WBCSSC বাংলা ইন্টারভিউ

WBCSSC বাংলা ইন্টারভিউ প্রস্তুতি
নবম-দশম শ্রেণি শিক্ষক নিয়োগ | প্রশ্নোত্তরে প্রাচীন ও মধ্যযুগ
প্রাচীনযুগ: চর্যাপদ
১. অবাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্য নিদর্শনগুলিকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অন্তর্ভুক্তির কারণ কী?
উত্তর: বাঙালিরা সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অবহট্ট ভাষায় যেসব সাহিত্য রচনা করেছিলেন সেগুলিতে বাংলার সমাজ জীবন, প্রকৃতি, প্রেমভাবনা সর্বোপরি বাঙালির মানস সাহিত্যিক রূপ পেয়েছে এবং পরবর্তীকালের রাধাকৃষ্ণ লীলায়, রামকথা, মঙ্গলকাব্যের নানা অনুসঙ্গের পূর্বসূত্র এসব সাহিত্যে মেলে। এইসব কারণে এগুলিকে বাংলা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্তি করা হয়।
২. চর্যাপদের আগে বাঙালিরা কোন ভাষায় সাহিত্য রচনা করতেন?
উত্তর: চর্যাপদের আগে বাঙালিরা সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অবহট্ট ভাষায় সাহিত্য রচনা করতেন।
৩. চর্যাপদের পুথি নেপালে পাবার কারণ কী?
উত্তর: তুর্কি আক্রমণকারীদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ এবং হিন্দু-বৌদ্ধ মঠ-মন্দির পুথিপত্র। তাই সেই আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য পুথিপত্র নিয়ে পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাষ্ট্র নেপালে তারা পালিয়ে গিয়েছিল। এই কারণে চর্যার পুথি আবিষ্কৃত হয় নেপালে।
৪. চর্যাপদের ভাষাকে সন্ধ্যাভাষা বলার কারণ কী?
উত্তর: চর্যাপদগুলিতে পদকর্তারা যে ভাষা ব্যবহার করে বক্তব্য প্রকাশ করেছেন তা সর্বসাধারণের বোধগম্য নয়, তা সন্ধ্যার আলো-আঁধারের মতো রহস্যময়; তাই একে সন্ধ্যাভাষা বলা হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সম্যক ধ্যানের মাধ্যমে এর অর্থ বুঝতে হয় বলে এর নাম সন্ধ্যাভাষা।
৫. চর্যাপদের পদকর্তারা আলো-আঁধারি ভাষায় গানগুলি লিখতেন কেন?
উত্তর: গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায়ের লোকেরা সহজিয়াদের প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না। তাই এই সমস্ত ব্রাহ্মণদের রক্তচক্ষু থেকে তাদের ধর্মাচরণকে রক্ষা করতেই বৌদ্ধসিদ্ধাচার্যেরা সন্ধ্যা ভাষার আশ্রয় নিতেন।
৬. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চর্যাপদের গুরুত্ব কোথায়?
উত্তর:
- চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম ও একমাত্র নিদর্শন।
- চর্যাপদে তৎকালীন বাঙালিদের সমাজ ও জীবনচিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।
- বাংলা পয়ার ছন্দের ও নানা অলংকারের আদি উৎস হলো চর্যাপদ।
৭. নবচর্যাপদ কী?
উত্তর: ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে ডঃ শশিভূষণ দাশগুপ্ত নেপালে ২০টি প্রাচীন পুথি থেকে ২৫০টি চর্যাপদ পান। তার থেকে ৯৮টি পদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘নবচর্যাপদ’ নামে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে শশিভূষণ দাশগুপ্তের মৃত্যু হলে ড. অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘নবচর্যাপদ’ প্রকাশিত হয়।
৮. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের যুগ বিভাগের প্রয়োজনীয়তা কী?
উত্তর: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের যুগ বিভাগ করা এই জন্য প্রয়োজন যে, কোনো কবি বা সাহিত্যিক সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে—তিনি কোন পর্বের ব্যক্তি। শুধু সাহিত্যিক সম্পর্কেই নয়, সমকালীন সমাজ জীবনের ইতিহাসের ধারাটি বুঝতেও এতে সুবিধা হয়।
মধ্যযুগ: সাধারণ পরিচয় ও মঙ্গলকাব্য
১. বাংলা সাহিত্যে কোন সময়কে বন্ধ্যাযুগ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ বলা হয়?
উত্তর: তুর্কি আক্রমণের পরবর্তী সময়কে অর্থাৎ ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীকে (১২০১-১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ)।
২. ঐ সময়কে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকারময় যুগ বলা হয় কেন?
উত্তর: কারণ এই সময়ে কোনো সাহিত্য রচনা হয়নি, বা হলেও তার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তুর্কি আক্রমণের ফলে প্রায় ১৫০ বছর বাংলা সাহিত্য তার সৃষ্টিশীল ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত ছিল, তাই এই সময়কে অন্ধকারময় যুগ বলা হয়।
৩. বাংলা সাহিত্যে তুর্কি আক্রমণের প্রভাব সম্পর্কে বলুন।
উত্তর:
- চর্যাপদের মাধ্যমে সাহিত্য রচনার যে সূচনা হয়েছিল, তুর্কি আক্রমণের ভয়াবহতা তার ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করেছিল।
- তুর্কি আক্রমণের ফলে ব্রাহ্মণ ও অব্রাহ্মণ, উচ্চ ও নিম্ন বর্গের সংযোগ নিবিড় হয়। এই মিশ্র সংস্কৃতির ফলে বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য ধারার সূত্রপাত ঘটে।
- মুসলমান শাসকরা হিন্দু শাস্ত্রের রসাস্বাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, ফলে অনুবাদ শাখার সূত্রপাত ঘটে।
৪. বাংলা সাহিত্যে একক কবি রচিত প্রথম কাব্য কোনটি?
উত্তর: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন।
৫. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যটিকে কে, কত খ্রিস্টাব্দে, কোথা থেকে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের পুঁথিটি পণ্ডিত বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩১৬ বঙ্গাব্দে) বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রামের শ্রী দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির গোয়ালঘরের মাচা থেকে আবিষ্কার করেন।
৬. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের পুঁথিটি কীসের উপর লেখা ছিল?
উত্তর: তুলোট কাগজে।
৭. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যে ক’টি খণ্ড রয়েছে?
উত্তর: ১৩টি খণ্ড।
৮. খণ্ডগুলির নাম বলতে পারবেন?
উত্তর: হ্যাঁ— জন্ম, তাম্বুল, দান, নৌকা, ভার, ছত্র, বৃন্দাবন, কালিয়াদমন, যমুনা, হার, বান, বংশী এবং রাধাবিরহ।
৯. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের রাধাবিরহ অংশটি কি প্রক্ষিপ্ত?
উত্তর: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের শেষখণ্ড ‘রাধাবিরহ’ নামটির সঙ্গে ‘খণ্ড’ শব্দটি না যুক্ত থাকার জন্য কেউ কেউ অনুমান করেন এই অংশটি প্রক্ষিপ্ত। কিন্তু কাহিনির ধারাবাহিকতা, চরিত্র, ভাষা, ভণিতার ব্যবহার ইত্যাদি সবদিক বিচার করে রাধাবিরহ-কে প্রক্ষিপ্ত বলে মনে হয় না।
১০. ‘চণ্ডীদাস সমস্যা’ কী?
উত্তর: ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে বড়ু চণ্ডীদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য আবিষ্কারের সাথে সাথেই দেখা দেয় ‘চণ্ডীদাস সমস্যা’। চৈতন্যদেব যে চণ্ডীদাসের পদ আস্বাদন করতেন তা বড়ু চণ্ডীদাসের নয় বলে মনে হয়। তাছাড়া একাধিক নামাঙ্কিত চণ্ডীদাসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়— যেমন পদাবলীর চণ্ডীদাস, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের চণ্ডীদাস, সহজিয়া চণ্ডীদাস। এর ফলেই চণ্ডীদাস সমস্যা দেখা দেয়।
১১. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বলো।
উত্তর:
- শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা অবলম্বনে রচিত প্রথম বাংলা আখ্যান কাব্য।
- এই কাব্যেই প্রথম আখ্যান, নাটক ও গীতিময়তার ত্রিবেণী সঙ্গম ঘটেছে।
- চরিত্র চিত্রণ এবং ছন্দ-অলংকার প্রয়োগ কাব্যের এক বিশিষ্ট দিক।
১২. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যটি আধুনিক পাঠকদের কাছে তেমন ভাবে সমাদর লাভ করেনি কেন?
উত্তর:
- আধ্যাত্মিকতা বর্জিত রাধাকৃষ্ণ প্রেম আধুনিক পাঠকদের হৃদয় হরণ করতে পারেনি।
- কাব্যটির দুর্বোধ্য শব্দের ব্যবহার পাঠককে আকর্ষণ করতে পারেনি।
- কাব্যটির কোনো কোনো অংশ পাঠকের কাছে অশ্লীল বলে মনে হয়।
১৩. “যেখানে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের শেষ, সেখানে বৈষ্ণব পদাবলীর শুরু”—এই উক্তিটি কার? এমন মন্তব্যের কারণ কী?
উত্তর: উক্তিটি প্রমথনাথ বিশীর।
বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি মানবীয় আবেগে পরিপূর্ণ; পরবর্তীকালে বৈষ্ণব পদাবলীতে সেই মানবপ্রেম আরও আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক রূপ লাভ করে—রাধা-কৃষ্ণের প্রেম সেখানে ভক্ত ও ভগবানের সম্পর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন মানবিক প্রেমের শেষ বিন্দুতে পৌঁছে যায়, আর সেখান থেকেই বৈষ্ণব পদাবলী ঈশ্বরভক্তির পথে যাত্রা শুরু করে। তাই বলা হয়— “যেখানে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের শেষ, সেখানে বৈষ্ণব পদাবলীর শুরু।”
বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি মানবীয় আবেগে পরিপূর্ণ; পরবর্তীকালে বৈষ্ণব পদাবলীতে সেই মানবপ্রেম আরও আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক রূপ লাভ করে—রাধা-কৃষ্ণের প্রেম সেখানে ভক্ত ও ভগবানের সম্পর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন মানবিক প্রেমের শেষ বিন্দুতে পৌঁছে যায়, আর সেখান থেকেই বৈষ্ণব পদাবলী ঈশ্বরভক্তির পথে যাত্রা শুরু করে। তাই বলা হয়— “যেখানে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের শেষ, সেখানে বৈষ্ণব পদাবলীর শুরু।”
১৪. মঙ্গলকাব্য কী? এর মূল বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: মঙ্গলকাব্য হলো লৌকিক দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য রচিত ধর্মবিষয়ক আখ্যান কাব্য। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানব সমাজে দেবতাকে প্রতিষ্ঠা করা।
১৫. মঙ্গলকাব্যের প্রধান ধারাগুলো কী কী?
উত্তর: প্রধান তিনটি ধারা হলো: মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল ও ধর্মমঙ্গল।
১৬. মনসামঙ্গল কাব্যের আদি ও শ্রেষ্ঠ কবি কে?
উত্তর: মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি হলেন কানাহরি দত্ত এবং শ্রেষ্ঠ কবি বিজয়গুপ্ত।
১৭. বিজয়গুপ্তের কবি কৃতিত্ব সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন।
উত্তর: বিজয়গুপ্ত প্রধানত ভাবতন্ময়তার কবি হলেও সংস্কৃত পুরাণ সাহিত্যে তাঁর যথেষ্ট পাণ্ডিত্য ছিল। গল্পরস সৃজনে, করুণ রস ও হাস্যরসের প্রয়োগে, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক জীবনের পরিচয়ে, চরিত্রচিত্রণে বিজয়গুপ্তের ‘পদ্মাপুরাণ’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় কাব্য।
১৮. বাইশা কী?
উত্তর: ‘বাইশা’ হলো মনসামঙ্গল কাব্যের সংকলন গ্রন্থ। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আশুতোষ ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় বাইশ কবির মনসামঙ্গল বা ‘বাইশা’।
১৯. চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি কে?
উত্তর: চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি হলেন মুকুন্দ চক্রবর্তী।
২০. ‘কবিকঙ্কণ’ উপাধিটি কার? উপাধিটি কে দিয়েছিলেন? তাঁর দুটি চরিত্রের নাম বলুন।
উত্তর: ‘কবিকঙ্কণ’ উপাধিটি মুকুন্দ চক্রবর্তীর। উপাধিটি দিয়েছিলেন রঘুনাথ রায়। তাঁর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের দুটি জনপ্রিয় চরিত্র হলো কালকেতু ও ফুল্লরা।
২১. “এ যুগে জন্মগ্রহণ করিলে তিনি কবি না হইয়া একজন ঔপন্যাসিক হইতেন।” — কে কার সম্পর্কে এই উক্তি করেছেন?
উত্তর: শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মুকুন্দ চক্রবর্তী সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেছেন।
২২. কোন গ্রন্থে এই মন্তব্যটি করেছেন বলতে পারবেন?
উত্তর: ‘বঙ্গসাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’ গ্রন্থে।
২৩. এমন মন্তব্যের কারণ কী?
উত্তর: উপন্যাসের যে প্রধান লক্ষণ— বাস্তবতাবোধ, চরিত্র সৃষ্টি, সমাজ অভিজ্ঞতা এবং আশাবাদী জীবনদর্শন প্রভৃতি মুকুন্দের ‘অভয়ামঙ্গল’ কাব্যে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
২৪. চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কোন্ কবির কাব্যে প্রথম মুরারী শীল ও ভাঁড়ু দত্ত চরিত্রটি পাওয়া যায়?
উত্তর: মুকুন্দ চক্রবর্তীর ‘অভয়ামঙ্গল’ কাব্যে।
২৫. মধ্যযুগের কোন্ কবি নিজের কাব্যকে ‘নৌতন মঙ্গল’ বলেছেন?
উত্তর: মুকুন্দ চক্রবর্তী।
২৬. ‘পিপীড়ার পাখা ওঠে মরিবার তরে’ — প্রবাদটি কার, কোন্ গ্রন্থে আছে?
উত্তর: মুকুন্দ চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে।
২৭. রাঢ়ের জাতীয় কাব্য বলা হয় কোন কাব্যকে?
উত্তর: ধর্মমঙ্গল কাব্যকে।
২৮. এ কথা কে বলেছেন?
উত্তর: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়।
২৯. ধর্মমঙ্গল কাব্যকে কী রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য বলা যায়?
উত্তর: সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ধর্মমঙ্গল কাব্যকে রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য বলেছেন। কারণ:
- এই কাব্যে রাঢ় দেশের ইতিহাস, সমাজ ও বৃহত্তর জনজীবনের চালচিত্র নিখুঁতরূপে ধরা পড়েছে। রাঢ়ের ডোম চরিত্রের শৌর্যবীর্য ও সাহসিকতার পরিচয়ে বীররস উজ্জীবিত হয়েছে।
- ধর্মমঙ্গলের কাহিনি কেবল রাঢ় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ এবং এই অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষাই কাব্যে উপস্থিত।
৩০. “অন্নদামঙ্গল গান রাজকন্ঠের মণিমালার মতো।” — কে বলেছেন?
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩১. ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের তিনটি প্রবাদ প্রবচনের নাম বলুন।
উত্তর:
- “নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়।”
- “বাঘের বিক্রম সম মাঘের হিমানী।”
- “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।”
৩২. অন্নদামঙ্গল কাব্যকে নতুন মঙ্গলকাব্য বলা হয় কেন?
উত্তর: ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যকে নতুন মঙ্গলকাব্য বলা হয়, কারণ কবি স্বয়ং এটিকে ‘নূতন মঙ্গল’ বলেছেন। এটি প্রথাসিদ্ধ দেবমহিমা ছাপিয়ে মানুষের মাহাত্ম্য ও সমকালীন সমাজকে তুলে ধরে। কাহিনি ও চরিত্রে মানবিকতা আরোপিত হয়েছে। এর নাগরিক রুচি ও উন্নত শিল্পশৈলী একে পূর্ববর্তী মঙ্গলকাব্য থেকে স্বতন্ত্র করেছে।
৩৩. ভারতচন্দ্রকে যুগসন্ধির কবি বলা হয় কেন?
উত্তর: ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরকে যুগসন্ধির কবি বলা হয়, কারণ তিনি মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের ধারা এবং আধুনিক যুগের বাস্তবতাবোধ ও নাগরিক রুচির মধ্যে সেতুবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর কাব্যে প্রাচীন ও নতুনের সংমিশ্রণ ঘটেছে। কাব্যের বিষয়বস্তুতে পৌরাণিক দেবদেবী আধুনিক মানুষের রূপ ধারণ করেছে এবং দেব-দেবীর মাহাত্ম্য অপেক্ষা মানব মহিমার জয়গান ঘোষিত হয়েছে।
৩৪. মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের আগে মঙ্গলকাব্যের প্রচার কীভাবে হতো?
উত্তর: মূলত পাঁচালী গানের মাধ্যমে, দলবদ্ধভাবে গান গেয়ে এবং পুঁথি পাঠের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে মঙ্গলকাব্যের কাহিনি ও মাহাত্ম্য প্রচার করা হতো।
বৈষ্ণব পদাবলী
৩৫. বৈষ্ণব পদাবলী কাকে বলে?
উত্তর: রাধাকৃষ্ণ লীলা বিষয়ক শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর রসাশ্রিত গীতিব্যঞ্জনামূলক রসমধুর পদের সমষ্টি হলো বৈষ্ণব পদাবলী।
৩৬. প্রাক্-চৈতন্য ও চৈতন্যোত্তর বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
উত্তর:
- প্রাক্-চৈতন্য যুগে শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বর্য রূপ প্রাধান্য পেয়েছে; কিন্তু চৈতন্যোত্তর যুগে শ্রীকৃষ্ণের মধুর রূপ প্রাধান্য পেয়েছে।
- প্রাক্-চৈতন্য পর্বে কবিদের প্রেমচেতনায় ব্যক্তিগত ভাবের উচ্ছ্বাস দেখা যায়; চৈতন্যোত্তর পর্বে কবিদের ভক্তপ্রাণ ভাবোচ্ছ্বাস দেখা যায়।
- প্রথম পর্বে কবিদের ধর্মচেতনা আলাদা ছিল; চৈতন্যোত্তর পর্বে কবিরা সকলেই গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত ছিলেন।
৩৭. বৈষ্ণব পদাবলীর পাঁচটি প্রধান রস কী কী? কোন রসকে শ্রেষ্ঠ রস বলা হয় এবং কেন?
উত্তর: পাঁচটি প্রধান রস হলো: শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর।
মধুর রসকে শ্রেষ্ঠ রস বলা হয়, কারণ এই রসে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা বর্ণিত হয়, যা জীবাত্মা ও পরমাত্মার চরম মিলনের প্রতীক।
মধুর রসকে শ্রেষ্ঠ রস বলা হয়, কারণ এই রসে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা বর্ণিত হয়, যা জীবাত্মা ও পরমাত্মার চরম মিলনের প্রতীক।
৩৮. ব্রজবুলি ভাষা কী? বাংলা সাহিত্যের জন্য এর গুরুত্ব কতখানি?
উত্তর: এটি বাংলা, মৈথিলী ও অসমীয়া ভাষার মিশ্রণে গঠিত একটি কৃত্রিম বা কবিভাষা। বৈষ্ণব পদাবলীকে একটি সর্বভারতীয় রূপ দিতে এই ভাষার সৃষ্টি হয়েছিল। এর সুরমাধুর্য বাংলা সাহিত্যের রসবোধকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে।
৩৯. পূর্বরাগ কাকে বলে? এই পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি কে?
উত্তর: মিলনের পূর্বে যে রতি নায়ক-নায়িকার চিত্তে দর্শন ও শ্রবণের মাধ্যমে জাগ্রত হয় তাকে পূর্বরাগ বলা হয়। শ্রীরূপ গোস্বামী ‘উজ্জ্বলনীলমণি’ গ্রন্থে লিখেছেন:
“রতির্যা সঙ্গমাৎ পূর্বং দর্শন-শ্রবণাদিজা।
তয়োরুন্মীলতি প্রাজ্ঞৈঃ পূর্বরাগঃ স উচ্যতে।।”
এই রস পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি চণ্ডীদাস।তয়োরুন্মীলতি প্রাজ্ঞৈঃ পূর্বরাগঃ স উচ্যতে।।”
৪০. পূর্বরাগ ও অনুরাগের পার্থক্য বলুন।
উত্তর: মিলনের পূর্বে যে অনুরাগ জাগ্রত হয় তা ‘পূর্বরাগ’, আর মিলনের পরেও যে প্রীতি প্রতিনিয়ত নব নব রূপ ধারণ করে তা হলো ‘অনুরাগ’।
৪১. অভিসার কাকে বলে? শ্রেষ্ঠ কবি কে?
উত্তর: প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনের বাসনায় নায়ক বা নায়িকার পূর্বনির্দিষ্ট সংকেতকুঞ্জে গমনকে অভিসার বলে। অভিসার পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি হলেন গোবিন্দদাস।
৪২. গৌরচন্দ্রিকা কাকে বলে?
উত্তর: গৌরাঙ্গদেবের অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ জীবনের কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে রচিত যে পদ রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ কীর্তনের সূচনা বা ভূমিকা হিসেবে গাওয়া হয়, তাকে ‘গৌরচন্দ্রিকা’ বলে।
৪৩. বৈষ্ণব কবিদের লীলাশুক বলা হয় কেন?
উত্তর: বৈষ্ণব কবিরা শুক পাখির মতো আপন আনন্দে ভাবতন্ময় হয়ে রাধাকৃষ্ণের কীর্তন করতেন। রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনাই তাঁদের একমাত্র সাধনা ছিল বলে তাঁদের ‘লীলাশুক’ বলা হয়ে থাকে।
৪৪. “খেতুরীর উৎসব” বাংলা সাহিত্যে কেন স্মরণীয়?
উত্তর: ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে নরোত্তম ঠাকুর এই উৎসবের আয়োজন করেন। এই উৎসবে বৈষ্ণব রসশাস্ত্র আলোচনার মাধ্যমে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার হয়, যা বাংলা বৈষ্ণব সাহিত্যের গতিপথ নির্ণয়ে সাহায্য করে।
৪৫. বিদ্যাপতিকে ‘অভিনব জয়দেব’ উপাধি কে দিয়েছিলেন এবং কেন?
উত্তর: মিথিলার রাজা শিবসিংহ বিদ্যাপতিকে ‘অভিনব জয়দেব’ উপাধি দিয়েছিলেন। রাজসভার কবি বিদ্যাপতির পদে যে নাগরিক মানসিকতা, বিলাসবহুল সমারোহ, ছন্দের ঝংকার ও অলংকারের কারুকার্য প্রতিফলিত হয়েছে, তাতে জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম’ কাব্যের প্রভাব লক্ষ্য করেই শিবসিংহ তাঁকে এই আখ্যা দেন।
৪৬. বিদ্যাপতি বাংলা ভাষায় কোনো পদ রচনা করেননি, তবুও তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করার কারণ কী?
উত্তর:
- বিদ্যাপতির রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলি বাঙালিদের অতি প্রিয় বিষয় ছিল।
- রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা নির্ভর রচনার প্রতি বাঙালির অন্তরের গভীর টান ছিল।
- স্বয়ং শ্রীচৈতন্যদেব বিদ্যাপতির পদের রস আস্বাদন করতেন।
- বিদ্যাপতির ব্রজবুলি ভাষা পরবর্তী বাঙালি কবিদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
৪৭. চণ্ডীদাসের সঙ্গে বিদ্যাপতির পার্থক্য বলুন।
উত্তর: চণ্ডীদাস গ্রামবাংলার কবি; পাণ্ডিত্যবর্জিত সহজ-সরল ভাষায় তিনি পদ রচনা করেছেন। অন্যদিকে বিদ্যাপতি নাগরিক ও পণ্ডিত কবি; তাই তাঁর রচনায় বাকবৈদগ্ধ ও অলংকার কারুকার্য বেশি।
রবীন্দ্রনাথের মতে: (ক) “বিদ্যাপতি সুখের কবি, চণ্ডীদাস দুঃখের কবি।” (খ) “চণ্ডীদাস গভীর এবং ব্যাকুল, বিদ্যাপতি নবীন এবং মধুর।”
রবীন্দ্রনাথের মতে: (ক) “বিদ্যাপতি সুখের কবি, চণ্ডীদাস দুঃখের কবি।” (খ) “চণ্ডীদাস গভীর এবং ব্যাকুল, বিদ্যাপতি নবীন এবং মধুর।”
৪৮. পূর্বরাগের শ্রেষ্ঠ কবি কে? তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ কী?
উত্তর: চণ্ডীদাস পূর্বরাগের শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর পূর্বরাগের পদগুলিতে শ্রীরাধার হৃদয়গ্রাহী ব্যাকুলতা যে বেদনাঘন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, সমগ্র বৈষ্ণব পদসাহিত্যে তার তুলনা নেই।
একটি বিখ্যাত পদ:
একটি বিখ্যাত পদ:
“সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম।
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো
আকুল করিল মোর প্রাণ।।”
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো
আকুল করিল মোর প্রাণ।।”
৪৯. ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’ — এটি কার লেখা?
উত্তর: চণ্ডীদাস।
৫০. জ্ঞানদাসকে চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য বলা হয় কেন?
উত্তর: জ্ঞানদাস রূপানুরাগ ও আক্ষেপানুরাগের পদগুলিতে চণ্ডীদাসের মতোই সহজ-সরল ভাষায় ভাবের গভীরতাকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর পদে চণ্ডীদাসের মতো প্রেমের তীব্র জ্বালা, মিলনের ব্যাকুলতা ও বিরহের আবেগ প্রতিফলিত হয়েছে বলে তাঁকে চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য বলা হয়।
৫১. গোবিন্দদাসকে ‘দ্বিতীয় বিদ্যাপতি’ কে বলেছেন এবং কেন?
উত্তর: কবি বল্লভদাস গোবিন্দদাসকে ‘দ্বিতীয় বিদ্যাপতি’ বলেছেন। গোবিন্দদাস কাব্যাদর্শের দিক থেকে বিদ্যাপতিকে বিশেষভাবে অনুসরণ করেছিলেন। বিদ্যাপতির ছন্দমাধুর্য ও অলংকারের ঝংকার গোবিন্দদাসের প্রতিভায় নতুনভাবে বিকশিত হয়েছিল।
৫২. বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন।
উত্তর: বৈষ্ণব পদাবলীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। তৎকালীন মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস-সংস্কার এবং বাংলা ভাষার রূপটি পদাবলীর মধ্যে ধরা পড়েছে। এটি কেবল গীতিসাহিত্য নয়, একটি সামাজিক ও ধর্মীয় আন্দোলনেরও প্রতিফলন, যা তৎকালীন সামাজিক ভেদাভেদ দূর করতে সাহায্য করেছিল।
৫৩. দুজন মুসলমান বৈষ্ণব কবির নাম বলুন।
উত্তর: শেখ কবীর ও সৈয়দ মর্তুজা (সপ্তদশ শতাব্দী)।
৫৪. বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীর নাম বলুন।
উত্তর: সনাতন গোস্বামী, রূপ গোস্বামী, জীব গোস্বামী, গোপাল ভট্ট গোস্বামী, রঘুনাথ ভট্ট গোস্বামী ও রঘুনাথ দাস গোস্বামী।
৫৫. গৌরচন্দ্রিকা ও গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
উত্তর: গৌরাঙ্গদেবের অন্তরঙ্গ এবং বহিরঙ্গ জীবনের যেকোনো প্রসঙ্গ নিয়ে রচিত পদই হলো ‘গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ’। কিন্তু গৌরাঙ্গ বিষয়ক যে পদ রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ কীর্তনের ভূমিকা বা সূচনা হিসেবে গাওয়া হয়, তাকে ‘গৌরচন্দ্রিকা’ বলে।
চৈতন্যজীবনী, অনুবাদ ও অন্যান্য সাহিত্য
৫৬. বাংলা সাহিত্যে কোন্ সময়কে সুবর্ণযুগ বলা হয় এবং কেন?
উত্তর: ষোড়শ শতাব্দীকে। এই শতাব্দীতে শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখা নব নব রূপে মুকুলিত ও পল্লবিত হয়ে ওঠে বলে একে সুবর্ণযুগ বলা হয়।
৫৭. চৈতন্যদেবের জন্ম ও মৃত্যু সাল বলুন।
উত্তর: জন্ম: ১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দ, মৃত্যু: ১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ।
৫৮. চৈতন্যদেব কোন গ্রন্থ রচনা করেননি তবুও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ কেন?
উত্তর: চৈতন্যদেব নিজে কোনো গ্রন্থ রচনা না করলেও ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে সাহিত্যকে এক অভূতপূর্ব প্রেরণা দিয়েছিলেন। তাঁর জীবন ও প্রেমধর্ম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলা ভাষায় জীবনী সাহিত্য ও নতুন পদাবলী সাহিত্যের সৃষ্টি হয়, যা বাংলা ভাষার পরিধিকে প্রসারিত করে।
৫৯. চৈতন্যদেবকে নিয়ে লেখা প্রাচীনতম জীবনীগ্রন্থ কোনটি? এর রচয়িতা কে?
উত্তর: প্রাচীনতম বাংলা জীবনীগ্রন্থ হলো ‘চৈতন্যভাগবত’। এর রচয়িতা বৃন্দাবন দাস।
৬০. ‘চৈতন্যভাগবত’ গ্রন্থটি স্মরণীয় কেন?
উত্তর:
- এটি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম চৈতন্যজীবনী গ্রন্থ।
- গ্রন্থটিতে শ্রী চৈতন্যের জীবন ও বাংলা বৈষ্ণবধর্ম সম্পর্কে প্রামাণ্য তথ্য মেলে।
- এটি ষোড়শ শতাব্দীর বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের জীবন্ত দলিল।
৬১. শ্রেষ্ঠ চৈতন্যজীবনী গ্রন্থ কোনটি এবং কেন?
উত্তর: শ্রেষ্ঠ চৈতন্যজীবনী গ্রন্থ হলো কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’। কবিরাজ গোস্বামীর দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, তথ্যনিষ্ঠতা, প্রামাণিকতা এবং বিচার বিশ্লেষণের গভীরতা কাব্যটিকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছে।
৬২. মধ্যযুগে অনুবাদ সাহিত্য রচিত হলো কেন?
উত্তর: (ক) তুর্কি আক্রমণের পর নবগঠিত বাঙালি জাতির সামনে পৌরাণিক আদর্শ তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল। (খ) মুসলমান শাসকেরা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনুরাগী হওয়ায় তাঁদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় অনুবাদ সাহিত্যের সূচনা হয়।
৬৩. বাংলা ভাষার গঠনে অনুবাদ সাহিত্যের ভূমিকা কী?
উত্তর: নতুন ও গঠনমুখী ভাষার বিকাশ ও শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধিতে অনুবাদ সাহিত্য অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। সংস্কৃত রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ধ্রুপদী মহাকাব্যের গাম্ভীর্য ও প্রকাশক্ষমতা লাভ করেছিল।
৬৪. কৃত্তিবাসী রামায়ণের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণ কী?
উত্তর:
- রামায়ণের পাত্র-পাত্রীদের মধ্যে বাঙালি স্বভাব ও আবেগ আরোপ করা হয়েছিল।
- কাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে বাংলার নিজস্ব সমাজচিত্র।
- ভক্তি ও করুণ রসের সহজ প্রকাশ।
- পাঁচালির সুরে সহজে আবৃত্তিযোগ্যতা।
৬৫. রামায়ণ-মহাভারতের মতো ভাগবত পুরাণ জনপ্রিয়তা লাভ করেনি কেন?
উত্তর: (ক) ভাগবত মূলত বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের তত্ত্বপ্রধান গ্রন্থ হওয়ায় তা সর্বজনীন লৌকিক আবেদন পায়নি। (খ) ভাগবতের গভীর ও শুষ্ক তত্ত্ব আলোচনা সাধারণ বাঙালির আবেগপ্রধান মনে রামায়ণ-মহাভারতের মতো সাড়া ফেলেনি।
৬৬. শাক্তপদাবলী কাকে বলে?
উত্তর: জগজ্জননী দেবী আদ্যাশক্তি দুর্গাকালীকে ভক্তি ও বাৎসল্যের মাধ্যমে পূজার্চনা করতে গিয়ে সাধক কবিরা যে গীতিবহুল ভক্তিভাবের পদ বা কবিতা রচনা করেছিলেন, তাকে শাক্তপদাবলী বলা হয়।
৬৭. শাক্ত পদাবলীর প্রধান কবি কে?
উত্তর: রামপ্রসাদ সেন।
৬৮. রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের মধ্যে কী পার্থক্য দেখতে পান?
উত্তর: রামপ্রসাদ সেন ‘ভক্তের আকুতি’ পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন এবং তাঁর ভাষা সহজ-সরল ও সাধারণের সুরের কাছাকাছি। আর কমলাকান্ত শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন ‘আগমনী ও বিজয়া’ পর্যায়ে এবং তাঁর ভাষা অলংকারময় ও সুরপ্রধান।
৬৯. শাক্তপদাবলীর অপর নাম কী এবং কেন?
উত্তর: শাক্তপদাবলীর অপর নাম ‘মালসী গান’। কারণ এই গানগুলি ঐতিহ্যগতভাবে প্রাচীন ‘মালবশ্রী’ রাগে গীত হতো।
৭০. শাক্ত পদাবলী ও বৈষ্ণব পদাবলীর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
উত্তর:
- বৈষ্ণব পদাবলীর মূল রস হলো মধুর রস; শাক্ত পদাবলীর মূল রস হলো বাৎসল্য রস।
- বৈষ্ণব পদাবলী ভাবপ্রধান ও প্রেমভিত্তিক; শাক্ত পদাবলী বাস্তব জীবনের পারিবারিক বেদনার রূপায়ণ।
৭১. বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আদি কবি কে? তাঁর লেখা একটি গ্রন্থের নাম বলুন।
উত্তর: শাহ মুহম্মদ সগীর। তাঁর লেখা বিখ্যাত কাব্যের নাম ‘ইউসুফ-জুলেখা’।
৭২. ষোড়শ শতাব্দীর দুজন ইসলামী কবির নাম বলুন।
উত্তর: সাবিরিদ খান ও বাহারাম খান।
৭৩. তাঁদের লেখা একটি করে কাব্যের নাম বলুন।
উত্তর: সাবিরিদ খানের ‘রসুল বিজয়’ এবং বাহারাম খানের ‘লায়লী মজনু’।
৭৪. রোসাঙ রাজসভার দুজন কবির নাম বলুন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রোসাঙ রাজসভা প্রসিদ্ধ কেন?
উত্তর: দুই স্বনামখ্যাত কবি হলেন দৌলত কাজী ও সৈয়দ আলাওল।
দেবকেন্দ্রিকতার বাইরে এসে সম্পূর্ণ মানবিক প্রেম ও রোমান্টিক আখ্যানকাব্য রচনার পথ দেখানোর জন্য বাংলা সাহিত্যে রোসাঙ (আরাকান) রাজসভা স্মরণীয়।
দেবকেন্দ্রিকতার বাইরে এসে সম্পূর্ণ মানবিক প্রেম ও রোমান্টিক আখ্যানকাব্য রচনার পথ দেখানোর জন্য বাংলা সাহিত্যে রোসাঙ (আরাকান) রাজসভা স্মরণীয়।
৭৫. বাংলা সাহিত্যে আরাকান রাজসভার গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন।
উত্তর: মধ্যযুগের ধর্মীয় দেবকেন্দ্রিকতার গণ্ডি পেরিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক প্রেমকাহিনি রচনার সূচনা ঘটে এই রাজসভার কবিদের হাতেই। এটি হিন্দু ও মুসলিম সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল।
৭৬. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দৌলত কাজির ‘লোরচন্দ্রাণী’ স্মরণীয় কেন?
উত্তর: দৌলত কাজির ‘লোরচন্দ্রাণী’ (বা সতী ময়না) কাব্যটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম মানবীয় প্রণয় উপাখ্যান। দেবমহিমামুক্ত বাস্তব মানব জীবনের অনুভূতি প্রকাশে এটি অনন্য।
৭৭. নাথ সাহিত্য কেন বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: নাথ সাহিত্য সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গের মানুষের নাথধর্ম, যোগসাধনা এবং অলৌকিক ক্ষমতার কাহিনি প্রকাশ করে। ‘গোরক্ষবিজয়’ বা ‘ময়নামতীর গান’ এই ধারার প্রধান নিদর্শন।
৭৮. গীতিকা কী?
উত্তর: স্থানীয় বা ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছড়া বা পাঁচালির আকারে মুখে মুখে রচিত ও গীত আখ্যানমূলক লোকসঙ্গীতই হলো গীতিকা।
৭৯. গাথা বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ইংরেজি ‘Ballad’-এর বাংলা প্রতিশব্দ হলো ‘গাথা’। এটি মূলত একটি সংক্ষিপ্ত লোকপ্রিয় আখ্যানমূলক কবিতা বা গান, যা সাবলীল গতিতে কোনো ঘটনা বা কাহিনি বর্ণনা করে।
৮০. ময়মনসিংহ গীতিকার আবিষ্কারক, সংগ্রাহক ও প্রকাশক সম্পর্কে বলুন।
উত্তর: আবিষ্কারক ও সংগ্রাহক হলেন চন্দ্রকুমার দে। ১৯২৩ সালে ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদনায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এটি ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ নামে প্রকাশিত হয়।
৮১. বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের কোন সময়কে অবক্ষয়ের যুগ বলা হয় এবং কেন?
উত্তর: অষ্টাদশ শতককে (বিশেষত উত্তর পর্বকে) অবক্ষয়ের যুগ বলা হয়। কারণ এই সময়ে কাব্যের মৌলিকতা ও ভাবগাম্ভীর্য হ্রাস পেয়েছিল এবং তার জায়গায় স্থান পেয়েছিল কৃত্রিম অলংকারপ্রিয়তা, শব্দচাতুর্য এবং অনুকরণপ্রিয়তা।
