য। তিনি প্রায় পঁয়ত্রিশটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং জন ড্রিংকওয়াটার বেথুনকে বেথুন স্কুল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, নারীর শিক্ষা ছাড়া সমাজের প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়।
সমাজসংস্কার
বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কারের আদর্শ ছিল মানবতা ও যুক্তিবোধ। বিধবাদের দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। শাস্ত্রীয় যুক্তি ও মানবিকতার ভিত্তিতে জনমত গড়ে তোলার ফলে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন প্রণীত হয়। এছাড়া বহুবিবাহ প্রথার বিরুদ্ধেও তিনি দীর্ঘ আন্দোলন চালান, শাস্ত্রীয় প্রমাণসহ পুস্তিকা রচনা করে এই প্রথার কুফল তুলে ধরেন। এই আন্দোলনগুলির মাধ্যমে তিনি ভারতীয় সমাজসংস্কারের ইতিহাসে যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
সাহিত্যসৃষ্টি
বাংলা গদ্যের আধুনিক রূপদানে বিদ্যাসাগর ছিলেন প্রধান পথিকৃৎ; তাঁকে যথার্থই ‘বাংলা গদ্যের আধুনিক রূপদানের সেনাপতি’ বলা হয়। তাঁর ‘বর্ণপরিচয়’ বাংলা ভাষাশিক্ষার ইতিহাসে এক অমর সৃষ্টি। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনা—’বোধোদয়’, ‘কথামালা’, ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, ‘শকুন্তলা’, ‘সীতার বনবাস’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’ ও ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’। তাঁর গদ্য ছিল সহজ, যুক্তিনিষ্ঠ, পরিমিত ও সুসংবদ্ধ।
মানবতাবোধ ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
বিদ্যাসাগরের চরিত্রের শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য ছিল গভীর মানবতাবোধ। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর জীবনের আদর্শ। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই তাঁর জীবনাবসান ঘটলেও তাঁর আদর্শ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে কন্যাশ্রী বা মেয়েদের শিক্ষাবৃত্তির মতো উদ্যোগে তাঁরই নারীশিক্ষার স্বপ্নের প্রতিফলন দেখা যায়।
উপসংহার
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন এমন এক মহাপুরুষ, যাঁর জীবনে জ্ঞান, কর্ম ও মানবতার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। তিনি শুধু বিদ্যার ‘সাগর’ ছিলেন না, ছিলেন করুণারও ‘সিন্ধু’। অশিক্ষা ও কুসংস্কারের অন্ধকার দূর করে শিক্ষা ও মানবতার আলো জ্বালানোর যে ব্রত তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা তাঁকে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তাই বিদ্যাসাগর বাঙালির গর্ব এবং মানবসভ্যতার এক চিরন্তন আলোকবর্তিকা।
