বহুরূপী- সুবোধ ঘোষ | Bohurupi – Subodh Ghosh | মাধ্যমিক – গল্প | প্রশ্ন ও আলোচনা | BanglaSahayak.com






বহুরূপী – সুবোধ ঘোষ

দশম শ্রেণী | মাধ্যমিক বাংলা প্রস্তুতি

লেখক পরিচিতি

সুবোধ ঘোষ (জন্ম: ১৯০৯ – মৃত্যু: ১০ মার্চ, ১৯৮০) বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক। বিহারের হাজারিবাগে ১৯০৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আদি নিবাস বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের বহর গ্রামে। তাঁর লেখালেখির কালপর্ব ১৯৪০ থেকে ১৯৮০।

প্রথম গল্প: ‘অযান্ত্রিক’।

বিখ্যাত গল্পসমূহ: ‘ফসিল’, ‘থির বিজুরি’, ‘সুন্দরম্’, ‘জতুগৃহ’, ‘পরশুরামের কুঠার’ ইত্যাদি।

উল্লেখযোগ্য উপন্যাস: তিলাঞ্জলি (১৯৪৪), গঙ্গোত্রী (১৯৪৭), ত্রিযামা (১৯৫০), শতকিয়া (১৯৫৮) ইত্যাদি।

📂 উৎস : গল্প সমগ্র তৃতীয় খণ্ড।

বিষয়-সংক্ষেপ

‘বহুরূপী’ শব্দের অর্থ যে বহু রূপ ধারণ করে। এই গল্পের মূল চরিত্র হরিদা একজন বহুরূপী। অত্যন্ত গরিব হরিদার ধরাবাঁধা কাজ পছন্দ ছিল না। তাই তিনি বিভিন্ন সময়ে বহুরূপী সেজে শহরের মাঝে ঘুরে বেড়াতেন এবং তা থেকে সামান্য কিছু পয়সা রোজগার হতো। কখনো পাগল, কখনো পুলিশ, কখনো বাউল, কখনো কাপালিক, এমনকি বাইজির রূপও তিনি ধারণ করেছেন।

এরকমভাবেই একদিন জগদীশ বাবুর বাড়িতে তিনি এক ‘বিরাগী’ সন্ন্যাসী সেজে হাজির হন। বিরাগীর নিখুঁত সাজপোশাক ও শান্ত রূপ দেখে জগদীশবাবু এবং তাঁর বন্ধুরাও হরিদাকে চিনতে পারেননি। হরিদা বহুরূপী চরিত্রটির সঙ্গে এতটাই একাত্ম হয়ে যেতেন যে, কেউ তাঁকে নকল বলে ধরতে পারত না। বিরাগী চরিত্রের সেই পরম পবিত্রতা ও বৈরাগ্য বজায় রাখতে গিয়ে জগদীশবাবু তাঁকে তীর্থ ভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চাইলেও হরিদা তা সহজেই ফিরিয়ে দেন। এখানেই তাঁর শিল্পীসত্তার জয় হয়েছে।

১. বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর (MCQ)

১. ‘খুব হয়েছে হরি, এই বার সরে পড়ো। অন্যদিকে যাও।’ — একথা কে বলেছে?
(ক) ভবতোষ
(খ) অনাদি
(গ) কাশীনাথ
(ঘ) জনৈক বাসযাত্রী

২. বিরাগী মতে ‘পরম সুখ’ হল —
(ক) সংসার ত্যাগ না করা
(খ) ঈশ্বর সাধনা করা
(গ) সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারা
(ঘ) পরমাত্মার দর্শন লাভ

৩. বিরাগীরূপী হরিদার গায়ে ছিল কেবলমাত্র একটি —
(ক) জামা
(খ) পাঞ্জাবি
(গ) শাল
(ঘ) উত্তরীয়

৪. সপ্তাহে হরিদা বহুরূপী সেজে বাইরে যান —
(ক) একদিন
(খ) দুদিন
(গ) চারদিন
(ঘ) পাঁচদিন

৫. বাইজির ছদ্মবেশে হরিদার রোজগার হয়েছিল —
(ক) আট টাকা দশ আনা
(খ) আট টাকা আট আনা
(গ) দশ টাকা চার আনা
(ঘ) দশ টাকা দশ আনা

৬. পুলিশ সেজে হরিদা দাঁড়িয়েছিলেন —
(ক) জগদীশবাবুর বাড়ি
(খ) চকের বাসস্ট্যান্ডে
(গ) দয়ালবাবুর লিচুবাগানে
(ঘ) চায়ের দোকানে

৭. জগদীশবাবু বিরাগীকে প্রণামী দিতে চেয়েছিলেন –
(ক) এক হাজার টাকা
(খ) পাঁচশো টাকা
(গ) একশো এক টাকা
(ঘ) একশো টাকা

৮. “সাতদিন হলো এক সন্ন্যাসী এসে জগদীশবাবুর বাড়িতে ছিলেন।” – সন্ন্যাসী সম্পর্কে নীচের কোন তথ্যটি সঠিক?
(ক) হিমালয়ের গুহাতে থাকেন
(খ) সারা বছরে শুধু একটি হরীতকী খান
(গ) সন্ন্যাসীর বয়স হাজার বছরের বেশি
(ঘ) সবগুলিই সঠিক

৯. নকল পুলিশ হরিদা মাস্টারমশায়ের কাছে কত ঘুষ নিয়েছিলেন?
(ক) চার আনা
(খ) আট আনা
(গ) বারো আনা
(ঘ) এক টাকা

১০. “সাদা মাথা সাদা দাড়ি সৌম্য শান্ত ও জ্ঞানী মানুষ “- যার সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে —
(ক) জগদীশবাবু
(খ) বিরাগী সন্ন্যাসী
(গ) সন্ন্যাসী
(ঘ) অনাদি

১১. জগদীশবাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসীর বয়স আনুমানিক —
(ক) একশো বছর
(খ) পাঁচশো বছর
(গ) হাজার বছরের বেশি
(ঘ) চারশ বছর

১২. জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসী সারা বছর কী খেতেন?
(ক) একটি আমলকী
(খ) একটি হরীতকী
(গ) চারটি রুটি
(ঘ) শুধু দুধ

১৩. “সে ভয়ানক দুর্লভ জিনিস”- দুর্লভ জিনিসটি হল —
(ক) সন্ন্যাসীর আশীর্বাদ
(খ) সন্ন্যাসীর সান্নিধ্য
(গ) সন্ন্যাসীর পদধূলি
(ঘ) সন্ন্যাসীর উপদেশ

১৪. হরিদা চকের বাসস্ট্যান্ডে পাগল সেজেছিলেন —
(ক) সকালবেলায়
(খ) সন্ধেবেলায়
(গ) দুপুরবেলায়
(ঘ) বিকালবেলায়

১৫. “একটু তারিফই করলেন” – যিনি তারিফ করলেন —
(ক) জগদীশবাবু
(খ) দোকানদার
(গ) সন্ন্যাসী
(ঘ) মাস্টারমশাই

১৬. “ঘুষ নিয়ে তারপর মাস্টারের অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন সেই নকল-পুলিশ হরিদা”- ঘুষের পরিমাণ ছিল —
(ক) আট টাকা
(খ) আট আনা
(গ) পাঁচ আনা
(ঘ) দশ আনা

১৭. “আপনি কি ভগবানের চেয়েও বড়ো?”- এ কথা বলেছেন —
(ক) জগদীশবাবু
(খ) হিমালয়ের সন্ন্যাসী
(গ) বিরাগী
(ঘ) ভবতোষ

১৮. বিরাগীর মতে সব তীর্থ —
(ক) মানুষের বুকের ভিতর
(খ) গভীর অরণ্যে
(গ) হিমালয়ের চূড়ায়
(ঘ) শূন্য আকাশে

১৯. “আপনিই বিরাগী?”- কথাটি বলেছিলেন —
(ক) কথক
(খ) ভবতোষ
(গ) জগদীশবাবু
(ঘ) অনাদি

২০. ‘সেটা পূর্বজন্মের কথা’- পূর্বজন্মের কথাটি হল —
(ক) বিরাগী সংসার বিমুখ
(খ) বিরাগী নির্মোহ হন
(গ) বিরাগী রাগের অধীন
(ঘ) বিরাগী কাউকে পদধূলি দেন

🎯 MCQ উত্তরপত্র (একনজরে)

১. (গ)
২. (গ)
৩. (খ)
৪. (ক)
৫. (ক)
৬. (গ)
৭. (গ)
৮. (ঘ)
৯. (খ)
১০. (ক)
১১. (গ)
১২. (খ)
১৩. (গ)
১৪. (গ)
১৫. (ঘ)
১৬. (খ)
১৭. (গ)
১৮. (ক)
১৯. (খ)
২০. (গ)

২. অতিসংক্ষিপ্ত উত্তরধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান – ১)

১. জগদীশবাবু তীর্থভ্রমণের জন্য কত টাকা বিরাগীকে দিতে চেয়েছিলেন? [মাধ্যমিক-২০১৭]
উঃ- জগদীশবাবু তীর্থভ্রমণের জন্য বিরাগীকে একশো এক টাকা দিতে চেয়েছিলেন।

২. ”হরিদার জীবন এইরকম বহুরূপের খেলা দেখিয়েই একরকম চলে যাচ্ছে।” — কী রকম খেলা দেখিয়ে হরিদার জীবন চলে যাচ্ছে? [মাধ্যমিক-২০১৮]
উঃ- বিচিত্র ছদ্মবেশে বহুরূপী সেজে খেলা দেখিয়ে হরিদার জীবন চলে যাচ্ছে।

৩. “সপ্তাহে বড়োজোর একটা দিন বহুরূপী সেজে পথে বের হন হরিদা” — ‘বহুরূপী’ কাকে বলে? [মাধ্যমিক-২০১৯]
উঃ- ‘বহুরূপী’ হল একধরনের লোকশিল্পী যারা বিবিধ বেশে সজ্জিত হয়ে নানা রূপ ধারণ করে জীবিকা নির্বাহের জন্য উপার্জন করে।

৪. “আক্ষেপ করেন হরিদা”- হরিদার আক্ষেপের কারণ কী?
উঃ- সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পে হিমালয়ের গুহা থেকে আসা সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিতে না পারার জন্য হরিদা আক্ষেপ করেন।

৫. “বাঃ, এ তো বেশ মজার ব্যাপার!” – মজার ব্যাপারটা কী?
উঃ- জগদীশ বাবু একজোড়া কাঠের খড়মে সোনার বোল লাগিয়ে যেভাবে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো নিয়েছিলেন সেই ব্যাপারটিকে মজার ব্যাপার বলা হয়েছে।

৬. “নইলে আমি শান্তি পাব না”—বক্তা কেন শান্তি পাবেন না?
উঃ- সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পে বক্তা জগদীশবাবু বিরাগী সন্ন্যাসী কিছু উপদেশ শুনিয়ে না গেলে শান্তি পাবেন না।

৭. “ও সব সুন্দর সুন্দর এক-একটি বঞ্চনা” –ও সব কী?
উঃ- সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পে ওসব বলতে ধন, জন ও যৌবনকে বোঝানো হয়েছে।

৮. “আপনার কাছে এটা আমার প্রাণের অনুরোধ”– প্রাণের অনুরোধটি কী?
উঃ- সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পে জগদীশবাবু বিরাগী সন্ন্যাসীকে তার বাড়িতে কয়েকটা দিন থাকতে বলেছিলেন। এটিই হল প্রাণের অনুরোধ।

৯. “জগদীশবাবুর দুই বিস্মিত চোখ অপলক হয়ে গেল”—কী দেখে জগদীশবাবুর এমন অবস্থা হয়েছিল?
উঃ- জগদীশবাবু সিঁড়ির দিকে আদুড় গায়ে সাদা উত্তরীয় পরা এক বিরাগী সন্ন্যাসীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অপলক দৃষ্টিতে চেয়েছিলেন।

১০. “অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।”—হরিদার কোন্ ভুল অদৃষ্ট কখনো ক্ষমা করবে না?
উঃ- ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদা বিরাগী সন্ন্যাসী সেজে জগদীশ বাবুর কাছে অনেকগুলো টাকা পেয়েও গ্রহণ করেননি। এখানে টাকা না নেওয়াকে ভুল বলা হয়েছে।

১১. “পরম সুখ কাকে বলে জানেন?”—বক্তা ‘পরম সুখ’ বলতে কী বােঝাতে চেয়েছেন?
উঃ- সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পে বিরাগী সন্ন্যাসী সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াকেই ‘পরম সুখ’ বলে অভিহিত করেছেন।

১২. “কী অদ্ভুত কথা বলেন হরিদা!”—হরিদার কোন্ কথাকে অদ্ভুত মনে হয়েছিল?
উঃ- হরিদা জানিয়েছিলেন যে, একজন বিরাগী সন্ন্যাসী সেজে টাকা-ফাকা স্পর্শ করলে তার ঢং নষ্ট হয়ে যায়। তার এই কথাকে গল্প লেখকের অদ্ভুত মনে হয়েছিল।

১৩. “এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝে বেশ চমৎকার ঘটনা সৃষ্টি করেন বহুরূপী হরিদা।”—“বহুরূপী’ গল্পে হরিদার বহুরূপী সাজার কয়েকটি উল্লেখ করো।
উঃ- সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদা পাগল, বাইজি, বাউল, কাপালিক, police, কাবুলিওয়ালা, ফিরিঙ্গি কেরামিন সাহেব, সন্ন্যাসী প্রভৃতি সেজে উপার্জন করেন।

১৪. “মাঝে মাঝে সত্যিই উপোস করেন হরিদা।”—হরিদা মাঝে মাঝে উপোস করেন কেন?
উঃ- হরিদা সপ্তাহে একদিন বহুরূপী সেজে রোজগার করত। সামান্য রোজগারে তার এক সপ্তাহ চলত না। তাই হরিদাকে মাঝে মাঝেই সত্যিই উপোস করে দিন কাটাতে হয়।

১৫. “এবার মারি তো হাতি লুঠি তো ভাণ্ডার।”–কে কোন প্রসঙ্গে বলেছে?
উঃ- হরিদা জগদীশ বাবুর বাড়িতে আসা সন্ন্যাসীর গল্প শুনে মতলব আঁটেন। বহুরূপী সেজে জগদীশবাবুর কাছ থেকে অনেক টাকা ঝালিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে একথা বলেছিলেন হরিদা।

৩. ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নোত্তর (মান – ৩)

১. হরিদা police সেজে কোথায় দাঁড়িয়েছিলেন? তিনি কীভাবে মাস্টারমশাইকে বোকা বানিয়েছিলেন? [মাধ্যমিক-২০১৭]
উত্তর: সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পের মুখ্য চরিত্র, বহুরূপী হরিদা police সেজে দয়ালবাবুর লিচু বাগানে দাঁড়িয়েছিলেন।

হরিদা police সেজে স্কুলের চারজন ছাত্রকে আটক করেছিলেন যারা লিচুবাগানে অনধিকার প্রবেশ করেছিল। ছেলেগুলো ভয়ে কান্নাকাটি করতে থাকে। অবশেষে বিদ্যালয়ের মাস্টারমশাই policeবেশী হরিদার স্বরূপ না বুঝতে পেরে তাকে অনুরোধ করেন ছেলেদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য এবং আট আনা উপঢৌকন দিয়ে ছাত্রদের মুক্ত করেন। এইভাবেই হরিদা তার সুনিপুণ সাজসজ্জা ও অভিনয় কৌশলের মাধ্যমে মাস্টারমশাইকে বোকা বানিয়ে ছিলেন।

২. ঠিক দুপুরবেলাতে একটা আতঙ্কের হল্লা বেজে উঠল। আতঙ্কের হল্লাটির পরিচয় দাও?
উত্তর: আতঙ্কের হল্লা: সুবোধ ঘোষের বহুরূপী গল্পে হরিদা মাঝে মাঝে বহুরূপী সাজতেন। এক দুপুরবেলা চকের বাসস্ট্যান্ডের কাছের এক পাগলকে দেখা গিয়েছিল। কটকটে লাল চোখে সেই পাগলের মুখ থেকে লালা ঝরছিল। তার কোমরে ছেঁড়া কম্বল আর গলায় টিনের কৌটোর মালা জড়ানো। পাগলটি থান ইট নিয়ে বাসে বসা যাত্রীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখে যাত্রীরা চেঁচিয়ে উঠেছিল। কেউ কেউ দু-একটা পয়সা তার সামনে ফেলে দিচ্ছিল। কেউ চিনতে না পারলেও কাশীনাথ চিনতে পেরেছিল পাগলটি আসলে হরিদা। হরিদা পাগল সেজে সবাইকে ভয় দেখাচ্ছিল।

৩. জগদীশবাবুর বাড়িতে যে সন্ন্যাসী এসেছিলেন—তার বর্ণনা দাও।
উত্তর: সন্ন্যাসীর বর্ণনা: জগদীশবাবুর বাড়িতে সাতদিন ধরে এক সন্ন্যাসী ছিলেন। খুব উঁচু দলের এই সন্ন্যাসী থাকতেন হিমালয়ের গুহাতে। তিনি সারা বছরে শুধুমাত্র একটি হরীতকী খান, এছাড়া তিনি আর কিছু খেতেন না। অনেকে মনে করত সন্ন্যাসীর বয়স ছিল হাজার বছরের বেশি। তার পায়ের ধুলো ছিল অত্যন্ত দুর্লভ জিনিস। একমাত্র জগদীশবাবু একজোড়া সোনার বোল লাগানো খড়মের কৌশলে সন্ন্যাসীর পায়ের ধুলো পেয়েছিলেন।

৪. হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে—নাটকীয় বৈচিত্র্য কী?
উত্তর: নাটকীয় বৈচিত্র্য: গরিব হরিদা নিজের ছোটো ঘরে দিন কাটাত। কোনোদিন খাবার জুটত, কোনোদিন জুটত না। প্রতিদিনের এই একঘেয়ে জীবনে হরিদার একটি নাটকীয় বৈচিত্র্য ছিল। হরিদা মাঝে মাঝে বহুরূপী সেজে রোজগার করত। সকাল অথবা সন্ধ্যায় বিচিত্র ছদ্মবেশে রাস্তায় পেরিয়ে পড়ত। যারা চিনতে পারত তাদের মধ্যে কেউ দুই-একটা পয়সা দিত—কেউ বা বিরক্ত হত। এই অনিয়মিত ও রোমাঞ্চকর পেশাই ছিল হরিদার জীবনের নাটকীয় বৈচিত্র্য।

৫. “অদৃষ্ট কখনো হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।” — হরিদা কী ভুল করেছিল? কেন সেই ভুল অদৃষ্ট ক্ষমা করবে না বলা হয়েছে?
উত্তর: সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদা বিরাগী সন্ন্যাসী সেজে জগদীশবাবুর কাছ থেকে একশ এক টাকা পেয়েও গ্রহণ করেননি। এটাকে এখানে গল্পকথক ‘ভুল’ বলেছেন।

হরিদা খুব গরিব মানুষ। বহুরূপী সাজা ছাড়া নির্দিষ্ট পেশা নেই তাঁর। সপ্তাহে একদিন সে বের হয়, যা রোজগার হয় তাতে ঠিকমতো সাত দিন চলে না। কিন্তু হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগী সন্ন্যাসী সেজে একশো এক টাকা অনায়াসে আদায় করতে পেরেছিলেন। হরিদার ভাগ্য হরিদাকে সঙ্গ দিতে চাইলেও ব্যক্তিগত সততা ও চরম শিল্পী আদর্শ বোধের কারণে হরিদা সেই টাকা গ্রহণ করেননি (কারণ তাতে বিরাগীর ঢং নষ্ট হতো)। তাই কথক আফসোস করে বলেছেন অদৃষ্ট কখনো হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।

৪. রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর (মান – ৫)

১. জগদীশবাবুর বাড়ি হরিদা বিরাগী সেজে যাওয়ার পর যে ঘটনা ঘটেছিল, তা বর্ণনা করো। [মাধ্যমিক-২০১৭]
উত্তর: প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পে জগদীশবাবু এক ধনী ও কৃপণ ব্যক্তি হলেও অলৌকিক ও সাধু-সন্ন্যাসীর প্রতি তাঁর অন্ধ ভক্তি ছিল। সেই সুযোগেই অভাবী বহুরূপী হরিদা এক মহৎ নাটকীয় চাল চালেন এবং বিরাগী সেজে তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হন।

এক স্নিগ্ধ-শান্ত জ্যোৎস্নালোকিত উজ্জ্বল সন্ধ্যায় জগদীশবাবু যখন বারান্দায় বসেছিলেন, তখন সেখানে বিরাগীর আগমন ঘটে। বিরাগীর রূপ দেখে জগদীশবাবু ও গল্পকথকরা স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি চিরাচরিত জটাধারী বা গৈরিক বসন পরা সন্ন্যাসী ছিলেন না; তাঁর পরনে ছিল ছোট বহরের থান, আদুড় গা, তার উপর ধবধবে সাদা উত্তরীয়, মাথায় ফুরফুরে সাদা চুল এবং কাঁধে ঝোলা যার ভেতরে ছিল শুধু একটি গীতা।道を দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন ইহজগতের সীমার ওপার থেকে হেঁটে এসেছেন।

জগদীশবাবু ভক্তিভরে তাঁকে ওপরে আসার অনুরোধ জানালে বিরাগী শান্ত গম্ভীর স্বরে বলেন যে, তিনি ভগবানের চেয়ে বড় নন, তাই সিঁড়ি মাড়িয়ে ওপরে উঠবেন না। জগদীশবাবু তাঁর উপদেশ শুনতে চাইলে বিরাগী জানান, ধন-জন-যৌবন আসলে সুন্দর সুন্দর এক-একটি বঞ্চনা মাত্র। সব সুখের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াই হলো পরম সুখ। বিদায়বেলায় জগদীশবাবু বিরাগীকে তীর্থ ভ্রমণের জন্য একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চাইলে বিরাগী চরম নির্লিপ্ততায় তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং বলেন— “আমি যেমন অনায়াসে ধুলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনিই অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি।” এইভাবে একজন সামান্য বহুরূপী হয়েও হরিদা তাঁর নিখুঁত অভিনয়ে ও ব্যক্তিগত উচ্চ আদর্শে খাঁটি বিরাগী হয়ে উঠেছিলেন।

২. “হরিদার জীবনে সত্যিই একটা নাটকীয় বৈচিত্র্য আছে।” -বহুরূপী হরিদার কর্মকাণ্ডের মধ্যে যেভাবে নাটকীয় বৈচিত্র্য ধরা পড়েছে তার বিবরণ দাও।
উত্তর: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পের প্রধান চরিত্র হরিদা ছিলেন অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত দরিদ্র। কিন্তু সাধারণ মানুষের মতো ঘড়ির কাঁটা ধরে নিয়মে বাঁধা একঘেয়ে চাকরি বা কাজ করা তাঁর অপছন্দ ছিল। তিনি অভাবকে বরণ করে নিলেও নিজের স্বাধীনতার সাথে আপস করেননি। এই স্বাধীনচেতা মনোভাব থেকেই তাঁর জীবনে ও পেশায় এসেছে নাটকীয় বৈচিত্র্য।

হরিদার এই নাটকীয় বৈচিত্র্য প্রকাশ পায় তাঁর বিভিন্ন বহুরূপী ছদ্মবেশের মাধ্যমে:

  • পাগলের রূপ: কখনো তিনি উন্মাদ পাগল সেজে চকের বাসস্ট্যান্ডে হাতে ইট নিয়ে যাত্রীদের তাড়া করে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছেন।
  • রূপসী বাইজি: কখনো আবার নিখুঁত সুন্দরী বাইজি সেজে, পায়ে ঘুঙুর বেঁধে শহরের চায়ের দোকানে দোকানে মিষ্টি ছন্দে নেচে সকলের কাছ থেকে সিকি-দুয়ানি আদায় করেছেন।
  • নকল police: দয়ালবাবুর লিচুবাগানে নকল police সেজে স্কুলের চার ছাত্রকে ধরে মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে আট আনা ঘুষ নিয়ে নিজের অভিনয় দক্ষতার চরম পরিচয় দিয়েছেন।
  • অন্যান্য রূপ: এছাড়াও তিনি কাপালিক, বাউল, বুড়ো কাবুলিওয়ালা কিংবা হ্যাট-কোট পরা ফিরিঙ্গি সাহেব সেজেও রাস্তায় বের হতেন।

সবচেয়ে বড় নাটকীয়তা আসে গল্পের শেষে যখন তিনি একশো এক টাকার লোভ ত্যাগ করে প্রকৃত বিরাগী সেজে চলে যান। সামান্য বকশিশের ওপর নির্ভর করে বাঁচা এই মানুষটি দারিদ্র্যের মধ্যেও নিজের ভেতরের শিল্পীকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাই বলা যায়, হরিদার জীবনে সত্যিই এক অনন্য নাটকীয় বৈচিত্র্য ছিল।

৩. “বড়ো চমৎকার আজকে এই সন্ধ্যার চেহারা।”- ‘এই সন্ধ্যার’ পরিচয় দাও। সে দিনের সন্ধ্যার ঘটনাটি বর্ণনা করো। (২+৩)
উত্তর: সন্ধ্যার পরিচয়: সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী’ গল্পে বর্ণিত সেদিনের সন্ধ্যাটি ছিল অনির্বচনীয় সুন্দর। শহরের আকাশে চাঁদের আলো এমন এক স্নিগ্ধ, শান্ত ও উজ্জ্বল পরিবেশ তৈরি করেছিল যা ছিল যেন এক স্বর্গীয় অনুভূতির জগৎ। ফুরফুরে বাতাসে গাছের পাতাগুলিও ঝিরিঝিরি শব্দে যেন কিছু বলতে চাইছিল—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব মোহময় রূপ ধারণ করেছিল সেই সন্ধ্যা।

সেদিনের ঘটনা: সেই চমৎকার সন্ধ্যায় ওমি-শান্ত জগদীশবাবু তাঁর বাড়ির বারান্দার আলোয় বসেছিলেন। এমন সময় হঠাৎ বারান্দার সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ান এক অপার্থিব আগন্তুক। তাঁর রূপ দেখে জগদীশবাবুসহ উপস্থিত সবাই অপলক ও চমকিত হয়ে যান। আগন্তুকের আদুড় গা, ধবধবে সাদা উত্তরীয়, পরনে ছোট বহরের সাদা থান, মাথায় ফুরফুরে শুকনো সাদা চুল, ধুলো মাখা পা আর কাঁধের ঝোলার ভেতরে ছিল শুধু একটি গীতা।

জগদীশবাবু তাঁকে ভেতরে আসার আমন্ত্রণ জানালে তিনি বলেন যে তিনি ঈশ্বরের চেয়ে বড় নন, তাই অহংকার ত্যাগ করে নিচেই দাঁড়াবেন। নিজেকে সৃষ্টির এক কণা ধূলি ও ‘বিরাগী’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি জানান, বিষয়ী মানুষের বাড়ি নয়, খোলা আকাশই তাঁর আসল বাসস্থান। তিনি উপদেশ দেন যে ‘ধন-জন-যৌবন’ আসলে সুন্দর বঞ্চনা মাত্র এবং হৃদয়ের ভেতরেই মানুষের সব তীর্থ অবস্থিত। বিদায়বেলায় জগদীশবাবুর দেওয়া একশো এক টাকার থলিটি সিঁড়িতে পড়ে থাকলেও সেদিকে না তাকিয়ে বিরাগী অনায়াসে সোনা মাড়িয়ে অন্ধকারের দিকে হেঁটে চলে যান।

৪. “এই শহরের জীবনে মাঝে মাঝে বেশ চমৎকার ঘটনা সৃষ্টি করেন বহুরূপী হরিদা। “–হরিদার সৃষ্ট চমৎকার ঘটনাগুলি সংক্ষেপে উল্লেখ করো।
উত্তর: ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদা তাঁর অসাধারণ অভিনয় ও ছদ্মবেশের মাধ্যমে শহরের একঘেয়ে জীবনে চমৎকার সব চমক এনে দিতেন। তাঁর সৃষ্ট প্রধান চমৎকার ঘটনাগুলি হলো:

প্রথমত, এক দুপুরবেলায় চকের বাসস্ট্যান্ডে হঠাৎ এক পাগল কটকটে লাল চোখে, মুখ থেকে লালা ঝরিয়ে এবং কোমরে ছেঁড়া কম্বল জড়িয়ে হাতে থান ইট নিয়ে বাসের যাত্রীদের তাড়া করে। সবাই ভয়ে চিৎকার করে উঠলেও পরে জানা যায় সেটি ছিল হরিদার কৌতুক অভিনয়।

দ্বিতীয়ত, এক সন্ধ্যায় ব্যস্ত বাজারের মাঝে ঘুঙুরের মিষ্টি শব্দ তুলে এক রূপসী বাইজি প্রায় নাচতে নাচতে হাজির হয়। শহরের নতুন মানুষজন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। দোকানে দোকানে বাটি এগিয়ে দিলে দোকানদাররা হেসে তাকে সিকি ছুঁড়ে দেয়। পরে সবাই বুঝতে পারে এটি হরির কাণ্ড।

তৃতীয়ত, দয়ালবাবুর লিচুবাগানে হরিদা police সেজে স্কুলের চারজন ছাত্রকে ধরে ভয় দেখান। স্কুলের মাস্টারমশাই এসে ক্ষমা চেয়ে আট আনা ঘুষ দিয়ে ছাত্রদের মুক্ত করেন। পরে মাস্টারমশাই যখন জানতে পারেন তিনি নকল police-এর কাছে বোকা বনেছেন, তখন তিনি হরিদার তারিফ না করে পারেননি।

৫. “অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।” — হরিদা কী ভুল করেছিলেন? অদৃষ্ট ক্ষমা না করার পরিণাম কী? [মাধ্যমিক-২০১৯]
উত্তর: হরিদার ভুল: ‘বহুরূপী’ গল্পে হরিদা বিরাগী সেজে ধনী জগদীশবাবুর বাড়িতে গিয়ে তাঁর নিখুঁত অভিনয়ের মাধ্যমে জগদীশবাবুকে মুগ্ধ করেছিলেন। জগদীশবাবু খুশি হয়ে বিরাগীকে তীর্থ ভ্রমণের খরচ বাবদ একশো এক টাকা প্রণামী দিতে চান। কিন্তু হরিদা একজন সত্যিকারের বিরাগীর মতো নির্মোহভাবে সেই টাকা প্রত্যাখ্যান করে চলে আসেন। গল্পকথকদের মতে, চরম অভাবের সংসারে এসেও এমন নিশ্চিত বিপুল অর্থ হাতছাড়া করাটাই ছিল হরিদার মস্ত বড় ‘ভুল’।

ক্ষমা না করার পরিণাম: অদৃষ্ট বা ভাগ্য হরিদাকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা বড় সুযোগ দিয়েছিল, কিন্তু হরিদা নিজের শিল্পীসত্তার আদর্শ ও সততা বজায় রাখতে গিয়ে (টাকা নিলে বিরাগীর ‘ঢং’ নষ্ট হতো) তা হেলায় হারান। এর পরিণাম হলো অত্যন্ত করুণ। এই ভুলের কারণে হরিদার চিরদিনের অভাবী জীবন আর কখনোই কাটবে না। তাঁর ভাগ্যে সেই আগের মতোই চরম দারিদ্র্য বজায় থাকবে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে তাঁর ঘরের উনানের হাঁড়িতে ভাতের বদলে শুধু জলই ফুটবে এবং সামান্য কিছু খুচরো পয়সার বকশিশের আশাতেই তাঁকে আবার নতুন কোনো ছদ্মবেশ নিয়ে পথে নামতে হবে।

৬. বহুরূপী গল্প অবলম্বনে হরিদার চরিত্রের বর্ণনা দাও।
উত্তর: প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্পের মূল চালিকাশক্তি হলো হরিদা চরিত্রটি। গল্পের আধারে তাঁর চরিত্রের বহুমুখী ও উজ্জ্বল দিকগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

  • দরিদ্র কিন্তু স্বাধীনচেতা: হরিদা অত্যন্ত গরিব, শহরের সরু গলির একটি ছোট্ট ঘরে তাঁর বাস। কিন্তু কোনো ধরাবাঁধা নিয়মের চাকরি বা কাজ তাঁর পছন্দ নয়। একঘেয়েমিকে ভয় পেতেন বলেই তিনি বহুরূপীর মতো এক অনিশ্চিত পেশা বেছে নিয়েছিলেন।
  • আড্ডাপ্রিয় ও বন্ধুবৎসল: দরিদ্র হলেও হরিদার মন ছিল বড়। তাঁর ঘরে সকাল-সন্ধ্যা বন্ধুদের আড্ডা বসত। চা পানের অভাব থাকলেও বন্ধুদের সাথে গল্পগুজব ও হৃদ্যতায় কোনো কমতি ছিল না।
  • উচ্চমানের নিপুণ শিল্পী: হরিদা কেবল ছদ্মবেশ ধারণ করতেন না, সেই চরিত্রের আত্মাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতেন। পাগল, বাইজি বা police—প্রতিটি রূপেই তাঁর অভিনয় ছিল জীবন্ত ও নিখুঁত, যা মানুষকে সহজেই বোকা বানিয়ে দিত।
  • অনন্য শিল্পীসত্তা ও সততা: হরিদা চরিত্রের শ্রেষ্ঠ দিকটি প্রকাশ পায় গল্পের শেষে। বিরাগী সেজে তিনি জগদীশবাবুর দেওয়া সোনা বা একশো এক টাকার থলি অনায়াসে মাড়িয়ে চলে আসেন। অভাবের তাড়না থাকা সত্ত্বেও একজন প্রকৃত শিল্পীর মতো তিনি নিজের ‘ঢং’ বা অভিনয়কে কলঙ্কিত করেননি।

উপসংহারে বলা যায়, হরিদা কেবল একজন সাধারণ বহুরূপী নন, তিনি একজন খাঁটি ও নিরাসক্ত শিল্পী, যিনি অর্থের চেয়ে শিল্পের সম্মানকে অনেক ওপরে স্থান দিয়েছেন।

৭. “অথচ আপনি একেবারে খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো সব তুচ্ছ করে সরে পড়লেন?”— কার কথা বলা হয়েছে? তিনি কীভাবে ‘খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো’ ব্যবহার করেছিলেন সংক্ষেপে আলোচনা করো।
উত্তর: সুবোধ ঘোষ রচিত ‘বহুরূপী’ গল্প থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশে পরম শ্রদ্ধেয় ও নিরাসক্ত শিল্পী **হরিদার** কথা বলা হয়েছে।

এক স্নিগ্ধ ও শান্ত জ্যোৎস্নালোকিত সন্ধ্যায় জগদীশবাবুর বাড়ির বারান্দার সিঁড়ির কাছে হরিদা যখন ‘বিরাগী’ সেজে এসে দাঁড়ান, তখন তাঁর রূপ ও আচরণ ছিল এক প্রকৃত সন্ন্যাসীর মতো। তিনি কোনো জটাধারী বা গৈরিক বসন পরা ভণ্ড সাধু ছিলেন না; তাঁর ধবধবে সাদা উত্তরীয়, সাদা থান এবং শান্ত উদাত্ত দৃষ্টির মধ্যে ছিল এক অলৌকিক পবিত্রতা। ভক্ত জগদীশবাবুর অনুরোধে তিনি মাত্র এক গ্লাস জল গ্রহণ করেন কিন্তু অন্য কোনো আতিথ্য বা দান নিতে অস্বীকার করেন।

জগদীশবাবু তাঁর কাছে অধ্যাত্ম উপদেশ চাইলে তিনি খুব সহজ ভাষায় জানান যে, জগতের ধন, জন, যৌবন আসলে এক-একটি সুন্দর বঞ্চনা মাত্র। পরমেশ্বরের সন্ধান পেলেই আসল ঐশ্বর্য লাভ হয়। যখন জগদীশবাবু তাঁকে তীর্থ ভ্রমণের অজুহাতে একশো এক টাকা প্রণামী দিতে যান, তখন বিরাগী বলেন যে তাঁর হৃদয়ের ভেতরেই সব তীর্থ রয়েছে, বাইরের টাকার তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই। চরিত্রের এই চরম সত্য বজায় রাখতে গিয়ে সিঁড়িতে পড়ে থাকা টাকার থলির দিকে ফিরেও না তাকিয়ে তিনি অন্ধকারের বুকে মিলিয়ে যান। হরিদার এই নির্মোহ ত্যাগই প্রমাণ করে যে তিনি সেদিনের জন্য সত্যিই ‘খাঁটি সন্ন্যাসীর মতো’ আচরণ করেছিলেন।

💬 হরিদার অমর বাণী: “আমি যেমন অনায়াসে ধূলো মাড়িয়ে চলে যেতে পারি, তেমনই অনায়াসে সোনাও মাড়িয়ে চলে যেতে পারি। কিন্তু টাকা নিলে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়!”


Your Cart

error: Content is protected !!
Scroll to Top