বাঙালির চিত্রকলা | বাংলা ভাষা ও সাহিত্য | দ্বাদশ শ্রেণি | H.S. Bengali | XII | bangalir chirakala

বাঙালির চিত্রকলা | বাংলা ভাষা ও সাহিত্য | দ্বাদশ শ্রেণি

  বাংলার চিত্রকলার ইতিহাসে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চিত্রকলার জগতে ইউরোপীয় রীতির পাশাপাশি ভারতীয় শিল্পীদের যে বিরাট ভূমিকা থাকতে পারে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তুলিতে তা  প্রথম প্রকাশিত হয়। তিনি হলেন ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ। নব্যবঙ্গীয় চিত্ররীতির জনকও তিনি । তিনি হলেন প্রথম ভারতীয়, যিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী।

অবনীন্দ্রনাথের চিত্রকলার পাঠ শুরু হয় তৎকালীন আর্ট স্কুলের শিক্ষক ইতালীয় শিল্পী গিলার্ডির কাছে। তাঁর কাছে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেখেন ড্রয়িং, প্যাস্টেল ও জলরং। পরবর্তীতে ইংরেজ শিল্পী সি এল পামারের কাছে লাইফ স্টাডি, তেলরং ইত্যাদি শিক্ষা অর্জন করেন। ভারতীয় রীতিতে তাঁর আঁকা প্রথম চিত্রাবলি ‘কৃষ্ণলীলা-সংক্রান্ত’। এই কৃষ্ণলীলা সিরিজ থেকেই ভারতীয় আধুনিক চিত্রকলার জয়যাত্রা শুরু হয়।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান দক্ষতা ছিল জলরঙে, ‘ওয়াশ’ পদ্ধতিতে চিত্র রচনায়।ওয়াশ পদ্ধতিতে চিত্র রচনার ফলে তাঁর ছবিতে ব্যবহৃত রঙের চরিত্র হয়ে উঠল পেলব ও মৃদু।দৃশ্যমান জগতের চেয়ে অনুভূতির জগৎ প্রাধান্য পেল। তাঁর শাজাহানের অন্তিমকাল মোঘল মিনিয়েচারের এক লোকায়ত নিরীক্ষা,যেখানে শাজাহানের অন্তিম সারবত্তা করুণ রসের। ক্রমান্বয়ে আকঁলেন বুদ্ধ ও সুজাতা (১৯০১), কালীদাসের ঋতুসংহার বিষয়ক চিত্রকলা (১৯০১), ভারতমাতা(১৯০৫), কচ ও দেবযানি (১৯০৬), শেষযাত্রা (১৯১৪)। জাপানি প্রভাবে অবনীন্দ্রনাথ অঙ্কন করেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ওমর খৈয়াম (১৯৩০)চিত্রাবলি। চিত্রসাধনের শেষ পর্যায়ে অবনীন্দ্রনাথের শিল্পচিন্তা নতুন মাত্রা লাভ করে। গড়ে তোলেন কুটুম কাটাম – আকারনিষ্ঠ এক বিমূর্ত রূপসৃষ্টি।

রামকিঙ্কর বেইজ

ভারতীয় শিল্পকলা চর্চায় আধুনিকতার প্রবক্তা হিসেবে যাদের নাম উচ্চারিত হয় তাদের মধ্যে রামকিঙ্কর বেইজ অন্যতম। রামকিঙ্কর বেইজ, আধুনিক ভারতীয় ভাস্কর্যের অন্যতম পথপ্রদর্শক ও বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। তাঁর শিল্প সৃষ্টির মূলে আছে দলিত এবং আদিবাসীর জীবনাচরণ । প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় তাকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন। তিনি তেল রং ও জল রঙের ছবি এঁকেছেন । ছবিগুলো প্রধানত প্রকৃতি কেন্দ্রিক।

ভারতীয় ভাস্কর্যের চরিত্র নির্মাণে রামকিঙ্করের বিশেষ ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি তাঁর শিল্পকর্মে সাঁওতালদের জীবন ও কর্মের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন পাশ্চাত্য প্রকাশবাদী ঢঙে। তার ভাস্কর্য ও চিত্রকলার কোনোটিই তার সময়ের প্রচলিত ভারতীয় রূপরীতির অনুসারী নয়। সেগুলো তার নিজস্ব ভাবনার ঋদ্ধ প্রকাশ। শহরের আকর্ষণ ছেড়ে দূরে উত্তর কলকাতায় শান্তিনিকেতনে কাটিয়েছেন প্রায় সারাটা জীবন। ওখানকার ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষরা তার আগ্রহ কেড়ে নিয়েছিল। ছবি ও ভাস্কর্যে তিনি তাদের জীবনকে ধরে রাখতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তার চারপাশে সচল, প্রাণবন্ত মৃত্তিকালগ্ন এই জীবন-প্রবাহ তাকে সার্বক্ষণিক টানতো। প্রকৃতির সৌন্দর্য ও তার দানবীয় শক্তি উভয়ই তিনি তার শিল্পকর্মে ভিন্নমাত্রায় তুলে ধরেছেন। তাইতো তার ছবিতে দেখতে পাই ধানমাড়াইরত গ্রামীণ নারী, সাঁওতাল উৎসব, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এবং ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে চিত্রিত।

তাঁর শিল্পকর্ম ভারতীয় শিল্প-ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। প্রথমদিকে রামকিঙ্কর ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা অসহযোগ আন্দোলনের সংগ্রামীদের আবক্ষ চিত্র আঁকতেন। মানুষের মুখ, অভিব্যক্তি, তাদের শরীরের ভাষা নাটকীয় ভঙ্গিতে প্রকাশ করাতে তার আগ্রহ ছিল বেশি। আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্প, প্রাচীন ও আধুনিক ভারতীয় ধ্রুপদী চিত্রকর্ম তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। দারিদ্র্যকে বরণ করে নিয়েও দেশের দীপ্ত মুখচ্ছবিকে সারা বিশ্বের কাছে উপহার দিয়েছেন এই সার্থক চিত্রশিল্পী।

 

বাংলার চিত্রকলার ইতিহাসে নন্দলাল বসুর অবদান 

বাংলার চিত্রকলার ইতিহাসে নন্দলাল বসুর অবদান অনস্বীকার্য । নন্দলাল বসু শৈশবকাল থেকেই চিত্রকলার প্রতি গভীর আকৃষ্ট ছিলেন। তিনি কম বয়স থেকেই উৎসাহের মধ্য দিয়ে দেবদেবীর মূর্তি সহ পুতুল তৈরি করতেন । অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রচেষ্টায় তিনি আর্টস্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান । এরপর থেকেই তাঁর চিত্রশিল্পের প্রতিভার প্রকাশ পায়।

অবনীন্দ্রনাথের চিত্রচর্চায় ধ্রুপদী ও পৌরাণিক অতীত সম্পর্কে যে দ্বিধাহীন ঝোঁক ছিল তা থেকে সরে এসে তাঁর ছাত্র নন্দলাল বসু নিজের চারপাশের বহমান জীবনকে ছবির বিষয় করে তোলেন। গ্রামীণ প্রকৃতি সাধারণ দরিদ্র মানুষের জীবন হয়ে উঠলো তার ছবির উপজীব্য। ১৯২০ সালে নন্দলাল শান্তিনিকেতনের কলাভবন স্থায়ীভাবে যোগদান করার পর থেকেই শিল্প শিক্ষার এক বৈশিষ্ট পদ্ধতি এই প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করে তোলে। ভারতীয় শিল্পশিক্ষায় নন্দলালই সর্বপ্রথম আউটডোর স্টাডি বা নেচার স্টাডির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন ।

নন্দলাল বসুর হাতে প্রাধান্য পেয়েছিল প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ মূলক ছবি।

শান্তিনিকেতনের দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তর , তার খোয়াই, মাঠে বিচরণরত মোষ, নারী-পুরুষ-শিশু, হাট যাত্রী পথিক, মালবোঝাই গরুর গাড়ি – এ সমস্তই উঠে এল তার ছবির বিষয় হিসেবে। নন্দলালের করার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সহজ পাঠে’র অনবদ্য অলংকরণ প্রতিটি বাঙালির শৈশব স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। স্বদেশী ভাবনায় গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ছিলেন নন্দলাল বসু । ১৯৩০ সালে ডান্ডি লবণ আন্দোলনে গান্ধীজির গ্রেফতারের পরে নন্দলাল সাদা-কালোয় লাঠি হাতে চলমান গান্ধীজিকে এঁকেছিলেন। এই চিত্রটি অহিংস আন্দোলনের আইকন বা প্রতীকে পরিণত হয় ।

নন্দলাল বসু অঙ্কিত বিখ্যাত ছবি হলো সতী, পার্থসারথি, হলকর্ষণ, রাঙামাটির পথ ,শোকার্ত সিদ্ধার্থ ,জগাই মাধাই প্রভৃতি । ভারতীয় সংবিধানের সচিত্র সংস্করণও নন্দলাল বসু অলংকৃত করেন।

 

বাংলা চিত্রকলার ইতিহাসে চিত্রশিল্পী যামিনী রায়ের অবদান 

বাংলা চিত্রকলার ইতিহাসে চিত্রশিল্পী যামিনী রায়ের অবদান অনস্বীকার্য। তিনি বাংলার বিখ্যাত লোকচিত্র কালীঘাট পটচিত্র শিল্পকে বিশ্বনন্দিত করে তোলেন। তিনি নিজে পটুয়া না হলেও নিজেকে পটুয়া হিসেবে পরিচয় দিতেই তিনি পছন্দ করতেন।১৯১৮-১৯ থেকে তাঁর ছবি ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টের পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে।

বিদেশি ভাবধারায় প্রথম দিকে ছবি আঁকলেও পরবর্তীতে সম্পূর্ণ দেশীয় তথা গ্রামবাংলার প্রতিরূপ তার ছবিতে ফুটে উঠেছে। নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তার লক্ষ্যে তিনি লোক ও নৃগোষ্ঠীদের সংস্কৃতি বেছে নেন। নিজস্ব বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাবধারার জন্য তিনি গর্বিত ছিলেন। তিনি বহুবার বিদেশ থেকে আমন্ত্রণ পেলেও কখনও বিদেশে যাননি।-

   “আমরা গরিব দেশের মানুষ, এত পয়সা খরচ করে ওদের দেশে যাব কেন? ওদের অনেক পয়সা, ওরা এসে আমাদেরটা দেখে যাক।”

বাংলার লোকজ পুতুল, শিশু, গ্রাম বাংলার সরল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখর চিত্র ইত্যাদি তিনি তার ছবির ‘ফর্ম’ হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর ছবির বিষয় বৈচিত্র্য লক্ষ্যনীয়। তাঁর আঁকা ছবিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য-সাঁওতাল জননী ও শিশু,মাদলবাদনরত সাঁওতাল,নৃত্যরত সাঁওতাল,মা ও শিশু, রাধাকৃষ্ণ, রাবণ, সীতা, জটায়ু, যীশু প্রভৃতি।

 

Your Cart

error: Content is protected !!
Scroll to Top