বাংলা ছাত্রছাত্রীদের পাশে সারাক্ষণ

Kanyashree Prakalpo | কন্যাশ্রী | কন্যাশ্রী প্রকল্প

Kanyashree Prakalpo | কন্যাশ্রী প্রকল্প

কন্যাশ্রী: আজকের কন্যা আগামীর দিশারী

ভূমিকা :

কন্যাশ্রী শুধু একটি সরকারি প্রকল্পের নাম নয়; এটি বাংলার লক্ষ লক্ষ কিশোরীর আত্মমর্যাদা ও স্বপ্নের এক মূর্ত প্রতীক। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় নারীশক্তিকে অবহেলা ও বঞ্চনার অন্ধকার থেকে মুক্ত করে উন্নয়নের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনাই এই প্রকল্পের মূল সুর। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে উচ্চ প্রশংসিত এই প্রকল্প বাংলার কন্যাদের সামাজিক সুরক্ষাকে সুনিশ্চিত করেছে। নতুন সময়ের প্রেক্ষাপটে নারীশিক্ষার প্রসার ও নারীর ক্ষমতায়নে এটি এক অনন্য সামাজিক সংকল্প।

প্রকল্পের সূচনা ও প্রেক্ষাপট :

বাংলার বিপুল নারীশক্তিকে যথাযোগ্য সম্মানের আসনে বসাতে ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্পের সূচনা করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ কিশোরী। এই বিপুল শক্তির জীবন বিকাশের পথ সুগম করতে এবং দারিদ্র্যের কারণে স্কুলছুট হওয়ার হাত থেকে তাদের রক্ষা করতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দূরদর্শী পদক্ষেপ।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য :

কন্যাশ্রী প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো নারীশিক্ষার মানোন্নয়ন এবং একটি সুস্থ সমাজ গঠন। এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হলো:

বাল্যবিবাহ রোধ: ১৮ বছরের আগে বিয়ে নয়—এই সচেতনতা গড়ে তোলা।

স্কুলছুট আটকানো: কিশোরীরা যাতে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে না দেয়, বিশেষ করে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা।

কন্যাভ্রূণ হত্যা রোধ: সমাজে কন্যা সন্তানের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

স্বনির্ভরতা: আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করা এবং তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা।

বৃত্তিলাভের শর্ত ও নিয়মাবলি :

এই প্রকল্পের সুফল পেতে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। আবেদনকারী ছাত্রীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং কোনো সরকারি স্বীকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠরতা হতে হবে।

 * আর্থিক সীমা: পরিবারের বার্ষিক আয় ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বা তার কম হতে হবে। তবে অনাথ বা প্রতিবন্ধী ছাত্রীদের ক্ষেত্রে আয়ের কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই।

 * বয়স ও বৈবাহিক অবস্থা: ছাত্রীকে অবশ্যই ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত অবিবাহিত থাকতে হবে।

অনুদানের পরিমাণ: বাৎসরিক বৃত্তির পাশাপাশি ১৮ বছর পূর্ণ হলে এবং পড়াশোনা চালিয়ে গেলে এককালীন ২৫ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়।

সরকারি ব্যয় ও সাফল্য :

রাজ্য সরকার এই জনহিতকর প্রকল্পের জন্য বছরে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয় করে। এর সাফল্য আজ অপরিসীম। কন্যাশ্রীর প্রভাবে সমাজে বাল্যবিবাহের হার যেমন কমেছে, তেমনি অভাবের কারণে পড়াশোনা বন্ধ হওয়া বা নারীপাচারের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলিও অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আজ বাংলার মেয়েরা মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ছাড়িয়ে স্নাতক ও উচ্চশিক্ষার পথে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলেছে।

কন্যাশ্রী থেকে বিশ্বশ্রী :

কন্যাশ্রী আজ কেবল বাংলার নয়, বিশ্বের দরবারে সমাদৃত। ২০১৭ সালের ২৩ জুন নেদারল্যান্ডসের হেগ শহরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৬২টি দেশের ৫৫২টি প্রকল্পের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা ছিনিয়ে নেয় কন্যাশ্রী। জাতিসংঘ (UN) এই প্রকল্পকে জনপরিষেবায় প্রথম পুরস্কারে ভূষিত করে। ফলে ‘কন্যাশ্রী’ আজ রূপ নিয়েছে ‘বিশ্বশ্রী’-তে।

উপসংহার :

পরিশেষে বলা যায়, কন্যাশ্রী প্রকল্প বাংলার মেয়েদের চোখে নতুন জীবনের স্বপ্ন বুনে দিয়েছে। তবে এই সাফল্যের ধারা বজায় রাখতে প্রকল্পের আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা এবং সরকারি নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। প্রকৃত প্রাপক যাতে সঠিক সময়ে এই সহায়তা পায়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা জরুরি। আজকের কন্যাশ্রী কন্যারা আগামীর সমাজের কারিগর। তাদের জয়যাত্রায় ধ্বনিত হচ্ছে সেই গর্বিত স্লোগান— “আমি কন্যাশ্রী কন্যা / ভবিষ্যতের অনন্যা।”

PDF ডাউনলোড করার জন্য নীচের ডাউনলোড বাটনে ক্লিক করুন

 

Scroll to Top