অভিষেক
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
কবি পরিচিতি
জন্ম: ২৫ জানুয়ারি ১৮২৪ | মৃত্যু: ২৯ জুলাই ১৮৭৩
মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক মহাকবি। স্বতন্ত্র কবিসত্তার অধিকারী এই দূরদর্শী সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ও সনেটের (চতুর্দশপদী কবিতা) প্রবর্তক। এছাড়াও তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক নাট্যকার, প্রহসন রচয়িতা এবং পত্রকাব্যকার হিসেবে খ্যাত।
নাট্যকার হিসেবেই তিনি প্রথম বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে পদার্পণ করেন। রামনারায়ণ তর্করত্ন বিরচিত ‘রত্নাবলী’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব গভীরভাবে বোধ করেন। এই অভাব পূরণের লক্ষ্য নিয়েই তিনি নাটক লেখায় আগ্রহী হন। ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি রচনা করেন ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক, যা প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক।
উল্লেখযোগ্য সাহিত্য সৃষ্টি
- মহাকব্য: মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১)
- কাব্যগ্রন্থ: তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০), ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১), দ্য ক্যাপটিভ লেডি (১৮৪৯), ভিশন অফ দ্য পাস্ট (১৮৪৯)
- পত্রকাব্য: বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২)
- সনেট: চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৫)
- নাটক: শর্মিষ্ঠা (১৮৫৯), পদ্মাবতী (১৮৬০), কৃষ্ণকুমারী (১৮৬১), মায়াকানন (১৮৭৪)
- প্রহসন: একেই কি বলে সভ্যতা? (১৮৬০), বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ (১৮৬০)
- অনুবাদ গ্রন্থ: হেক্টর বধ (১৮৬২ – হোমারের ইলিয়াডের বঙ্গানুবাদ)
— বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
উৎস ও বিষয়-সংক্ষেপ
মূলগ্রন্থ: পাঠ্য ‘অভিষেক’ নামক কাব্যাংশটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখা যুগান্তকারী সাহিত্যিক মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত হয়েছে। মূল মহাকাব্যটি মোট ৯টি সর্গে রচিত। প্রথম সর্গের নামই ‘অভিষেক’। এই সর্গে মোট ৭৮৬টি লাইন রয়েছে, যার মধ্যে ৬৫৭ থেকে ৭১২ নম্বর লাইন পর্যন্ত (মোট ১০৬টি লাইন) আমাদের পাঠ্য।
সংক্ষেপ: লঙ্কার ঘোরতর সংকটের সময়ে রাবণপুত্র মেঘনাদ প্রমোদ উদ্যানে বিলাসে মত্ত ছিলেন। ধাত্রীমাতা প্রভাষার ছদ্মবেশে দেবী লক্ষ্মী সেখানে উপস্থিত হয়ে মেঘনাদকে তাঁর প্রিয় অনুজ বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ দেন এবং জানান যে শত্রুপক্ষ লঙ্কাপুরী ঘিরে ফেলেছে। দেশের এই বিপদে আমোদপ্রমোদে মত্ত থাকার জন্য মেঘনাদ নিজেকে ধিক্কার জানান এবং তৎক্ষণাৎ যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নেন। স্ত্রী প্রমীলা অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানতে চাইলে মেঘনাদ রাঘবকে (রামচন্দ্র) বিনাশ করে দ্রুত ফিরে আসার আশ্বাস দেন।
যুদ্ধযাত্রার পূর্বে পিতা রাবণের অনুমতি চাইতে গেলে পুত্রস্নেহে আকুল রাবণ তাঁকে পাঠাতে অসম্মতি জানান, কারণ বিধাতা তাঁর প্রতি বিরূপ। রামের মায়াবী শক্তির কারণে বীরবাহু ও কুম্ভকর্ণের মতো বীরদের পতন হয়েছে। তাই রাবণ পুত্রকে প্রথমে ইষ্টদেবের পূজা ও নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন। এরপর শাস্ত্রীয় বিধি অনুসারে গঙ্গাজল (গঙ্গোধক) দিয়ে মেঘনাদকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করেন。
বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (MCQ) — পার্ট ১
[নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর চেক করতে “উত্তর দেখুন” বাটনে ক্লিক করুন]
অতি সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (মান – ১)
সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক প্রশ্ন (মান – ৩)
বিস্ময়ের কারণ: প্রভাষা রাক্ষসীর ছদ্মবেশী দেবী লক্ষ্মীর কাছে ইন্দ্রজিৎ জানতে পারলেন যে, তাঁর প্রিয় ভাই বীরবাহু রামচন্দ্রের হাতে নিহত হয়েছেন এবং পুত্রশোকে কাতর রাজা রাবণ স্বয়ং যুদ্ধযাত্রা করার জন্য সসৈন্যে সাজছেন। কিন্তু ইন্দ্রজিৎ নিজেই আগের রাতের যুদ্ধে রাঘবকে (রামচন্দ্র) পরাস্ত করে খণ্ড-খণ্ড করে কেটেছিলেন। সুতরাং মৃত রামচন্দ্র কীভাবে পুনর্জীবন লাভ করে বীরবাহুকে হত্যা করতে পারেন—এই অলৌকিক ঘটনাটিই ইন্দ্রজিতের চরম বিস্ময়ের কারণ হয়ে উঠেছিল।
উক্তির কারণ: রাবণের মনে হয়েছে ভাগ্য বা বিধাতা তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ প্রতিকূল। কারণ প্রকৃতির অমোঘ নিয়মকে লঙ্ঘন করে মৃত রামচন্দ্র অলৌকিকভাবে পুনরায় প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। শুধু তাই নয়, পুনর্জীবিত হয়ে রামচন্দ্র রাবণের অপরাজেয় বীরপুত্র বীরবাহু ও পর্বতসম ভাই কুম্ভকর্ণকে বীর দর্পে হত্যা করেছেন। নিয়তির এই অভূতপূর্ব ও মায়াবী বিরূপতার কারণেই রাবণ গভীর হতাশায় এই উক্তি করেছেন।
কোন কলঙ্ক: রাক্ষসকুলের শ্রেষ্ঠ ও অপরাজেয় বীর সন্তান মেঘনাদ জীবিত থাকা সত্ত্বেও যদি তাঁর বৃদ্ধ পিতা রাক্ষসাধিপতি রাবণকে স্বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলা করতে যেতে হয়, তবে তা পুত্র হিসেবে মেঘনাদের পক্ষে চরম লজ্জাজনক। মেঘনাদের মতে, তাঁর বর্তমানে পিতার এই যুদ্ধযাত্রা বীরপুত্র হিসেবে তাঁর কর্তব্যের অবহেলাকে প্রমাণ করবে এবং সমগ্র বিশ্বজগতে তাঁর এই অক্ষমতার অপবাদ বা কলঙ্ক রটে যাবে।
অপবাদ: যখন প্রবল পরাক্রমী শত্রু রামচন্দ্র লঙ্কাপুরী বেষ্টন করেছে এবং প্রিয় অনুজ বীরবাহু যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন, সেই জাতীয় সংকটের দিনে রাবণের শ্রেষ্ঠ বীর পুত্র হয়েও ইন্দ্রজিৎ প্রমোদ উদ্যানে নারীদের সান্নিধ্যে বিলাসে মত্ত ছিলেন। দেশের এই চরম দুর্দিনে পিতার পাশে না থেকে প্রমোদবিহারে লিপ্ত থাকার এই লজ্জাজনক আত্মবিস্মৃতিকেই বক্তা নিজের ‘অপবাদ’ বলে চিহ্নিত করেছেন।
সজ্জার বর্ণনা: ধাত্রী প্রভাষার মুখে লঙ্কার চরম বিপদের কথা শুনে ইন্দ্রজিৎ সমস্ত অলংকার ত্যাগ করে বীরসাজে সজ্জিত হন। কবি তাঁর এই যুদ্ধসজ্জাকে দুটি পৌরাণিক উপমায় ভূষিত করেছেন—তারকাসুর বধের জন্য মহাদেব ও পার্বতীপুত্র কার্তিকেয় যেভাবে তেজস্বী সাজে সেজেছিলেন, কিংবা মহাভারতে অজ্ঞাতবাসকালে বৃহন্নলারূপী অর্জুন বিরাটপুত্রের গোধন উদ্ধার করতে শমীবৃক্ষমূলে যেভাবে বীর সাজে সেজেছিলেন, ইন্দ্রজিতের রণসজ্জাও ছিল ঠিক তেমনই দীপ্তিময় ও পরাক্রমশালী।
রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান – ৫)
পিতা ও পুত্রের কথোপকথন: লঙ্কার সংকটকালে প্রমোদ উদ্যান থেকে ফিরে এসে মেঘনাদ অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পিতা রাবণের চরণে প্রণাম জানিয়ে লঙ্কা জয়ের জন্য সেনাপতি পদে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি প্রার্থনা করেন। পুত্রের এই রণহুঙ্কার ও দেশপ্রেমের কথার প্রত্যুত্তরে লঙ্কেশ্বর রাবণের এক ব্যাকুল ও স্নেহশীল পিতার রূপ প্রকাশিত হয়। রাবণ পুত্রকে জানান যে, তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ মেঘনাদকে আর এই ভয়ানক যুদ্ধে পাঠাতে চান না। কারণ তিনি অনুভব করেছেন যে, দৈব বা বিধাতা লঙ্কার প্রতি সম্পূর্ণ বিমুখ। নইলে যে রামচন্দ্রকে ইন্দ্রজিৎ নিশারণে বধ করেছিলেন, সে কীভাবে পুনর্জীবিত হয়ে বীরবাহুকে হত্যা করতে পারে! শিলা যেমন কখনও জলে ভাসে না, মৃত মানুষও তেমন বাঁচে না, কিন্তু লঙ্কার ভাগ্যে তা-ই ঘটছে।
পিতার এই আশঙ্কায় মেঘনাদ দমে যাননি। তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে পিতাকে বলেন যে, তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে জয় করেছেন, সুতরাং এই সামান্য মানব রামচন্দ্র তাঁর কাছে কিছুই নয়। তিনি পিতার কাছে আর একটিবার মাত্র সুযোগ চান এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে শত্রুপক্ষকে সমূলে বিনাশ করবেন। পুত্রের এই অদম্য জেদ ও আত্মবিশ্বাসের কাছে পিতা রাবণ নতিস্বীকার করেন। তবে দূরদর্শী পিতা হিসেবে তিনি মেঘনাদকে পরামর্শ দেন যেন যুদ্ধযাত্রার পূর্বে তিনি তাঁদের ইষ্টদেব অগ্নির পূজা করেন এবং নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করেন। কথোপকথন শেষে শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী পবিত্র গঙ্গাজল (গঙ্গোধক) দিয়ে রাবণ পরম স্নেহে ও গুরুদায়িত্বে পুত্র মেঘনাদকে লঙ্কার সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করেন।
অপবাদের বিবরণ: রামচন্দ্রের সাথে লঙ্কার ঘোরতর সমরে লঙ্কার একের পর এক বীর ও রথীদের পতন ঘটছিল। মেঘনাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বীরবাহু এবং লঙ্কার পর্বতসম মহাশক্তিধর বীর কুম্ভকর্ণ যুদ্ধে নিহত হন। বীরদের এই অকাল প্রয়াণে রাক্ষসরাজ রাবণ গভীর শোকে মগ্ন হয়ে নিজেই যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন। অথচ লঙ্কার এই চরম দুর্দিনে, যখন জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে পিতার পাশে দাঁড়িয়ে রাজ্য রক্ষা করা তাঁর প্রধান কর্তব্য ছিল, তখন মেঘনাদ প্রমোদ উদ্যানে স্ত্রী প্রমীলা ও সখীদের সাথে আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত ছিলেন। বীরশ্রেষ্ঠ হয়েও দেশের সংকটে এই উদাসীন থাকাকেই ইন্দ্রজিৎ নিজের চরম ‘অপবাদ’ বলে মনে করেছেন।
অপবাদ ঘোচাতে গৃহীত পদক্ষেপ: ধাত্রীমাতা প্রভাষার মুখে স্বর্ণলঙ্কার এই দুর্দশার কথা শোনার সাথে সাথে মেঘনাদের বীরসত্তা জাগ্রত হয়। তিনি তীব্র অনুশোচনায় ও ক্রোধে নিজের শরীর থেকে কনকবলয়, কুণ্ডল, কুসুমদাম প্রভৃতি সমস্ত বিলাসী আভরণ দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেন। লঙ্কায় দ্রুত পৌঁছানোর জন্য তিনি রথ আনার নির্দেশ দেন। তারকাসুর বধের জন্য সাজা কার্তিকেয় কিংবা গোধন উদ্ধারে যাওয়া অর্জুনের মতো তিনি নিজেকে মহাশক্তিশালী রণসাজে সাজিয়ে তোলেন। তাঁর ধনুকের তীব্র টঙ্কারে লঙ্কা ও সমুদ্র কেঁপে ওঠে। এরপর বীরদর্পে লঙ্কায় প্রবেশ করে পিতা রাবণের চরণে প্রণত হয়ে তিনি যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চান এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে মায়াবী রাঘবকে তিনি এবার সমূলে বিনাশ করে লঙ্কার বুকে নিজের এই অপবাদ চিরতরে মুছে দেবেন।
ইন্দ্রজিৎ ত্রিভুবন বিজয়ী বীর। তিনি দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাজিত করে ‘ইন্দ্রজিৎ’ উপাধি লাভ করেছিলেন। তাঁর বীরত্বের দাপট এতটাই যে, তাঁর ধনুকের সামান্য টঙ্কারে লঙ্কাপুরী ও মহাসমুদ্র প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। শত্রুপক্ষকে দমন করার জন্য তিনি সদা প্রস্তুত।
ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে দেবী লক্ষ্মীর কাছে যখন তিনি লঙ্কার বিপন্নতার কথা শোনেন, তখন প্রমোদ উদ্যানের সমস্ত বিলাসিতা তাঁর কাছে তুচ্ছ হয়ে যায়। স্বদেশের এই দুর্দিনে প্রমোদকাননে সময় কাটানোকে তিনি নিজের প্রতি ‘ধিক্কার’ বলে মনে করেছেন। দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও কর্তব্যবোধ অত্যন্ত প্রখর।
ইন্দ্রজিৎ অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয়ী। রামচন্দ্র অলৌকিকভাবে বেঁচে উঠেছে শুনেও তিনি ভয় পাননি। বরং দৃঢ় কণ্ঠে পিতার কাছে অনুমতি চেয়ে বলেছেন— “দুইবার আমি হারানু রাঘবে; / আর একবার পিতঃ দেহ আজ্ঞা মোরে।” নিজের বাহুবলের ওপর তাঁর এই অগাধ বিশ্বাস চরিত্রটিকে মহিমান্বিত করেছে।
ইন্দ্রজিৎ যেমন রণক্ষেত্রে কঠোর, পরিবারে তেমনই কোমল। যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে স্ত্রী প্রমীলা যখন অশ্রুসজল চোখে তাঁর পথ আগলে দাঁড়ায়, তখন তিনি তাঁকে অত্যন্ত মধুর বাক্যে সান্ত্বনা দেন এবং “বিধুমুখী” সম্বোধন করে বলেন যে রাঘবকে বিদায় জানিয়ে তিনি দ্রুত প্রমীলার কল্যাণে ফিরে আসবেন।
লঙ্কায় ফিরে এসে বীরদর্পে সোজা পিতার কাছে গেলেও তিনি উদ্ধত হননি। পিতার চরণে নত হয়ে করজোড়ে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চেয়েছেন। পিতার আদেশ মেনে ইষ্টদেবের পূজা ও যজ্ঞ সম্পন্ন করতেও তিনি রাজি হন।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত চিরাচরিত রামায়ণের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে মেঘনাদকে দেশপ্রেমিক, কর্তব্যপরায়ণ স্বামী, বীর ও বিনীত এক আধুনিক নায়কোচিত গরিমায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
প্রদত্ত সান্ত্বনা: বিরহকাতর ও ভীত প্রমীলাকে সান্ত্বনা দিয়ে বীর মেঘনাদ অত্যন্ত মধুর স্বরে বলেন যে, প্রমীলা তাঁর প্রেমের বাঁধনে ইন্দ্রজিৎকে এমনভাবে বেঁধেছেন যে সেই বাঁধন ছিন্ন করার সাধ্য কারও নেই। তিনি প্রমীলাকে আশ্বস্ত করে “কল্যাণি” ও “বিধুমুখী” বলে সম্বোধন করেন এবং বলেন যে তিনি অত্যন্ত দ্রুত লঙ্কা থেকে রাঘবকে (রামচন্দ্র) সমূলে বিনাশ করে তাঁর কাছে ফিরে আসবেন। প্রমীলার কল্যাণের জন্যই তিনি এই যুদ্ধে যাচ্ছেন, তাই তাকে ভয় না পেয়ে হাসিমুখে বিদায় দিতে বলেন।
উক্তির কারণ: রাবণের এই উক্তির মূল কারণ হলো প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম লঙ্কার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উল্টে গেছে, যা প্রমাণ করে ভাগ্য বা বিধাতা তাদের প্রতি সম্পূর্ণ বিমুখ (বাম)। মেঘনাদ নিজের হাতে নিশারণে রামচন্দ্রকে খণ্ড-খণ্ড করে কেটে বধ করেছিলেন। কিন্তু সেই মৃত রামচন্দ্র অলৌকিকভাবে পুনরায় জীবিত হয়ে রাবণের কনিষ্ঠ পুত্র বীরবাহু এবং অপরাজেয় ভাই কুম্ভকর্ণকে হত্যা করেছে। শিলা যেমন জলে ভাসে না, মৃত মানুষও তেমন বাঁচে না; কিন্তু রামচন্দ্রের ক্ষেত্রে এই অসম্ভবই সম্ভব হচ্ছে। এই দৈব মায়া ও নিয়তির নির্মম পরিহাসের কারণেই রাবণ নিজেকে অসহায় মনে করে এই উক্তি করেছেন।
ভয় পাওয়ার কারণ: রাবণের ভয় পাওয়ার কারণটি বস্তুগত নয়, বরং অলৌকিক বা দৈব। মেঘনাদ স্বয়ং নিশারণে রামচন্দ্রকে শরবিদ্ধ করে হত্যা করা সত্ত্বেও সে অলৌকিকভাবে পুনর্জীবন লাভ করে লঙ্কায় ফিরে এসেছে। এই অলৌকিক ক্ষমতার বলে সে রাবণের পুত্র বীরবাহু ও ভ্রাতা কুম্ভকর্ণকে বধ করেছে। প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘনকারী এই দৈব মায়াশক্তি এবং নিয়তির বিরূপতা দেখেই রাবণ মনে মনে অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েছিলেন যে হয়তো মেঘনাদকেও তিনি হারাবেন।
ভয় দূর করতে বক্তার প্রচেষ্টা: পিতার মন থেকে এই ভয় দূর করতে মেঘনাদ তাঁর নিজের অতীত পরাক্রমের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন যে, তিনি স্বয়ং দেবরাজ ইন্দ্রকে যুদ্ধে পরাস্ত করেছেন, সুতরাং এই সামান্য ছার মানব রামচন্দ্র তাঁর কাছে কোনো পাত্তাই পায় না। তিনি পিতার কাছে দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সাথে মাত্র আর একবার যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চান এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে এবার তিনি রামচন্দ্রকে এমন কোনো ঔষধে বা উপায়ে বাঁচতে দেবেন না, তাকে সমূলে নির্মূল করবেন। পিতার মনে বীরত্বের চেতনা জাগিয়ে তুলে এবং নিজের অপরাজেয় শক্তির আশ্বাস দিয়ে মেঘনাদ রাবণের ভয় দূর করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন।
