WBCSSC বাংলা ইন্টারভিউ

প্রাচীনযুগ: চর্যাপদ
১. প্রশ্ন : অবাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্য নিদর্শনগুলিকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অন্তর্ভুক্তির কারণ কী?
উত্তর: বাঙালিরা সংস্কৃত প্রাকৃত অবহট্ট ভাষায় যেসব সাহিত্য রচনা করেছিলেন সেগুলিতে বাংলার সমাজ জীবন, প্রকৃতি, প্রেমভাবনা সর্বোপরি বাঙালির মানস সাহিত্যিক রূপ পেয়েছে এবং পরবর্তীকালের রাধাকৃষ্ণ লীলায়, রামকথা, মঙ্গলকাব্যের নানা অনুসঙ্গের পূর্বসূত্র এসব সাহিত্যে মেলে। এইসব কারণে এগুলিকে বাংলা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্তি করা হয়।
২. প্রশ্ন: চর্যাপদের আগে বাঙালিরা কোন ভাষায় সাহিত্য রচনা করতেন ?
উত্তর: চর্যাপদের আগে বাঙালিরা সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অবহট্ট ভাষায় সাহিত্য রচনা করতেন।
৩. প্রশ্ন: চর্যাপদের পুথি নেপালে পাবার কারণ কী?
উত্তর: তুর্কি আক্রমণকারীদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ এবং হিন্দু- বৌদ্ধ মঠ-মন্দির পুথিপত্র। তাই সেই আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য পুথিপত্র নিয়ে পার্শ্ববর্তী হিন্দু রাষ্ট্র নেপালে তারা পালিয়ে গিয়েছিল। এই কারণে চর্যার পুথি আবিষ্কৃত হয় নেপালে।
৪. প্রশ্ন: চর্যাপদের ভাষাকে সন্ধ্যাভাষা বলার কারণ কী?
উত্তর: চর্যাপদ গুলিতে পদকর্তারা যে ভাষা ব্যবহার করে বক্তব্য প্রকাশ করেছেন তা সর্বসাধারণের বোধগম্য নয়, তা সন্ধ্যার আলো-আঁধারের মতো রহস্যময় তাই একে সন্ধ্যাভাষা বলা হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন। সম্যক ধ্যানের মাধ্যমে এর অর্থ বুঝতে হয় তাই এর নাম সন্ধ্যাভাষা।
৫. প্রশ্ন : চর্যাপদের পদকর্তারা আলো–আঁধারি ভাষায় গানগুলি লিখতেন কেন?
উত্তর: গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায়ের লোকেরা সহজিয়াদের প্রতি প্রসন্ন ছিলেন না। তাই এই সমস্ত ব্রাহ্মণদের রক্তচক্ষু থেকে তাদের ধর্মাচরণকে রক্ষা করতেই বৌদ্ধসিদ্ধাচার্যেরা সন্ধ্যা ভাষার আশ্রয় নিতেন।
৬. প্রশ্ন: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চর্যাপদের গুরুত্ব কোথায়?
উত্তর: ১. চর্যাপদ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথম ও একমাত্র নিদর্শন।
২. চর্যাপদের তৎকালীন বাঙালিদের সমাজ ও জীবনচিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।
৩. বাংলা পয়ার ছন্দের ও নানা অলংকারের আদি উৎস হল চর্যাপদ
৭. প্রশ্ন: নবচর্যাপদ কী?
উত্তর: ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে ডঃ শশিভূষণ দাশগুপ্ত নেপালে ২০টি প্রাচীন পুথি থেকে ২৫০ টি চর্যাপদ পান। তার থেকে ৯৮টি পদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘নবচর্যাপদ’ নামে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু আকস্মিকভাবে শশিভূষণ দাশগুপ্তের মৃত্যু হলে ড. অসিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় নবচর্যাপদ প্রকাশিত হয়।
৮. প্রশ্ন : বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের যুগ বিভাগের প্রয়োজনীয়তা কী?
উত্তর: বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের যুগ বিভাগ করা এই জন্য প্রয়োজন যে, কোনো কবি সাহিত্যিক সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে যে তিনি কোন পর্বের ব্যক্তি। শুধু সাহিত্যিক সম্পর্কেই নয়, সমকালীন সমাজ জীবনের ইতিহাসের ধারাটি বুঝতে সুবিধা হয়।
মধ্যযুগ :
১. প্রশ্ন : বাংলা সাহিত্যে কোন সময়কে বন্ধ্যাযুগ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগ বলা হয়?
উত্তর: তুর্কি আক্রমণের পরবর্তী সময়কে অর্থাৎ ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীকে (১২০১-১৩৫০) ।
২. প্রশ্ন: ঐ সময়কে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকারময় যুগ বলা হয় কেন?
উত্তর: কারণ এই সময়ে কোনো সাহিত্য রচনা হয়নি, বা হলেও তার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়নি । তুর্কি আক্রমনের ফলে ১৫০ বছর বাংলা সাহিত্য তার সৃষ্টিশীল ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত ছিল তাই এই সময়কে অন্ধকারময় যুগ বলা হয় ।
৩. প্রশ্ন: বাংলা সাহিত্যে তুর্কি আক্রমণের প্রভাব সম্পর্কে বলুন।
১.চর্যাপদের মাধ্যমে সাহিত্য রচনার যে সূচনা তুর্কি আক্রমণের ভয়াবহতা তার ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করেছিল।
২. তুর্কি আক্রমণের ফলে ব্রাহ্মণ ও অব্রাহ্মণ, উচ্চ ও নিম্ন বর্গের সংযোগ নিবিড় হয়। এই মিশ্র সংস্কৃতির ফলে বাংলা সাহিত্যে মঙ্গলকাব্য ধারার সূত্রপাত ঘটে।
৩. মুসলমান শাসকরা হিন্দু শাস্ত্রের রসাস্বাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠে ফলে অনুবাদ শাখার সূত্রপাত ঘটে।
৪. প্রশ্ন: বাংলা সাহিত্যে একক কবি রচিত প্রথম কাব্য কোনটি ?
উত্তর: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
৫. প্রশ্ন: কাব্যটিকে কে, কত খ্রিস্টাব্দে, কোথা থেকে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্যের পুঁথিটি পণ্ডিত বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩১৬ বঙ্গাব্দে) বাঁকুড়া জেলার কাঁকিল্যা গ্রামের শ্রী দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ির গোয়াল ঘরের মাচা থেকে আবিষ্কার করেন।
৬. প্রশ্ন: ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন‘ কাব্যের পুঁথিটি কীসের উপর লেখা ছিল ?
উত্তর: তুলোট কাগজে।
৭. প্রশ্ন: ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন‘ কাব্যে ক‘টি খণ্ড রয়েছে ?
উত্তর: ১৩টি খণ্ড
৮. প্রশ্ন: খণ্ডগুলির নাম বলতে পারবেন ?
উত্তর: হ্যাঁ। জন্ম, তাম্বুল, দান, নৌকা, ভার,. ছত্র, বৃন্দাবন, কালিয়াদমন, যমুনা, হার, বান, বংশী এবং রাধাবিরহ।
৯. প্রশ্ন: ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন‘ কাব্যের রাধাবিরহ অংশটি কি প্রক্ষিপ্ত?
উত্তর: শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের শেষখণ্ড ‘রাধাবিরহ’ নামটির সঙ্গে খণ্ড শব্দটি না যুক্ত থাকার জন্য কেউ কেউ অনুমান করেন এই অংশটি প্রক্ষিপ্ত। কিন্তু কাহিনীর ধারাবাহিকতা, চরিত্র, ভাষা, ভণিতার ব্যবহার ইত্যাদি সবদিক বিচার করে রাধা বিরহ-কে প্রক্ষিপ্ত বলে মনে হয় না।
১০. প্রশ্ন: ‘চণ্ডীদাস সমস্যা‘ কী?
উত্তর: ১৯০৯ খ্রীঃ বড়ু ‘চণ্ডীদাস রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য আবিষ্কারের সাথে সাথে দেখা দেয় ‘চণ্ডীদাস সমস্যা । চৈতন্যদেব যে ‘চণ্ডীদাসের পদ আস্বাদন করতেন তা বড়ু ‘চণ্ডীদাসের নয় বলে মনে হয়। তাছাড়া একাধিক নামাঙ্কিত ‘চণ্ডীদাসের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। পদাবলীর ‘চণ্ডীদাস, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ‘চণ্ডীদাস, সহজিয়া ‘চণ্ডীদাস এর ফলে ‘চণ্ডীদাস সমস্যা দেখা দেয়।
১১. ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন‘ কাব্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বলো।
উত্তর: (ক) শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা অবলম্বনে রচিত প্রথম বাংলা আখ্যান কাব্য।
খ) এই কাব্যেই প্রথম আখ্যান, নাটক ও গীতিময়তার ত্রিবেণী সঙ্গম ঘটেছে।
গ) চরিত্র চিত্রণ এবং ছন্দ-অলংকার প্রয়োগ কাব্যের এক বিশিষ্ট দিক।
১২. প্রশ্ন: ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন‘ কাব্যটি আধুনিক পাঠকদের কাছে তেমন ভাবে সমাদার লাভ করেনি কেন?
উত্তর: (ক) আধ্যাত্মিকতা বর্জিত রাধাকৃষ্ণ প্রেম আধুনিক পাঠকদের হৃদয় হরণ করতে পারে নি।
(খ) কাব্যটির দুর্বোধ্য শব্দের ব্যবহার পাঠককে আকর্ষণ করতে পারে নি।
(গ) কাব্যটির কোন কোন অংশ পাঠকের কাছে অশ্লীল বলে মনে হয়।
১৩. প্রশ্ন: “যেখানে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের শেষ, সেখানে বৈষ্ণব পদাবলীর শুরু”—এই উক্তিটি কার? এমন মন্তব্যের কারণ কী?
উত্তর: প্রমথনাথ বিশী
বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি মানবীয় আবেগে পরিপূর্ণ, পরবর্তী কালে বৈষ্ণব পদাবলীতে সেই মানবপ্রেম আরও আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক রূপ লাভ করে—রাধা-কৃষ্ণের প্রেম সেখানে ভক্ত ও ভগবানের সম্পর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে।
অর্থাৎ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন মানবিক প্রেমের শেষ বিন্দুতে পৌঁছে যায়, আর সেখান থেকেই বৈষ্ণব পদাবলী ঈশ্বরভক্তির পথে যাত্রা শুরু করে। তাই বলা হয়—যেখানে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের শেষ, সেখানে বৈষ্ণব পদাবলীর শুরু।
মঙ্গলকাব্য:
১৪. প্রশ্ন: মঙ্গলকাব্য কী? এর মূল বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: মঙ্গলকাব্য হলো লৌকিক দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য রচিত ধর্মবিষয়ক আখ্যান কাব্য। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মানব সমাজে দেবতাকে প্রতিষ্ঠা করা।
১৫. প্রশ্ন: মঙ্গলকাব্যের প্রধান ধারাগুলো কী কী?
উত্তর: প্রধান তিনটি ধারা হলো মনসামঙ্গল , চণ্ডীমঙ্গল
১৬. প্রশ্ন: মনসামঙ্গল কাব্যের আদি ও শ্রেষ্ঠ কবি কে?
মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি হলেন কানাহরি দত্ত এবং শ্রেষ্ঠ কবি বিজয়গুপ্ত
১৭. প্রশ্ন: বিজয়গুপ্তের কবি কৃতিত্ব সম্পর্কে সংক্ষেপে বলুন ।
উত্তর: বিজয়গুপ্ত প্রধানত ভার তন্ময়তার কবি হলেও সংস্কৃত পুরাণ সাহিত্যে তাঁর যথেষ্ট পান্ডিত্য ছিল। গল্পরস সৃজনে, করুণ রস ও হাস্যরসের প্রায়াগে, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক জীবনের পরিচয়ে, চরিত্রচিত্রনে বিষয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ একটি জনপ্রিয় কাব্য।
১৮. প্রশ্ন : বাইশা কী ?
উত্তর: ‘বাইশা’ হল মনসামঙ্গল কাব্যের সংকলন গ্রন্থ। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আশুতোষ ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় বাইশ কবির মনসামঙ্গল বা ‘বাইশা’।
১৯. প্রশ্ন: চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবি কে?
উত্তর: চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের শ্রেষ্ঠ এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি হলেন মুকুন্দ চক্রবর্তী।
২০. প্রশ্ন: ‘কবিকঙ্কণ‘ উপাধিটি কার? উপাধিটি কে দিয়েছিলেন ? তাঁর দুটি চরিত্রের নাম বলুন।
‘কবিকঙ্কণ’ উপাধিটি মুকুন্দ চক্রবর্তীর।
উপাধিটি দিয়েছিলেন রঘুনাথ রায়।
তাঁর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের একটি জনপ্রিয় চরিত্র হলো কালকেতু ও ফুল্লরা।
২১. প্রশ্ন: “এ যুগে জন্মগ্রহণ করিলে তিনি কবি না হইয়া একজন উপন্যাস হইতেন।” – কে কার সম্পর্কে এই উক্তি করেছেন ?
শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মুকুন্দ চক্রবর্তী সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেছেন ।
২২. প্রশ্ন: কোন গ্রন্থে এই মন্তব্যটি করেছেন বলতে পারবেন ?
‘বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা’ গ্রন্থে।
২৩. প্রশ্ন: এমন মন্তব্যের কারণ কী ?
উপন্যাসের যে প্রধান লক্ষণ বাস্তবতা , চরিত্র সৃষ্টি, সমাজ অভিজ্ঞতা এবং আশাবাদী জীবন দর্শন প্রভৃতি মুকুন্দের ‘অভয়ামঙ্গল’ কাব্যের সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
২৪. প্রশ্ন–চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কোন্ কবির কাব্যে প্রথম মুরারী শীল ও ভাঁড়ু দত্ত চরিত্রটি পাওয়া যায়?
উত্তর : মুকুন্দ চক্রবর্তীর ‘অভয়ামঙ্গল’ কাব্যে।
২৫. প্রশ্ন–মধ্যযুগের কোন্ কবি নিজের কাব্যকে ‘নৌতন মঙ্গল‘ বলেছেন?
উত্তর: মুকুন্দ চক্রবর্তী।
২৬. প্রশ্ন-‘পিপীড়ার পাখা ওঠে মরিবার তরে‘-প্রবাদটি কার, কোন্ গ্রন্থে আছে?
উত্তর : মুকুন্দ চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল কাব্যে।
২৭. প্রশ্ন: রাঢ়ের জাতীয় কাব্য বলা হয় কোন কাব্যকে ?
ধর্মমঙ্গল কাব্যকে ।
২৮. প্রশ্ন: এ কথা কে বলেছেন ?
সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়।
২৯. প্রশ্ন– ধর্মমঙ্গল কাব্যকে কী রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য বলা যায়?
উত্তর : সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ধর্মমঙ্গল কাব্যকে রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য বলেছেন। কারণ, এই কাব্যে রাঢ় দেশের ইতিহাস, সমাজ ও বৃহত্তর জনজীবনের চালচিত্র নিখুঁতরূপে ধরা পড়েছে। রাঢ়ের ডোম চরিত্রের শৌর্যবীর্য ও সাহসিকতার পরিচয়ে বীররস উজ্জীবিত হয়েছে।
২। ধর্মমঙ্গলের কাহিনি কেবল রাঢ় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ এবং এই অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষাই কাব্যে উপস্থিত।
৩০. প্রশ্ন: “অন্নদামঙ্গল গান রাজকন্ঠের মণিমালার মতো”। – কে বলেছেন ?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩১. প্রশ্ন: ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যের তিনটি প্রবাদ প্রবচনের নাম বলুন।
নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়।
বাঘের বিক্রম সম মাঘের হিমানী ।
আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে ।
৩২. প্রশ্ন: অন্নদামঙ্গল কাব্যকে নতুন মঙ্গলকাব্য বলা হয় কেন ?
‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যকে নতুন মঙ্গল কাব্য বলা হয়, কারণ কবি স্বয়ং এটিকে ‘নূতন মঙ্গল’ বলেছেন। এটি প্রথাসিদ্ধ দেবমহিমা ছাপিয়ে মানুষের মাহাত্ম্য ও সমকালীন সমাজকে তুলে ধরে। কাহিনী ও চরিত্রে মানবিকতা আরোপিত হয় হয়। এর নাগরিক রুচি ও উন্নত শিল্পশৈলী একে পূর্ববর্তী মঙ্গলকাব্য থেকে স্বতন্ত্র করেছে।
৩৩. প্রশ্ন: ভারতচন্দ্রকে যুগসন্ধির কবি বলা হয় কেন ?
ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরকে যুগসন্ধির কবি বলা হয়, কারণ তিনি মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যের ধারা এবং আধুনিক যুগের বাস্তবতাবোধ ও নাগরিক রুচির মধ্যে সেতুবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর কাব্যে প্রাচীন ও নতুনের সংমিশ্রণ ঘটেছে।
কাব্যের বিষয়বস্তুতে পৌরাণিক দেবদেবী আধুনিক মানুষের রূপ ধারণ করেছে এবং দেব-দেবীর মাহাত্ম্য অপেক্ষা মানব মহিমার জয়গান ঘোষিত হয়েছে।
৩৪. প্রশ্ন: মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের আগে মঙ্গলকাব্যের প্রচার কীভাবে হতো?
উত্তর: মূলত পাঁচালী গানের মাধ্যমে, দলবদ্ধভাবে গান গেয়ে এবং পুঁথি পাঠের মাধ্যমে জনসাধারণের মধ্যে মঙ্গলকাব্যের কাহিনি ও মাহাত্ম্য প্রচার করা হতো।
বৈষ্ণব পদাবলী
৩৫. প্রশ্ন: বৈষ্ণব পদাবলি কাকে বলে?
উত্তর: রাধাকৃষ্ণ লীলা বিষয়ক শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর রসাশ্রিত গীতিব্যঞ্জনামূলক রসমধুর পদের সমষ্টি হল বৈষ্ণব পদাবলি।
৩৬. প্রশ্ন: প্রাক্–চৈতন্য ও চৈতন্যোত্তর বৈষ্ণব পদাবলী সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য কোথায় ?
(ক) প্রাক্-চৈতন্য যুগে শ্রীকৃষ্ণের ঐশ্বর্য রূপ প্রাধান্য পেয়েছে। চৈতন্যোত্তর যুগে শ্রীকৃষ্ণের মধুর রূপ প্রাধান্য পেয়েছে।
(খ) কবিদের প্রেম চেতনায় ব্যক্তিগত ভাবের উচ্ছ্বাস দেখা যায়। কবিদের ভক্ত প্রাণভাবের উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
(গ) এই পর্বে কবিদের ধর্মচেতনা আলাদা ছিল।
এই পর্বে কবিরা সকলেই গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত ছিলেন।
৩৭. প্রশ্ন: বৈষ্ণব পদাবলীর পাঁচটি প্রধান রস কী কী? কোন রসকে শ্রেষ্ঠ রস বলা হয় এবং কেন?
উত্তর: পাঁচটি প্রধান রস হলো: শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর। মধুর রসকে শ্রেষ্ঠ রস বলা হয়, কারণ এই রসে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা বর্ণিত হয়, যা জীবাত্মা-পরমাত্মার চরম মিলনের প্রতীক।
৩৮. প্রশ্ন: ব্রজবুলি ভাষা কী? বাংলা সাহিত্যের জন্য এর গুরুত্ব কতখানি?
উত্তর: এটি বাংলা, মৈথিলী ও অসমীয়া ভাষার মিশ্রণে গঠিত একটি কৃত্রিম বা কবিভাষা। বৈষ্ণব পদাবলীকে একটি সর্বভারতীয় রূপ দিতে এই ভাষার সৃষ্টি হয়েছিল। এর সুরমাধুর্য বাংলা সাহিত্যের রসবোধকে সমৃদ্ধ করেছে।
৩৯. প্রশ্ন: পূর্বরাগ কাকে বলে? এই পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি কে?
মিলনের পূর্বে যে রতি নায়ক-নায়িকার চিত্তে দর্শন ও শ্রবণের মাধ্যমে জাগ্রত হয় তাকে পূর্বরাগ বলা হয়। পূর্বরাগের সংজ্ঞায় শ্রীরূপ গোস্বামী ‘উজ্জ্বল নীলমণি’ গ্রন্থে বলেছেন-
“রতির্যা সঙ্গমাৎ পূর্বং দর্শন-শ্রবণাদিজা।
তয়োরুন্মীলতি প্রাজ্ঞৈঃ পূর্বরাগঃ স উচ্যতে।।”
এই রস পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি চন্ডীদাস।
৪০. প্রশ্ন: পূর্বরাগ ও অনুরাগের পার্থক্য বলুন।
মিলনের পূর্বে যে রাগ তাই পূর্বরাগ এবং মিলনের পরে যে রাগ তাই অনুরাগ ।
৪১. প্রশ্ন: অভিসার কাকে বলে? শ্রেষ্ঠ কবি কে?
প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনের বাসনায় নায়ক নায়িকার পূর্ব নির্দিষ্ট সংকেত কুঞ্জে যে গমন, তাকে অভিসার বলে।
অভিসার পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি গোবিন্দ দাস।
৪২. গৌরচন্দ্রিকা কাকে বলে?
গৌরাঙ্গ বিষয়ক যে পদ রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ কীর্তনের ভূমিকা হিসাবে গাওয়া হয়, তাকে ‘গৌরচন্দ্রিকা’ বলে।
৪৩. বৈষ্ণব কবিদের লীলাশুক বলা হয় কেন?
বৈষ্ণব কবিরা শুক পাখির মতো আপন আনন্দে ভাবতন্ময় হয়ে রাধাকৃষ্ণের কীর্তন করতেন। রাধাকৃষ্ণের লীলা বর্ণনাই তাঁদের একমাত্র সাধনা ছিল বলে তাদের লীলাশুক বলা হয়ে থাকে।
৪৪. “খেতুরীর উৎসব” বাংলা সাহিত্যে কেন স্মরণীয়?
উত্তর: ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে নরোত্তম ঠাকুর এই উৎসবের আয়োজন করেন। এই উৎসবে বৈষ্ণব রসশাস্ত্র আলোচনার মাধ্যমে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার হয়, যা বাংলা বৈষ্ণব সাহিত্যের গতিপথ নির্ণয়ে সাহায্য করে।
৪৫. বিদ্যাপতিকে ‘অভিনব জয়দেব‘ উপাধি কে দিয়েছিলেন এবং কেন?
মিথিলার রাজা শিব সিংহ বিদ্যাপতিকে অভিনব জয়দেব উপাধি দিয়েছিলেন। রাজসভার কবি বিদ্যাপতির পদে যে নাগরিক মানসিকতা, বিলাসবহুল সমারোহ, ছন্দের ঝংকার, অলংকারের কারুকার্য প্রতিফলিত হয়েছে তাতে জয়দেবের ‘গীতগোবিন্দম’ কাব্যের প্রভাব লক্ষ্য করে শিব সিংহ তাঁকে ‘অভিনব জয়দেব’ আখ্যা দিয়েছেন।
৪৬. বিদ্যাপতি বাংলা ভাষায় কোনো পদ রচনা করেননি তবু তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অন্তর্ভুক্ত করার কারণ কী ?
(ক) বিদ্যাপতির রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদাবলি বাঙালির অতি প্রিয় বিষয় ছিল।
(খ) রাধাকৃষ্ণের প্রণয়লীলা নির্ভর রচনার প্রতি বাঙালির অন্তরের টান ।
(গ) স্বয়ং, চৈতন্যদেব বিদ্যাপতির পদের রস আস্বাদন করতেন।
(ঘ) বিদ্যাপতির ব্রজবুলি ভাষা পরবর্তী বাঙালি কবিদের প্রভাবিত করেছিল।
৪৭. চণ্ডীদাসের সঙ্গে বিদ্যাপতির পার্থক্য বলুন ।
চণ্ডীদাস গ্রামবাংলার কবি। পাণ্ডিত্যবর্জিত সহজসরল ভাষায় তিনি রাধাকৃষ্ণ-বিষয়ক পদ রচনা করেন।
অন্যদিকে বিদ্যাপতি নাগরিক কবি পণ্ডিত। তাই তাঁর রচনায় বাকবৈদগ্ধ ও মণ্ডলকলার বৈচিত্র্য আছে।
রবীন্দ্রনাথের মতে :(ক) বিদ্যাপতি সুখের কবি, চণ্ডীদাস দুঃখের কবি’। (খ) চণ্ডীদাস গভীর এবং ব্যাকুল, বিদ্যাপতি নবীন এবং মধুর।
৪৮. পূর্বরাগের শ্রেষ্ঠ কবি কে? তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ কী?
চণ্ডীদাস পূর্বরাগের শ্রেষ্ঠ কবি। তার পূর্বরাগের পদগুলিতে শ্রীরাধার হৃদয়গ্রাহী ব্যাকুলতা যে বেদনাঘন ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে সমগ্র বৈষ্ণব পদসাহিত্যে তার তুলনা নেই। মানবহৃদয়ের চিরন্তন প্রেমাকূলতা যেন এসকল পদে রূপ লাভ করেছে।
মানবিক আবেদনে সর্বজনস্বীকৃত একটি পূর্বরাগের পদ-
“সই কেবা শুনাইল শ্যাম নাম।
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো
আকুল করিল মোর প্রাণ।”
৪৯. ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। –এটি কার লেখা?
চণ্ডীদাস ।
৫০. প্রশ্ন– জ্ঞানদাসকে চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য বলা হয় কেন?
উত্তর : জ্ঞানদাস রূপানুরাগ ও আক্ষেপানুরাগের পদগুলিতে চণ্ডীদাসের মতোই সহজ সরল ভাষায় ভাবের গভীরতাকে প্রকাশ করেন। তাঁর পদে চণ্ডীদাসের মতো প্রেমের তীব্র জ্বালা, মিলনের ব্যাকুলতা ও বিরহের তীব্র আভি প্রতিফলিত হয়েছে বলে জ্ঞানদাসকে চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য বলা হয়।
৫১. গোবিন্দ দাসকে ‘দ্বিতীয় বিদ্যাপতি‘কে বলেছেন এবং কেন?
কবি বল্লভ দাস গোবিন্দ দাসকে ‘দ্বিতীয় বিদ্যাপতি’ বলেছেন। কবি গোবিন্দ দাস কাব্যাদর্শের দিক থেকে বিদ্যাপতিকে বিশেষভাবে অনুসরণ করেছেন। বিদ্যাপতির ছন্দ মাধুর্য, অলংকারের ঝঙ্কার গোবিন্দদাসের প্রতিভায় নতুনভাবে বিকশিত হয়েছে।
৫২. বৈষ্ণব পদাবলীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন।
বৈষ্ণব পদাবলীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। মানুষের জীবনযাপন, তাদের বিশ্বাস-সংস্কার, এমনকি তৎকালীন বাংলা ভাষার রূপটিও পদাবলীর মধ্যে ধরা পড়েছে। বৈষ্ণব পদাবলী কেবল এক ধরনের গীতিকাব্যই নয়, এটি একটি ধর্মীয় আন্দোলনেরও প্রতিফলন। এই আন্দোলন তৎকালীন সমাজের অনেক সামাজিক ভেদাভেদকে দূর করতে সক্ষম হয়েছিল। তাই বৈষ্ণব পদাবলীকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা বলা যেতে পারে।
৫৩. দুজন মুসলমান বৈষ্ণব কবির নাম বলুন।
শেখ কবীর, সৈয়দ মর্তুজা (সপ্তদশ শতাব্দী)
৫৪. বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীর নাম বলুন।
সনাতন গোস্বামী, রূপ গোস্বামী, জীব গোস্বামী, গোপাল ভট্ট, রঘুনাথ ভট্ট ও রঘুনাথ দাস।
৫৫. গৌরচন্দ্রিকা ও গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
উঃ গৌরাঙ্গদেবের অন্তরঙ্গ এবং বহিরঙ্গ জীবনের যেকোনো প্রসঙ্গ নিয়ে রচিত পদই হল গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ। কিন্তু গৌরাঙ্গ বিষয়ক যে পদ রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক পদ কীর্তনের ভূমিকা হিসাবে গাওয়া হয়, তাকে ‘গৌরচন্দ্রিকা’ বলে।
চৈতন্যজীবনী সাহিত্য:
৫৬. বাংলা সাহিত্যে কোন্ সময়কে সুবর্ণ যুগ বলা হয় এবং কেন?
বাংলা সাহিত্যে ষোড়শ শতাব্দীকে সুবর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাবকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটির শাখা নব নব রূপে মুকুলিত ও পল্লবিত হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্যের ঐশ্বর্যময় এই পর্বটিকে তাই সুবর্ণযুগ বলে উল্লেখ করা হয়।
৫৭. চৈতন্যদেবের জন্ম ও মৃত্যু সাল বলুন।
চৈতন্যদেবের জন্ম ১৪৮৬ সালে ও মৃত্যু ১৫৩৩ সালে।
৫৮. চৈতন্যদেব কোন গ্রন্থ রচনা করেননি তবুও বাংলা সাহিত্যে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ কেন ?
চৈতন্যদেব নিজে কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি, তবুও বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অপরিসীম। তিনি ভক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে ধর্ম, প্রেম ও মানবতার বার্তা প্রচার করেন। তাঁর জীবন ও উপদেশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বহু কবি ও সাহিত্যিক ভক্তিকাব্য রচনা করেছেন, যা সাহিত্যকে নতুন দিশা দিয়েছে।
৫৯. প্রশ্ন: চৈতন্য দেবকে নিয়ে লেখা প্রাচীনতম জীবনীগ্রন্থ কোনটি? এর রচয়িতা কে?
উত্তর: প্রাচীনতম জীবনীগ্রন্থ হলো ‘চৈতন্যভাগবত’ । এর রচয়িতা হলেন বৃন্দাবন দাস।
৬০. ‘চৈতন্যভাগবত‘ গ্রন্থটি স্মরণীয় কেন?
(ক) চৈতন্যভাগবত বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম চৈতন্য জীবনী গ্রন্থ।
(খ) গ্রন্থটিতে শ্রীচৈতন্যের জীবন ও বাংলা বৈয়বধর্ম সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।
(গ) গ্রন্থটি ষোড়শ শতাব্দীর বাংলা দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের জীবন্ত দলিল।
৬১. শ্রেষ্ঠ চৈতন্যজীবনী গ্রন্থ কোনটি এবং কেন?
উত্তর: শ্রেষ্ঠ চৈতন্যজীবনী গ্রন্থ হল ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ ভক্তি ও আন্তরিকতা সহকারে শ্রীচৈতন্যের জীবনের পবিত্র আদর্শকে তুলে ধরেন। তাঁর বাস্তবতা বোধ, দার্শনিক তত্ত্বের ব্যাখ্যা, ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি, শব্দ ছন্দের ব্যবহার কাব্যটিকে শ্রেষ্ঠ চৈতন্যজীবনী কাব্যে পরিণত করেছে।
অনুবাদ সাহিত্য :
৬২. প্রশ্ন–মধ্যযুগে অনুবাদ সাহিত্য রচিত হল কেন?
উত্তর (ক) তুর্কি আক্রমণের পর নবগঠিত বাঙালি জাতির সামনে হিন্দুর পৌরাণিক আদর্শ তুলে ধরার জন্য অনুবাদ সাহিত্যের সূত্রপাত ঘটে।
(খ) মুসলমান শাসকেরা বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি কৌতূহলী হওয়ায় তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুবাদ সাহিত্যের সূচনা হয়।
৬৩. বাংলাভাষার গঠনে অনুবাদ সাহিত্যের ভূমিকা কী?
যে কোনো ভাষাসাহিত্যের সমৃদ্ধির জন্য অপরাপর শ্রেষ্ঠ ও সম্পদশালী ভাষার সাহিত্য কীর্তির অনুবাদ একশটি আবশ্যিক উপাদান। যেভাষার অনুবাদ সাহিত্য মত সম্পদশালী, সেই ভাষা তত বলিষ্ঠ। বিশেষ করে নতুন গঠমান ভাষার পক্ষে অনুবাদ আমোন্নতি সাধনের এক অপরিহার্য পদ্মা।
৬৪. কৃত্তিবাসী রামায়ণের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণ কী?
১. রামায়ণের মূল চরিত্রগুলির মধ্যে বাঙালি স্বভাবের প্রতিচ্ছবি
২.কাব্যে প্রতিফলিত বাংলার পরিবেশ ও প্রাত্যহিক জীবনচিত্র
৩. ভক্তি ও করুণরসের সর্বজনগ্রাহ্যতা
৪. সাধারণ মানুষের মননে সহায়ক পাঁচালির ঢঙ।
৬৫. রামায়ণ মহাভারতের মতো ভাগবত পুরাণ জনপ্রিয়তা লাভ করেনি কেন ?
উত্তর : (ক) ভাগবত বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের গ্রন্থ ছিল বলে সর্বজনীন আবেদন লাভ করতে পারেনি।
(খ) ভাগবতের শুষ্ক বীররসে বাঙালি পাঠকের রুচি ছিল না।
শাক্তপদাবলী
৬৬. প্রশ্ন: শাক্তপদাবলী কাকে বলে?
জগজ্জননী দেবী আদ্যাশক্তি দুর্গাকে ভক্তি বাৎসল্যের মাধ্যমে পূজার্চনা করতে গিয়ে সাধক কবিরা যে গীতিবহুল ভক্তিভাবের চমৎকার পদ বা কবিতা রচনা করেছিলেন তাকে বলা হয় শাক্তপদাবলী।
৬৭. শাক্ত পদাবলীর প্রধান কবি কে ?
শাক্ত পদাবলীর প্রধান কবি হলেন রামপ্রসাদ সেন।
৬৮. আপনি রামপ্রসাদ ও কমলাকান্তের মধ্যে কী পার্থক্য দেখতে পান ?
রামপ্রসাদ সেন ভক্তের আকুতি পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন আর কমলাকান্ত শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন আগমনী ও বিজয়া পর্যায়ে।
রামপ্রসাদ সহজ ভাবনাকে সরল ভাষায় ভাষায় প্রকাশ করেছেন, আর কমলাকান্ত মনের ভাবকে ছন্দ অলংকারে সজ্জিত করে শিল্পসম্মত রূপ দিয়েছেন।
৬৯. প্রশ্ন: শাক্তপদাবলীর অপর নাম কী ? এবং কেন?
শাক্তপদাবলীর অপর নাম ‘মালসীগান’। শাক্তপদাবলীর গানগুলি মালবশ্রী রাগে গাওয়া হত বলে গানগুলির অপর নাম মালসী গান
৭০. শাক্ত পদাবলী ও বৈষ্ণব পদাবলীর মধ্যে পার্থক্য কোথায় ?
১. বৈষ্ণবপদাবলীর বিষয়বস্তু রাধাকৃষ্ণের সূক্ষ্ম রসোতীর্ণ প্রেমগীতিকা। শাক্তপদাবলী বাস্তব বাংলাদেশের বাস্তব মায়ের বেদনার গান।
২. বৈষ্ণবপদাবলীর মূলরস মধুর রস। শাক্তপদাবলীর মূলরস বাৎসলী।
৩.বৈষ্ণব কবিদের সাধনা ভাবপ্রধান। শাক্ত কবিদের সাধনা ক্রিয়াপ্রধান।
৭১. বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আদি কবি কে? তাঁর লেখা একটি গ্রন্থের নাম বলুন ।
শাহ মুহম্মদ সংগীর। তাঁর লেখা কাব্যের নাম ইউসুফ জুলেখা।
৭২. ষোড়শ শতাব্দীর দুজন ইসলামী কবির নাম বলুন।
সাবিরিদ খান ও বাহারাম খান ।
৭৩. তাঁদের লেখা একটি করে কাব্যের নাম বলুন।
সাবিরিদ খানের রাসুল বিজয়। বাহারাম খানের লায়লী মজনু ।
৭৪. প্রশ্ন: রোসাঙ রাজসভার দুজন কবির নাম বলুন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে রোসাঙ রাজসভা প্রসিদ্ধ কেন?
উত্তর: সপ্তদশ শতাব্দীর দুই স্বনামখ্যাত কবি দৌলত কাজি ও সৈয়দ আলাওল রোসাঙ রাজসভার সভাকবি ছিলেন।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মানব রসমণ্ডিত রোমান্টিক কাহিনিকাব্য এবং হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় সাহিত্যের পষ্ঠপোষকতার জন্য রোসাঙ রাজসভা প্রসিদ্ধি অর্জন করেছে।
৭৫. প্র: বাংলা সাহিত্যে আরাকান রাজসভার গুরুত্ব সম্পর্কে বলুন।
উঃ ১. আরাকান রাজসভার হাত ধরেই মধ্যযুগের দেবকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে মানব-মানবীর প্রণয় কাহিনিকে আশ্রয় করে সাহিত্য রচনা শুরু হয়।
২. এই রাজসভার কারণে বাঙালি হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির সংযোগ ঘটে এবং মানবতাবাদের মহিমা ঘোষিত হয়।
৭৬. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে দৌলত কাজির ‘লোরচন্দ্রাণী‘ স্মরণীয় কেন?
দৌলত কাজির ‘লোরচন্দ্রাণী’ মধ্যযুগের দেববাদপুষ্ট বাংলা সাহিত্যের গতানুগতিকতা ভঙ্গ করে নতুন জীবনাদর্শের জয়ধ্বনি ঘোষণা করেছে। অনুভূতির গভীরতায়, মানব চরিত্রের সার্থক রূপায়ণে, প্রেমের মুক্তমহিমা প্রচারে ও সহজ রচনারীতিতে দৌলত কাজির ‘লোরচন্দ্রাণী’ কাব্যটি স্মরণীয় হয়ে আছে।
৭৭. প্রশ্ন: নাথ সাহিত্য কেন বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: নাথ সাহিত্য সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের জীবনযাত্রা, যোগসাধনা এবং অলৌকিক ক্ষমতার কাহিনি বর্ণনা করে। ‘গোরক্ষবিজয়’ হলো এই ধারার প্রধান গ্রন্থ। এটি মধ্যযুগের ধর্মীয় সাহিত্যের একটি লোকায়ত ধারা।
৭৮. গীতিকা কী?
স্থানীয় বা ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে ছড়া, পাঁচালির আকারে মুখে মুখে রচিত ও প্রচারিত লোকসঙ্গীতই হল গীতিকা। গীতিকা লোকসঙ্গীত হলেও কাহিনিমূলক।
৭৯. গাথা বলতে কী বোঝ?
ইংরেজি Ballad-এর বাংলা প্রতিশব্দ ‘গাথা’। প্রাচীন কালে নৃত্য সহযোগে যে কবিতা গীত হত তাকে গাথা বলা হত। এখন গাঁথা বলতে আমরা কোন লোকপ্রিয় পল্লীগান অথবা বিশেষ প্রতিবেশ সমালোচনামূলক সহজ, সাবলীল লঘুগতি কবিতাকে বুঝে থাকি।
৮০. ময়মনসিংহ গীতিকার আবিষ্কারক, সংগ্রাহক ও প্রকাশক সম্পর্কে বলুন।
ময়মনসিংহ গীতিকার আবিষ্কারক ও সংগ্রাহক হলেন চন্দ্রকুমার দে।
১৯২৩ সালে ময়মনসিংহ গীতিকা প্রকাশিত হয় ড. দীনেশচন্দ্র সেন-এর সম্পাদনায় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
৮১. বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের কোন সময়কে অবক্ষয়ের যুগ বলা হয় এবং কেন?
বাংলা সাহিত্যে মধ্যযুগের শেষ পর্ব তথা অষ্টাদশ শতককে অবক্ষয় যুগ বলা হয়। কারণ এই সময়ে বাংলা সাহিত্যে মৌলিকতা ও ভাবগত গভীরতা হারিয়ে যায়।
ভক্তিপ্রধান কাব্যের পুনরাবৃত্তি, কৃত্রিম অলংকারপ্রিয়তা, ও নৈতিক-সামাজিক চিন্তার অভাব দেখা দেয়।নতুন সৃজনশক্তির পরিবর্তে অনুকরণ ও ধর্মকেন্দ্রিক ভাবধারা প্রাধান্য পায়।তাই মধ্যযুগের অষ্টাদশ শতকের সাহিত্যকালকে “অবক্ষয় যুগ” বলা হয়।
