বহুরূপী – সুবোধ ঘোষ
দশম শ্রেণী | মাধ্যমিক বাংলা প্রস্তুতি
লেখক পরিচিতি
সুবোধ ঘোষ (জন্ম: ১৯০৯ – মৃত্যু: ১০ মার্চ, ১৯৮০) বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক। বিহারের হাজারিবাগে ১৯০৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আদি নিবাস বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের বহর গ্রামে। তাঁর লেখালেখির কালপর্ব ১৯৪০ থেকে ১৯৮০।
প্রথম গল্প: ‘অযান্ত্রিক’।
বিখ্যাত গল্পসমূহ: ‘ফসিল’, ‘থির বিজুরি’, ‘সুন্দরম্’, ‘জতুগৃহ’, ‘পরশুরামের কুঠার’ ইত্যাদি।
উল্লেখযোগ্য উপন্যাস: তিলাঞ্জলি (১৯৪৪), গঙ্গোত্রী (১৯৪৭), ত্রিযামা (১৯৫০), শতকিয়া (১৯৫৮) ইত্যাদি।
বিষয়-সংক্ষেপ
এরকমভাবেই একদিন জগদীশ বাবুর বাড়িতে তিনি এক ‘বিরাগী’ সন্ন্যাসী সেজে হাজির হন। বিরাগীর নিখুঁত সাজপোশাক ও শান্ত রূপ দেখে জগদীশবাবু এবং তাঁর বন্ধুরাও হরিদাকে চিনতে পারেননি। হরিদা বহুরূপী চরিত্রটির সঙ্গে এতটাই একাত্ম হয়ে যেতেন যে, কেউ তাঁকে নকল বলে ধরতে পারত না। বিরাগী চরিত্রের সেই পরম পবিত্রতা ও বৈরাগ্য বজায় রাখতে গিয়ে জগদীশবাবু তাঁকে তীর্থ ভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চাইলেও হরিদা তা সহজেই ফিরিয়ে দেন। এখানেই তাঁর শিল্পীসত্তার জয় হয়েছে।
১. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (MCQ)
🎯 MCQ উত্তরপত্র (একনজরে)
২. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান – ১)
৩. ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর (মান – ৩)
হরিদা police সেজে স্কুলের চারজন ছাত্রকে আটক করেছিলেন যারা লিচুবাগানে অনধিকার প্রবেশ করেছিল। ছেলেগুলো ভয়ে কান্নাকাটি করতে থাকে। অবশেষে বিদ্যালয়ের মাস্টারমশাই policeবেশী হরিদার স্বরূপ না বুঝতে পেরে তাকে অনুরোধ করেন ছেলেদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য এবং আট আনা উপঢৌকন দিয়ে ছাত্রদের মুক্ত করেন। এইভাবেই হরিদা তার সুনিপুণ সাজসজ্জা ও অভিনয় কৌশলের মাধ্যমে মাস্টারমশাইকে বোকা বানিয়ে ছিলেন।
হরিদা খুব গরিব মানুষ। বহুরূপী সাজা ছাড়া নির্দিষ্ট পেশা নেই তাঁর। সপ্তাহে একদিন সে বের হয়, যা রোজগার হয় তাতে ঠিকমতো সাত দিন চলে না। কিন্তু হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সন্ন্যাসী সেজে একশো এক টাকা অনায়াসে আদায় করতে পেরেছিলেন। হরিদার ভাগ্য হরিদাকে সঙ্গ দিতে চাইলেও ব্যক্তিগত সততা ও চরম শিল্পী আদর্শ বোধের কারণে হরিদা সেই টাকা গ্রহণ করেননি (কারণ তাতে বিরাগীর ঢং নষ্ট হতো)। তাই কথক আফসোস করে বলেছেন অদৃষ্ট কখনো হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।
৪. রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান – ৫)
এক স্নিগ্ধ-শান্ত জ্যোৎস্নালোকিত উজ্জ্বল সন্ধ্যায় জগদীশবাবু যখন বারান্দায় বসেছিলেন, তখন সেখানে বিরাগীর আগমন ঘটে। বিরাগীর রূপ দেখে জগদীশবাবু ও গল্পকথকরা স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি চিরাচরিত জটাধারী বা গৈরিক বসন পরা সন্ন্যাসী ছিলেন না; তাঁর পরনে ছিল ছোট বহরের থান, আদুড় গা, তার উপর ধবধবে সাদা উত্তরীয়, মাথায় ফুরফুরে সাদা চুল এবং কাঁধে ঝোলা যার ভেতরে ছিল শুধু একটি গীতা।道を দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন ইহজগতের সীমার ওপার থেকে হেঁটে এসেছেন।
জগদীশবাবু ভক্তিভরে তাঁকে ওপরে আসার অনুরোধ জানালে বিরাগী শান্ত গম্ভীর স্বরে বলেন যে, তিনি ভগবানের চেয়ে বড় নন, তাই সিঁড়ি মাড়িয়ে ওপরে উঠবেন না। জগদীশবাবু তাঁর উপদেশ শুনতে চাইলে বিরাগী জানান, ধন-জন-যৌবন আসলে সুন্দর সুন্দর এক-একটি বঞ্চনা মাত্র। সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াই হলো পরম সুখ। বিদায়বেলায় জগদীশবাবু বিরাগীকে তীর্থ ভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চাইলে বিরাগী চরম নির্লিপ্ততায় তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন— “আমি যেমন অনায়াসে ধুলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনিই অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি।” এইভাবে একজন সামান্য বহুরূপী হয়েও হরিদা তাঁর নিখুঁত অভিনয়ে ও ব্যক্তিগত উচ্চ আদর্শে খাঁটি বিরাগী হয়ে উঠেছিলেন।
হরিদার এই নাটকীয় বৈচিত্র্য প্রকাশ পায় তাঁর বিভিন্ন বহুরূপী ছদ্মবেশের মাধ্যমে:
- পাগলের রূপ: কখনো তিনি উন্মাদ পাগল সেজে চকের বাসস্ট্যান্ডে হাতে ইট নিয়ে যাত্রীদের তাড়া করে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছেন।
- রূপসী বাইজি: কখনো আবার নিখুঁত সুন্দরী বাইজি সেজে, পায়ে ঘুঙুর বেঁধে শহরের চায়ের দোকানে দোকানে মিষ্টি ছন্দে নেচে সকলের কাছ থেকে সিকি-দুয়ানি আদায় করেছেন।
- নকল police: দয়ালবাবুর লিচুবাগানে নকল police সেজে স্কুলের চার ছাত্রকে ধরে মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে আট আনা ঘুষ নিয়ে নিজের অভিনয় দক্ষতার চরম পরিচয় দিয়েছেন।
- অন্যান্য রূপ: এছাড়াও তিনি কাপালিক, বাউল, বুড়ো কাবুলিওয়ালা কিংবা হ্যাট-কোট পরা ফিরিঙ্গি সাহেব সেজেও রাস্তায় বের হতেন।
সবচেয়ে বড় নাটকীয়তা আসে গল্পের শেষে যখন তিনি একশো এক টাকার লোভ ত্যাগ করে প্রকৃত বিরাগী সেজে চলে যান। সামান্য বকশিশের ওপর নির্ভর করে বাঁচা এই মানুষটি দারিদ্র্যের মধ্যেও নিজের ভেতরের শিল্পীকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাই বলা যায়, হরিদার জীবনে সত্যিই এক অনন্য নাটকীয় বৈচিত্র্য ছিল।
সেদিনের ঘটনা: সেই চমৎকার সন্ধ্যায় ওমি-শান্ত জগদীশবাবু তাঁর বাড়ির বারান্দার আলোয় বসেছিলেন। এমন সময় হঠাৎ বারান্দার সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ান এক অপার্থিব আগন্তুক। তাঁর রূপ দেখে জগদীশবাবুসহ উপস্থিত সবাই অপলক ও চমকিত হয়ে যান। আগন্তুকের আদুড় গা, ধবধবে সাদা উত্তরীয়, পরনে ছোট বহরের সাদা থান, মাথায় ফুরফুরে শুকনো সাদা চুল, ধুলো মাখা পা আর কাঁধের ঝোলার ভেতরে ছিল শুধু একটি গীতা।
জগদীশবাবু তাঁকে ভেতরে আসার আমন্ত্রণ জানালে তিনি বলেন যে তিনি ঈশ্বরের চেয়ে বড় নন, তাই অহংকার ত্যাগ করে নিচেই দাঁড়াবেন। নিজেকে সৃষ্টির এক কণা ধূলি ও ‘বিরাগী’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি জানান, বিষয়ী মানুষের বাড়ি নয়, খোলা আকাশই তাঁর আসল বাসস্থান। তিনি উপদেশ দেন যে ‘ধন-জন-যৌবন’ আসলে সুন্দর বঞ্চনা মাত্র এবং হৃদয়ের ভেতরেই মানুষের সব তীর্থ অবস্থিত। বিদায়বেলায় জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকার থলিটি সিঁড়িতে পড়ে থাকলেও সেদিকে না তাকিয়ে বিরাগী অনায়াসে সোনা মাড়িয়ে অন্ধকারের দিকে হেঁটে চলে যান।
প্রথমত, এক দুপুরবেলায় চকের বাসস্ট্যান্ডে হঠাৎ এক পাগল কটকটে লাল চোখে, মুখ থেকে লালা ঝরিয়ে এবং কোমরে ছেঁড়া কম্বল জড়িয়ে হাতে থান ইট নিয়ে বাসের যাত্রীদের তাড়া করে। সবাই ভয়ে চিৎকার করে উঠলেও পরে জানা যায় সেটি ছিল হরিদার কৌতুক অভিনয়।
দ্বিতীয়ত, এক সন্ধ্যায় ব্যস্ত বাজারের মাঝে ঘুঙুরের মিষ্টি শব্দ তুলে এক রূপসী বাইজি প্রায় নাচতে নাচতে হাজির হয়। শহরের নতুন মানুষজন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। দোকানে দোকানে বাটি এগিয়ে দিলে দোকানদাররা হেসে তাকে সিকি ছুঁড়ে দেয়। পরে সবাই বুঝতে পারে এটি হরির কাণ্ড।
তৃতীয়ত, দয়ালবাবুর লিচুবাগানে হরিদা police সেজে স্কুলের চারজন ছাত্রকে ধরে ভয় দেখান। স্কুলের মাস্টারমশাই এসে ক্ষমা চেয়ে আট আনা ঘুষ দিয়ে ছাত্রদের মুক্ত করেন। পরে মাস্টারমশাই যখন জানতে পারেন তিনি নকল police-এর কাছে বোকা বনেছেন, তখন তিনি হরিদার তারিফ না করে পারেননি।
ক্ষমা না করার পরিণাম: অদৃষ্ট বা ভাগ্য হরিদাকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা বড় সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু হরিদা নিজের শিল্পীসত্তার আদর্শ ও সততা বজায় রাখতে গিয়ে (টাকা নিলে বিরাগীর ‘ঢং’ নষ্ট হতো) তা হেলায় হারান। এর পরিণাম হলো অত্যন্ত করুণ। এই ভুলের কারণে হরিদার চিরদিনের অভাবী জীবন আর কখনোই কাটবে না। তাঁর ভাগ্যে সেই আগের মতোই চরম দারিদ্র্য বজায় থাকবে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে তাঁর ঘরের উনানের হাঁড়িতে ভাতের বদলে শুধু জলই ফুটবে এবং সামান্য কিছু খুচরো পয়সার বকশিশের আশাতেই তাঁকে আবার নতুন কোনো ছদ্মবেশ নিয়ে পথে নামতে হবে।
- দরিদ্র কিন্তু স্বাধীনচেতা: হরিদা অত্যন্ত গরিব, শহরের সরু গলির একটি ছোট্ট ঘরে তাঁর বাস। কিন্তু কোনো ধরাবাঁধা নিয়মের চাকরি বা কাজ তাঁর পছন্দ নয়। একঘেয়েমিকে ভয় পেতেন বলেই তিনি বহুরূপীর মতো এক অনিশ্চিত পেশা বেছে নিয়েছিলেন।
- আড্ডাপ্রিয় ও বন্ধুবৎসল: দরিদ্র হলেও হরিদার মন ছিল বড়। তাঁর ঘরে সকাল-সন্ধ্যা বন্ধুদের আড্ডা বসত। চা পানের অভাব থাকলেও বন্ধুদের সাথে গল্পগুজব ও হৃদ্যতায় কোনো কমতি ছিল না।
- উচ্চমানের নিপুণ শিল্পী: হরিদা কেবল ছদ্মবেশ ধারণ করতেন না, সেই চরিত্রের আত্মাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতেন। পাগল, বাইজি বা police—প্রতিটি রূপেই তাঁর অভিনয় ছিল জীবন্ত ও নিখুঁত, যা মানুষকে সহজেই বোকা বানিয়ে দিত।
- অনন্য শিল্পীসত্তা ও সততা: হরিদা চরিত্রের শ্রেষ্ঠ দিকটি প্রকাশ পায় গল্পের শেষে। বিরাগী সেজে তিনি জগদীশবাবুর দেওয়া সোনা বা একশো এক টাকার থলি অনায়াসে মাড়িয়ে চলে আসেন। অভাবের তাড়না থাকা সত্ত্বেও একজন প্রকৃত শিল্পীর মতো তিনি নিজের ‘ঢং’ বা অভিনয়কে কলঙ্কিত করেননি।
উপসংহারে বলা যায়, হরিদা কেবল একজন সাধারণ বহুরূপী নন, তিনি একজন খাঁটি ও নিরাসক্ত শিল্পী, যিনি অর্থের চেয়ে শিল্পের সম্মানকে অনেক ওপরে স্থান দিয়েছেন।
এক স্নিগ্ধ ও শান্ত জ্যোৎস্নালোকিত সন্ধ্যায় জগদীশবাবুর বাড়ির বারান্দার সিঁড়ির কাছে হরিদা যখন ‘বিরাগী’ সেজে এসে দাঁড়ান, তখন তাঁর রূপ ও আচরণ ছিল এক প্রকৃত সন্ন্যাসীর মতো। তিনি কোনো জটাধারী বা গৈরিক বসন পরা ভণ্ড সাধু ছিলেন না; তাঁর ধবধবে সাদা উত্তরীয়, সাদা থান এবং শান্ত উদাত্ত দৃষ্টির মধ্যে ছিল এক অলৌকিক পবিত্রতা। ভক্ত জগদীশবাবুর অনুরোধে তিনি মাত্র এক গ্লাস জল গ্রহণ করেন কিন্তু অন্য কোনো আতিথ্য বা দান নিতে অস্বীকার করেন।
জগদীশবাবু তাঁর কাছে অধ্যাত্ম উপদেশ চাইলে তিনি খুব সহজ ভাষায় জানান যে, জগতের ধন, জন, যৌবন আসলে এক-একটি সুন্দর বঞ্চনা মাত্র। পরমেশ্বরের সন্ধান পেলেই আসল ঐশ্বর্য লাভ হয়। যখন জগদীশবাবু তাঁকে তীর্থ ভ্রমণের অজুহাতে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে যান, তখন বিরাগী বলেন যে তাঁর হৃদয়ের ভেতরেই সব তীর্থ রয়েছে, বাইরের টাকার তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই। চরিত্রের এই চরম সত্য বজায় রাখতে গিয়ে সিঁড়িতে পড়ে থাকা টাকার থলির দিকে ফিরেও না তাকিয়ে তিনি অন্ধকারের বুকে মিলিয়ে যান। হরিদার এই নির্মোহ ত্যাগই প্রমাণ করে যে তিনি সেদিনের জন্য সত্যিই ‘খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো’ আচরণ করেছিলেন।
